২১ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিতর্কের কেন্দ্রে নিক্সন প্রশাসন!

১৯৭১ সালের ১৩ আগস্ট দিনটি ছিল শুক্রবার। বাঙালীর স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা আন্দোলনকে অবদমিত করতে পাকিস্তানী আর্মির রক্তাক্ত অভিযানের পর বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে। সাধারণভাবে বাঙালির, বিশেষ করে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকা- চলেছে; ৭০ লাখ ভয়ার্ত মানুষ শরণার্থী হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিবেকবান জনগণ তা দেখে ক্ষুদ্ধ হয়েছেন, সহমর্মী হয়েছেন, পাকিস্তান সরকারের মধ্যযুগীয় এই বর্বরতার নিন্দা জানিয়েছেন তারা। কিন্তু হিটলারের পর থেকে সংঘটিত গণহত্যাগুলোর মাঝে ভয়াবহতম এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ব্যাপারে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কথিত বিশ্বশক্তিগুলো, বড় অথবা ছোট, তাদের নীরবতা বজায় রেখেছে। নিজেদের জনগণের শোরগোল ক্ষমতার রাজনীতির দূরাতিক্রম্য বাধা অতিক্রম করে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। লাখো শরণার্থীর দেখভালের পাহাড়সম দায়িত্ব নেবার পাশাপাশি ভারত বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামে প্রকাশ্যেই সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে বাঙালীর জন্য একটি রাজনৈতিক অবস্থান গঠিত হবার আগে পাকিস্তানকে কোনোরূপ সামরিক সাহায্য না দেবার সিদ্ধান্ত নিতে প্রচ- অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপের মুখোমুখি হয়েও আমেরিকা রক্তপিপাসু পাকিস্তানী সামরিক জান্তাকে সামরিক উপকরণ পাঠিয়ে যাচ্ছে। চীন, যারা এখনো পর্যন্ত আগ্রাসনকারী এবং তাদের পালিত কুকুরদের বিপক্ষে সবচেয়ে সচেষ্ট সমালোচক ছিল তারাই পাকিস্তানী আগ্রাসনের পক্ষ নিয়ে সেই একই আচরণ করছে। আর এসবের মাঝে বাংলাদেশের রক্ত ঝরছে, অঝোরে ঝরেই যাচ্ছে। নিজেদের ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে বাঙালীর প্রয়োজন সার্বজনীন একতা-সকল রাজনৈতিক দল এবং যুদ্ধরত শক্তির মাঝে। শেখ মুজিবের সোনার বাংলার বিজয় সুনিশ্চিত। ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দল পাক বিমানবাহিনীর একটি জিপকে ডেমরার কাছে অ্যামবুশ করে। এই অ্যামবুশে জিপটি ধ্বংস হয় এবং ৪ জন পাক বিমানসেনা ও সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাছ থেকে অনেক মূল্যবান কাগজপত্র, পরিচয়পত্র ও কয়েকটি রিভলবার দখল করে। মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলাদল ঘোড়াশালের কাছে পাকবাহিনীর ঝিনারদি অবস্থানের উপর আক্রমণ চালায়। আড়াই ঘন্টাব্যাপী যুদ্ধে একজন পাকসেনা নিহত হয় ও ১৫ জন গেরিলাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এ অভিযানে মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের ক্যাম্প থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, রসদ ও অন্যান্য জিনিসপত্র দখল করে। মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর ভুরঙ্গামারী বাজার ঘাঁটি আক্রমণ করে। এই আক্রমণ অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রচ- সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে পাকবাহিনী ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর সিপাহী কবির আহমদ শহীদ হন। ডেমরার নিকট মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা দল বিকাল তিনটার সময় পাক বিমান বাহিনীর একটি জীপ অ্যামবুশ করে ধ্বংস করে দেয়। অ্যামবুশ ৪ জন বিমান বাহিনীর এবং সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সৈনিক নিহত হয়। তাদের কাছ থেকে অনেক কাগজপত্র, পরিচয়পত্র এবং কয়েকটি রিভলবার দখল করা হয়। দখলকৃত কাগজপত্র আমাদের হেডকোয়ার্টারে গেরিলারা পাঠিয়ে দেয়। দুপুর আড়াইটায় মুক্তিফৌজের একটি গেরিলা দল পাকসেনাদের ঝিনারদি