১৮ আগস্ট ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালী জাতির পিতা

  • মেজর জেনারেল (অব) সুবিদ আলী ভূঁইয়া

বাঙালীর ইতিহাস হাজার বছরের। হাজার বছরে জাতির অসংখ্য বীর সন্তানের জন্ম হয়েছে এই ভূ-খন্ডে। কিন্তু ‘বাংলাদেশ’ নামক জাতিসত্তার একটি দেশের প্রতিষ্ঠাতা কেবল একজনই। হাজার বছরের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানটির নাম শেখ মুজিবুর রহমান। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার এক নিভৃত পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই বাঙালীর অধিকার সচেতন ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাহচর্যে এসে রাজনীতিতে নিজের একটা স্বতন্ত্র অবস্থান গড়েন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আন্দোলনের পথ বেয়েই তিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক ব্যবধান ১২০০ মাইল। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতির ক্ষেত্রে দুটি ভূ-খন্ডের ব্যবধান ছিল শত-সহস্র। কেবল ধর্মই বন্ধনকে টিকিয়ে রাখার অবলম্বন ছিল। কিন্তু শুরুতেই পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণ ও বৈষম্য এই অঞ্চলের মানুষের বোধে আঘাত হানে। প্রথম আঘাতটাই আসে বাঙালীর ভাষার ওপর। পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ বাঙালী হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়। সেই থেকে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ে বাঙালী রুখে দাঁড়ায়। ভাষার জন্য রক্ত দেয় বাঙালী। রক্তের পথ বেয়েই এ দেশের মানুষ অধিকার ছিনিয়ে আনে। দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ এবং বৈষম্যের পর বাঙালীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বাধীনতার কোন বিকল্প ছিল না। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল এই দীর্ঘদিনের আন্দোলন আর সংগ্রামেরই চূড়ান্ত পর্যায়। আর এসবই সংঘটিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। সেই ছাত্রাবস্থা থেকে আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেয়ে তিনি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালী জাতির পিতা।

তার দীর্ঘ সংগ্রামী নেতৃত্বের মূলভিত্তি হলো ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি। ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও অসাধারণত্ব ছিল বহুমাত্রিক। প্রায় ১৯ মিনিটের এই ভাষণে শব্দ ছিল ১০০৭টি। অলিখিত এই ভাষণটি ছিল পাকিস্তানের ২৩ বছরের বঞ্চনা ও শোষণের ইতিহাস। সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সে প্রেক্ষিতে কী কী করণীয় তার দিক-নির্দেশনা। এতে আরও ছিল স্বাধিকার আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত করার কৌশল ও সফলতা লাভের রূপরেখা। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিচার করলে ভাষণটি ছিল অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা হয়েও ৭ মার্চের ভাষণে আসন্ন পরিস্থিতিতে জনগণের কী কী করণীয় তুলে ধরেছেন এভাবে- ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। আমি যদি হুকুম দেবার না পারি... মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’

এ ধরনের তেজোদীপ্ত বাক্য কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার নয়, একজন দেশস্রষ্টার কণ্ঠেই ধ্বনিত হওয়া সম্ভব। তার অন্তর থেকে ছুঁয়ে আসা আত্মবিশ্বাসই বলেছিল বাংলার মানুষ কী চায়। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- একটি দেশকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে এর চেয়ে স্পষ্ট উচ্চারণ আর কী হতে পারে! প্রকৃতপক্ষে, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেই ‘ডি ফ্যাক্টো’ স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল। এই ভাষণের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল। তাই পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছিল।

