২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্পদ কর ॥ বড় লোকের যত মাথাব্যথা

  • এনামুল হক

যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ কর নেই। মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ধনীদের ওপর সম্পদ কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন। পুঁজিবাদের একটা অন্তর্নিহিত প্রবণতা হলো সমাজে সম্পদের অসাম্য ক্রমাগতই বেড়ে চলে। এর সমাধান হিসেবে টমাস পিকেটি ২০১৪ সালে সম্পদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাঁর গ্রন্থ ‘ক্যাপিটেল ইন দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’তে। তার সেই ধারণা বা প্রস্তাবই এখন গ্রহণ করেছেন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন। উল্লেখ্য, মিজ ওয়ারেন-২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একজন প্রার্থী।

ধনীদের ওপর আঘাত হানার যারা সমর্থক তাদের অনেকের কাছেই ওয়ারেনের প্রস্তাবটি অভিনব বলে মনে হয়েছে। বামপন্থীদের কাছে তো বটেই। আরেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বিলিয়নিয়ারদের ওপর উচ্চ হারে এস্টেট (উত্তরাধিকার) কর আরোপের পক্ষপাতী। অন্যরা চান এই শ্রেণীটির ওপর অনেক বেশি আয়কর আরোপ করা হোক।

মিজ ওয়ারেন যদি প্রেসিডেন্ট হন তা হলে তিনি ৫ কোটি ডলারের নিট সম্পদের ওপর ২ শতাংশ বার্ষিক লেভী আরোপ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এক বিলিয়ন ডলারের ওপর সম্পদের ক্ষেত্রে তা হবে ৩ শতাংশ। তাঁর এই নীতিকে যারা সমর্থন ও উৎসাহ যোগাচ্ছেন তাদের লক্ষ্য মোটামুটি তিনটি- অসাম্য হ্রাস করা, সরকারের রাজস্ব বাড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে এমন বিপুল পরিমাণ সম্পদ পুঞ্জীভূত হতে না দেয়া। তারা মনে করেন যে সম্পদ কর মার্কিন পুঁজিবাদকে নতজানু করতে পারবে। অন্যদিকে এই প্রস্তাবের বিরোধীরা বলেন যে, ধনীদের অর্থ শুষে নেয়ার যে কোন পরিকল্পনার মতো সম্পদ করও দেশের শিল্পোদ্যোগের স্পৃহাকে ধ্বংস করে দেবে।

ওয়ারেন যদি প্রেসিডেন্ট হন এবং সম্পদ কর বিলে সই দিয়ে সেটিকে আইনে পরিণত করেন সেক্ষেত্রে একটি বিষয় নিশ্চিত যে এর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত চ্যালেঞ্জ আসবে। কারণ মার্কিন সংবিধানে প্রায় সকল ধরনের প্রত্যক্ষ কর নিষেধ করা আছে। ওয়ারেনের কর সংক্রান্ত নীতিটা ইমানুয়েল সায়েজ ও গ্যাব্রিয়েল জুকম্যানের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রণীত। দু’জনেই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। দু’জনে হিসাব করে দেখেছেন যে সম্পদ করের আওতায় আসবে মাত্র ৭৫ হাজার পরিবার যা প্রতি ১৭০০ জনের মধ্যে একজনেরও কম। এতে বছরে প্রায় ২১ হাজার কোটি ডলারের নতুন রাজস্ব সংগৃহীত হবে যা জিডিপির ১ শতাংশ। ওয়ারেন এই বাড়তি রাজস্ব বেশিরভাগ ছাত্র ঋণ মওকুফ, বেশিরভাগ সরকারী কলেজের টিউশন ফি বিলোপ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সর্বজনীন শিশু স্বাস্থ্য সেবার পেছনে ব্যয় করার পক্ষপাতী। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন ওই হিসাবটা বড় বেশি আশাবাদী হিসাব। ওয়ারেন যতটা আশা করেন প্রকৃত অঙ্কটা তার চেয়ে অনেক কম হবে। নিট সম্পদ করের তেমন একটা উৎসাহব্যঞ্জক রেকর্ড নেই। ১৯৯০ সালে ১২টি ধনী দেশ এই কর আরোপ করেছিল। ২০১৭ সাল নাগাদ এদের সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র চারটিতে। অবশ্য ওসব দেশ যেসব কারণে সম্পদ কর তুলে দিয়েছিল সেগুলো যে আমেরিকার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে এমন নয়।