ঘোড়াশালের এই ক্যাম্পটিতে অতর্কিত আক্রমণ করে। সাতজন পাকসেনা পালিয়ে যেতে সমর্থ হয়। গেরিলারা ঝিনারদি রেল স্টেশনটিকে ধ্বংস করে দেয়। স্টেশনের টেলিফোন যোগাযোগের সেটটিও তারা ধ্বংস করে দেয়। টিকেট ও অন্যান্য কাগজপত্রও তারা জ্বালিয়ে দেয়। ক্যাম্প থেকে গেরিলারা একটি হালকা মেশিনগান, ১১টি রাইফেল, হালকা মেশিনগানের ৪৫০০টি গুলি, ১টি স্টেনগান, ১০০ রাউন্ড স্টেনগানের গুলি, ১৪টি বেল্ট, ২৬ জোড়া বুট, ১৭ ব্যাগ আটা, ১১ পেটি দুধের টিন এবং আরো অন্যান্য জিনিসপত্র দখল করে। মুক্তিবাহিনী সিঙ্গিমারি এলাকায় পাক প্যাট্রোলে অতর্কিত আক্রমণ করে ৪ জনকে হত্যা করে। কিছু গোলাবারুদ সঙ্গে একটি রাইফেল উদ্ধার করা হয়। নাগেশ্বরী ও গজলায় মুক্তিবাহিনীর অভিযানে ২ জন শত্রুসেনা নিহত এবং ৭ জন আহত হয়। বুরিপন্তা এবং বারিবাঙ্কা অঞ্চলে পাকবাহিনীর সঙ্গে গুলিবিনিময়ে দুই পাকসেনা নিহত হয়। শিঙ্ঘিচর ও ভুশ্মারি গ্রামে পাকসেনারা ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। গ্রামবাসীদের ভারতে বামনহাট শরণার্থী রিসিপশন ক্যাম্পে যেতে বাধ্য করে। সেখানে ভারত ফেরতদের ধরার জন্য পাকসেনাদের ক্যাম্প ছিল। মুক্তিবাহিনী দিনাজপুর থানায় গ্রেনেড ছুড়ে ও কাজীপুর এলাকায় তিন রাজাকার হত্যা করে। লতলা-ঠাকুরগাঁও সড়কে মাইন বিস্ফোরণে এক পাকিস্তানী জিপ বিস্ফোরিত হয়; এতে ২ পাকসেনা নিহত হয়। বাগবানে মুক্তিবাহিনী দুই পাকসেনাকে হত্যা এবং তিন জনকে আহত করে। মাছুডাঙ্গা এলাকায় পাক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে সতেরো পাকসেনা নিহত হয়। বায়রা এলাকায় এক রাজাকার নিহত ও একটি রাইফেল উদ্ধার হয়। পাকবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবাসে অভিযান চালিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ক্লাবের সম্পাদকসহ বিভিন্ন বিভাগের ১১ জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে আটক করে নিয়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দরে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ পরিচালনার জন্য ১ এবং ২ নম্বর গ্রুপ স্থলপথে মিরেশ্বরাই এবং চট্টগ্রাম শহর হয়ে কর্ণফুলীর পূর্বপাড় চরলক্ষার সর্বশেষ ঘাঁটিতে পৌঁছে যায়। জায়গাটি চট্টগ্রামের কাছেই। পথে অবশিষ্ট অংশটুকু এদের জন্য খুবই মারাত্মক কারণ তাদেরকে শহরের ভেতর দিয়ে নৌকায় নদী পার হতে হয়। তারপরই তাদের শেষঘাঁটি চরলক্ষ্যা। এদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে মুক্তিবাহিনী সাংঘাতিক আক্রমণ চালাবে। এ কারণে শত্রুরা ছিল পুরো সতর্কাবস্থায়। সারারাত ধরে কারফিউ চলতো। লোকজনকে তল্লাশির জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছিলো অসংখ্য চেকপোস্ট। মেশিনগান ফিট করা আর্মি জীপগুলো সারা শহর টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিল। নতুন করে আবার বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকা ঘেরাও দিয়েও অভিযান চালানো হয়। পথচারী সবাইকে কঠিন তল্লাশি শুরু হয়। এতসব তল্লাশি ফাঁকি দিয়ে শহরের মাঝখান দিয়ে পার হতে হবে ১নম্বর ও ২নম্বর গ্রুপকে তারপর আছে নদী পার হওয়ার সময় তল্লাাশির ঝামেলা। কিন্ত কোন কারণে দলের একজনও ধরা পড়ে তাহলে সমস্ত অভিযান বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা। নৌকায় করে ৩ নম্বর গ্রুপটি ১৩নম্বর ঘাঁটিতে পৌঁছার কথা ছিল, তারা সে ঘাঁটিতে পৌঁছতে সক্ষম হয়নি। এদিকে কলকাতা রেডিওর সঙ্গীতানুষ্ঠান শোনার ট্টানজিস্টর খুলতেই কমান্ডারের কানে ভেসে এলো পুরনো দিনের বাংলা গান ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ী’। এ গানের ভেতর দিয়ে সে এবং তার দল প্রথম সংকেত লাভ করে। কমান্ডার জানতো, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় আরেকটি গান সে শুনতে পাবে। ওটি শোনার পর সে ট্রানজিস্টর ফেলে দিতে পারবে। ‘অপারেশন জ্যাকপট সফল না হওয়া পর্যন্ত তাদের আর কোন গান শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রেডিও শুনতে হবে না। পাকবাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে গেঁয়ো পোশাকপরা একদল লোক ফলমূল, মাছ, চাউল এবং লবণের ঝুড়ি নিয়ে নৌকায় উঠলো এবং চালক যখন নিশ্চিত মনে নৌকার মুখ ঘুরিয়ে কর্ণফুলীতে পাড়ি জমালো তখনও পাকিস্তানীরা কিছুই বুঝতে পারেনি। সবাই ভেবেছিল লোকজন বাজার সেরে বাড়ি ফিরছে। প্রতিটি ঝুড়ির একেবারে তলায় চটের থলেতে ছিল লিমপেট মাইন, ফিনা, স্টেনগান ইত্যাদি। পরদিন পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচী বানচাল করার জন্য ভারত থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিফৌজের দলটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত বিদ্যুতের পাওয়ার স্টেশনের টাওয়ারগুলো নষ্ট করে ফেলে। ঐদিন রাতে হাফেজ মৌলভী আসহাবুল হকসহ মুক্তির দলটি চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ৩৬টি মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শক্রর ওপর আঘাত হানে। একই রাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যেমন: পাহাড়তলী পাঞ্জাবি ক্যাম্প, দেওয়ানহাটের ক্যাম্প, চকবাজার ক্যাম্প, লালদীঘির পশ্চিমের ক্যাম্প, চাকতাই ক্যাম্প, কালুরঘাট ক্যাম্প, দোহাজারী ও পটিয়া ক্যাম্প, বিবিরহাট ক্যাম্প, রাউজান ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্যাম্প গেরিলা পদ্ধতিতে অপারেশন চালানো হয়। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ঐ রাত্রে বিভিন্ন অপারেশনে ১২৫ জন পাঞ্জাবী ও ২৩০ জন রাজাকার মারা যায়। ফলে পাঞ্জাবী, রাজাকার ও দালালরা গ্রাম ছেড়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও থানাগুলোতে আশ্রয় নেয়। দিনের বেলা তারা বিরাট দল বেঁধে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতো এবং মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার করতো। এই পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণের পরিকল্পনা করে। পাকিস্তানের কারাগারে অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রহসন সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষক সমিতি এবং বাংলাদেশ কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেন্টশিয়া যৌথ উদ্যোগে কলকাতায় এক জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে। সেদিন শহরের বেশ কিছু অংশ প্রদক্ষিণ করে এই বিচার প্রহসন বন্ধ করার দাবিতে কলকাতার সকল বিদেশী দূতাবাসে শিক্ষক সমিতি স্মারকলিপি প্রদান করে। এর পর পরই পৃথিবীর নানা স্থানে শেখ মুজিবের বিচারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হতে থাকে এবং পাকিস্তানী সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ হতে থাকে বিশ্বের বিভিন্ন মহল থেকে। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রকৃত অবস্থা জানতে ও উদ্বা¯ুÍদের অবস্থা পরিদর্শনে এলে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে ড.এ আর মল্লিকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাত করে তাকে একটি স্মারকলিপি প্রদান করে। এই স্মারকলিপিতে বাংলাদেশের অবস্থা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও সরকারের সমর্থন কামনা করা হয়। এই স্মারকলিপির একটি প্রতিলিপি আমরা যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু হলে সারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। পাকিস্তান সরকারের কোন অধিকার নেই বঙ্গবন্ধুর বিচার অনুষ্ঠানের। তিনি এ ব্যাপারে বিশ্বশক্তিবর্গের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব উ’ থান্ট বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার প্রসঙ্গে জাতিসংঘ সনদে উল্লিখিত মানবিক বিষয়ের পরিপন্থী মন্তব্য করে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের মামলা সম্পর্কে কোন আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পাকিস্তান সীমান্তের বাইরে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে। কেননা, তাঁর বিচার প্রসঙ্গটি মানবিক উদ্বেগের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী শিবিরসমূহ পরিদর্শন শেষে নয়াদিল্লী পৌঁছান এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি.ভি গিরির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। ঢাকা শহর শান্তি কমিটির আহ্বায়ক সিরাজউদ্দিন বলেন, ‘দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দলে দলে মানুষ রাজাকারে যোগ দিচ্ছে। রাজাকাররা দেশ থেকে দুষ্কৃতকারীদের উৎখাত করবেই। ‘দিনাজপুরের সামরিক কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের সমম্বয়ে একটি মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। সামরিক কর্তৃপক্ষ আগামীকাল রাজাকার ও পুলিশের র‌্যালি এবং প্যারেড অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য সকল সরকারী কর্মচারীদের নির্দেশ দেয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত জেবুন্নাহার আইভি রচিত ‘কথিকায় বলা হয়েছে, ২৪ বছর আগেকার দিনটির কথা। সেদিন কী উজ্জ্বল ছিল বাংলাদেশ, আর প্রাণদৃপ্ত ছিল বাংলার মানুষ। আমরা স্বাধীন হয়েছি, এবার আমাদের দুঃখ ঘুচবে। বিদেশী শাসন, জমিদারের অত্যাচার, মহাজনের শোষণ আর সামাজিক অসম্যের হাত থেকে রেহাই পাবে বাংলার মানুষ। সারাদেশের মানুষ অন্তরের সবটুকু ভালবাসা দিয়ে বরণ করে নিল ১৪ আগস্টের ভোরের লগ্নটি। বাংলার মানুষ তাদের ন্যায়সঙ্গত প্রত্যাশা নিয়ে প্রতিবছর ১৪ আগস্টের ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। কিন্তু প্রতিবারই ভুল ভেঙ্গে গেছে বাংলার মানুষের। বিদেশী শাসনের পরিবর্তে তার ঘাড়ে চেপে বসলো পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন। তীব্রতর হলো শোষণ। বাংলার বীর সন্তানেরা ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, ১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে, ১৯৬৬ সালে ছয়দফা প্রতিষ্ঠায় এবং ১৯৬৯ সালে বাংলার স্বাধিকারের দাবিতে, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার দাবিতে, প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে বুকের তাজা রক্তে বাংলার শ্যামল মাটি লালে লাল করে দিয়েছে। প্রতিবারই বর্বররা বাংলার সংগ্রামী জনতার প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছে। তারপর তারা চূড়ান্ত আক্রমণ পরিচালনা করল ২৫ মার্চের গভীর রাতে। বাংলায় আজ রক্তের স্রোত বইছে। ঘরে-ঘরে মাঠে-মাঠে রাজপথে জমাট বাঁধা রক্ত। তাই আজ স্বাধীন বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে শেকল ছেঁড়া বাংলার মানুষ অতীতের অপমান আর গ্লানি ভরা দিনগুলোকে স্মরণ করছে প্রচ- ঘৃণার সঙ্গে। সিরাজকান্দী জাহাজমারা যুদ্ধে বিদ্ধস্ত জাহাজ ও জাহাজ থেকে খোয়া অস্ত্র সম্ভার উদ্ধারের লক্ষ্যে পাক বাহিনী চারদিক থেকে পর্যায়ক্রমে সিরাজকান্দী মাটিকাটাসহ ভূঞাপুরে জল, স্থল ও আকাশ পথে সরাসরি অভিযান পরিচালনা করে। মুক্তিবাহিনী সেই অস্ত্র দিয়েই সাহসিকতার সঙ্গে তা মোকাবেলা করে। জাহাজ মারাযুদ্ধে পাক বাহিনীর ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ ও খোয়া যাওয়া অস্ত্র গোলা বারুদের ঘটনা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহুল ছিল যে, হারানো অস্ত্র সম্ভার উদ্ধার ও মুক্তি বাহিনীকে উৎখাতের জন্য আগত পাক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পাক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের প্রধান লে.এ.