২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কাশ্মীর কোন পথে

  • শাহরিয়ার কবির

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে কাশ্মীরের অবস্থান অনেকটা মুকুটের মতো। বহু দেশী-বিদেশী পর্যটক কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আট শ’ বছর আগে দিল্লীর সুফী কবি আমীর খসরু (১২৫৩-১৩২৫ খৃ.) কাশ্মীরের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে লিখেছিলেন, ‘আগার ফিরদৌস বার রুয়ে যামিন্ অস্ত্, হামিন অস্ত্, হামিন অস্ত্ হামিন অস্ত্’ (এই পৃথিবীতে স্বর্গ যদি কোথাও থাকে, এইখানে এইখানে এইখানে)। এর প্রায় তিন শ’ বছর পর মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশ্মীর জয় করে আমীর খসরুর এই শ্লোক আবারও উচ্চারণ করেছিলেন।

এই ভূস্বর্গকে জঙ্গী, মৌলবাদী সন্ত্রাস কীভাবে নরকে পরিণত করেছে এটি জানার জন্য ১৯৯৮ থেকে এ পর্যন্ত আটবার কাশ্মীর সফর করেছি। ভারতের কলকাতা ও দিল্লী ছাড়া সবচেয়ে বেশি ঘুরেছি শ্রীনগর এবং এর চারপাশ। জম্মু আর লাদাখেও ভ্রমণ করেছি একাধিকবার। কাশ্মীরের সমস্যা বোঝার জন্য পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরেও যেতে চেয়েছিলাম। অনুমতি না পাওয়ায় ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে তথাকথিত আজাদ কাশ্মীরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি।

কারগিল যুদ্ধের পর সরকারী আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম কাশ্মীর সফরের জন্য। সেবার হেলিকপ্টারে লাদাখের লেহ, কারগিল, জাংসক্র, পানিখা আর হেমিসের মতো হিমালয়ের দুর্গম গিরিপথের ছোট ছোট জনপদে ঘুরেছি, বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। উপভোগ করেছি বরফে ঢাকা সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, ঝর্ণা আর গভীর নীল জলের হ্রদের অপার্থিব সৌন্দর্য। কথা বলেছি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং খেটে-খাওয়া মানুষের সঙ্গে। এর অনেক কথা আমার বইয়ে (কাশ্মীরের আকাশে মৌলবাদের কালোমেঘ) আছে, অনেক কথা নোট বইয়ে রয়েছে, অনেক কথা রয়েছে ক্যামেরার ফুটেজে। কাশ্মীর নিয়ে তখন একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণেরও উদ্যোগ নিয়েছিলাম। ২০০১-০৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের জমানায় একাধিকবার জেলে যাওয়ার কারণে ছবি বানানো সম্ভব না হলেও জম্মু-কাশ্মীরের বন্ধুদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ এখনও অক্ষুন্ন আছে। যে কারণে বিনীতভাবে এমন কথা বলতেই পারি- কাশ্মীর সম্পর্কে বাংলাদেশের অনেকের চেয়ে আমি বেশি জানি।

গত ৫ আগস্ট ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে, যার ফলে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং এটি অন্যান্য রাজ্যের সমমর্যাদা লাভ করেছে। একই সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীর থেকে লাদাখকে পৃথক করে রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পার্লামেন্টের ভেতরে সোচ্চার হলেও বাইরে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা ৩৭০ ধারা বাতিল নীতিগতভাবে সমর্থন করেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, যে পদ্ধতিতে এটি বাতিল করা হয়েছে সেটি ঠিক হয়নি। রাষ্ট্রপতির উচিত ছিল জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভার মতামত নেয়া, যা সংবিধানের এই ধারা তাদের দিয়েছে। বিজেপির বক্তব্য হচ্ছে, যেহেতু জম্মু-কাশ্মীরে বর্তমানে কোন বিধানসভা নেই, ২০১৮ সালের জুন থেকে সেখানে রাষ্ট্রপতির শাসন চলছে, সেহেতু বিরোধী দলের এই দাবি অবান্তর।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ৩৭০ ধারা বাতিলের বিল উত্থাপনকালে সরকারের পক্ষে যুক্তি হিসেবে মোটা দাগে চারটি বিষয় উল্লেখ করেছেন- ১. এ বছর নির্বাচনী ইশতেহারে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ছিল, নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর ভারতের জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী তারা এটি করতে বাধ্য এবং এর ফলে বিশাল এক ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন করা হয়েছে, ২. কাশ্মীরের অর্থনীতিসহ সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ৭০ বছর ধরে ৩৭০ ধারা প্রধান বাধা হিসেবে বিরাজ করছিল, ৩. কাশ্মীরে জঙ্গী, মৌলবাদী সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রেও সংবিধানের এই বিশেষ ধারা বাতিল অনিবার্য হয়ে উঠেছিল এবং ৪. সংবিধানের যখন এই বিশেষ ধারা যুক্ত করা হয়েছিল তখন এটিকে সাময়িক বলা হয়েছিল; এটি স্থায়ী কোন বিধান কখনও ছিল না এবং অতীতেও একাধিকবার ৩৭০ ধারা সংশোধন করা হয়েছে।

