১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জীবনের ঝুঁকি আছে তবুও ফেরার তাড়া

জীবনের ঝুঁকি আছে তবুও ফেরার তাড়া
  • ঈদের পর রাজধানীতে ফিরছে মানুষ ;###;অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঘাটে ভিড়ছে লঞ্চ ;###;ট্রেনের ছাদেও ঠাসাঠাসি ;###;তবে সড়কপথে বাসের ছাদে ওঠার দৃশ্য চোখে পড়েনি

ওয়াজেদ হীরা ॥ ভোর সাড়ে ৪টা। মুসল্লিরা যখন মসজিদে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন একসঙ্গে কয়েকটি লঞ্চ ভিড়ল সদরঘাট টার্মিনালে। প্রতিটি লঞ্চেই তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ঈদ ফেরত যাত্রীদের কোলাহলে কর্মচঞ্চল পুরো এলাকা। লঞ্চ থেকে নেমেই যে যার গন্তব্যে যেতে বিভিন্ন বাহন খুঁজতে লাগলেন। কয়েক হাজার যাত্রীর একত্রে সমাগমে একটা জটলাও ওই এলাকায়। এরই মধ্যে এসে যায় আরও কয়েকটি লঞ্চ। নিরাপত্তার শঙ্কা থাকলেও লঞ্চের ছাদ পর্যন্ত অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই লঞ্চ বিভিন্ন স্থান থেকে ঘাটে ভিড়ছে। শুধু লঞ্চেই নয়, ট্রেনের ছাদেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফিরছে মানুষ। এমন যাত্রায় আছে জীবনের ঝুঁকি আবার আছে কর্মস্থলে ফেরার তাড়াও। ক্লান্তি আর ঘুম চোখে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দস্মৃতি নিয়ে ফিরছে ঈদে বাড়ি যাওয়া মানুষ।

কোরবানির ঈদে রাজধানী থেকে বাড়ি যাওয়া মানুষের কিছু অংশ গত মঙ্গলবার রাতেই ফিরেছেন। অনেকেই বুধবার অফিসও করেন। আবার বৃহস্পতিবার জাতীয় শোক দিসবের সরকারী ছুটির কারণে বড় অংশ শুক্রবার রাত থেকে ফিরতে শুরু করেন। শুক্র ও শনিবার রাজধানীর লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে নানা বিড়ম্বনা আর ঝুঁকিপূর্ণ ফেরার দৃশ্য। তবে ঈদ ফেরত যাত্রীরা বলছেন, ঝুঁকি থাকলেও কর্মস্থলের দায়িত্ববোধের কারণে ফিরতে হচ্ছে। আর স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির জন্য কয়েক ঘণ্টার বিড়ম্বনা মেনে নিচ্ছেন তারা।

শনিবার ভোরে সদরঘাট এলাকায় দেখা যায় মানুষের বড় কোলাহল এই ঘুমন্ত শহরে। রাজধানীর মানুষ যেখানে ঘুমিয়ে আছে সেখানে শুধু স্টেশনগুলোতেই কোলাহল। ঘাট সংশ্লিষ্টরা জানান, সারারাতই বিভিন্ন লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে-আসছে। ফলে রাতব্যাপী কোলাহল থাকে এখানে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ততাও বাড়ে। তবে অধেকের বেশি লঞ্চ ঘাটে ভিড়ে ভোর ৪ টা থেকে ৭ টার মধ্যে। সকাল ৯টা পর্যন্ত অর্ধশত লঞ্চে প্রায় দুই লাখের মতো যাত্রী ঢাকায় এসেছে বলে সূত্র জানায়। তবে দিনের অন্যান্য সময়ও আসা লঞ্চে আরও অসংখ্য যাত্রী প্রবেশ করেছে। আজ রবিবার ভোরে আরও কয়েক লাখ মানুষ এই নদীপথে ফিরবে ঢাকায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ২২টি জেলা থেকে কর্মস্থল ঢাকায় ফিরছে মানুষ। পটুয়াখালী থেকে ফেরা জুলহাস পরিবার নিয়ে ঈদ শেষে ফিরেছেন ঢাকায়। ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা নিয়ে বলেন, ভাড়াও বেশি দিছি আবার রবিবার থেকে অফিস করতেই হবে। সারা বছরের জন্য কর্ম করে খাই সেটি টিকিয়ে রাখতে এই ঝুঁকি তো নিতেই হয়।

এদিকে, লঞ্চ ও যাত্রীদের চাপে টার্মিনালে জনজট ও লঞ্চজট দুটোই দেখা গেছে। টার্মিনালে ভিড়তে না পেড়ে অনেক লঞ্চ অন্য লঞ্চের ভেতর দিয়ে যাত্রী নামাতে হয়েছে। ফলে নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষকে মাইকিং করতে শোনা গেছে, দ্রুত যাত্রী নামিয়ে টার্মিনাল ত্যাগ করারও নির্দেশনা দিচ্ছে। আবার ফিরতি যাত্রী না নিয়ে খালি লঞ্চ ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঈদ শেষে শহরমুখী যাত্রীর উদ্দেশে। ভোর থেকেই হকারদের হাঁকডাক, লঞ্চের হর্ন, রিকশা, সিএনজিচালকদের হাঁকডাকে কর্মচঞ্চলতা ফিরে পেয়েছে।

