১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ওরা বাংলাদেশকে তালেবান রাষ্ট্র করতে চেয়েছিল

  • কবীর চৌধুরী তন্ময়

প্রায় দেড় দশক অতিবাহিত হতে চললো ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা। এ জাতি জঙ্গীদের এই তান্ডব ভুলে যায়নি। এবারও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব থেকে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক থেকে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক থেকে শিক্ষার্থীরাও ১৭ আগস্ট নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছে। ঘৃণাভরে স্মরণ করেছে এই দিনটিকে। আর সে সময়কার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মদদপুষ্টে কীভাবে বাংলাকে আফগান বানানোর ষড়যন্ত্র করেছে- এটিরও বিচার-বিশ্লেষণ দেখা গেছে। অর্থাৎ, বাঙালী জাতি এখনও আঁতকে উঠে সেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলের কথা চিন্তা করে, যেখানে সরকার নিজেই বাঙালীকে তালেবান বানানোর ষড়যন্ত্র করেছিল।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলায় কেঁপে উঠেছিল সারাদেশ। ওইদিন মুন্সীগঞ্জ বাদে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে ৫৫৯টি যুগপৎ বোমা হামলা চালিয়েছিল জঙ্গী সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। বিএনপি-জামায়াতের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একদিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙ্গে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো একটি সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদী অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করেছে অন্যদিকে বাঙালী জাতিকে জোর করে তালেবান হিসেবে বিশ্বের দারবারে পরিচিতি দিতে সব ধরনের কর্মসূচী হাতে নিয়েছিল। তাই প্রকাশ্যে লিফলেট বিতরণ থেকে শুরু করে ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’-এই স্লোগান পর্যন্ত দিয়েছিল বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মৌলবাদগোষ্ঠী ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জামায়াত ইসলামসহ জোটের প্রভাবশালী শরিক ইসলামিক ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরা।

মৌলবাদগোষ্ঠী ‘এক ধর্মীয়’ রাষ্ট্র কায়েম করতে তাদের নীল নক্সা অনুযায়ী দলীয় ক্যাডার বাহিনী গঠন, দেশ ও বিদেশ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ফান্ড গঠন, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচী গ্রহণ, জনসাধারণকে ধর্মীয় বাণী শুনিয়ে আদর্শভিত্তিক ব্যক্তিদের দিয়ে নিজেদের দল-গ্রুপ ভারি করাসহ নানা ধরনের কর্মসূচীও গ্রহণ করে তখনকার সময়ে। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে সম্ভাব্য এমন সকল কিছু প্রতিহত করতেও নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে। আর এটি দেখা যায় হুমায়ুন আজাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর ওপর হামলার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে। কবি, ভাষা বিজ্ঞানী, ঔপন্যাসিক, শিশুদের জন্য উৎকৃষ্ট রচনার লেখক হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘পাক সার জমিন সাদবাদ’ বিখ্যাত উপন্যাসটি লেখার কারণে রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ক্ষুব্ধ হয়ে পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার দিলেন ‘হুমায়ুন আজাদকে শাস্তি পেতে হবে’। অবশেষে এটাই হলো। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ইসলামের নীল নক্সায় হুমায়ুন আজাদ এ পৃথিবী থেকে চিরতরের জন্য বিদায় নিলেন।

মৌলবাদগোষ্ঠীর তখনকার মূল চালিকাশক্তি ছিল বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতা। সেসময় জামায়াতের দুইজন চিহ্নিত রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী নিজামী ও মুজাহিদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। নিজামী প্রথমে কৃষিতে থাকলেও পরে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে আর মুজাহিদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করে যা রাষ্ট্রীয় শক্তির ওপর ভর করে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে যেতে সক্ষম হয় এই অপশক্তি।

১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা ছিল জেএমবির শক্তিমত্তার পরিচয় ঘটানোর একটি লক্ষ্যমাত্র। সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়ে দেশের সাধারণ জনগণকে জিম্মি করার ষড়যন্ত্র। দেশের মানুষ যাতে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারে, মানুষ যাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে তালেবান হওয়া রোধ করতে না পারে- এই হামলার মুখ্য উদ্দেশ্য এটি হলেও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশকে চিরতরের জন্য অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র ছিল যা পাকিস্তানের ইচ্ছার প্রতিফল।

আর এখানেই ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রকে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে এবং সংসদকে। তাই কুখ্যাত রাজাকার যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো লোকও সংসদে দাঁড়িয়ে বহুবিদ প্রতিভার অধিকারী হুমায়ুন আজাদকে শাস্তির নামে হত্যা করতে উস্কানি দিয়েছিল। অনেকেই বলেন, বিএনপির হাওয়া ভবন ছিল সকল পাপের গোডাউন। এমনকি খোদ বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মুখেও শোনা যায় তারেক জিয়ার পাপের খতিয়ান। আর সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, চাকরি কিংবা তথাকথিত শাস্তির ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্তাব্যক্তিদের রীতিমতো বাধ্য করে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সম্পৃক্ত করতে। জজ মিয়ার নাটক তৈরি করতে। আর এই একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলাটিও ছিল সিরিজ বোমা হামলার সুদীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ।