আমরা তার আহ্বানেই পরিবার-পরিজন ছেড়ে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে দীর্ঘ নয় মাস জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছি। পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনে ১৪ বছরই কারাগারে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। আসলে শেখ মুজিবের উচ্চতায় কেবল শেখ মুজিবকেই মানায়; অন্য কাউকে নয়। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, ’৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো একটি মীমাংসিত বিষয়কে নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করে। সেই থেকে ইতিহাস বিকৃতির পালা শুরু হয়। এরপর একটি মহল ক্রমান্বয়ে পাঠ্যপুস্তক, স্বাধীনতার দলিলপত্রেও নগ্ন হস্তক্ষেপ চালায়। একজন সেক্টর কমান্ডারকে তার সমকক্ষ হিসেবে আনার জন্য মিথ্যা ইতিহাস রচনার প্রতিযোগিতা চলে। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সুযোগ-সন্ধানী কিছু মুক্তিযোদ্ধাও। কিন্তু সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। যারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় থেকে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে নিয়ে গিয়েছিল তারা সফল হয়নি।

আজ জাতীয় শোক দিবস। শোক দিবসে পাঠকদের আমি এই মহামানবের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিময় ঘটনা তুলে ধরছি-

১৬ ডিসেম্বর ’৭১ দেশ স্বাধীন হলেও সেই সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি বিহারী অধ্যুষিত এলাকা তখনও উত্তপ্ত ছিল। ওই সব স্থানে তখনও বাঙালি-বিহারী সংঘর্ষ চলছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিহারীদের অমানুষিক ও বর্বর আচরণের কারণে স্বাধীনতার পর বাঙালিরা ছিল তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ। সময়টা আমার যতদূর মনে পরে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে। আমি তখন যশোর ক্যান্টনমেন্টে ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের টু-আই-সি। একদিন রাত প্রায় ১২ টার দিকে টেলিফোন পেলাম খুলনার খালিশপুরে বাঙালি-বিহারী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে। ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার মেজর মতিন ফোনে জানালেন দুই ঘণ্টার মধ্যে একটি কোম্পানি নিয়ে আমাকে ঘটনাস্থলে যেতে হবে। এর কিছুক্ষণ পরই ৫৫ বিগ্রেডের বিগ্রেড কমান্ডার লে. কর্নেল এম এ মঞ্জুর আমাকে ফোনে খুলনার খালিশপুরে বাঙালি বিহারী সংঘর্ষের বিস্তারিত জানালেন এবং নির্দেশ দিলেন যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। নির্দেশ পেয়ে ব্যাটালিয়নে গেলাম। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে খুলনার দিকে রওয়ানা হলাম। খুলনা পৌঁছে সূর্য ওঠার আগেই দাঙ্গা কবলিত এলাকায় সৈন্য মোতায়েন করলাম। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মেশিনগান ফিট করলাম। এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলাম।

এর ক’দিন পর বঙ্গবন্ধু দাঙ্গা কবলিত এলাকা দেখতে এলেন। লে. কর্নেল এম এ মঞ্জুর বিগ্রেড কমান্ডার হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করলেন। বঙ্গবন্ধু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর খুলনা সার্কিট হাউসে চলে গেলেন। লে. কর্নেল এম এ মঞ্জুর আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার সময় বললেন, ভূঁইয়া আমি সার্কিট হাউসে যাচ্ছি, বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকেছেন। আমি মঞ্জুরকে বললাম স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে যেতে পারি? আমি কখনও বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখিনি। মঞ্জুর বললেন, ও তুমি কখনও দেখনি! ঠিক আছে চল, গাড়িতে উঠো।

সার্কিট হাউসে গেলাম। লে. কর্নেল মঞ্জুর খুলনার পরিস্থিতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট কথা বললেন। বিদায়ের আগে মঞ্জুর বঙ্গবন্ধুকে বললেন স্যার, আমার সঙ্গে একজন অফিসার এসেছে, সে আপনাকে কখনও কাছ থেকে দেখেনি। আপনাকে দেখতে চায়। বঙ্গবন্ধু বললেন, ও তাই নাকি, ওর নাম কি? ঠিক আছে, ওকে ডাক।

