১৮ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হত্যাকারীদের মূল সমস্যা ছিল সেনা নিয়ন্ত্রণ

  • যাহিদ হোসেন

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল মূলত বিপথগামী কয়েকজন কর্মরত এবং কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা-কর্মকর্তা। তাই দেশের সেনাবাহিনীকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখাই ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারীর তথা তাদের দ্বারা নিয়োজিত খন্দকার মোশতাক সরকারের মূল সমস্যা।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারীদের রক্ষাকারী খন্দকার মোশতাক সরকার তাই প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীকে নিয়োগ দেয় রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে। এর পরেই তারা নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। নতুন পদ সৃষ্টি করে মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে নিয়োগ দেয় চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ পদে এবং ব্রিগেডিয়ার এইচএম এরশাদকে দিল্লীতে প্রশিক্ষণরত অবস্থা থেকে সেনাবাহিনী উপ-স্টাফপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ঢাকা নিয়ে আসে এবং মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।

ধানমন্ডির ৩২নং রোডের বাড়িতে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে স্বঘোষিত সরাসরি জড়িত মেজর কামরুল হুদাকে নিয়োগ দেয়া হয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা নির্দেশ মোতাবেক আইএসপিআরের পরিচালককে প্রতিনিধিসহ এক বা একাধিকবার যেতে বলা হয় বঙ্গ ভবনে প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রচারণা সংক্রান্ত বিষয়ে তার নির্দেশনা গ্রহণের জন্য।

জেনারেল ওসমানী ছিলেন খুবই ফরমাল প্রকৃতি ব্যক্তিত্ব। তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় থেকেই আমার সম্পর্ক ছিল অনেকটা ঘনিষ্ঠ। কারণ, ৮নং থিয়েটার রোডে (কলকাতা) একই কমান্ডের মধ্যে আমরা অফিস করতাম। মাঝেমধ্যেই তিনি তার তৎকালীন এডিসি ক্যাপ্টেন নুরুকে দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠাতেন সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার প্রধান হিসেবে এবং দিতেন নানা পরামর্শ ও নির্দেশনা।

মেজর হুদার সঙ্গে আমার প্রায় প্রতিদিনই টেলিফোনে কথা হতো। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার দৈনন্দিন কর্মসূচী নিয়ে। কখন এবং কোথায় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার কোন্ অনুষ্ঠানে আমাকে উপস্থিত থাকতে হবে সেটা তিনি আমাকে অবহিত করতেন। বিশেষ কোন সেনানিবাসে সামরিক বাহিনীর কোন অনুষ্ঠানে গেলে তিনি চাইতেন সেখানে আমি উপস্থিত থাকি। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সপ্তাহে একদিন অথবা দুদিন ঢাকার বাইরের সেনানিবাসে অথবা বিমানঘাঁটি অথবা নৌঘাঁটিতে যেতেন তিন বাহিনীপ্রধান, তৎকালীন নতুন সৃষ্টি করা চীফ অব স্টাফ পদে নিয়োজিত মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান এবং পরিচালক আইএসপিআরকে সঙ্গে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে।

একদিন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার নির্দেশ মোতাবেক নির্ধারিত সময়ে বঙ্গভবনে গেলে প্রাইভেট সেক্রেটারি মেজর হুদা জানান, অনির্ধারিত একটা জরুরী সভায় রাষ্ট্রপতির কাছে যেতে হয়েছে উপদেষ্টাকে। তাই তার রুমে ফিরতে দেরি হবে। মেজর হুদার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব একটা নিবিড় ছিল না। নানা বিষয়ে আলোচনার সময়ে তাকে ১৫ আগস্ট সংঘটিত হত্যাকান্ড সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করার সুযোগ হয় আমার। তিনি আমাকে দুপুরের খাবার খাওয়ান। সেদিন মোটামুটি খোলামেলা আলাপ হচ্ছিল ১৫ আগস্টের মতো একটা মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে। যার সঙ্গে তিনি নিজেও ছিলেন জড়িত। আলোচনাকালে তিনি কিছুটা হাল্কাভাবে আমাকে জানালেন যে, তিনি অতি সম্প্রতিকালে একটা বই লেখার কাজে হাত দিয়েছেন যার শিরোনাম দিয়েছেন ‘ফ্রম গান সেলুট টু গান ফায়ার।’ তিনি নিজেই তার বইয়ের শিরোনাম বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন ‘১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের বন্দীজীবন থেকে ছাড়া পেয়ে লন্ডন ও দিল্লী হয়ে ঢাকা বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করলে তার নেতৃত্বে একদল সৈনিক তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। আবার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে আমার নেতৃত্বে একদল সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক শেখ মুজিবকে গুলি করে হত্যা করে।