কে নিয়াজি। ’ভারতের সঙ্গে চুক্তি, সোভিয়েতের যুদ্ধ এড়াবার চেষ্টা’ শিরোনামে নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সরকারী কর্মকর্তা বলেছেন যে তারা ধারণা করছেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ৩ দিন আগে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে ভারতের সঙ্গে যে মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করেছে তার মাধ্যমে তারা পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিতে ভারতকে নিরুতসাহিত করতে সফল হয়েছে। ভারত এখন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে যে বিলম্ব করছে, তার মুল্য হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী আন্দ্রেই এ গ্রোমিকোর উপস্থিতিতে ২০ বছরের শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার একটি চুক্তি নয়া দিল্লীতে স্বাক্ষরিত হয়। মাত্র দুইদিনের নোটিসে মিঃ গ্রোমিকো এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য সাপ্তাহিক ছুটির মধ্যেই ভারতের রাজধানীতে গমন করেন। সোমবার প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে দেয়া ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে বলা হয় যে, সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুর্ক করে দেয়া হয়েছে যে ভারত সরকার যদি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তা পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধের সূচনা করবে। পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রচ- উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ভারতের উপর চেপে বসা লাখ লাখ শরণার্থীর দায়। দুই দেশ একে অপরকে ইতিমধ্যে যুদ্ধের হুমকিও দিয়েছে। ওয়াশিংটনের রিপোর্ট বলছে যে ভারত সপ্তাহের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে জানিয়েছিল যে, তারা ৯ আগস্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে। রিপোর্ট অনুযায়ী স্বীকৃতি দেয়ার এই পরিকল্পনা ২ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে নিযুক্ত ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ দূত হিসেবে কর্মরত শ্রী দুর্গা প্রসাদ ধরের মাধ্যমে মস্কোতে জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ ও কুটনৈতিক বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী মিঃ গ্রোমিকো শ্রী ধরকে বলেছেন ভারতের আরও সাবধানী হওয়া প্রয়োজন এবং বাংলাদেশের স্বীকৃতি একটি যুদ্ধাবস্থার অবতারণা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যসূত্র মতে, পরবর্তী ধাপ হিসেবে মিঃ গ্রোমিকো অনতিবিলম্বে নয়া দিল্লীতে গমন করে শ্রীমতি গান্ধী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী শরন সিং এর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। গত শুক্রবার এই ভ্রমনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দাওয়া হয় এবং মিঃ গ্রোমিকো রবিবার পৌঁছান। রিপোর্ট অনুযায়ী মিঃ গ্রোমিকো ভারতীয় প্রতিনিধিকে মস্কোতেই জানিয়েছিলেন যে তিনি এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে শ্রীমতি গান্ধিকে নিরুৎসাহিত করবেন এবং প্রয়োজনে যেকোন ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যসূত্র মতে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলে ভারতকে যেকোন বাড়তি আর্থিক ও সৈন্য সহায়তা দিতে মস্কো প্রস্তুত আছে। কিন্তু একইসঙ্গে তারা ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হয় এমন কোন বেপরোয়া পরিস্থিতি তৈরি করা থেকে ভারতকে বিরত রাখতে বদ্ধপরিকর। কর্মকর্তারা আবারো স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট আগা মোঃ ইয়াহিয়া খান সম্প্রতিই ঘোষণা দিয়েছেন যে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি বলেন যে, যদি ভারত অবৈধভাবে রাজ্যকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামীদের সাহায্য করে তবে পাকিস্তান এটাকে ভারতের হামলা বলে ধরে নিবে এবং তারা যুদ্ধের ডাক দিবেন। সম্প্রতি, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যের বৈরিভাব কমাতে ও যুদ্ধাবস্থাকে প্রশমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চায়নাসহ সকলেই কাজ করে যাচ্ছে। কূটনৈতিকদের রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানের বন্ধুরাষ্ট্র চায়নাও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে সাবধানতার সঙ্গে আগানোর পরামর্শ দেন। আমেরিকান অফিসিয়ালরা ধারণা করছেন যে মিঃ গ্রোমিকো এই মৈত্রীচুক্তি স¦াক্ষর করতে সম্মতি দিয়ে ভারতের মতপরিবর্তন করাতে সক্ষম হয়েছেন। কর্তৃপক্ষীয় সূত্র থেকে জানা যায় যে, পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধের যে পটভুমি তৈরি হয়েছে তাতে ভারত ও এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে একবাক্যে সম্মত হয়েছে। ভারত তার বর্তমান নিরাপত্তা হিসেবে এই সোভিয়েত চুক্তিকে গণ্য করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায় যে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে থেকে কিছু জানায়নি এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এ তথ্য ওয়াশিংটনে পাঠানোর কোন উদ্যোগ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাগণ আশঙ্কা করছেন যে নয়াদিল্লী যদি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি স্থগিতও রাখে, তবুও অদূর ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এ বিবাদের শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। গোয়েন্দা বিভাগ আরো বলছে যে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেয়া এবং গেরিলাদের আরও বেশি সাহায্য করার জন্য সংসদ সদস্যগণ প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। দৈনিক যুগান্তর এপির বরাত দিয়ে রিপোর্ট করেন, মুক্তিবাহিনীর গেরিলাদের বোমা বর্ষণের ফলে মঙ্গলবার ঢাকা শহরের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের প্রচ- ক্ষতি হয় এবং ওই হোটেলের ১৯ জন পাকিস্তানী ও ১ জন মার্কিন নাগরিক আহত হয়। বিস্ফোরণের ফলে হোটেলের লবির উপরের অংশ বিশেষ উড়ে যায়। এর পর থেকে দখলদার সেনারা শহরের জনশূন্য পথে টহল দিতে থাকে। জনৈক ফৌজি অফিসার বলেন, পুরুষদের শৌচাগারে রাখা একটি টাইম বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। মুক্তিফৌজ যে পাকসেনাদের ওপর আক্রমণের মান বৃদ্ধি করে এই বোমা বিস্ফোরণ তাঁর একটি নিদর্শন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু হওয়ার সঙ্গে এই বোমা বিস্ফোরণের সংযোগ আছে। আগামী শনিবার পাকিস্তানের ২৪ তম বার্ষিক স্বাধীনতা অনুষ্ঠান কে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে মুখর করে তোলার জন্য ঢাকার বাঙালী অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছে। ঐদিন প্রতিরোধ আরও তীব্রতর করে তোলার কথাও প্রচার পত্রে বলা হচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাকবাহিনী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর সেনাসজ্জার তৎপরতা বাড়িয়ে তুলেছে। উদ্দেশ্য ভারতের বিরুদ্ধে রণউন্মাদনা বাড়িয়ে তোলা। পাক জঙ্গী বাহিনী এখন সীমান্তের ৬০টি চৌকিতে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করেছে। কিন্তু সেনা কমান্ডের নির্দেশ সত্ত্বেও ভারত- বাংলাদেশ নদী, জলপথ, পাহাড়, চারণ ভূমি প্রভৃতির ভেতর দিয়ে বিস্তৃত ২৭০টি সীমান্ত ফাঁড়ির ওপর সফল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এখনো সফল হয়নি। এই সীমান্ত ফাঁড়িগুলো ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, অসম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা বরাবর। অন্যদিকে মুক্তিবাহিনী সমগ্র সীমান্ত বরাবর বাংলাদেশের ৫০ কিলোমিটার ভিতর পর্যন্ত নিজ নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং নানা অঞ্চলে অনেকখানি ভিতরে ঢুকে পড়েছে। ছিদ্দিকুর রহমান আশরাফীর সম্পাদনায় ‘বাংলার মুখ’ সংবাদ সাময়িকীটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

লেখক : শাহাব উদ্দিন মাহবুব