আমি বঙ্গবন্ধুর রুমে ঢুকে সামরিক কায়দায় সালাম দিলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ভূঁইয়া তুমি কেমন আছ? আমি জবাব দেয়ার আগেই হাসতে হাসতেই বললেন, আরে তুমি মেজর ভূঁইয়া না ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া? আমি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছি। বঙ্গবন্ধু আবারও বললেন, তুমি যুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে ছিলে, তোমরা চট্টগ্রামে যুদ্ধ করেছিলে তা আমি শুনেছি। তারপর বললেন, আমি নাসিরের (শেখ আবু নাসের) বাসায় যাচ্ছি। ইউ বোথ ফলো মি।

বঙ্গবন্ধু সকল সফর সঙ্গীকে নিয়ে শেখ নাসের সাহেবের বাসায় পৌঁছলেন। খানাপিনার সুন্দর আয়োজন। বঙ্গবন্ধু খাবার টেবিলে বসলেন। টেবিলটি উত্তরে-দক্ষিণে সাজানো। বঙ্গবন্ধু দক্ষিণ দিকে বসলেন। তাঁর পাশে মন্ত্রী-এমপিরা বসলেন। এম এ মঞ্জুর ও আমি বসলাম উত্তর প্রান্তে শেষ দিকে, মুখোমুখি। বঙ্গবন্ধু এদিক ওদিক তাকিয়ে বললেন, আরে দেখতো, আমার সঙ্গে দু’জন সামরিক বাহিনীর অফিসার এসেছে, ওরা কোথায়? আমাদের অবস্থান জানার পর তিনি তাঁর ডানে এবং বামে বসা দুই মন্ত্রীকে অন্যত্র বসতে বলে আমাদের তাঁর কাছে এসে বসতে বললেন। আমি বসলাম বঙ্গবন্ধুর ডানে এবং মঞ্জুর বামে। মঞ্জুর আর আমি মুখোমুখি। খাবার টেবিলেই বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে কি ঘটেছিল, কিভাবে কি করেছিলাম। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করলেন। জানতে চাইলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কথা। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে বললেন, ‘ওই ভূঁইয়া তোরা তো একটা ভুল করেছিলি। আমাকে পাকিস্তানীরা ধরে নিয়ে গেল আর তোরা রেডিওতে প্রচার করেছিলি আমি তোদের সাথেই আছি- এটা কেমনে করলি তোরা। আমি বললাম স্যার- আপনার নাম বলা ছাড়া তো আর কোন উপায় ছিল না। আমাদের কে চিনে! বঙ্গবন্ধু বললেন শোন্, আমি আছি পাকিস্তানীদের সাথে আর তোরা বলছিলি আমি আছি তোদের সাথে। এই অজুহাতে ওরা যদি আমাকে মেরে ফেলত? স্যার, আসলে ওই সময়তো এত সিরিয়াসলি ভাবি নাই। তবে আপনার নাম বলার কারণ ছিল জনসাধারণকে আমাদের পক্ষে টেনে আনা, তাদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য। জনগণ যদি জানতো এবং বিশ্বাস করতো আপনি আমাদের সাথে নাই, তখন তো যুদ্ধের শুরুতেই দেখা দিত বিশৃঙ্খলা বা হতাশা। বঙ্গবন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। এক পর্যায়ে আমি বললাম, স্যার একটা কথা বলি, আপনিতো দেশটা স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। আমরা আপনার নাম ব্যবহার করার ফলে যদি তারা আপনাকে মেরে ফেলত, বিনিময়ে যদি আমরা স্বাধীনতা পেতাম, আপনার আত্মা অন্তত শান্তি পেত। বঙ্গবন্ধু আমার কথা শুনে হাসি দিয়ে খাবার টেবিল মাতিয়ে তুললেন। সেই স্মৃতিময় সাক্ষাত আমাকে আজও বিমোহিত করে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি আমাকে তুমি থেকে তুই বলে আপন করে নিয়েছিলেন। এরপর যতবারই দেখা হয়েছে ততবারই তুই বলে সম্বোধন করতেন।

আসলে ১৬ কোটি মানুষের মনে যে শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান, তার চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে। এই স্বীকৃতি বাঙালির অন্তরে লালিত। এই স্বীকৃতির নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয় শোক দিবসে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারসহ সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

লেখক : সংসদ সদস্য, সভাপতি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি