২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তাদের চোখে আগামীর স্বপ্ন ...

তাদের চোখে আগামীর স্বপ্ন ...

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ অ-২১ জাতীয় হকি দলের ক্যাম্প শুরু হয়েছে ১ আগস্ট থেকে। এই ক্যাম্পের উদ্দেশ্য- আগামী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের পাইপলাইন সমৃদ্ধ করা। মোট তিনটি বয়সভিত্তিক দল গঠনের পরিকল্পনা আছে হকি ফেডারেশনের। অ-১৮, অ-২১ এবং এর নিচের বয়সের যেকোন একটি দল। এছাড়া ‘এ’ দলও গঠন করা হবে। এই খেলোয়াড়দের প্রিমিয়ার ডিভিশন, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে খেলানো হবে এবং খেয়াল রাখা হবে যেন খেলোয়াড় সঙ্কট না হয় এবং খেলোয়াড়রা যেন স্কিলফুল হয়। ফেডারেশনের এটাই মূল উদ্দেশ্য। এই দলের সহকারী কোচ আলমগীর আলম বলেন, ‘আমরা যখন খেলোয়াড় ছিলাম, তখন কখনই এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী ক্যাম্প হতে দেখিনি।’

এই দলের খেলোয়াড়দের বাছাই প্রক্রিয়াটা ছিল এরকম। প্রথমে সারা দেশ থেকে আগ্রহী খেলোয়াড়দের উন্মুক্ত ট্রায়ালের জন্য ডাকা হয় ঢাকার মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে। সেখান উপস্থিত ছিল মোট ১০৭ খেলোয়াড়। এরা এসেছে বিভিন্ন সার্ভিসেস সংস্থা, বিভিন্ন জেলা ও বিকেএসপি থেকে। সেখানে ১৮ খেলোয়াড় পাওয়া যায়, যারা এর আগেও বিভিন্ন জাতীয় দলে খেলেছে এবং এখনও তাদের বয়স আছে, তাদের আলাদা করে রাখা হয় এই ট্রায়ালের বাইরে। পরে যথাসময়ে (আগামী ১৮ আগস্ট) তাদের এই দলের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। আপাতত ১০৭ জনের মধ্যে থেকে গত সাত দিনে বাছাই করে ৩৫ খেলোয়াড়কে ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। আর কিছু খেলোয়াড় নিয়ে অ-১৮ দল গড়ার প্রক্রিয়া চলছে। ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক খুব শিগগীরই অ-১৮ দল নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্যাম্প করার সিদ্ধান্ত নেবেন।

অ-২১ দলটির লক্ষ্য হবে ২০২০ সালের মার্চে (সম্ভাব্য মাস, এখনও চূড়ান্ত হয়নি) জুনিয়র বিশ্বকাপে অংশ নেয়া। ওই সময় পর্যন্ত এই দলের খেলোয়াড় থাকবে ৩৫ থেকে ৪০ জন। তবে কোন টুর্নামেন্টে অংশ নিলে তখন দলে থাকবে ১৮ জন। তাই বলে বাকিদের কিন্তু বাদ দেয়া হবে না। তারাও ক্যাম্পে থাকবে, তাদের পরে অন্য কোন আসরে খেলার সুযোগ করে দেয়া হবে। আলম বলেন, ‘তাদের যদি আমরা উন্নত প্রশিক্ষণ এবং পরিচর্যা করতে পারি, তাহলে আশা করা যায় বাংলাদেশ যুব হকি দলটি আগামী ৩-৪ বছরের মধ্যেই তারা শক্তিশালী জাতীয় দলে পরিণত হবে। কেননা জিমিসহ অনেক খেলোয়াড়ই ওই সময়ে অবসর নিয়ে নেবে। তখন তাদের শূন্য জায়গাটা এরাই নিয়ে নেবে।’

কি ধরনের হকি খেলোয়াড় আছে ক্যাম্পে? আলম বলেন, ‘গরিব ঘরের খেলোয়াড়, লেখাপড়া জানা খেলোয়াড়, লেখাপড়া না করা খেলোয়াড় ... সব ধরনের খেলোয়াড়ই আছে। তবে সবাই হকিকে ভালবেসে এখানে এসেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই।’