কংগ্রেস ছাড়া অন্যান্য বিরোধী দলও ৩৭০ ধারা বাতিলের সমালোচনা করেছে। কোন কোন মুসলিম সাংসদ আসন্ন ঈদের কথাও বলেছেন-কাশ্মীরের মুসলমানরা কারফিউর ভেতর কীভাবে ঈদ-উল-আজহা উদযাপন করবে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এর জবাবে বলেছেন, কাশ্মীরের অমরনাথে অতীতে এ সময়ে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ওপর পাকিস্তান থেকে আসা জঙ্গী, সন্ত্রাসীরা বহুবার হামলা করেছে। এবারও অমরনাথ থেকে পাকিস্তানী স্নাইপার রাইফেল ও মাইন উদ্ধার করা হয়েছে, তদন্ত থেকে প্রতীয়মান হয়েছে, এবার অমরনাথে ২০১৭ সালের চেয়েও বড় রকমের হামলার পরিকল্পনা ছিল। যে কারণে দ্রুত তীর্থযাত্রীদের অমরনাথ থেকে এবং অন্যান্য পর্যটকদের শ্রীনগর থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, কংগ্রেস সরকারের শাসনকালে কাশ্মীরে আরও অধিক সময়ের জন্য কারফিউ বলবৎ ছিল।

৩৭০ ধারার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের স্থানীয় প্রধান দুই দল- ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিডিপি। এনসি প্রধান ফারুখ আবদুল্লাহ কয়েকবার কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, বর্তমানে তিনি লোকসভার সদস্য। পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি বিজেপির সঙ্গে জোটবেঁধে গতবারই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরে বিজেপি সমর্থন প্রত্যাহার করলে তার দল বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেলে। যে কারণে গত বছর জুন থেকে কাশ্মীরে রাষ্ট্রপতির শাসন চলছে। ফারুখ আবদুল্লাহ বলেছেন, ৩৭০ ধারা সংবিধানে রাখার জন্য প্রয়োজন হলে তিনি নিজের জীবন বিসর্জন দেবেন। মেহবুবা মুফতি বলেছেন, ৩৭০ ধারা বাতিলের ফলে ভারতের সঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের আর কোন বৈধ সম্পর্ক থাকল না। এখন থেকে কাশ্মীরে ভারতীয় সৈন্যরা দখলদার সেনাবাহিনী হিসেবে চিহ্নিত হবে। ৩৭০ ধারা বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে ফারুখ আবদুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিসহ কাশ্মীরের স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে শ্রীনগরে বিক্ষোভ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছে। এই লেখা যখন লিখছি (৯ আগস্ট, ২০১৯) তখন পর্যন্ত কাশ্মীরে সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও টেলিযোগাযোগ পরিষেবা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিরোধী দল যদিও ৩৭০ ধারা বাতিলের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে যাওয়ার কথা বলেছে, সুভাষ কাশ্যপের মতো সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার যা করেছে সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে করেছে। অন্যদিকে এ্যাডভোকেট এ এল শর্মা পার্লামেন্টে ৩৭০ ধারা বাতিলের একদিন পরই সুপ্রীমকোর্টে রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে আর্জি পেশ করে দ্রুত শুনানির অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, পাকিস্তান এ নিয়ে জাতিসংঘে যাওয়ার কথা বলেছে, তার আগেই সুপ্রীমকোর্টের বক্তব্য আসা দরকার। শুনানি যথাসময়ে হবে বলে বিচারপতি এনভি রামানা বলেছেন, পাকিস্তান জাতিসংঘে গেলে কি জাতিসংঘ ভারতের সংবিধান স্থগিত বা বাতিল করে দেবে?

প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা পি চিদাম্বরম, কপিল সিবাল, গোলাম নবী আজাদ প্রমুখ ৩৭০ ধারা বাতিলের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে সরকারের কঠোর সমালোচনা করলেও নতুন প্রজন্মের কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, দীপেন্দর হুদা ৩৭০ ধারা বাতিলের পক্ষে বলেছেন। এমনকি বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং-এর পুত্র ড. করণ সিং, যিনি ১৯৪৭ সালে কাশ্মীরের ভারতভুক্তির পর ১৮ বছর জম্মু-কাশ্মীরের সদরে রিয়াসত, ১৮ বছর গবর্নর এবং পরে ১৮ বছর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন; বর্তমানে রাজ্যসভার সদস্য। তিনি ৩৭০ ধারা বাতিল সমর্থন করে বলেছেন, সরকারের উচিত ছিল কাশ্মীরের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা। তিনি ফারুখ আবদুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতিকে অন্তরীণ রাখা এবং তাদের দেশদ্রোহী বলারও সমালোচনা করেছেন।

বিজেপির কট্টর সমালোচক দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি, উত্তর প্রদেশে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি এবং আরও কয়েকটি আঞ্চলিক দল সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের পক্ষে অভিমত দিয়েছে। ৩৭০ ধারা বাতিলের বিল পার্লামেন্টে উত্থাপনের আগে বিজেপি প্রকাশ্যে আলোচনা না করলেও গোপনে বিরোধী দলগুলোকে স্বপক্ষে আনার জন্য প্রচুর সময় ব্যয় করেছে। কংগ্রেসের মতো প্রাচীন দলকেও তারা এ বিষয়ে বিভক্ত করতে পেরেছে। মোদি সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কাশ্মীরের দুই প্রধান আঞ্চলিক দল এনসি ও পিডিপি এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য জিহাদ ঘোষণাকারী ‘অল পার্টি হুরিয়াত কনফারেন্স’কে মোকাবেলা করা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পার্টি বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, ৭০ বছর ধরে কাশ্মীরের কয়েকটি পরিবারের ক্ষমতা ভাগাভাগি ও দুর্নীতির মাসুল দিতে গিয়ে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ দারিদ্র্য ও হতাশার চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছেছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো এখন থেকে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষেরও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে। গত ২০ বছর ধরে কাশ্মীর সফর করতে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আমি জানার চেষ্টা করেছি। যার একটি-কাশ্মীর কীভাবে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হলো। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে প্রায় ৬০০টি দেশীয় রাজ্য ছিল। দেশভাগের সময় তাদের দুটি অপশন দেয়া হয়েছিল। এর ভেতর ৫৬২টি দেশীয় রাজ্য ভারতে যোগ দেয়, ১৪টি যোগ দেয় পাকিস্তানে। সমস্যা দেখা দিয়েছিল কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ ও জুনাগড়ের ক্ষেত্রে। জুনাগড়ের শাসক ছিলেন মুসলিম (নওয়াব মোহাম্মদ মোহাব্বত খান তৃতীয়) অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিলেন হিন্দু। নওয়াবের দেওয়ান পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করে ১৯৪৭ এর ১৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানভুক্তির চুক্তি স্বাক্ষর করলেও জুনাগড়ের হিন্দুরা নওয়াবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ভারতভুক্তির পক্ষে দাঁড়ান। ভারতীয় সৈন্য জুনাগড় অবরোধ করে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সাড়া না পেয়ে জুনাগড়ের শাসকরা ভারতভুক্তি মেনে নেন।

