২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তারুণ্য ধরে রাখুন ব্যস্ততার মাঝেও ...

  • তৈয়্যবা রহমান

তোফা প্রতিদিন তার পরিবারের প্রতি যেমন সচেতন ঠিক তেমনি তিনি অফিসের সব কাজও দায়িত্ব নিয়ে সময়মতো শেষ করেন। ছোট পরিবারে তিনি যেমন বাচ্চাদের দিকে খেয়াল রাখেন সঙ্গে স্বামী এবং আত্মীয়দের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে তার সুন্দর মন মানসিকতার কারণেই। ভাল থাকার এবং ভাল রাখার মানসিকতা।

এখন নিয়মিত জিমে যাচ্ছেন অনেকেই শরীরটাকে ফিট রাখতে। কর্মক্ষেত্র এবং সংসার একসঙ্গে সামলে নিজের ফিটনেস নিয়ে ভাবনার সময়টা বের করা একটু কঠিন হলেও কিন্তু উদ্যোমী নারীরা ছাড়ছেন না হাল। অন্যদিকে আজকাল নারীরা নিজেদের সৌন্দর্য ধরে রাখার বিষয়েও খুব সচেতন। নিয়মিত করছেন রূপচর্চা।

মানসিক শক্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আভা রহমান বলেন, পড়াশোনা শিখেছি, এখন জব করছি, নিজের একটি পরিচয় হয়েছে। আমার পরিবারও খুব সচেতন এ ব্যাপারে। এটা যখন ফিল করি তখন কাজ করার উদ্যোম এবং শক্তি আরও বেড়ে যায়। বরং নিজের পেশা আর সম্মান নিয়ে জীবনটাকেই বেশি উপভোগ করছি। যদিও এখন পর্যন্ত আমাদের দেশের মানুষ ঘরের কাজ-রান্নাঘরের কাজ বলতেই নারীর কাজ বোঝান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় কর্মজীবী নারী কাজ করেন তিনগুণ। সম্প্রতি বিবিএস পরিচালিত শ্রমশক্তি জরিপে কর্মজীবী নারীর ঘরের কাজকে ‘ডাবল বারডেন’ বলা হয়েছে।

ঘরে-বাইরে ব্যস্ত নারীদের জন্য করণীয়-

সুস্থতা : সুস্থতা প্রত্যেক মানুষেরই কাম্য। প্রতিটি কাজ সঠিকভাবে করার জন্য সুস্থতা প্রয়োজন।

মেদবিহীন ছিপছিপে সুগঠিত, সুন্দর, সুগড়ন ও কার্যক্ষম শরীর সবার পছন্দ। নিয়মিত ফ্রিহ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন। সময় না পেলে বাড়িতে ফেরার সময় গাড়িতে না উঠে হাঁটুন, লিফটে নয় সিঁড়ি দিয়ে উঠুন। ব্যায়াম করার জন্য নিজের পছন্দসই এক্সারসাইজটাই বেছে নিন। হাঁটলে শরীরে সব রকম রক্ত সঞ্চালন বজায় রেখে আপনাকে রাখবে চনমনে। নিয়মিত শরীর চর্চায় ব্রত শক্ত মনের মানুষই স্বাভাবিক ওজন ও সুস্থ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকেন। এজন্য অহেতুক জিমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। খুব বেশি প্রচেষ্টা বা জোগাড় যন্ত্রেরও প্রয়োজন পড়ে না। তার জন্য কিছু বদাভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

- মিষ্টি ও ভাজা অথবা ভুনা খাবার খাবেন না এবং ভাত খাবেন নামমাত্র।

- প্রতিদিন জীবনে যাই ঘটুক অথবা যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন নিজে নিজে একটু ব্যায়াম করে নেবেন। এ দুটি হলো জিমে না গিয়ে ওজন কোমানোর প্রাথমিক ও অন্যতম শর্ত।

ত্বক ও চুল : এই দুটি জিনিস ভাল রাখতে সর্বপ্রথম প্রচুর পানি পান করা সব চেয়ে জরুরী। দিনে অন্তত ৮ গ্লাস পানি পান করুন এবং তাজা ফল ও বেশি করে সবজি খাওয়ার অভ্যাস করুন।