অবশ্য সম্পদ কর আদায়ে সমস্যাও আছে। প্রথমত সম্পদের মূল্য নির্ধারণ। নিট সম্পদ করের জন্য প্রয়োজন নিট সম্পদের নির্ভরযোগ্য হিসাব। অনেক ধরনের সম্পদ আছে যেগুলো সম্পদ করের আওতায় পড়ে না। তা ছাড়া কর এড়ানোর জন্য সম্পদ বিদেশে কিংবা জটিল আইনগত কাঠামোর মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায়। ফোরবিস ম্যাগাজিন বিশ্বব্যাপী চার শ’ অতি ধনীদের একটি তালিকা প্রতিবছরই তৈরি করে। এর মধ্যে বেশিরভাগই থাকে আমেরিকান। কিন্তু মার্কিন কর কর্তৃপক্ষ ইন্টারন্যাল রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস) লক্ষ্য করেছে যে ওই তালিকায় যা প্রকাশ করা হয়েছে বড় এস্টেটগুলোর করযোগ্য মূল্য তার মাত্র অর্ধেক। সম্পদ কর আগে আদায় করলেও পরে বাতিল করেছে এমন সব দেশের অভিমত হলো, সম্পদ কর ফাঁকির বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং সেটা বন্ধের জন্য প্রশাসনিক ব্যয় যতটা হয় তার তুলনায় এই খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণ এই কম যে ওতে আর পোষায় না। অবশ্য ওয়ারেনের সমর্থকদের যুক্তি হলো মার্কিন সরকার যদি সম্পদ কর ফাঁকি বন্ধ করতে যথেষ্ট মাত্রায় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকে তাহলে নিশ্চয়ই তা বন্ধ করতে পারে। আর তার ফলে এই খাতে প্রাপ্তি অনেক বেড়ে যাবে।

তবে সম্পদ কর আরোপের অর্থনৈতিক প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার প্রশ্ন আছে। কর তত্ত্বে¡ আয়ের ওপর করারোপ নিয়ে যত কথা বলা হয় সম্পদের ওপর করারোপ নিয়ে তার চেয়ে অনেক কম বলা হয়। তার পরও সম্পদ কর অর্থনীতির কিছুটা ক্ষতির কারণ হতে পারে বল মনে করার কারণ আছে। ২ থেকে ৩ শতাংশ লেভী সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা বছরে মুনাফা হিসেবে যা পেয়ে থাকে তার এক বড় অংশ গ্রাস করে ফেলার জন্য ওই ২ থেকে ৩ শতাংশ লেভীই যথেষ্ট বেশি। ধরে নেয়া যাক বিনিয়োজিত পুঁজি থেকে লভ্যাংশ আসছে ৫ শতাংশ। এর যদি ৩ শতাংশই সম্পদ কর হিসেবে কেটে নেয়া হয় তাহলে তাদের হাতে আর থাকল কি?

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন, এর পরও সম্পদের ওপর কিছু না কিছু কর বসানো দরকার। এ অনেকটা লাগাম টেনে ধরার মতো। তাদের আশঙ্কা এই লাগাম টানার ব্যবস্থা যদি না থাকে তাহলে বিনিয়োজিত সম্পদ থেকে প্রাপ্তির অঙ্কটা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির তুলনায় অপ্রতিরোধ্যভাবে বহুলাংশে বেড়ে যাবে। সম্পদের এই সম্প্রসাররণ রোধ করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। অন্যদিকে আয়ের ওপর করারোপের পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয় যাতে শিল্পোদ্যোগ ও সঞ্চয়ের মতো অর্থনৈতিক আচরণের ওপর সম্ভাব্য এমন ন্যূনতম প্রভাব পড়ে যে তা বরং কল্যাণকরই হয়। অন্যদিকে ওয়ারেন সম্পদের ওপর এমনভাবে কর বসাতে চান যার পরিণতিতে বিপুল ঐশ্বর্য অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। এতে সম্পদ সৃষ্টি ব্যাহত হতে পারে। কিন্তু ওয়ারেনের নীতির সমর্থকরা পাল্টা নজির দেন। তারা সুইজারল্যান্ডের দৃষ্টান্ত টেনে এনে বলেন সেখানে সম্পদ কর থাকা সত্ত্বেও সঞ্চয়ের হার ধনী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

প্রশ্ন হলো সম্পদ কর কি সমাজে আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে অসাম্য কমাতে পারবে? তা যে পারবে না সেটা অতিমাত্রায় দৃশ্যমান। তবে ওয়ারেন, স্যান্ডার্স ও অন্যদের যুক্তি হলো অসাম্য হয়ত কমাতে পারবে না কিন্তু বিলিয়নিয়ারদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া করায়ত্ত করার সুযোগ খর্ব করা এবং তাদের রাজনৈতিক শক্তিকেও দুর্বল করে দেয়া সম্ভব হবে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট