২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এখন একটাই কাজ এডিস মশা নিধন

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা লন্ডনে চোখের চিকিৎসা শেষে (অস্ত্রোপচার) বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলার সময় নির্দেশ প্রদান করেছেন, ‘এখন একটাই কাজ এডিস মশা নিধন।’

সত্যি এর বাইরে এখন আর অন্য কাজ নেই। ঘরে ঘরে এখন ডেঙ্গু আতঙ্ক। হাসপাতালে স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। চিকিৎসক-নার্সদের দম ফেলার সময় নেই। সকাল-বিকেল-মধ্যরাত হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসার জন্যে আসছে অথবা ডেঙ্গু সন্দেহে টেস্ট করার জন্য দৌড়াচ্ছে। এরই মধ্যে কত লোক আক্রান্ত হয়েছে, কত মৃত্যুবরণ করেছে তারও কোন সঠিক হিসেব কেউ দিতে পারছে না। এমনি একটা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে গণভবনে দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। দুইবারে প্রধানমন্ত্রীর দুই চোখেই সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি এখন সুস্থ আছেন। নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা জাতিসংঘের অটিজমবিষয়ক উপদেষ্টা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন (পুতুল) তার পাশে ছিলেন। নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, বেগম মতিয়া চৌধুরী, ওবায়দুল কাদের, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, ব্যারিস্টার নওফেল, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, আহমদ হোসেন, সুজিত রায় নন্দী, হারুনুর রশীদ, নাজমা বেগম, অপু উকিল, মারুফা আখতার পপি, এসএম কামাল, নুরুল আমিন রুহুল প্রমুখ। সকাল ৯টা থেকে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর জন্য গণভবনে অপেক্ষা করছিলাম। বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি বিমানে করে দীর্ঘ আকাশ পথ পাড়ি দিয়ে বেলা পৌনে ১১টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখান থেকে সরাসরি তার সরকারী বাসভবন গণভবনে ফিরে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সঙ্গত কারণেই তার এই নির্দেশ কেবল দলীয় নেতা- নেত্রীদের জন্যে ছিল না, এ নির্দেশ দলের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরের নেতা-কর্মীর প্রতিও ছিল। ছিল সচেতন নাগরিকদের প্রতিও। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে গণসচেতনতা সৃষ্টির ওপর বিশেষভাবে জোর দেন। চিকিৎসার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিরাময়ের পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল যাতে সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এ সময়ের সবচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রফেসর ডাঃ এবিএম আবদুল্লাহ প্রথম থেকেই দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় কলাম প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের সচেতনতার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। এখন শোকের মাস আগস্ট এবং আগামী ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ পরিবারের সদস্যগণ ওইদিন শাহাদাতবরণ করেন। কী নির্মম, কী বীভৎস, কী হৃদয় বিদারক ছিল সেই ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। একরাতে শেষ হয়ে গেল বাঙালী জাতির পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে সংগ্রামী, সবচেয়ে ত্যাগী, সবচেয়ে সাহসী, মানবদরদী রাজনৈতিক পরিবারটি। ঘটনাক্রমে ওই সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত অণুবিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে জার্মানীতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। হয়তো এখানেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কারিশমা যে, তিনি শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রাখেন উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য। আজ আমরা সেই বাংলাদেশের নাগরিক।

আর দু’দিন পরই পবিত্র ঈদ-উল-আজহা বা কোরবানির ঈদ। লাখ লাখ মানুষ এরই মধ্যে গ্রামের পথে চলেছেন বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানির সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার জন্য। জর্দা-সেমাই-পায়েস রান্না হবে, খাওয়া হবে। কোরবানির গরম গরম ভুনা মাংস খাওয়া হবে, এ বাড়ি-ও বাড়ি গিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি হবে। এমনি ভাবেই চিরায়ত বাংলার ঈদ উদযাপিত হবে। ঈদের নামাজ শেষে কবরস্থানে ঘুরে স্বজনের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করবে- ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুরে অইন্না ইনশাল্লাহু বেকুম লাহেকুম..... (হে কবরবাসী, আপনাদের ওপর আল্লাহ পাকের শান্তি বর্ষিত হোক, আপনারা ঘাবড়াবেন না, আল্লাহ চাহে তো খুব শীঘ্রই আপনাদের সঙ্গে আমরাও মিলিত হব...)।

তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে ক্ষমা চেয়ে কয়েকটা কথা বলতে চাই। আমরা জানি কোরবানির শুরু হয়েছিল হজরত ইব্রাহিম (আ.) থেকে। আল্লাহ নির্দেশ করেছিলেন তাকে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দেয়ার জন্য। হজরত ইব্রাহিম তার সবচেয়ে প্রিয় হিসেবে নিজ ছেলে হজরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং যথারীতি প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। হজরত ইসমাইলও হাসিমুখে পিতার হাতের ছোরার নিচে শুয়ে পড়লেন। এমনকি এমনও নাকি বলেছিলেন, ইয়া নবী আল্লাহ (হজরত ইব্রাহিম), আপানি চোখ বেঁধে নিন, নইলে ছোরা চালানোর মুহূর্তে আমার চেহারার দিকে তাকালে আপনার হাত থেকে ছোরা পড়ে যেতে পারে। আল্লাহ পাক খুশি হলেন এবং ইব্রাহিম (আ.) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন ও হজরত ইসমাইলকে (আ.) সরিয়ে তদস্থলে একটি দুম্বা তথা পশু শুইয়ে দিলেন এবং পশুটি কোরবানি হয়ে গেল। এখানে তিনটি জিনিস খুব তাৎপর্যপূর্ণ :

এক. কোরবানি অর্থ ত্যাগ বা Sacrifice

দুই . প্রিয় বস্তু কোরবানি

তিন. কোরবানির মাংস সমান তিনভাগ করে একভাগ গরিব-দুঃখী, একভাগ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে অবশিষ্ট একভাগ নিজেরা খাবেন।

এখানে ‘ত্যাগ’ বা ‘Sacrifive’ এবং ‘প্রিয়বস্তু কোরবানি’ এই বিষয়গুলো আমাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যায়ভাবে অর্থ-সম্পদ অর্জন, ঘুষ খাওয়া, অন্যের সম্পদ, এমন কি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করা (যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ নদী দখল, সরকারী খাস জমি দখল ইত্যাদি) ইত্যাদির লোভ সংবরণ বা Sacrifice করছি কিনা, আমার মনে হয় কোরবানির পাশাপাশি ওই লোভগুলো আমরা বর্জন করছি কিনা, এটি যাপিত জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মধ্যে লোভ-লালসার মতো কয়েকটি খারাপ ‘নফস’ বা ‘রিপু’ রয়েছে। এগুলোকে কতখানি Sacrifice বা ত্যাগ করতে পারছি এ প্রশ্নটি আমরা নিজেরা নিজেকে করছি কিনা? এই যেমন বেশি মুনাফার আশায় খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশাচ্ছি কিনা, ফল-ফলাদি, শাক-সবজি যাতে নষ্ট না হয় (ফল পাকলে এক পর্যায়ে পচবেই) সে জন্য ফলমালিন-ডিডিটির মতো বিষাক্ত দ্রব্য মিশাচ্ছি কিনা, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার লোভে ব্যাংক এবং শেয়ার মার্কেটের টাকা লোপাট করছি কিনা, দেশের উন্নয়নে এবং গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার প্রদত্ত টিআর-কাবিখার টাকা বা চাল-গম নিজের পকেটস্থ করছি কিনা, অর্থাৎ এই খারাপ নফসগুলোকে বর্জন বা Sacrifice করছি কিনা এই প্রশ্ন নিজেকে নিজে করা দরকার। আজ আবার নতুন এক সঙ্কট সমাজে দেখা দিয়েছে- তা হলো ড্রাগ বা মাদক দ্রব্য। এর কারবার করলে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যায় এবং যার মধ্যে নফসটি একটিভ রয়েছে সে ব্যক্তি তা ঝধপৎরভরপব করছে কিনা এসব প্রশ্ন আমাদের মতো কোরবানিদাতার জন্য, বিশেষ করে আমরা যারা status রক্ষা বা বৃদ্ধির জন্যে সবচেয়ে বড় গরুটা ক্রয় করে কোরবানি দেই তাদের প্রত্যেকের বিষয়টি ভাবা দরকার। আমি কাউকে সবক দিচ্ছি না, কেবল আমার অনুভূতির কিছু কথা বললাম। যেমন অতীতে আমরা দেখেছি বন্যা, ঝড়-ঝঞ্ঝায় স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীরা এক সঙ্গে বসে দুর্গত মানুষের জন্য রুটি বানাচ্ছে, রান্না করছে, নিজেরা ঘুরে ঘুরে রুটি-খাবার বিতরণ করছে এখন এসব দেখা যায় না। এখন ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে গেলে দেখা যায় কারও কোন অনুভূতিই নেই, বরং মোবাইল টিপছে, এমনকি চার বন্ধু এক আসরে বসেছে অথচ কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না, মোবাইল টিপছে। বর্তমান ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মধ্যেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় রাস্তা পরিষ্কারের নামে ঝাড়ু হাতে লোক দেখানো ফটোসেশন করছে। মানুষকে এতোটাই বোকা ভাবছি যে, পরিষ্কার রাস্তায় ঝাড়ু চালাচ্ছি এবং এর লাইভ শো করছি ধং রভ মানুষ কিছুই বোঝে না।