ভোর থেকে বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠী, পিরোজপুর, বরগুনা, চরফ্যাশন, হুলারহাট, ভা-ারিয়া, লালমোহনসহ দেশের বিভিন্ন রুটের যাত্রীবোঝাই লঞ্চ টার্মিনালে ভিড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টার্মিনালে লঞ্চ ও যাত্রী বাড়তে থাকে। এ সময় টার্মিনালে লঞ্চজটের সৃষ্টির ফলে অনেক লঞ্চকে টার্মিনালের ভিড়তে ঘণ্টারও বেশি অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কোন কোন লঞ্চ টার্মিনালে ভিড়তে না পেরে অন্য লঞ্চের মাধ্যমে যাত্রীদের নামাতে দেখা গেছে। একই সময়ে অনেক লঞ্চ চলে আসায় টার্মিনালের অতিরিক্ত চাপ কমাতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তাদের বার বার মাইকিং করে দ্রুত যাত্রী নামিয়ে টার্মিনাল ছাড়ার নির্দেশ দিতে শোনা যাচ্ছে। যাতে ঘাটে আসা অন্যান্য লঞ্চও যাত্রীদের নিরাপদে নামাতে পারে। লঞ্চগুলোও দ্রুত যাত্রী নামিয়ে ঈদ ফেরত যাত্রী আনতে আবার নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে যাচ্ছে।

এছাড়া ঈদ উপলক্ষে সতর্কতামূলক বিভিন্ন ব্যানার এখনও শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। অপরিচিত লোকের দেয়া কিছু না খেতে বা অপরিচিতদের সঙ্গ না দিতে নানা নির্দেশনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে না ওঠার পরামর্শও রয়েছে তবে বাস্তবতার নিরিখে সেটি যেন মানান। প্রয়োজনের তাগিদে ঝুঁকিকে গুরুত্বই দিচ্ছে না যাত্রীরা। শনিবার ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত টার্মিনালে যে সকল লঞ্চ ভিড়েছে প্রত্যেক উপচে পড়া ভিড়। এমভি মধুমতি, এমভি সুন্দরবন, এমভি পারভেজ, সুরভি, পারাবাতসহ একাধিক লঞ্চ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার যে সংখ্যক যাত্রী ঢাকায় এসেছেন তার কয়েকগুণ বেশি আসবেন রবি ও সোমবার। এছাড়াও চলতি সপ্তাহ পুরোটাই যাত্রীদের চাপ থাকবে বলেও মনে করছেন তারা। তবে চাকরিজীবীরা আজ রবিবারের মধ্যেই ফিরবেন বলে মনে করছেন। বৃহস্পতিবার যে লঞ্চগুলো ২০০ বা তিনশ’ যাত্রী নিয়ে এসেছে সেই লঞ্চেই শুক্রবার এসেছে প্রায় দুই হাজার যাত্রী, শনিবার তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও দেখা গেছে ঘাট এলাকায়। ভোলা থেকে আগত যাত্রী বলেন, লঞ্চে এমনিতেই জায়গা পাওয়া যায় না। যে সেখানে পারে আসতে পারলেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কষ্ট করে এলে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে পেরে খুশি তিনি। এদিকে, চাঁদপুর থেকে একটু পরপরই লালকুটি ঘাটে ভিরে অনেক লঞ্চ। ঢাকার নিকটে হলেও এখানেও রয়েছে প্রচুর মানুষের ভিড়। অনেকেই সড়কপথ এড়িয়ে নৌপথ ব্যবহার করেন বলে এই ভিড়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘাটে দায়িত্বরত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে যাতায়াত বিষয়ে সব সময়ই নির্দেশনা দেয়া হয়। আমরা এই কঠোর থাকার বিষয়ে চেষ্টাও করি। এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ঈদের সময় মানুষের ¯্রােত বেশি থাকে। ফলে আমাদের ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় পারি না। আর যে সকল জেলা থেকে লঞ্চ ছেড়ে আসে সেখানেও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তবে আমরা আন্তরিক। জীবনের মূল্য নিয়ে মানুষের মধ্যেও সচেতনতা আসতে হবে বলে মনে করেন ঐ কর্মকর্তা।

সদরঘাট নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা (বিআইডব্লিউটিএ) জনকণ্ঠকে বলেন, শনিবার বলা যায় যাত্রী অনেক বেড়ে গেছে। রবিবারও থাকতে পারে। তবে এরপরে হয়ত চাপ কমে আসবে।

বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তা বলছেন, ঈদ যাত্রায় আমরা দুর্ঘটনার খবর এখনও পাইনি। আর অতিরিক্ত ভাড়া বিষয়ে কেউ কোন অভিযোগও করেনি। এছাড়া অজ্ঞান পার্টি, ছিনতাইকারী, পকেটমারের খপ্পরে পড়েছে এমন কোন খবরই পায়নি বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। যাত্রীবাহী লঞ্চ মালিক সমিতির নেতারাও জানান, অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে না ওঠার জন্য যাত্রীদের নিষেধ করলেও শেষ পর্যন্ত ঠিকই উঠে যান। ঈদের সময় এটি বেশি হয় বলেও জানান।