এই ৩৫ খেলোয়াড় থাকছেন মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামেই। তাদের থাকা, খাওয়া সবকিছু দেখছে ফেডারেশন। আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে অচিরেই বিদেশ থেকে ভালমানের কোচ নিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফেডারেশন। বিদেশী কোচের সঙ্গে দেশী কোচরা একই ধাঁচে কাজ করে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে হকি লম্বা সময় যেন সার্ভিস দিতে পারে, সেটাও ফেডারেশনের পরিকল্পনা। তাছাড়া জাতীয় দলের খেলোয়াড় সংগ্রহর জন্য বিকেএসপির ওপর বেশিমাত্রায় যেন নির্ভরশীল হতে না হয়, সেটাও ফেডারেশনের মাথায় আছে।

অ-২১ দলের খেলোয়াড়দের বেশিরভাগই এর আগে নিজ নিজ এলাকায় হকি খেলেছে ঘাসের মাঠে। কিন্তু এখন তাদের অনুশীলন করতে হচ্ছে টার্ফে। মানিয়ে নেয়া কতটা কষ্টসাধ্য? আলম বলেন, ‘সবাই যেন টার্ফে মানিয়ে নিতে পারে, সেজন্যই আমরা তাদের নিয়ে লম্বা সময়ের জন্য ক্যাম্প করবো, এই সময়ের মধ্যে ওরা এতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। তখন আর কোন সমস্যা হবে না।’

ঈদের ছুটির কারণে ক্যাম্প বন্ধ হয় ৭ আগস্ট বুধবার। আবার খুলবে ১৮ আগস্ট। ক্যাম্পে শুরু থেকেই সচেতন থাকার কারণে হকি ক্যাম্পের কোন খেলোয়াড়ই ভয়াবহ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়নি। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাবার আগে দেখা গেল প্রত্যেক খেলোয়াড়কে একটি করে টি-শার্ট দেয়া হচ্ছে। এছাড়া তাদের দৈনিক ভাতা হিসেবে কিছু টাকা দেয়া হয় এবং শিগগীরই তাদের প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম দেয়া হবে বলে জানালেন আলম।

কথা হয় ক্যাম্পের তিন খেলোয়াড়ের সঙ্গে। আল-নাহিয়ান শুভ। কিশোরগঞ্জের ছেলে। সেন্টার মিডফিল্ডার। আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ে যখন ক্লাস সিক্সে পড়ে তখন তিনি হকি খেলায় আগ্রহী হন। তিনি বলেন, ‘যদিও আমার সমবয়সীরা তখন ক্রিকেটই বেশি খেলতো। আমিও ক্রিকেট খেলতাম। কিন্তু যখন দেখলাম সবাই ক্রিকেটে ভিড় করছে, তখন হকি বেছে নিই। তারপর বিকেএসপিতে ভর্তির জন্য এলাকার স্টেডিয়ামে ট্রায়াল দিই এবং টিকে যাই। তৃণমূল ক্যাম্প থেকে বিকেএসপিতে চলে যাই। আমার স্কুলশিক্ষক বাবা (চান্দুগনি স্কুলের প্রধান শিক্ষক) নুরুল হক এবং গৃহিণী মা আফরোজা সুলতানা আমাকে শুরু থেকেই হকি খেলতে পূর্ণ সমর্থন-সম্মতি দিয়েছেন।’

জাতীয় দলের তারকা ফরোয়ার্ড রাসেল মাহমুদ জিমিকে নিজের আদর্শ মনে করেন শুভ। প্রিমিয়ার লিগে সোনালী ব্যাংকের হয়ে তার বিরুদ্ধে খেলেছেনও। ‘এছাড়া জাতীয় দলের ক্যাম্পে ওনার সঙ্গে ছিলাম। খেলার ব্যাপারে তার কাছ থেকে অনেক উৎসাহ-পরামর্শ পেয়েছি। তবে লজ্জায় তাকে কখনও বলতে পারিনি তিনি যে আমার প্রিয় খেলোয়াড়! ভবিষ্যত লক্ষ্য জাতীয় দলে খেলা এবং বিশ্বকাপে খেলা। স্মরণীয় কোন স্মৃতি? ‘২০১৬ সালে ঊষার হয়ে ক্লাব কাপ হকি খেলার সময় একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমাকে খেলা শেষ হবার তিন মিনিট আগে মাঠে নামানো হয়। প্রতিপক্ষ ছিল মোহামেডান। তখন খুবই ঘাবড়ে যাই। দুই দলেই জাতীয় খেলোয়াড়ের ছড়াছড়ি। মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম বল যেন আমার কাছে না আসে! কিন্তু সেটা হয়নি। ওই খেলা শেষ হবার মাত্র ৩০ সেকেন্ড আগে পুস্কর খিসা মিমো ভাইয়ের গোলে আমরা জিতে যাই।’ শুভর স্মৃতিচারণ।