আগেই বলেছি প্রফেসর ডাঃ আবদুল্লাহ ডেঙ্গু শুরুর দিন থেকে এর চিকিৎসা এবং এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিত করা ও কিভাবে প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা বা হতে না দেয়ার পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। এবার ঈদে বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে কি-না তারও পরামর্শ তিনি দিয়েছেন। তার মতে যারা ডেঙ্গু জ্বরে ভুগছেন অর্থাৎ যাদের ডেঙ্গু জ্বর চলছে তাদের ক্ষেত্রে বাড়ি (গ্রামে) না যাওয়াটাই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে। কারণ এবারের ডেঙ্গু জ্বরের ধরনটা একটু ভিন্নতর। তাই গ্রামে এই জ্বর হলে চিকিৎসা সম্ভব হবে কিনা সেটি একটি প্রশ্ন। ডেঙ্গু জ্বর হয়ে চিকিৎসার পর ভালো হয়েছে এমন লোক গ্রামে যেতে পারবেন। কারণ ডেঙ্গু শুরুর ৪-৬ দিন পর্যন্ত ডেঙ্গু ভাইরাস থাকে, এরপর থাকে না। আবার কারও শরীরে ডেঙ্গুর ভাইরাস প্রবেশ করেছে এবং এরপর তিনি গ্রামে গেলেন, তার থেকেও ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ডেঙ্গু জ্বরের বাহক হলো স্ত্রী এডিস মশা। এই মশা গ্রামে থাকে না। অন্য মশা কামড়ালে ডেঙ্গু জ্বরের সম্ভাবনা থাকে না।

তবে সাধারণ ধারণা হলো এবার কেন ডেঙ্গু এতো ছড়াল এবং এই জ্বরে বেশ কিছু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটল। আমাদের সাধারণ জ্ঞান বলে ডেঙ্গু জ্বরের বাহক স্ত্রী এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র পাত্রে-টবে বা ডাবের খোসায় জমে থাকা পানিকে আমরা দিনের পর দিন অবহেলা করেছি। আমরা গুরুত্বই দেইনি, না সিটি কর্পোরেশনগুলো, না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, না রাজধানীবাসী, কেউই না।

তবে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে জাতির সামনে একটা সুযোগ এসেছে। আমরা যারা রাজনীতি বা যারা সাদা কাপড় পরে সমাজ সেবা করছি বা সমাজসেবার নাটক করছি, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, মহিলা লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সামনে সেই সুযোগটি হলো ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই। অর্থাৎ ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস বাহক স্ত্রী এডিস মশা যাতে জন্ম নিতে না পারে তার জন্য ডোবা-নালা, টব বা অন্যান্য পাত্র ধ্বংস করার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করা। তাহলেই বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতাসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে।

ঢাকা- ৯ আগস্ট ২০১৯

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও এমপি, সদস্য- তথ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, সদস্য- সংসদ পাঠাগার সংসদীয় কমিটি, সদস্য- মুজিব বর্ষ উদ্্যাপন জাতীয় কমিটি, সিনেট সদস্য-জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়,

উপদেষ্টা- সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম,

সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেসক্লাব।

balisshafiq@gmail.com