১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভালবাসার নাম রাসেল

  • মোহাম্মদ ছালামত প্রধান শামীম

শেখ রাসেল অবিকশিত এক ফুলের নাম। ঘাতকের বুলেট যার জীবন প্রদীপ থামিয়ে দিয়েছিল বিকশিত হওয়ার আগেই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ধানম-ির বত্রিশ নম্বর বাড়ি সেদিন যেন গণহত্যার মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। ঘাতকদের নির্মম বুলেট মাত্র দশ বছর বয়সী এই শিশুটির প্রাণও কেড়ে নেয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। কোন কাকুতি-মিনতি কিংবা নিষ্পাপ মুখশ্রী দুর্বৃত্তদের মন টলাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীরা তাকে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার নিশ্চিহ্ন করতে। তাদের অপচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। শহীদ শেখ রাসেল আজ বাংলাদেশের শিশু-কিশোর, তরুণ, শুভবুদ্ধিবোধ সম্পন্ন মানুষের কাছে ভালবাসার নাম। রাসেল ভাই বেঁচে থাকলে আমাদের সমবয়সী হতেন। হয়তো বোন শেখ হাসিনার রাজনীতির সহযোগী হতেন। দেশ সেবায় পিতার মতো মানুষের পাশে দাঁড়াতেন।

১৯৬৪ সাল। সময়টা ছিল রাজনীতির জন্য অন্ধকার। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে দাঁড়িয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। অন্ধকার দূর করে রাঙা আভার স্বপ্ন দেখছে এই অঞ্চলের মানুষ। যার হাত ধরে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটবে তার ঘর আলোকিত করে জন্ম নিল এক ছোট্ট শিশু। শিশুর নাম রাসেল। এত নাম থাকতে রাসেল কেন! কারণ মায়ের প্রিয় নাম ছিল রাসেল। মা ছিলেন বই পোকা মানুষ, বই পড়তে ভাল বাসতেন এবং ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন। তাই বার্ট্রান্ড রাসেলের নামানুসারে নাম রাখা হয় রাসেল। পুরো নাম হয় শেখ রাসেল।

স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের কথা বলছি। ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানম-ির বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্ম নেন ছোট্ট শিশু রাসেল। ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবন তখন আজকের রূপে ছিল না। শুনেছি, দোতলার কাজ তখনও শেষ হয়নি, ধীরে ধীরে বাড়ির কাজ চলছে। নিচতলার উত্তর-পূর্ব দিকের ঘরটা ছিল শেখ কামাল ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সেই ঘরেই রাসেল জন্ম। জানা যায়, রাসেলের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিতেন বঙ্গবন্ধু। সভা-সমাবেশ করে ফিরতে রাত হলেও রাসেলকে ঘুমের মধ্যে আদর করতেন শেখ মুজিব। শিশু বয়সেই রাসেল ছিল চঞ্চল প্রকৃতির। সারা বাড়ি সব সময় মাথায় তুলে রাখত। তবে রাসেলের দুর্ভাগ্য বাবাকে খুব বেশি কাছে পায়নি। বলা যায়, ছোটকাল কেটেছে বাবাকে ছাড়াই। কারণ, তার বাবা রাজনৈতিক বন্দী হয়ে কারাগারে ছিলেন দীর্ঘদিন। বাবাকে দেখতে না পেয়ে মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে আব্বা বলে সম্বোধন করতেন রাসেল। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে রাসেলকে নিয়ে কষ্টের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘কারাগারে রোজনামচা’ বইয়ে শেখ মুজিব অসংখ্যবার রাসেলের কথা তুলে ধরেছেন এবং তার কাছে যে ছোট্ট সন্তান খুব প্রিয় ছিল সেটিও ফুটিয়ে তুলেছেন।

১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের পর থেকেই রাজবন্দী হিসেবে জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার বাবাকে রেখে আসবে না। এ কারণেই তার মন খারাপ থাকত। ‘কারাগারের রোজনামচা’তে শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছেন : ‘৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বাড়ি চলো।’ কী উত্তর ওকে আমি দিব। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দী। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কি বুঝতে চায়! কি করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখেনি। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে। এই ছিল শেখ রাসেলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর দরদ যা ফুটে ওঠে জাতির পিতার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে।

৪ বছর বয়সে রাসেলের শিক্ষাজীবন শুরু। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে। নিজ আগ্রহ নিয়ে স্কুলে যেত। বন্ধুবৎসল ছিল রাসেল। পর্যায়ক্রমে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে ওঠে রাসেল। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে শেখ রাসেলের জন্য একজন গৃহশিক্ষিকা রাখা হয়। শেখ হাসিনার স্মৃতিচারণে জানা যায়, শিক্ষিকাকে খুব সম্মান করতেন শেখ রাসেল। খুব দুষ্ট প্রকৃতির ছিল। তাই শিক্ষিকাকে রাসেলের কথা শুনতে হতো, নইলে সে পড়াশোনায় মনোযোগী হতো না। তাই শিক্ষিকাও রাসেলের কথা অনুযায়ী শিক্ষাদান করতেন। শিক্ষিকার খাবার-দাবারের ব্যাপারে খুব সচেতন ছিল শেখ রাসেল। প্রত্যেক দিন শিক্ষিকার জন্য দুটি করে মিষ্টি বরাদ্দ থাকত এবং শিক্ষিকাকে তা খেতে হতো রাসেলের ইচ্ছানুযায়ী। এভাবেই চলছিল শেখ রাসেলের বাল্যকাল।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কচি মুখ, মায়াবী চোখ, নির্মল হাসির অবুঝ শিশু রাসেলের বাঁচার আকুতির বিনিময়ে, ঘাতকরা কচি বুকটা ঝাঁঝরা করে বুলেটের আঘাতে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তারও বুকের তাজা রক্তে ভেসে যায় মেঝে। শিশু রাসেল ঘাতকদের বাধা দিতে পারেনি, ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে নীরবে। রাসেলের কান্না, সেদিন পায়নি মানবতার ছোঁয়া। রাতের নিস্তব্ধতা ও অশুভ শক্তির বেষ্টনী ভেদ করে পৌঁছায়নি পৃথিবীর মানুষের কানে। কিন্তু ইথারে ভাসতে ভাসতে পৌঁছে গেছে আল্লাহ্র দরবারে, প্রচ- ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠেছে আল্লাহ্র আরশ যা আমরা বুঝতে পারিনি, অনুভব করতে পারিনি। তারপরও আল্লাহ্র অপার মহিমা! বিদেশে থাকার কারণে ভাগ্যগুণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা আমাদের প্রিয় নেত্রী, শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। স্বজন হারাবার ব্যথায় ক্ষতবিক্ষত তাঁদের হৃদয়, বিভীষিকাময় ও দুর্বিষহ কাল রাতের স্মৃতি আজ তাদের জীবনের একমাত্র সম্বল।

আসলে বঙ্গবন্ধু নিজেই এক ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস, ইতিহাসের এক কিংবদন্তি। ইতিহাসের এই কিংবদন্তিকে হত্যা করে যারা বদলে দিতে চেয়েছিল ইতিহাসের ধারা, তারা জানে না হত্যা ইতিহাসের পথচলা থামাতে পারে না। ইতিহাসের হাত ধরেই বঙ্গবন্ধু যেন উঠে এসেছেন তাঁর প্রিয় সোনার বাংলায়, তাঁর প্রিয় মানুষের কাছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মিছিলে, কবিতার আসরে, নাটকের মঞ্চে সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে বঙ্গবন্ধু অস্তিত্ব। কবির ভাষায়, যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

আগস্ট শোকের মাস। এই শোকের মাসে শেখ রাসেলকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি। স্মরণ করছি, জাতির পিতাসহ ১৫ আগস্টের সকল শহীদকে ।

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

salamot46@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