আবেদ উদ্দিন। পুরনো ঢাকার ছেলে। বাসা আরমানিটোলা। মিডফিল্ডার। ‘ওস্তাদ ফজলু ভাই’-এর শিষ্য তিনি। বড় দুই ভাইও জাতীয় দলের হকি খেলোয়াড়। একজন নাঈম উদ্দিন, অন্যজন আফসার উদ্দিন (অ-২১ দলে খেলেছেন)। আবেদ পুরোপুরি হকি পরিবারের ছেলে। কোন সন্দেহ নেই, বড় দুই ভাইকে দেখেই হকির অঙ্গনে আসেন আবেদ। তার আদর্শ কামরুজ্জামান রানা। এ পর্যন্ত ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ও মোহামেডানে খেলেছেন আবেদ। এ পর্যন্ত আসার পেছনে বিকেএসপির অবদান অনস্বীকার্য বলে জানান আবেদ।

ইয়ুথ অলিম্পিক কোয়ালিফাই খেলতে থাইল্যান্ড এবং আরেকটি টুর্নামেন্ট খেলতে জাতীয় দলের হয়ে আজের্ন্টিনা সফর করেছেন আবেদ। পাঁচ ভাই, চার বোনের মধ্যে সবার ছোট আবেদ। ব্যবসায়ী বাবা হাজী মোঃ মোস্তফা হোসেন এবং গৃহিণী মা রওশন আরা বেগম কখনই আবেদকে হকি খেলতে বাধা দেননি। বাংলাদেশ জাতীয় সিনিয়র দলের হয়ে অলিম্পিক এবং বিশ্বকাপ হকিতে খেলার স্বপ্ন বুকে লালন করে আবেদ। স্মরণীয় ঘটনা? ‘থাইল্যান্ডে গিয়ে কোরিয়ার সঙ্গে খেলার আগে দলের সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। কেননা তারা অনেক শক্তিশালী দল। অবিশ্বাস্য ব্যাপার-ওই ম্যাচে আমরা অসাধারণ খেলে ৫-৪ গোলে জিতে যাই! দলের প্রথম গোলটা আমার ছিল।’

মোহাম্মদ আনাস। পজিশন সেন্টার ফরোয়ার্ড। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ লাইনে বাড়ি। পুলিশ লাইন স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়তেন। ফরোয়ার্ড হিসেবে ফুটবল খেলতেন। মাঠের অন্য পাশে ছেলেরা স্টিক দিয়ে হকি খেলতো। স্টিক দেখেই মূলত এই খেলার প্রতি আকৃষ্ট হন। এক মাস পর বিকেএসপিতে হকিতে ট্রায়াল দিয়ে চান্স পান। ২০১১ সালে ওখানে ভর্তি হই। তবে পারিবারিক সমস্যার কারণে ২০১৪ সালে বিকেএসপি ছাড়তে বাধ্য হন। দশম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করেননি। কেন? ‘ইচ্ছে করে না। শুধু খেলতে মন চায়।’ ২০১৪ সালেই বাবা মোঃ আসলাম (মাইক্রোবাস চালক) স্ট্রোক করে মারা যান। ‘আমার কোন ভাই বোন নেই। মা এবং আমি আছি। সংসার চলে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া কিছু সম্পত্তি এবং একটি দোতলা বাড়ি ভাড়া দিয়ে।’ জাতীয় দলের হয়ে খেলে দেশের জন্য কিছু করতে চান আনাস। এজন্য দ্বিগুণ পরিশ্রম করতেও রাজি আছেন তিনি। তার প্রিয় খেলোয়াড় রুম্মান সরকার। এ পর্যন্ত তিনি খেলেছেন শিশু-কিশোর সংঘ, আজাদ, পিডব্লিউডি এবং এ্যাজাক্সে। এরপর আবাহনী-মোহামেডান-ঊষার মতো দলে খেলতে চান তিনি।

নির্বাচিত সংবাদ