আর গ্রীষ্মকালে ত্বকের জন্য অবশ্যই বাইরে যাওয়ার ঠিক ৩০ মিনিট আগে ভাল মানের সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। এসপিএফ ১৫-৩০-এর সানস্ক্রিন ব্যবহার করবেন। বাইরে বের হলে সঙ্গে ছাতা অথবা টুপি রাখতে পারেন। পরিমাণমতো বিশ্রামও নিন। সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে মাসে দু-একবার পার্লারে গিয়ে ফেসিয়াল, পেডিকিওর-মেনিকিওর ও হেয়ার ট্রিটমেন্ট করাতে পারেন। ত্বকের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকারক সূর্যের বেগুনি রশ্মি। এর প্রভাবে ত্বকের কোষগুলো মরে গিয়ে ত্বক বিবর্ণ হয়ে যায়। ত্বক বিবর্ণ হওয়া থেকে অনেক সময় ত্বকে ক্যান্সার হতে পারে।

ঘন চকচকে সুন্দর চুল এখন সবারই কাম্য

চুল নিয়ে আজকাল অনেকেরই ভাবনার অন্ত নেই। গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত সমান ভারি চুলকে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল সবাই চায়। এ প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সর্বপ্রথম চুল এবং মাথার ত্বক পরিষ্কার থাকতে হবে।

স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুলের জন্য প্রয়োজন সুষম খাদ্য এবং ভিটামিন। সঠিক পরিমাণে আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন প্রয়োজন। খাদ্য তালিকায় থাকতে হবে প্রচুর শাক-সবজি, ফল ও সালাদ। এবং খেতে হবে প্রচুর পরিমাণে পানি। খনিজ পদার্থ ও ভিটামিনের অভাবে চুলের স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়, চুল ঝরে পড়ে, খুশকি দেখা দেয়।

মাথার ত্বক নিয়মিত পরিষ্কার রাখাও প্রয়োজন। ভিটামিন ‘বি’ চুলকে চকচকে ও ঘন করে তোলে। শস্যদানা, দুধ, ডিম, কলা, বাদাম, কলিজা ও ডালে রয়েছে ভিটামিন ‘বি’। প্রতিদিন ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খেলে চুল ভাল হবে এবং চুল ঝরবে না। অন্যদিকে ভিটামিন ‘সি’র অভাবে চুলের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় তাই লেবু জাতীয় ফল, কমলালেবু, ইত্যাদি থাকা প্রয়োজন।

একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া : পরিবারের সবাই মিলে একটা গল্প করার জন্য ডাইনিং টেবিলটা খুবই প্রয়োজনীয়। ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিদিন অন্তত রাতের খাবারটা চেষ্টা করুন পরিবারের সবাই একসঙ্গে করতে। সারাদিন কি ঘটল, কার কি প্রয়োজন সব আলাপ সেরে নিতে পারেন। তবে আজকাল অনেকেই টিভিতে অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে খেতে পছন্দ করেন। এই খারাপ অভ্যাস অবশ্যই দূর করতে হবে। বরং তখন পারিলে কোন পরিকল্পনা থাকলে করতে পারেন। কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়, সন্তানদের কিছু জানার থাকলে তা বলতে দেয়া এসব ব্যাপারে একটি ছোট আলোচনা করে নিতে পারেন। অথবা অনেক সময় সুন্দর অতীতটা ভুলে যাই আমরা, খাওয়ার টেবিলে বসে পেছনের সুন্দর মুহূর্তগুলো রোমন্থন করলেন। পারিবারিক দূরত্বটাও কমে আসবে এভাবে। এতে পরিবারে পরস্পরের প্রতি টান বাড়ে ও পারিবারিক বন্ধন অটুট থাকবে।

বিনোদন : শহুরে জীবনে বিনোদন চাইলে ছুটির দিনে স্বামী সন্তান নিয়ে একবেলা বাইরে ঘোরার প্লান রাখুন, সিনেমা দেখা অথবা সেইদিন ঘরে রান্না না করে পরিবারকে নিয়ে বাইরে লাঞ্চ বা ডিনারটা সেরে নিতে পারেন। অনেক সময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে শপিং এ যেতে পারেন। অথবা ঘুরে আসুন আত্মীয়দের বাসা থেকে। এটিই সারা সপ্তাহের কাজের ক্লান্তিটা দূর করতে সাহায্য করবে।