এদিকে, একই অবস্থা ট্রেনেও। বিলম্বকে সঙ্গী করে ফিরছে মানুষ। সেই সঙ্গে ট্রেনের ছাদে যাচ্ছেন যাত্রী। অগ্রিম টিকেট সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত শত বিড়ম্বনা নিয়ে ঈদে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরেছিলেন রাজধানীবাসী। স্বজনদের সান্নিধ্য পেতে সেই সময় বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতার আর উচ্ছ্বাসই বলে দিচ্ছিল যে ঘরে ফেরার আনন্দ তাদের কতটা! সেই আনান্দের ইতি টেনে স্বজনদের ছেড়ে জীবিকার তাগিদে ফিরছেন এই জাদুর শহরে। ফেরাটাও স্বস্তির নয়। শনিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে কমলাপুর স্টেশনের ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছালো খুলনা থেকে ছেড়ে আসা সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি। যেই ট্রেনটি ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে কমলাপুর আসার কথা ছিল। ট্রেনটি বিলম্বে ছেড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা বিলম্বে কমলাপুর পৌঁছায়।

একইভাবে শনিবার সকালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে জানানো হয়েছে, রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে কমলাপুর এসে পৌঁছার কথা ছিল। কিন্তু এটি আসার সম্ভাব্য সময় ১০টা ২০ মিনিট। কিন্তু বেলা ১১টায়ও এসে পৌঁছাতে পারেনি। রংপুর থেকে ছেড়ে আসা রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৬টা ৫ মিনিটে কমলাপুর আসার কথা থাকলেও সম্ভাব্য সময় দেয়া হয় বিকেল সাড়ে ৩টা। এছাড়া চিলহাটী থেকে ঢাকাগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস সকাল ৭টা ১০ মিনিটে আসার কথা ছিল। এটি আসার সম্ভাব্য সময় দেয়া হয় বেলা ১১টায়। পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী একতা এক্সপ্রেস সকাল ৮টা ১০ মিনিটে কমলাপুর আসার কথা ছিল। কিন্তু এটি বেলা সাড়ে ১১টায় আসতে পারে বলে স্টেশন থেকে জানানো হয়। নির্দিষ্ট সময় পরেও যে সম্ভাব্য সময় দেয়া হয় অনেক ট্রেন সেই সময়ের মধ্যেও এসে পৌঁছাতে পারেনি।

পঞ্চগড় ॥ প্রায় ৫ ঘণ্টার মতো অপেক্ষা। যাওয়ার সময়ও কষ্ট করতে হয়েছে আসার সময়ও। সিডিউল বিপর্যয়ের মতো আরও রয়েছে ফিরতি টিকেট পাওয়ার ঝামেলা। আবার অনেকে টিকেটের ভোগান্তিতে ছাদে উঠেছেন। আলম হোসেন নামের খুলনা থেকে আসা যাত্রী বলেন, সব ট্রেনেই বিলম্ব করে ফিরছে। এতে করে আমরা যারা যাত্রী কষ্ট বেড়ে যাচ্ছে। ঈদের সময়ে এই ভোগান্তির একটা অবসান হওয়া দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার আমিনুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ঈদ শেষে ঢাকায় ট্রেনে ফিরতি পথে যাত্রীদের চাপের কারণে ট্রেন আসতে বিলম্ব হচ্ছে। প্রতিটি স্টেশনে যাত্রীদের ওঠার জন্য নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। এছাড়া যেসব ট্রেন বিলম্বে ছেড়েছে সেই ট্রেনগুলো বিলম্বে ফিরে আসছে ঢাকায়।

উত্তরবঙ্গের কয়েকটি ট্রেনের ছাদেও বেশ ভিড় দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যারা পোশাক কারখানায় কাজ করেন একটু অল্প খরচে ফেরার জন্য আর বাসের সিট না পেয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে পড়েন। এরা বিশেষ করে গাজীপুর, টঙ্গী, উত্তরা এলাকার যাত্রী বেশি থাকে। তবে অনেক যাত্রী ঢাকার কমলাপুর এসেও নামেন।

সিল্ক সিটির এক যাত্রী বলেন, তিনি সাভার পোশাক কারখানায় কাজ করেন। পরিবার নিয়ে ঈদের বাড়িতে যান ফিরেছেন ট্রেনের ছাদে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলেন, ঢাকায় তো আইতে হইবো। কোনো খানে সিন নাই। ট্রেনের ভিতরে সিট থাকলে তো আর উপরে উঠতাম না। এদিকে রেলস্টেশন এলাকায়ও এসব নিয়ে সতর্ক করা হলেও যাত্রীদের যেন এ বিষয়ে কোন মনোযোগ নেই! ট্রেন থেকে নেমে হাঁটা ধরে নিজ গন্তব্যে।

এবারের ঈদ যাত্রা শুরুর সময়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন ছাদে যারা ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করেন তাদের হাত নেড়ে শুভেচ্ছাও জানান। রেলের উর্ধতন কর্মকর্তারাও ছিলেন সেই সময়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে করে যাত্রীদের যাওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে রেলমন্ত্রী সুজন বলেন, এসব লোককে নামিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান করতে পারব? সব সময় ইচ্ছা থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা যাত্রীদের ছাদ থেকে নামিয়ে দিতে পারি না। তবে ট্রেনের ছাদে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় যে মন্ত্রণালয়ের ওপরই পড়বে, তা স্বীকার করে নেন মন্ত্রী। এই সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দেয়ার আহ্বানও জানান তিনি। তবে আগামীতে চেষ্টা থাকবে যেন মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে না যায় সে বিষয়েও মন্ত্রী জানিয়ে রাখেন।