একইভাবে হায়দ্রাবাদের নিজাম মুসলিম (মীর ওসমান আলী খান) হলেও সেখানকার ৮৫ ভাগ বাসিন্দা ছিলেন হিন্দু, যারা ভারতে যোগদানের পক্ষে ছিলেন। দেশীয় রাজ্যগুলোর ভেতর হায়দ্রাবাদ আয়তন (৮৬,৬৯৮ বর্গমাইল) ও লোক সংখ্যায় (১ কোটি ৪০ লাখ) সবচেয়ে বড় ছিল। হায়দ্রাবাদের নিজামকে বলা হতো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি, যে রাজ্যের নিজস্ব মুদ্রা, সৈন্য বাহিনী, পরিবহন বিমান, রেলওয়ে, বেতার ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। দেশভাগের সময় হায়দ্রাবাদে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহ চলছিল। নেহরু সরকার সৈন্য পাঠিয়ে হায়দ্রাবাদকে ভারতভুক্ত করেন।

১৯৪৭-এ জম্মু-কাশ্মীরের পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে জটিল। আয়তনে হায়দ্রাবাদের চেয়ে ছোট হলেও জম্মু-কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং তার রাজ্যকে স্বাধীন রাখতে চেয়েছিলেন। কাশ্মীরে তখন মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭৭% এবং হিন্দু প্রায় ২১ ভাগ, বাকিরা বৌদ্ধ, শিখ ও খ্রীস্টান। কাশ্মীরে মুসলমানদের অবিসংবাদী নেতা ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আবদুল্লাহ, যিনি দেশভাগের বিরুদ্ধে ছিলেন। শেখ আবদুল্লাহর দল ছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের মতো ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। কাশ্মীরে জিন্নাহর মুসলিম লীগের সমর্থক মুসলিম কনফারেন্স থাকলেও মূল কাশ্মীরে তার কোন জনসমর্থন ছিল না। ভারতের জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে শেখ আবদুল্লাহর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ, যে কারণে মহারাজা হরি সিং ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, বিশেষভাবে নেহরুর প্রতি খুবই বিরূপ ধারণা পোষণ করতেন।

১৯৪৭-এ দেশ ভাগের আগেই জম্মু-কাশ্মীর স্বতন্ত্র থাকার কথা ঘোষণা করেছিল। মহারাজা হরি সিং-এর সঙ্গে নেহরুর বৈরী সম্পর্কে পাকিস্তান অবগত ছিল। পাকিস্তান মহারাজার দুর্বল সামরিক শক্তির সুযোগ নিয়ে কাশ্মীর দখল করার জন্য মুজাহিদের ছদ্মবেশে সৈন্য পাঠিয়ে দেয়। গিলগিট, বাল্টিস্তান, মোজাফফরাবাদ দখল করে পাকিস্তানী সৈন্যরা যখন শ্রীনগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন মহারাজা ভারতের সামরিক সাহায্য চেয়েছিলেন। দেশীয় রাজ্য ভারতভুক্তির দায়িত্বে নিযুক্ত মন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেছিলেন, কাশ্মীর যেহেতু ভারতের অংশ নয় কাশ্মীরের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ভারত নিতে পারে না। মহারাজা হরি সিং অন্য কোন উপায় না দেখে ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭ তারিখে কাশ্মীরের ভারতভুক্তির চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং পরদিন ভারতীয় সৈন্যরা শ্রীনগর গিয়ে পাকিস্তানীদের প্রতিহত করে। তখন থেকে মহারাজা হরি সিং-এর জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের চারটি জেলা পাকিস্তানের দখলে, যেটাকে পাকিস্তান বলে ‘আজাদ কাশ্মীর’।

ভারতভুক্তির চুক্তি স্বাক্ষরের পর শেখ আবদুল্লাহর উদ্যোগে ভারতের সংবিধানে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রক্ষার জন্য ৩৭০ ধারা যোগ করা হয়। এরপর মহারাজা হরি সিং তার আঠারো বছর বয়সী যুবরাজ করণ সিংকে কাশ্মীরের রিজেন্ট নিয়োগ করে প্যারিস চলে যান। করণ সিং শেখ আবদুল্লাহকে কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। এভাবেই ভূস্বর্গ কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। (চলবে)

নির্বাচিত সংবাদ