ছোট কাজগুলো সন্তানকে দিন : সংসারের ছোট কাজগুলো আপনার সন্তানকে দিন। যেমন তাদের ঘর ও বিছানা গোছানো, পড়ার টেবিল গোছানো। অথবা মাঝে মাঝে রান্নাঘরের খুটিনাটি কাজগুলো তাদের দিন। তাদের নিজেদের কাপড় মাঝেমধ্যে ধুতে দিন। এতে সন্তানও নিজের প্রতি যতœবান ও দায়িত্বশীল হতে শিখবে এবং আপনার কিছুটা কাজ কমবে। ছোট থেকেই এ কাজগুলো করার মাধ্যমে তারাও পরবর্তীতে স্বাবলম্বী হতে পারবে।

চোখকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিন : একটি জরিপে দেখা গেছে একটানা ৩ ঘণ্টা কম্পিউটার ব্যবহার করলে ভিটামিন-এ এর অভাব দেখা যায়। যার কারণে আপনি দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগতে পারেন। তাই কাজের মাঝে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে বিশ্রাম নিন। নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় ‘এ’ ভিটামিনযুক্ত খাবার অবশ্যই রাখুন। সঠিক পরিমাণে এই ভিটামিনযুক্ত খাবার না খেলে চোখের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ভিটামিন ‘এ’-এর প্রধান উৎস প্রাণীজ প্রোটিন যেমন যকৃত, ডিমের কুসুম, দুধ, মাখন, পনিরও মাছ। ছোট বেলা থেকে আমরা এটা শুনে আসছি যে ছোট মাছ বা মলা, ডেলা, পুঁটিমাছ খেলে চোখ ভাল থাকে, রাতকানা রোগ হয় না। অন্যদিকে সহজলভ্য রঙিন ফলমূল শাকসবজি থেকেও প্রচুর ভিটামিন ‘এ’ পাওয়া যায়। তাই ভিটামিনে যুক্ত খাবার প্রতিদিন খান।

পর্যাপ্ত সময় ঘুমান : একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে প্রতিদিন অন্তত ৮ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। এর কম বিশ্রাম হলে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পরবেন। গবেষকরা একমত হয়েছেন যে শরীর ও মনের শক্তি পুনঃসঞ্চয় (রিস্টোর) করার জন্য ঘুমের প্রয়োজন রয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে, স্মৃতি ধরে রাখতে, আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে ও মনঃসংযোগ বাড়াতে ঘুমের ভূমিকা আছে। ঘুম পর্যাপ্ত না হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, স্মরণশক্তি কমে যায়, মনোযোগও কমতে থাকে। ঘুম হরমোনের নিঃসরণ, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কর্মকা চালাতেও প্রয়োজন।

যদি কখনও ঘুমের সমস্যা দেখা যায়, অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। তবে এ অবস্থায় কখনও ঘুমের ওষুধ সেবন করবেন না।

রাতে ঘুমানোর সময় গল্প করুন : ব্যস্ততার কারণে সন্তানের সঙ্গে আপনার গল্প করাই হয়ত হয়ে ওঠে না। শৈশবে যে রাতগুলোতে আমাদের মা কিংবা দাদুর পাশে শুয়ে বিভিন্ন গল্প বলে ঘুম পাড়িয়েছেন সেই রাতগুলো এখনও আমরা হয়ত ভুলিনি। আপনার সন্তানেরও যেন এমন কোন স্মৃতি থাকে সেই কারণে রাতে একসঙ্গে ঘুমাতে যান তার সঙ্গে ঘুমাতে যান এবং সারাদিন এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে গল্প করুন। অথবা কোন জোকস, কোন মজার বিষয় নিয়ে, অথবা ছড়া শোনাতে পারেন। এতে দেখবেন আপনার সারাদিনের ক্লান্তি বা বিরক্তিটাও দূর করবে। এর ফলে সন্তানের সঙ্গে আপনার বন্ধন অনেক দৃঢ় হবে এবং সন্তানও তখন আপনার অনুপস্থিতিটা ফিল করবে না।

সবশেষে বলা উচিত যে সবসময় কাজ নিয়ে ব্যস্ত না থেকে নিজেকে প্রয়োজনীয় সময় দিন। এবং জীবনটাকে উপভোগ করুন।