সিরিজ বোমা হামলা চালিয়ে বাঙালী জাতির ভেতর ভয় ঢুকিয়ে জিম্মি করা আর বাংলাদেশকে নেতা ও নেতৃত্বশূন্য করতে, মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত পাকিস্তানী ভাবধারায় সন্ত্রাস-মৌলবাদ ও অকার্যকর জঙ্গীবাদ রাষ্ট্র কায়েম করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনাকে হত্যা করাই ছিল বিএনপি-জামায়াতের মূল উদ্দেশ্য। আর তাই জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত মদদে আর স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদগোষ্ঠী এবং তারেক জিয়ার একান্ত পরিকল্পনায় একুশে আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশস্থলে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে দলের চব্বিশজন নেতাকর্মীকে হত্যা করে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার ধারাবাহিকতায় ৩ অক্টোবর প্রায় একই সময়ে লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম জেলা আদালতে জেএমবি মরণঘাতী আক্রমণ চালায়। ২৯ নবেম্বর গাজীপুর আইনজীবী সমিতির হল ঘরের ভেতরে বোমা ও গ্রেনেড হামলা করে। ১৪ নবেম্বর আক্রমণ করে ঝালকাঠি আদালত প্রাঙ্গণে। সোহেল চৌধুরী ও জগন্নাথ পাঁড়ে নামের দুজন বিচারক ঝালকাঠিতে নিহত হন। অর্থাৎ, জনমনে ভয়-আতঙ্ক বিরাজ করতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে জেএমবি।

পাঠক! পরিবারের কর্তাই যখন আপনার অপরাধের পক্ষে সাফাই গাইবে তখন আপনার ভেতরও অপরাধবোধ কাজ করবে না। আর জেএমবির সদস্য তখন এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল, জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ ও হাফেজ মাহমুদরা তাদের নিজের পছন্দ-অপছন্দের জন্য মানুষকে গাছের সঙ্গে উল্টোভাবে ঝুলিয়ে পুতুল খেলার মতো হত্যা করেছে। অনেকের চোখ উপরে ফেলা হয়েছে। লোহার পেড়েক দিয়ে গাছের সঙ্গে মানুষকে লেপ্টে দিয়েছিল কারণ, সরকার ও সরকারপ্রধান খালেদা জিয়া নিজেই ওইসব বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃষ্টি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল, আড়াল করে রাষ্ট্রীয়ভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছিল।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, সিরিজ বোমা হামলা নিয়ে শুধু ১৭ আগস্টকে কেন্দ্র করে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা থেকে শুরু করে সামাজিক সংগঠনগুলো কিছু বক্তব্য-বিবৃতি প্রদান করে থাকে। আবার এই হামলার দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তার সম্পূর্ণ বিচারকাজ এখনও শেষ করা সম্ভব হয়নি। দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলায় দায়ের করা ১৫৯টি মামলার মধ্যে ৯৩টির নিষ্পত্তি হয়েছে। এতে ৩৩৪ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হলেও ৫৬টি মামলার এখনও বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা চারশ’। ১২ বছর আগে মুন্সীগঞ্জ ছাড়া দেশব্যাপী ৬৩টি জেলায় সংঘটিত এই সিরিজ বোমা হামলায় মোট ১৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়। আর ১৪৯টি মামলার ১১০৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হলেও অন্য ১০ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৭ জন আসামিকে অপর জঙ্গী সংশ্লিষ্ট মামলায় ফাঁসি রায় দেয়া হলেও এর মধ্যে ৮ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব মামলায় আনা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩৪৯ জন অভিযুক্তকে বেকসুর খালাসও দিয়েছে আদালত।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিএনপি-জামায়াত জোট যে ভাইরাস একবার সমাজ-রাষ্ট্রে জন্ম দিয়েছে তা আজও নির্মূল করা সম্ভব হয়নি, তবে সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারাবাহিক অভিযানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সক্ষম হয়েছে। তারপরেও জেএমবিকে কেন্দ্র করে বা জেএমবির পরিচালিত বিচ্ছিন্ন হামলাগুলোকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে অন্তুভুক্তি করতেও ষড়যন্ত্র করছে। এদিকে, গত ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে পুলিশের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। এ সময় ৩ পুলিশ সদস্য আহত হয়। পরে ২৭ মে মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়ের পাশে একটি পুলিশ ভ্যানে বোমা হামলা চালানো হয়। তখন ভ্যানটিতে কেউ না থাকায় এ হামলায় একজন পথচারী আহত হয়। এর ২ মাস পর গত ২৩ জুলাই রাতে রাজধানীর খামারবাড়ি ও পল্টনে পুলিশ বক্সে ২টি বোমা রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে বোমা নিষ্ক্রিয় ইউনিটের সদস্যরা বোমা দুটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করে। জানা যায়, দেশে বানানো বোমা আইইডি (ই-প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) দুটি শক্তিশালী ছিল।

বাংলাদেশকে যারা আফগানিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্র করেছিল, বাঙালীকে তালেবান বানানোর নীলনক্সা করেছিল, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা। অন্যদিকে যত দ্রুত সম্ভব সিরিজ বোমা হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এ হামলা নেপথ্যে যারা মদদ দিয়েছে তাদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ)

নির্বাচিত সংবাদ