এদিকে, সড়কপথেও ফিরছে মানুষ। তবে সড়কপথে কোথাও বাসের ছাদে ওঠার দৃশ্য দেখা যায়নি। তবে ভাড়া বেশি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে অসংখ্য। দুইশ’ টাকার ভাড়া দ্বিগুণ, কখনও তিনগুণ নেয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকার ভাড়া ১৫০ টাকা হলেও সৌখিন, শ্যামলী, আলম, এশিয়াসহ অন্যান্য গাড়িতে নেয়া হচ্ছে, কমপক্ষে তিনশ’ টাকা। কোন কোন বাসে চার বা পাঁচশ’। টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসতে অন্যান্য সময় বাস ভাড়া ১৫০-২০০ টাকার মধ্যে হলেও এখন তা তিনশ’র ওপর। অন্যান্য শহর থেকে ছেড়ে আসা বাসেও বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবারের ঈদ যাত্রায় দীর্ঘ জট বেশ ভুগিয়েছে সড়ক পথ। তবুও সড়কপথেই ফিরছে মানুষ। বাসের ছাদে না উঠলে সড়কে বিভিন্ন পণ্য-যাত্রী নিতে দেখা গেছে। বিশেষ করে নি¤œ আয়ের মানুষকে ট্রাক বা মিনি পিকাপ ভাড়ায় উঠেছেন যাত্রী হয়ে। এছাড়াও সড়কপথে দূর-দূরান্তের মোটরবাইকে করে অনেকেই বাড়ি গিয়েছিলেন। যদিও নিরাপত্তার স্বার্থে হেলমেট ব্যবহার করলেও দীর্ঘ যাত্রায় অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে অনেকেই এটি পরিহারের কথা বলে থাকেন। তবে দিন দিন আমাদের দেশে বিভিন্ন ছুটিতে মোটরবাইক নিয়ে যাত্রার প্রবণতা বাড়ছে। ঢাকার নিকটবর্তী জেলা থেকে শুরু করে কয়েকশ’ মাইল দূরের জেলায়ও এখন বাইক নিয়ে ছুটে যান অনেকেই। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আতাউর রহমান দুটি ব্যাগ মোটরবাইকের পেছনে বেঁধে বগুড়া থেকে এসেছেন ঢাকায়। তিনি বলেন, রাস্তা একটু দূরের হলেও যানজট থাকলে ফাঁকফোকর দিয়ে চলে যাওয়া যায়। তবে এত দূরের যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ সেটিও বলেন। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তামূলক হেলমেট বা জুতা পরিধান করা উচিত। জানা গেছে, রাজধানীতে যারা পাঠাও, উবার, ওভাই, সহজের মতো ভাড়ায় চালিত রাইড শেয়ারিংয়ে যারা মোটরবাইক চালান তাদের অধিকাংশই নিজের এলাকায় যান মোটরবাইক নিয়ে। রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চুরির আশঙ্কা আর যানজট এড়াতে তারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতেও রাজি থাকেন। আর রাজধানী অধিকাংশ সময় গাড়ি চালন বলে দীর্ঘ পথেও সমস্যা হবে না ভেবেই যাত্রা করে থাকেন। ঈদের যাত্রা এবং ফেরার পথে অধিকাংশ ফেরিতে বড় একটা অংশ মোটরবাইক দখল করেছেন। অনেকেই এসব আবার সামাজিক মাধ্যমে দেন। শুধু দক্ষিণাঞ্চলেই নয় উত্তর ও পূর্বাঞ্চলেও অনেক মানুষ বাড়ি যাওয়া আসার ক্ষেত্রে দুই চাকার এই বাহন ব্যবহার করছেন। জেনেশুনে অনেক সময় বড় পরিবহনের সঙ্গে পাল্লাও দিচ্ছেন।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিবছরই বিভিন্নভাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় অংশ নেন মানুষ। তবে আমাদের সচেতনতাও দরকার তেমনি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উইংগুলোকে শক্ত হতে হবে এসব বিষয়ে। যে কোন আনন্দ উৎসব করতে গিয়ে যেন বিপদ ডেকে না আনি। একটা লঞ্চ কোন কারণে ডুবে গেলে বা ট্রেনের ছাদ থেকে কেউ অবচেতনভাবে পড়েও যেতে পারেন। তাই এসব একেবারেই পরিহার করা দরকার।

বিভিন্ন বাহনে রাজধানীতে ফিরছে মানুষ। চলতি সপ্তাহেই পরিপূর্ণ হয়ে চিরচেনা রূপ ফিরে পাবে ঢাকা। তবে যে কোন ছুটিতেই নিজেদের নিরাপত্তাকে আগে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বলছেন ঝুঁকিমুক্ত যাতায়াতের কথা।

রংপুর ॥ ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলের দিকে ছুটছে মানুষ। রবিবার থেকে অফিস শুরু। শনিবার যে করেই হোক ঢাকার ট্রেনে বা বাসে উঠতেই হবে। কিন্তু বাস, ট্রেনের টিকেট যেন সোনার হরিণ। অনেকে বিকল্প উপায়ে দিগুণ বা তার বেশি দামে টিকেট কিনতেও দ্বিধা করছেন না। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি পয়সা কামানোর ধান্দায় নেমে পড়েছে বাস ও ট্রেনের টিকেট কালোবাজারি ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন নামে-বেনামে টিকেট সংগ্রহে রেখে বর্তমানে অধিক দামে বিক্রি করছে তারা।