যে সমস্ত সেনা-কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুকুর রহমান। ১৯৭২ সালের প্রথম দিকেই তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় তৎকালীন চীফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের অফিসে। ব্রিগেডিয়ার খালেদের সঙ্গে কর্নেল ফারুক তখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করার জন্য নানা কাগজপত্র হাতে নিয়ে যুক্তিতর্ক করছিলেন। ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন অফিসার হয়ে ও চীফ অব জেনারেল স্টাফের মতো উচ্চ পর্যায়ের এবং সেনাবাহিনীর একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে যেভাবে এবং যে সুরে কথা বলছিলেন- সেটা যে স্বাভাবিক ছিল না সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তীকালে অবশ্য জানা যায়, ফারুকের সঙ্গে ব্রিগেডিয়ার খালেদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার কারণেই হয়ত আলোচনার সুরটা ছিল অস্বাভাবিক এবং অনেকটা মান-অভিমানের।

আবুধাবিতে একটা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালের নবেম্বর মাসের শেষ দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করার উদ্দেশ্যে দিল্লীতে আসেন। তবে তার জন্য শেষ মুহূর্তে এমনি একটা সময়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের কোন সুযোগও ছিল না। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যখন ছিল অবধারিত এখন পাকিস্তান থেকে আগত একজন সেনা-কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডে সক্রিয়ভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদানের বিষয়টি বিবেচনায়ও নেয়া হয়নি। তবে নানা উপায়ে দেন দরবার-তদ্বির করে বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ক্ষমতাধর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফলে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও যেহেতু তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেননি তাই চাকরিতে দু’বছরের সিনিয়রিটি তাকে দেয়া হয়নি।

অনেক সেনা-কর্মকর্তার অভিমত, লে. কর্নেল ফারুককে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের নাম করে যুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত একটা বিশেষ মিশনে পাঠানো হয়েছিল। সাধারণত পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে যোগদান করলে নানা প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশন কোর্সের মাধ্যমে অফিসার ও নন অফিসার সকলের মধ্যে চরম ভারতবিরোধী মন-মানসিকতা গড়ে তোলা হয়- যা তাদের মধ্যে প্রথিত হয়ে থাকে আজীবন। কর্নেল ফারুক প্রথম থেকেই ভারত বিদ্বেষী সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীতে একটা গ্রুপ সৃষ্টি করার প্রচেষ্টা নেয় প্রথম থেকেই। তার আপন ভায়রা ২নং ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর খন্দকার রশিদ, মেজর ডালিম, মেজর নূর, মেজর হুদা, মেজর পাশা, মেজর শাহরিয়ার কয়েকজনকে নিয়ে এগিয়ে চলেন তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। এদিকে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত শুভেচ্ছার প্রতীক হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে উপহার হিসেবে পাঠানো ৩০ ট্যাঙ্ক নিয়ে বেঙ্গল ল্যান্সার্স বাহিনী গড়ে তোলার দায়িত্বের সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণে তার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সুযোগটা সহজতর হয়। ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন স্টেশন কমান্ডার লে. কর্নেল হামিদের ভাষ্য অনুযায়ী কর্নেল ফারুকের শক্তির উৎস ছিলেন তৎকালীন চীফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ। খালেদের ছত্রছায়ায় ফারুক জুনিয়র হলেও ক্যান্টনমেন্টে তার ছিল শক্তিশালী বিচরণ। কর্নেল ফারুক যেহেতু ১৯৭৫ সালের প্রথম দিকেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করে ফেলে তাই ব্রিগেডিয়ার খালেদকে ধরে তার ভায়রা মেজর রশিদকে যশোর আর্টিলারি স্কুল থেকে বদলি করে ঢাকায় নিয়ে আসতে সমর্থ হয়। কর্নেল হামিদ তার বইয়ে এমন কথাও লিখেছেন, ‘ফারুক যে একটা কিছু করবেন তা খালেদ জানতেন।’

মেজর খন্দকার রশিদ ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা, খন্দকার মোশতাক আহম্মদের ভাগ্নে। বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক কর্নেল ফারুক তার মাধ্যমে খন্দকার মোশতাক ও অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন। মেজর রশিদ এক সাক্ষাতকারে লে. কর্নেল হামিদকে অবহিত করেন যে, খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝতে পারেন প্রয়োজনের সময় তাকে ব্যবহার করা যাবে। তিনি আরও জানান, খন্দকার মোশতাক ছাড়া আরও অনেক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে এ বিষয়ে কৌশলে কথা বলেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ শেখ মুজিবের সর্বশেষ রাজনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে তারা খুশি ছিলেন না।

মেজর ডালিম ছিলেন আর একজন সেনা কর্মকর্তা যার নাম বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল এই কারণে যে, সে প্রথম ১৫ আগস্ট সকালে বেতার ঘোষণার মাধ্যমে প্রচার করছিল, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। মেজর ডালিমের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচয় হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে বেশ ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল আমাদের মধ্যে। তওফিক এলাহী, মাহবুব উদ্দিন, হাফিজ উদ্দিন ও আমিনুল হক বাদশাসহ আরও কয়েক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা মাঝেমধ্যেই আড্ডায় বসতাম কারও কারও বাড়িতে। এমনকি ডালিম ও নিম্মির বিয়েতেও আমরা প্রচুর হৈচৈ করেছি। যে বিয়েতে বঙ্গবন্ধু নিজেও হাজির ছিলেন ইস্কাটন লেডিস ক্লাবে।

১৫ আগস্ট বঙ্গন্ধুকে হত্যার পরে ষড়যন্ত্রের নায়করা বঙ্গভবনে থেকে দেশ পরিচালনার প্রচেষ্টা নেয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার একজন উপদেষ্টা এবং ভাষাসৈনিক গাজীউল হককে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পরিবারের সদস্যরা এক মাসের অধিককাল ধরে জানত না তাদের কোথায় এবং কিভাবে রাখা হয়েছে। গাজীউল হক যেহেতু আমারও নিকটাত্মীয় ছিল তাই বাধ্য হয়ে ডালিমের সঙ্গে বঙ্গভবনে গিয়ে দেখা করি এবং গাজীউল সাহেবকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে তার সহায়তা চাই। সে তার কথা রেখেছিল এবং পরের দিনই তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। মেজর নূর হল আর একজন সেনা-কর্মকর্তা যাকে অনেকে সত্যিকারভাবে বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে বলে থাকেন আমি অবশ্য তাকে ব্যক্তিগতভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় থেকে চিনি যখন সে আমাদের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানীর প্রথম এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করত এবং প্রধান সেনাপতির নির্দেশ মোতাবেক আমাকে চা খাবার আমন্ত্রণ জানাত। মূলত এটা ছিল প্রধান সেনাপতিকে আমাদের সাইকোলজ্যিাল ওয়ারফেয়ার বিষয়ক কর্মতৎপরতা বিষয়ে অবহিতকরণ এবং তার উপদেশ ও নির্দেশনা গ্রহণ করা বিষয়ে। আইএসপিআরের পরিচালক হিসেবে স্বাধীনতা উত্তরকালে সেনাবাহিনীর অনেক অফিসে ও বহু অনুষ্ঠানে বহুবার দেখা হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন দিনগুলোতে ৮নং থিয়েটার রোডের অনেক স্মৃতিচারণ করেছি নূরের সঙ্গে। নব্বই দশকের প্রথম দিকে যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছি তখন সে হংকংয়ে আমাদের দূতাবাসে কর্মরত ছিল এবং হংকংয়ে বেড়াতে যাওয়ার আমন্ত্রণও সে দিয়েছিলেন একবার।

আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহপাঠী এবং বন্ধু আহম্মদ গোরফুল হোসেনও ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের একজন। তাকে আমরা বন্ধুরা বটু নামেই বেশি চিনতাম। সে ছিল বেঙ্গল ল্যান্সার্স কোরের একজন অফিসার। সেই কারণেই কর্নেল ফারুকের সঙ্গে তার বেশি বন্ধুত্ব। ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের পরে যে গল্পটা সে আমাদের বন্ধুদের বলত সেটা হলো, ১৫ আগস্ট খুব ভোরে চারটি ট্যাঙ্ক নিয়ে সে যখন শেরেবাংলা নগর দিয়ে তৎকালীন রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরের সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল- তখন সে ছিল খুবই ভীতসন্ত্রস্ত এবং আতঙ্কিত এই ভেবে যে, রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা তাদের প্রতিহত করার জন্য গুলি চালানো শুরু করলে তাদের জন্য বাঁচার কোন রাস্তা থাকত না। কারণ, তাদের কোন ট্যাঙ্কেই ছিল না কোন গোলাবারুদ। পরবর্তীকালে জেনারেল এরশাদের আমলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন পরিচালক হিসেবে কয়েক বছর ঢাকায় দায়িত্ব পালন করে গেছে বটু এবং তখন বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে দেখা হতো তার সঙ্গে মাঝেমধ্যেই।

সবশেষে যে তিনজন বেসামরিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা প্রতিষ্ঠিত তারা হলেন : বঙ্গবন্ধু সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের পররাষ্ট্র সচিব মাহবুবুল আলম চাষী। এদের মধ্যে তাহের উদ্দিন ঠাকুরের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচয় ছিল ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকেই।

সময়ের পরিবর্তনে এবং ক্ষমতার হাত বদলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আচার-আচরণ ও ব্যবহারেরও আমূল পরিবর্তন হয় সেটা লক্ষ্য করেছি তাহের উদ্দিন ঠাকুরের বেলায়। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নয় দিন পরে অর্থাৎ ২৪ আগস্ট তৎকালীন সেনাবাহিনী উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে খুনী মোশতাক সরকার তৎকালীন সেনাপ্রধান কেএম শফিউল্লাহর স্থলে সেনা-বাহিনীপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেই তৎকালীন প্রতিরক্ষা সচিব মরহুম মুজিবুল হক অফিসে ডেকে নিয়ে নতুন সেনাবাহিনী প্রধানের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রচারণার বিষয়ে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করে তার নির্দেশ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমাকে আদেশ দেন। প্রতিমন্ত্রী অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে মন্ত্রী মহোদয়ের কক্ষে প্রবেশ করলে তিনি আমাকে বসতে না বলে অনেকটা ব্যাপকভাবে প্রশ্ন করলেন ‘আজ নয়দিন হলো সরকার পরিবর্তন হয়েছে; ডিরেক্টর আইএসপিআরকে দেখিনি কখনও এতদিন?’ আমার কোন জবাব ছিল না। তিনি কিছুক্ষণ পরে বসতে বললেন এবং জানতে চাইলেন কেন এসেছি তার কাছে? তার কাছে যাবার উদ্দেশ্যটা শুনে সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাকে লাল ফোনে ফোন করলেন এবং আমাকে বললেন তার কাছে যেতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার জন্য।

যেহেতু প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে আমার বহুদিনের পরিচয় এবং পরিচালক আইএসপিআর হিসেবে আমাকে ভালভাবেই জানেন তাই তার কাছে গেলে সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে গেলাম সমাধান। তবে জেনারেল ওসমানী প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রচারণা ও জনসংযোগ বিষয়ে যে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আমাকে সেদিন দিয়েছিলেন- সেটা ছিল প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রচারণা বিষয়ে কোন কিছু পত্রপত্রিকা, রেডি-টেলিভিশনে এবং অন্যান্য গণমাধ্যমে যাবে না তার ব্যক্তিগত ক্লিয়ারেন্স ছাড়া।

লেখক : সাবেক আইএসপিআর পরিচালক