০৬ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্যাবর জেট থেকে বোমাবর্ষণ

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট দিনটি ছিল শনিবার। বাঙালীর চোখে কত স্বপ্নছিল, দেশ স্বাধীন হবে, স্বাধীন দেশে এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন আসন্ন। এই নির্বাচনে দেশে আসবে বাক-স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা। সর্বোপরি দেশের মানুষ পাবে তাদের হারানো অধিকার। এই অধিকার বাঙালী পায়নি। তার বদলে পেয়েছে বুলেট। পাঁচশে মার্চ মধ্যরাতে অকস্মাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল বাঙালির, চারদিকে কামান আর ট্যাঙ্কের গর্জন। অসহায় মানুষের ভীত আর্তনাদ। রক্তে রাজধানী শহর ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশ ভেসে গেছে। আর সেই রক্তের স্রোতে ভাসমান স্তুপীকৃত লাশ। শিশু-নারী-বৃদ্ধ-যুবকের মৃতদেহ এই লাখো মানুষের মৃতদেহের স্তূপের নিচে ইয়াহিয়া চাপা দিতে চেয়েছে বাঙালীর আত্মপ্রতিষ্ঠা। খুনি ইয়াহিয়ার দস্যু সেনাবাহিনী বাঙালীর চোখ থেকে স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে, বাঙালীর রক্তে। কিন্তু সে বাঙালীর মৃত্যুঞ্জয়া কালজয়াী আবহমান কালের স্বাধিকার-চেতনা হরণ করতে পারেনি। তাই আজ মুক্ত বাংলার বুকে লাখো মুক্তিফৌজ লড়ছে। বাঙালীর যদি মরতে হয় স্বাধীনতার জন্য মরবে, যদি বাঁচতে হয় স্বাধীন জাতির গৌরব ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে। পাক হানাদারদের একটি দল ঘোড়াশালের কাছে ঝিনারদি রেলওয়ে স্টেশনের কাছে একটি গ্রামে লুটতরাজ করতে এলে মুক্তিবাহিনীর একদল গেরিলা যোদ্ধা তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। পাকসেনারা প্রায় তিনঘণ্টা যুদ্ধের পর দুটি মৃতদেহ ও কয়েকজন আহত সৈন্যকে ফেলে নরসিংদীর দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনী কোম্পানীগঞ্জ থানার বসুরহাটের কাছে পাক মিলিশিয়াদের ওপর অ্যামবুশ করে। এতে একটি টয়োটা জিপ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং ৩০ জন মিলিশিয়া হতাহত হয়। এই সংঘর্ষে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিপাই নুরুন্নবী মারাত্মকভাবে আহত হন। মহাদেবপুর থানার হাপুনিয়া মহাসড়কে মুক্তিবাহিনীর পুঁতে রাখা একটি শক্তিশালী ডিনামাইটের বিস্ফোরণে হানাদার বাহিনীর একটি জীপ ধ্বংস হয়। এতে পাকহানাদারদের ৫ জন সৈন্য নিহত হয়। ৭নং সেক্টরের মেহেদিপুর সাব-সেক্টরে সুবেদার মেজর মজিদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দল পাকহানাদারদের কানসাট অবস্থানের ওপর মর্টার আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে কয়েকজন পাকসেনা হতাহত হয়। ইলিয়াসের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দল মিরেরসরাই হয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসার পথে মিয়াজান ঘাটে পাকসেনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে ৫ জন পাকসেনা নিহত হয় ও অনেকে আহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা অক্ষত অবস্থায় নিজ অবস্থানে চলে আসে। কুমিল্লার মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর মাঝিগাছা অবস্থানের উপর আক্রমণ করে। মুক্তিবাহিনীর এই সফল আক্রমণে পাকবাহিনীর ১০ জন সৈন্য নিহত হয় ও অনেকে আহত হয়। মুক্তি সংগ্রামের পূর্ব সেক্টর প্রেস অ্যান্ড লিয়াজো অফিসার সুলতান মাহমুদ এর ঢাকা থেকে পাঠানো বিশেষ কমান্ডো অ্যাকশন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বৈদ্যর বাজার সাব-ইউনিটের গেরিলারা বৈদ্যের বাজার থেকে সোনারগাঁও গেট পর্যন্ত সড়কে ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী মাইন স্থাপন করে রাখে। তাতে মধ্যরাত প্রায় ১২ঃ৩০ মিনিটে পাকবাহিনীর সশস্ত্র একটি টহলরত দলকে বহন করা দুটি জীপ এবং একটি স্কুটার সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। এই ঘটনায় ১১ জন পাকিস্তানী সৈন্য এবং ৩ জন রাজাকার মারা যায়। মুক্তিযোদ্ধারা নি¤œলিখিত জায়গায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন এবং ভোর ৬.০০ টা থেকে ১৫ তারিখ দুপুর ১২.০০ পর্যন্ত কারফিউ ঘোষণা করেন। বৈদ্যর বাজার থেকে কৈকর টেক (কধরশধৎ ঞবশ), সোনারগাঁও থেকে সিএন্ডবি রোড, বৈদ্যর বাজার থেকে আনন্দ বাজার পর্যন্ত। সোনামুড়ি পোস্ট অফিসের সোনামুড়ি গ্রামের নূর হোসেনের কাছ থেকে ১ টি একনলা বন্দুক উদ্ধার করা হয়। ডেমরার কাছে মুক্তিযোদ্ধারা ২০-২২ জন রাজাকারকে হত্যা করে। মুক্তিযোদ্ধারা দুটি নৌকায় করে কোন একটি অপারেশনে যাওয়ার পথে রাস্তায় রাজাকাররা তাদের উপর আক্রমণ চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা তখন রাজাকারদের উপর গুলি চালালে তারা সবাই নিহত হয়। তাদের কাছ থেকে ৭ টা ৩০৩ রাইফেল এবং ৫ টি রেইন কোট উদ্ধার করা হয়। পাকসেনাদের একটি দল ঝিনারদি স্টেশনের কাছে একটি গ্রামে লুটতরাজের উদ্দেশ্যে আসে। খবর পেয়ে মুক্তিফৌজের একটি গেরিলা দল পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায়। পাকসেনারা তিনঘণ্টা যুদ্ধের পর দুটি মৃতদেহ ও কয়েকজন আহত সেনাকে ফেলে পালিয়ে গেলে গেরিলারা নরসিংদী-তারাবো সড়কে পাঁচদোনার নিকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে প্রহরারত পাকসেনাদের একটি দলের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণ প্রায় এক ঘণ্টা চলে। মুক্তিফৌজের আক্রমণ প্রবল হওয়ায় আহত পাকসেনাদের বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শোনা যায়। এমন সময় চার ট্রাক পাকসেনা তাদের সাহায্যে সেখানে উপস্থিত হয়। পাকসেনারা ভারি অস্ত্রের সাহায্যে মুক্তিফৌজের গেরিলাদের আক্রমণ প্রতিহত করে। ভারি অস্ত্রের মোকাবিলা করতে না পেরে গেরিলারা বাধ্য হয়ে পিছু হটে আসে। এ সময় পাকসেনাদেরকে পাঁচটি মৃতদেহ উঠিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়। লেফটেন্যান্ট ফজলুল কবীরের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা সফিউল আহমেদ বাবুল, মোঃ হোসেন, মজিবুল হক মজুমদার ও আমিনুল ইসলামসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার পাঁচথুবী ইউনিয়নের শাহপুর নামক স্থানে এ্যামবুশ করে। এই রাস্তা দিয়ে পাক বাহিনী প্রায়ই যাতায়াত করে। ১৫ আগস্ট সকাল ৭টার সময় ৩১ রেজিমেন্টের ২টি কোম্পানি ফাইটিং প্যাট্রল বের হলে মুক্তিযোদ্ধাদের এ্যামবুশে পড়ে এবং শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ১৭ জন পাক হানাদার বাহিনী নিহত হয় এবং এলএমজি চালাতে গিয়ে শত্রুর বোমার আঘাতে একজন মুক্তিসেনা আহত হয়। ভারতের পংবাড়ি থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা কায়দায় অপারেশন চলতে থাকে। ভোররাত তিনটার সময় ক্যাপ্টেন হূদার নির্দেশে একটি কমান্ডো অপারেশন চালানো হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মর্টার প্লাটুন চাঁদগাজিতে পাকিস্তানী সৈন্যদের ঘাঁটি আক্রমণের পরিকল্পনা নেয়। প্রচ- যুদ্ধ শুরু হয়। সেইদিন পাক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মুক্তিবাহিনী কোম্পানিগঞ্জ থানায় বসুর হাটের নিকটবর্তী এলাকায় পাক মিলিশিয়াদের অ্যামবুশ করে প্রায় ৩০ জনকে হতাহত করে। তারা একটি টয়োটা জিপও ধ্বংস করে দেয়। সংঘর্ষে আমাদের একজন সিপাহি নুরুন্নবি মারাত্মকভাবে আহত হয়। পাকসেনারা ৩০টি অটোমেটিক এলএমজির সাহায্যে গুলি চালায়। চট্টগ্রাম বন্দরে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ পরিচালনার জন্য ১ এবং২ নম্বর গ্রুপ স্থলপথে মিরেরসরাই এবং চট্টগ্রাম শহর হয়ে কর্ণফুলীর পূর্বপাড় চরলক্ষার সর্বশেষ ঘাঁটিতে পৌঁছে যায়। ৩ নম্বর গ্রুপের যোদ্ধারা প্রায় ৮০ মাইল হেঁটে আসায় একদিন তাদের বিশ্রাম দরকার। দিনের আলোতে কিছুটা রেকিও করা দরকার। এদিকে অপারেশনের সংকেত হিসেবে রেডিওতে দ্বিতীয় বাংলা গানটি শোনা গেলো’ আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম তার বদলে চাইনি কোন দান। যার ফলে সেই রাতেই নৌ-মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানী জাহাজসমূহে আঘাত করার কথা। কিন্ত দুর্ভাগ্য এই দলের অভিযান একদিন পিছিয়ে গেল। লক্ষ্যবস্তুগুলো প্রতিটি সদস্যের দেখা উচিত। যেখান দিয়ে তারা পানিতে নামবে এবং কাজ শেষ করে যেখানে তাদের উঠতে হবে সেসব জায়গাও আগে থেকে তাদের দেখে রাখতে হবে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে এম ভি হরমুজ ৯৯১০ মেট্রিক টন সমর-সম্ভার, এম বি আল আব্বাস ১০৪১০ টন সামরিক সরঞ্জাম ও ওরিয়েন্ট বার্জ ২৭৬ টন অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদসহ যথাক্রমে ১৩ও ১২ মংলা বন্দরের জেটিতে অবস্থান করে। বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজ তিনটিতে লিমপেট মাইন লাগিয়ে নিঃশব্দে নদীর ভাটিতে ভেসে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। সিরাজকান্দী জাহাজমারা যুদ্ধে বিদ্ধস্ত জাহাজ ও জাহাজ থেকে খোয়া অস্ত্র সম্ভার উদ্ধারের লক্ষ্যে পাক বাহিনী চারদিক থেকে পর্যায়ক্রমে সিরাজকান্দী মাটিকাটাসহ ভূঞাপুরে জল, স্থল ও আকাশ পথে সরাসরি অভিযান পরিচালনা করে। মুক্তিবাহিনী সেই অস্ত্র দিয়েই সাহসিকতার সঙ্গে তা মোকাবেলা করে। জাহাজ মারাযুদ্ধে পাক বাহিনীর ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ ও খোয়া যাওয়া অস্ত্র গোলা বারুদের ঘটনা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহুল ছিল যে, হারানো অস্ত্রসম্ভার উদ্ধার ও মুক্তি বাহিনীকে উৎখাতের জন্য আগত পাকবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পাক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের প্রধান লে.এ.কে নিয়াজি। তিনি ভূঞাপুর ডাকবাংলাতে অবস্থান করে অভিযান পরিচালনা করছিলেন। এই ব্যাপক তৎরপরতা সত্ত্বেও পাক বাহিনী তাদের খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থ হয়। পাক বাহিনীর ৪৭ ব্রিগেড এই অঞ্চল দখলের চেষ্টা করে। বিমান বাহিনীর দুটি স্যাবর জেট বোমা হামলা চালায়। কিন্তু কাদেরিয়া বাহিনী লুট করা অস্ত্র দিয়েই পাক বাহিনীকে সফলভাবে প্রতিহত করে। যুদ্ধকালীন গোলা-গুলি, ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের গোলা বারুদের আঘাতে এবং পাক বাহিনীর পাল্টা হামলা ও বিমান আক্রমণে লোকালয়, জনপদ, ঘর বাড়ী ও প্রচুর সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির উদ্যোগে ঢাকায় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রাদেশিক জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক গোলাম আযম বলেন, এবার শুধু তারাই স্বাধীনতা দিবস পালন করছে যারা পাকিস্তানকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের ঘরে-বাইরে শত্রুর অভাব নেই। তবু একথা একশ ভাগ সত্য, পাকিস্তান টিকে থাকার জন্যই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তিনি আরো বলেন, আমরা পাকিস্তানকে অখন্ড রাখার জন্য সংগ্রাম করছি। এদেশ টিকে না থাকলে আমাদের মুসলমান হিসেবে টিকে থাকা মুশকিল হবে।

নির্বাচিত সংবাদ