বিভিন্ন বাস কাউন্টার কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কপথে ঢাকামুখী ভিড় বাড়ে রাতের গাড়িতে। প্লেন এবং ট্রেনেরও একই অবস্থা। ২০ আগস্ট পর্যন্ত প্লেনের টিকেট পাওয়া দুষ্কর। অনেকে ট্রেনের টিকেট না পেয়ে বিনা টিকেটে দাঁড়িয়ে ঢাকা যাচ্ছেন। রংপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার জানান, টিকেট অনলাইনে বিক্রি হয়েছে। আর কোন টিকেট নাই। তবে ট্রেনে আরও বগি সংযোজন করা দরকার ছিল। ঈদে চাপ বেশি। তবে, আমরা যে কোনভাবে যাত্রীদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

রংপুর কামারপাড়া বাস টার্মিনালের শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার আক্তার হোসেন জানান, ২১ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকাগামী গাড়ির টিকেটের অনেক চাপ। সকলকেই ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত ফি কাউন্টারে নেয়া হচ্ছে না। বাইরে কেউ করছে কি না এটা আমরা জানি না।

রংপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এম এ মজিদ জানান, ঈদে যারা রংপুরে আছেন তারা কর্মস্থলে যেতে পারবেন। পর্যাপ্ত গাড়ি রয়েছে । কোন সমস্যা হবে না। তাছাড়া অনেকেই গাড়ি রিজার্ভ করে এনেছেন।

আরপিএমপির সহকারী কমিশনার (ডিবি এ্যান্ড মিডিয়া) আলতাফ হোসেন জানান, টিকেট কালোবাজারি রোধে পুলিশ মাঠে আছে। এছাড়া অজ্ঞান ও মলম পার্টির দৌরাত্ম্য বন্ধে পুলিশী টহল বাড়ানো হয়েছে। টার্মিনালগুলোতে সাদা পোশাকে পুলিশ টহল দিচ্ছে।

গলাচিপা ॥ কোরবানি শেষে পটুয়াখালীর গলাচিপা ও রাঙ্গাবালী থেকে প্রতিদিন কর্মস্থল ঢাকা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। কিন্তু অপর্যাপ্ত যানবাহনের সুযোগে বিশেষ করে নৌপথে ঢাকাগামী যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি ভাড়ার নামে অতিরিক্ত টাকা। যাত্রীরা হয়ে পড়ছে লঞ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে জিম্মি। বিশেষ করে একমাত্র নৌপথ নির্ভর যোগাযোগের জনপদ হিসেবে পরিচিত রাঙ্গাবালী উপজেলা থেকে ঢাকাগামী লঞ্চে যেতে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া নেয়া হচ্ছে আরও বেশি। প্রতিবছর ঈদ পুঁজি করে রাঙ্গাবালী-ঢাকা নৌরুটের লঞ্চগুলোতে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া নেয়ার চিত্রের কোন পরিবর্তনই হচ্ছে না। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

জানা গেছে, প্রতিদিন রাঙ্গাবালী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে একটি দোতলা লঞ্চ ছেড়ে যায়। সকাল ১১টা থেকে ১২ টার মধ্যে লঞ্চটি উপজেলার কোড়ালিয়া লঞ্চঘাট থেকে ছাড়ে। এছাড়া ঈদের এক সপ্তাহ আগে স্থায়ীভাবে চালু হওয়া রয়েল ক্রুজ-২ নামক একটি লঞ্চ একদিন পরপর দুপুর ১টা থেকে ২টার মধ্যে ছেড়ে যায়। এদিকে, গলাচিপা থেকে প্রতিদিন একটি হলেও কোরবানির আগে থেকে এ রুটে দু’টি লঞ্চ চালু হয়েছে। এ দু’টি রুটের লঞ্চে প্রতিবছর ঈদ মুহূর্ত এলেই বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়। ঈদের আগে এবং পরের প্রায় ১৫ দিন ধরে এ অব্যবস্থা অব্যাহত থাকে। এবারও যাত্রী প্রতি সর্বনি¤œ ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে সাফাই গেয়ে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ বলছেন, সারা বছরইতো কম ভাড়া নেয়া হয়। শুধু ঈদের দুই-একদিন সামান্য বেশি ভাড়া নেয়া হয়। এতে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

লঞ্চ যাত্রীদের অভিযোগ, ঈদ মুহূর্ত ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে রাঙ্গাবালী-ঢাকা ও গলাচিপা-ঢাকা নৌরুটের লঞ্চগুলোতে ডেকে যাত্রী পিছু ৩০০ টাকা নিলেও এখন ৪০০-৫০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। আগে সিঙ্গেল কেবিন ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা ছিল। এখন ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা। আগে ডাবল কেবিন ১৭০০ থেকে ২০০০ টাকা ছিল। এখন ৩৪০০ থেকে ৪০০০ টাকা। এছাড়া ভিআইপি কেবিনগুলোতেও প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া নিচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে এভাবে লঞ্চগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায় করার ফাঁদে পড়েছে যাত্রীরা। বাধ্য হয়ে বাড়তি ভাড়া দিয়েই তাদের গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন তদারকি নেই। এরফলে বহাল তবিয়তে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাচ্ছে।

রয়েল ক্রুজ-২ নামক লঞ্চে ঢাকাগামী যাত্রী মিজানুর রহমান বলেন, আমি কোড়ালিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য একটি ডাবল কেবিন বুকিং দেই। সেই কেবিনের জন্য ৩৪০০ টাকা নেয়া হয়েছে। অথচ অন্য সময় এই কেবিনের ভাড়া ১৭০০-১৮০০ টাকা। এভাবে বাড়তি ভাড়া আদায় এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। জাহিদ-৩ লঞ্চের যাত্রী খালিদ হাসান কিরণ বলেন, সর্বোচ্চ এক হাজার টাকার সিঙ্গেল কেবিন এখন এ লঞ্চে ১৭০০ টাকা। আমি অনেক বুঝিয়ে ১৫০০ টাকা দিয়েছি।

শনিবার কোরবানির পাঁচদিন দিন হলেও কোড়ালিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রিন্স অব রাসেল-৫ এবং ঈদ উপলক্ষে চলমান ঝান্ডা লঞ্চের কয়েকজন যাত্রী জানান, ঢাকাগামী এ রুটের সব ক’টি লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক যাত্রী অভিযোগ করেন, এ মুহূর্তে অগ্রীম টাকা দিয়েও কেবিন বুকিং করে যাত্রীরা প্রতারিত হচ্ছে। লঞ্চের কিছু লোকজন বেশি টাকা পেলেই বুকিং করা কেবিন অন্যদের বেশি টাকার বিনিময়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এদিকে, পটুয়াখালী-ঢাকা রুটের লঞ্চগুলোতেও চলছে এক ধরনের নৈরাজ্য। ঈদ উপলক্ষে এ রুটে প্রতিদিন ৫টি লঞ্চ চললেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট কম। এ সুযোগে চলছে অতিরিক্ত ভাড়া বাণিজ্য। অন্যদিকে, গলাচিপা ঘাট থেকে প্রতিদিন বেলা একটায় একটি দ্বোতলা লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রী সুবিধার দিকে খেয়াল রেখে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেটিকে বেলা তিনটায় ছাড়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না। লঞ্চগুলোর এ দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ।

বরিশাল ॥ ঈদের ছুটি শেষে পঞ্চমদিনে (শনিবার) বরিশাল নৌবন্দরে রাজধানীমুখী যাত্রীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। এর আগে চতুর্থদিনেও (শুক্রবার) যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। উভয়দিনেই সন্ধ্যার আগেই প্রতিটি লঞ্চ যাত্রীদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। লঞ্চের ডেক থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণীর কেবিনের বারান্দার জায়গাও খালি ছিল না।

অপরদিকে যাত্রীদের ভিড়ে ওভারলোড এড়াতে দুইদিনেই নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগেই লঞ্চগুলোকে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ ঘাট ছাড়তে বাধ্য করেছে। বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির ঈদের পরেরদিন থেকে গত তিনদিনে যে যাত্রী হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রীর সমাগম ঘটেছে শুক্র ও শনিবার। লঞ্চগুলো বরিশাল নদীবন্দর থেকে রাত নয়টার মধ্যে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও দুপুর থেকেই যাত্রীরা ঘাটে আসতে শুরু করেন। বিশেষ করে ডেক শ্রেণীর যাত্রীরা জায়গা পাওয়ার জন্য আগেভাগে ঘাটে এসে লঞ্চে উঠেন।

বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের ইন্সপেক্টর (টিআই) কবির হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, গত ১৩ আগস্ট থেকে রাজধানীর উদ্দেশে ঈদ ফেরত যাত্রীদের বরিশাল থেকে যাত্রা শুরু হয়। গত কয়েকদিন বৃষ্টি থাকলেও শনিবার আবহাওয়ার পরিস্থিতি ভাল। নদী বন্দরে যাত্রীদের চাপ গত কয়েকদিনের তুলনায় শনি ও শুক্রবার অনেক বেশি। শনিবার দুপুর থেকে যাত্রীরা লঞ্চে উঠতে শুরু করলেও বিকেল নাগাদ নদী বন্দর যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়।

তিনি আরও বলেন, বরিশাল নদী বন্দর থেকে শনিবার ১৭টি লঞ্চ যাত্রী নিয়ে সরাসরি ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছে। এছাড়া আরও একটি লঞ্চ বরিশাল থেকে চাঁদপুর হয়ে ঢাকা যাবে। এর আগে বিকেল তিনটার দিকে দিবা সার্ভিসের তিনটি নৌযান ঢাকার উদ্দেশে যাত্রী নিয়ে বরিশাল ত্যাগ করেছে। এছাড়া সন্ধ্যায় বিআইডব্লিউটিসি’র একটি সরকারী জাহাজ যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছে।

বরিশাল নৌ-বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু সরকার জনকণ্ঠকে বলেন, আগের কয়েকদিনের চেয়ে শনিবার ও এর আগেরদিন শুক্রবার যাত্রী চাপ অনেকটা বেশি ছিল। তবে আমরা কোন লঞ্চই ওভারলোড হয়ে ছাড়তে দিচ্ছি না। লঞ্চ ছাড়ার আগে চেক করে নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে লোড লাইন দেখে নির্ধারিত সময়ের আগেই লঞ্চগুলোকে ঘাট ত্যাগ করতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুট দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া দূরপাল্লার পরিবহন যাত্রীদের কারণে কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুটেও যাত্রীদের ঢল নেমেছে। ঈদের ছুটি শেষে কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুট হয়ে কর্মস্থল রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছে কর্মজীবী মানুষ। এরমধ্যে ছোট ছোট লঞ্চগুলোতে ভিড় ছিল বেশি। ফেরিতে যানবাহনের চাপ সহনীয় থাকলেও যাত্রী চাপ ছিল বেশি। দক্ষিণাঞ্চল থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি যানবাহন ও কাঁঠালবাড়ি থেকে ছেড়ে যাওয়া স্পিডবোটে এবং লঞ্চগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। একইভাবে দৌলতদিয়া ঘাটেও কর্মজীবী মানুষের ঢল নেমেছে।

মাদারীপুর ॥ শনিবার সকাল থেকে কাঁঠালবাড়ি লঞ্চ ও ফেরি ঘাটে যাত্রী চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদের ছুটি শেষে কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌপথ হয়ে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন কর্মজীবী মানুষ। শুক্রবার বিকেল থেকে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে কর্মস্থলমুখো যাত্রীদের ভিড় দেখা দেয়। ফিরতি পথেও সব ধরনের যানবাহনে বাড়তি ভাড়ার দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে। লঞ্চগুলোতে ভিড়ের কারণে ফেরিতে যাত্রী চাপ বেশি দেখা গেছে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে ফিরতি পথে প্রতিটি যানবাহন ও কাঁঠালবাড়ি থেকে ছেড়ে যাওয়া স্পীডবোটে ও লঞ্চগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ঘাটে বিআইডব্লিউটিএ, পুলিশ, র‌্যাব, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী নিয়োজিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর মধ্যদিয়ে চলছে বাড়তি ভাড়ার দৌরাত্ম্য।

ঘাটের একাধিক সূত্রে জানা যায়, কাঁঠালবাড়ি ঘাটে ফেরিতে যানবাহনের চাপ তেমন না থাকায় যাত্রীদের পর্যাপ্ত চাপ রয়েছে। স্পীডবোটে বাড়তি ভাড়ার কারণে যাত্রীরা ফেরিতে যাচ্ছেন। যাত্রীরা বরিশাল, খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিটি যানবাহন বোঝাই হয়ে যাত্রী কাঁঠালবাড়ি ঘাটে আসছেন। অনেক লোকাল বাসের ছাদেও যাত্রী উঠানো হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ সকল যাত্রী পরিবহনে বাড়তি ভাড়া দিয়েও রেহাই পাচ্ছেন না। ঘাটে নেমেই নৌযানে গুণতে হচ্ছে দেড়/দ্বিগুণ ভাড়া। কিছু কিছু স্পীডবোট ও লঞ্চে বাড়তি ভাড়া আদায়ের পরিমাণ বেশি বলে অভিযোগ করেন অনেক যাত্রী। এখানেই শেষ নয়, নদী পাড়ি দিয়ে শিমুলিয়া ঘাট থেকে বাড়তি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে তাদের।

যশোর ॥ ‘যশোর থেকে মাইক্রো ভাড়া জনপ্রতি দেড়শ’ টাকার স্থলে ৩শ’ টাকা নিয়েছে, আর স্পীডবোটে ১শ’ ২০ টাকার ভাড়া নিলো ২শ’ টাকা। শিমুলিয়া থেকে ঢাকা যেতে আর কত টাকা বেশি ভাড়া দিতে হবে বুঝতে পারছি না। প্রশাসনের অনেকেই বলেন বাড়তি ভাড়া নিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কই তেমন কিছু তো চোখে পড়ছে না। পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতে গেলে শ্রমিকদের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়। তাই মান-সম্মানের ভয়ে কেউ অভিযোগ করতে চায় না।’

কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক মোঃ সালাম হোসেন বলেন, ‘দঞ্চিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যাতায়াতের জন্য কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌপথ ব্যবহার করেন। ঈদে যাত্রী সেবায় ১৭ ফেরি, ৮৭ লঞ্চ ও ২ শতাধিক স্পীডবোট চলাচল করছে। এছাড়া ৩শতাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সার্বক্ষণিক কাজ করছেন। পাশাপাশি সিসিটিভির মাধ্যমে ঘিরে রাখা হয়েছে পুরো কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাট। তবে, সচেতন অনেক যাত্রী লঞ্চ ও স্পিডবোটের পরিবর্তে ফেরিতে পার হচ্ছেন।’

ভোলা ॥ ভোলা থেকে ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে যাত্রীরা পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ঈদের ছুটি শনিবার শেষ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীর চাপ এক সাথে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ভোলা-লক্ষèীপুর রুটের সি-ট্রাক ও লঞ্চ সঙ্কটের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করছে। তার সাথে যাত্রীদের জিম্মি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ যাত্রীদের। এছাড়া ভোলা-ঢাকা রুটে ডেকের যাত্রীদের তেমন সমস্যা না থাকলেও লঞ্চের কেবিন এখন সোনার হরিণ। একটি কেবিনের জন্য যাত্রীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।

