১৮ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোচ আলীমের তিন শিষ্যা এখন বাফুফের ক্যাম্পে ...

কোচ আলীমের তিন শিষ্যা এখন বাফুফের ক্যাম্পে ...

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ প্রতিভা হচ্ছে ব্যক্তির অসাধারণ সৃজনীশক্তি, ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিমত্তাবিশিষ্ট গুণাবলী বিশেষ। অন্তঃর্নিহিত ব্যতিক্রমধর্মী বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার সক্ষমতা, সৃজনশীলতা অথবা জন্মগত ও প্রকৃতিগতভাবে একে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন যিনি, তিনিই প্রতিভাবান। খেলাধুলায় বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শনও প্রতিভার অন্তর্ভুক্ত। তবে প্রতিভা বিকাশ করতে হলে প্রতিভা লালন করতে হবে। বাংলাদেশের মহিলা ফুটবল আজ যে এত ঈর্ষণীয় অবস্থানে আছে, তার মূলে আছে প্রতিভা চিহ্নিত করা এবং এর লালন বা যথাযথ বিকাশ। আর এই কাজটি সযত্নে করে যাচ্ছে দেশীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।

বাফুফের আবাসিক ক্যাম্পে পুরনো মহিলা খেলোয়াড় সংখ্যা ছিল ৪০। কয়েকমাস আগে তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল আরও ১৪ জন। সবমিলিয়ে ৫৪। ঈদ-উল-আজহার পর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও ৯ ফুটবলার। যাদের ৬ জন এসেছে জেএফএ কাপ অ-১৪ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ এবং বাকি ৩ জন এসেছে ইউনিসেফ অ-১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের আসর খেলে।

এই ৯ বালিকা ফুটবলারকে বাছাই করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের হেড কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন এবং সহকারী কোচ মাহবুবুর রহমান লিটু। গত জুলাইয়ে জেএফএ কাপ এবং ইউনিসেফ ফুটবলের দুটি আসরের চূড়ান্ত পর্বের খেলা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে। সেখানে অনুষ্ঠেয় প্রতিটি খেলাই গ্যালরিতে বসে গভীর মনোযোগ সহকারে দেখেছেন দুই কোচ ছোটন-লিটু। প্রতিভাময়ী কোন খেলোয়াড় চোখে পড়া মাত্রই তাদের নাম, দল, জার্সি নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য টুকে নিয়েছেন নোটবুকে। কোরবানীর ঈদের আগেই সেখান থেকে কয়েকজনকে বাছাই করে তাদের নয়জনকে ক্যাম্পে ডাকে বাফুফে। ঈদের পরেই ক্যাম্পে গিয়ে রিপোর্ট করেছে তারা।

কোচ ছোটন জনকণ্ঠকে জানান, ‘মহিলা ফুটবলারদের পাইপলাইন যেন সমৃদ্ধ থাকে, কখনই যেন দক্ষ খেলোয়াড় সঙ্কট দেখা না দেয়, সেজন্য সার দেশ থেকে বেছে বেছে ভালমানের খেলোয়াড় ঢাকায় নিয়ে আসাটা হচ্ছে বাফুফের নিয়মিত কার্যক্রম প্রক্রিয়া। সেই ধারাবাহিকতায় এবার আপাতত ৯ ফুটবলারকে ঢাকায় নিয়ে এসেছি। ইউনিসেফ ফুটবল থেকে নিয়েছি লিভা আক্তার, মরিয়ম আক্তার ও মুনকি আক্তারকে। আর জেএফএ কাপ থেকে নিয়েছি শামিমা আক্তার শিলা, জয়নবসহ আরও চারজনকে।’

ছোটন আরও যোগ করেন, ‘ইউনিসেফ ফুটবল থেকে নেয়া তিন ফুটবলারের বয়স খুবই কম, ১২-এর মধ্যে। তবে ওরা খুবই ট্যালেন্ট। ওরা আপাতত ক্যাম্পে থেকে অন্যদের সাথে অনুশীলন করবে, দেখবে, বুঝবে। পরে আরেকটু বয়স বাড়লে ওদের বয়সভিত্তিক দলে খেলানো হবে।’ তবে একটি সতর্কবাণীও উচ্চারণ করেন ছোটন, ‘তবে কোন ফুটবলারের ক্যাম্পে ডাক পাওয়া মানে এই নয় যে দলে তার জায়গা পাকা। এখানে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দিতে হবে। যে টিকে থাকতে পারবে, সে-ই ক্যাম্পে থাকবে। নয়তো বাদ পড়ে যাবে। এর আগে অনেক খেলোয়াড়ই ক্যাম্পে এসেও পড়ে বাদ পড়ে ফিরে গেছে।’ এ প্রসঙ্গে ছোটন উদাহরণ দিলেন জাতীয় মহিলা দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের কথা, ‘সাবিনা ক্যাম্পের সবচেয়ে সিনিয়র খেলোয়াড়। কিন্তু তাই বলে ওকে বিন্দুমাত্র কোন ছাড় দেয়া হয় না। তাকেও সবার মতো কঠোর অনুশীলন-পরিশ্রম করতে হয়, ফিটনেস টেস্ট দিতে হয়। এগুলো করে পাশ করে যোগ্যতা দিয়েই তাকে অন্যদের মতো টিকে থাকতে হয়। নতুন যারা এসেছে, তাদেরও তাই করতে হবে।’

শুক্রবার থেকে মেয়েদের অনুশীলন শুরু হবে বলে জানান ছোটন। আরও জানান, ‘জেএফএ কাপ খেলে আসা ৬ জন যদি ক্যাম্পে টিকে যায়, তাহলে তাদের অ-১৫ জাতীয় দলের জন্য বিবেচনা করা হবে।’

প্রশ্ন উঠতে পারে, জেএফএ কাপ এবং ইউনিসেফ ফুটবল থেকে এত কম সংখ্যক দক্ষ ফুটবলার চোখে পড়লো ছোটনের? এ প্রসঙ্গে ছোটনের ব্যাখ্যা, ‘না, ব্যাপারটা আসলে তা নয়। আমাদের তালিকায় আরও অনেক ফুটবলারই আছে। আরও কিছুদিন পর পর্যায়ক্রমে আমরা বাকি সবাইকেই ডাকবো, সবাইকেই পরখ করে দেখবো। কাজেই ডাক পায়নি বলে তাদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই।’

ইউনিসেফ ফুটবল থেকে ডাক পাওয়া তিন ফুটবলার লিভা-মুনকি-মরিয়ম সবাই আসরের চ্যাম্পিয়ন দল লালমনিরহাট জেলা দলের খেলোয়াড়। শুক্রবার তাদের কোচ আলীম আল সাঈদ খোকন তাদের ঢাকায় বাফুফে ক্যাম্পে নিয়ে তুলে দেন বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগের কাছে। সঙ্গে ছিলেন সহকারী কোচ লিটু। আলীম জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকায় আসার পথে ওরা তিনজন বেশ স্বাভাবিকই ছিল তবে বাফুফেতে ওদের কাছ থেকে যখন আমি বিদায় নেব, তখন ওরা প্রচণ্ড কান্নাকাটি করে। আমি নিজেও ভীষণ আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ি। শেষে সাধারণ সম্পাদক সোহাগ ভাই ওদের স্বান্তনা দিয়ে বলেন, তোমাদের আলীম স্যার মাঝে মাঝে ঢাকায় এসে তোমাদের সাথে দেখা করে যাবেন।’

এ নিয়ে আলীম তার ফেসবুক ওয়ালে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাতে লিখেছেন, ‘ফেডারেশন থেকে বিদায় বেলা আমার মেয়েদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আবেগ ভরা কান্না আমি আর সহ্য করতে পারছি না। তোমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমারও যে খুব কষ্ট হচ্ছে। লিভা, মরিয়ম, মুনকি তোমাদের কে খুব মিস করবো আমি। ভালো থেকো তোমরা। তৃণমূল পর্যায় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে তোদের মত গরিব, অবহেলিত মেয়েদের আমার মেধা, শ্রম দিয়ে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করে জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পাইয়ে দেয়াই আমার কাজ। তোমাদের জন্য মন থেকে ভালোবাসা ও দোয়া থাকলো। আমি জানি তোমরা পরিশ্রমী ও আত্মবিশ্বাসী। আমার বিশ্বাস তোমাদের ভবিষ্যৎ তোমরা নিজেরাই উজ্জ্বল করবে।’

নিজের শিষ্যাদের সম্পর্কে আলীম জনকণ্ঠকে বলেন, ‘লিভা ফরোয়ার্ড। ইউনিসেফ ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৬ গোল)। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয় একই দলের অধিনায়ক-মিডফিল্ডার মুনকি। আর মরিয়ম হচ্ছে লেফট উইঙ্গার। আশা করি আমার দলের বাকি মেয়েরাও আগামীতে বাফুফের ক্যাম্পে ডাক পাবে।’

লিভা ও মরিয়মের বাবা কৃষক। মুনকির বাবা দিনমজুর। তার মা অন্যের বাসায় কাজ করেন। মুনকির ছোট বোন মুন্নী ক্লাস টুতে পড়ে। সেও দারুণ ফুটবল খেলে। আগামীতে আলীম তাকে তার দলে নেবার স্বপ্ন দেখছেন। মোট কথা, সবার বাবাই অনেক গরিব। লিভা জমিতে তার বাবার সঙ্গে এক বেলা কৃষিকাজ করে।

এই খেলোয়াড়গুলোকে যদি এখন থেকেই যথাযথভাবে বাফুফে পরিচর্যা করতে পারে, তাহলে জাতীয় দলের জন্য তারা যে অনেক ভাল সম্পদে পরিণত হতে পারবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।