স্থানীয়রা জানান, তিন দিকে নদী ও এক দিকে সাগর বেষ্টিত দ্বীপ জেলা ভোলার মানুষের এখনো যাতায়তের প্রধান মাধ্যম নৌ রুট। লঞ্চ,সি-ট্রাক ও ফেরির ওপর ভরসা করেই এই দ্বীপের মানুষকে অন্য জেলায় আসা যাওয়া করতে হয়। এবার ঈদের প্রায় ৯ দিনের ছুটি শেষে রবিবার কর্মস্থলে যোগ দেয়ার জন্য শনিবার সকাল থেকেই বিভিন্ন রুটে মানুষের ঢল নামে। বিশেষ করে ভোলা থেকে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে ভোলা-লক্ষীপুর রুট দিয়ে সহজে সল্প সময়ে যাওয়ার জন্য ঈদে কর্মস্থলে ফিরতে ইলিশা ঘাটে হাজার হাজার যাত্রী লঞ্চ, সি-ট্রাকে এখন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। কোথায়ও তিল ধরার ঠাঁই নেই। ধারণ ক্ষমতায় কয়েক গুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে নৌ যানগুলো। বর্তমানে ৩টি লঞ্চ ও ৫টি সি-ট্রাক চলচাচল করলেও শত শত যাত্রী সিট না পেয়ে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে যেতে পারছে না। তার উপর লঞ্চে যাত্রীদের কাছ থেকে জোর পূর্বক আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। এমনকি লঞ্চঘাটে ইজারাদারদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ যাত্রীরা। লঞ্চ যাত্রী আরিফ উদ্দিন রনিসহ একাধিক যাত্রী জানান, নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। ইলিশা লঞ্চঘাটের ইজারাদারের লোকজন তাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে। ভোলা-লক্ষীপুর রুটে ১৫০ টাকার ভাড়া ২০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ভিড়ের কারণে অনেকেই ঠেলাঠেলি করতে গিয়ে সি-ট্রাকে উঠতে গিয়ে নদী পর্যন্ত পড়ে যায়।

অপর দিকে ভোলা খেয়াঘাট থেকে ঈদ উপলক্ষে ঢাকা রুটে ৬টি লঞ্চ চলাচল করলেও রয়েছে কেবিন সঙ্কট। যাত্রীদের অভিযোগ কেবিনের যাত্রীরা সেবা পাচ্ছে না। তবে লঞ্চের ডেকের যাত্রীরা বলছে তাদের কোন সমস্যা নেই। যাত্রীদের দাবি, ভোলার লক্ষèীপুর রুটের যাত্রীরা নির্বিঘেœœ যেতে পারে তার জন্য আরো অতিরিক্ত সি ট্রাক বা লঞ্চ দেয়া হয়। এদিকে গ্লোরী অব শ্রীনগর-৭ লঞ্চের টিকেট মাস্টার তরুন দে জানান, তারা সরকারী নির্ধারিত মূল্যের চাইতে কম মূল্যে ডেকের যাত্রীদের টিকেট কাটছেন।

মুন্সীগঞ্জ ॥ ঈদ শেষে টানা ৮ দিন ছুটির পর শনিবার মানুষ কর্মস্থল ঢাকায় ফিরছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ঈদের ছুটি শেষ হলেও বৃহস্পতিবার শোক দিবসের ছুটি থাকায় অধিকাংশ ঈদে ঘরমুখো মানুষ শুক্রবার পর্যন্ত ছুটি কাটিয়ে শনিবার কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে। তাই দীর্ঘ ছুটির পর শনিবার শিমুলিয়া ঘাটে ঈদে ঘরে ফেরা যাত্রীদের ঢল নামে। উপচে পড়া ভিড়ে বাস স্ট্যান্ডে বাসের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এ সময় দীর্ঘক্ষণ লাইনে থেকে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে। আর এ সুযোগে বাস মালিকরা বাসের ভাড়া দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত আদায় করেছে।

সাতক্ষীরা ॥ সোলায়মান হোসেন শনিবার বিকেলে শিমুলিয়া হয়ে ঢাকায় তার কর্মস্থলে ফিরছিলেন। তিনি বলেন বাসে ভাড়া অভিরিক্ত দিচ্ছি তাতে যতটা না কষ্ট পেয়েছি, তার চেয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে দাঁড়িয়ে গিয়েও একই ভাড়া দিচ্ছে হচ্ছে। এখানে দেখার যেন কেউ নেই।

রাজশাহী ॥ ঈদ শেষে ফিরতি যাত্রায় যাত্রীর চাপ ও বিভিন্ন কারণে রাজশাহী থেকে ট্রেনগুলো ছাড়তে বিলম্ব করেছে। ঈদ শেষে সবচেয়ে ঢাকায় যাওয়ার চাপ থাকলেও রাজশাহী আসার যাত্রীদের তেমন একটা চাপ নেই। তারপরও ঢাকার কমলাপুর ছাড়তে বিলম্ব করছে পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলো। ফলে রাজশাহীসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছেন।

খুলনা ॥ সুন্দরবন এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ঢাকা ছাড়ার কথা থাকলেও পাঁচ ঘণ্টা দেরিতে বেলা ১১টায় ঢাকা ছেড়ে গেছে। চিলাহাটি থেকে আসা নীলসাগর এক্সপ্রেস সকাল ৮টায় ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও চার ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকায় পৌঁছাবে। আর ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য সময় দেয়া রয়েছে ১২টা ১০ মিনিট।

লালমনিরহাট ॥ ঈদ স্পেশাল সকাল সোয়া ৯টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সাত ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকায় পৌঁছতে পারে। বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে ট্রেনটি ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পঞ্চগড় থেকে আসা একতা এক্সপ্রেস সকাল ১০টায় ঢাকা ছাড়ার কথা থাকলেও দুই ঘণ্টা বিলম্বে দুপুর ১২টায় পঞ্চগড়ের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া সময় দেয়া হয়েছে।

এই মাত্রা পাওয়া