২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পোড়া ধ্বংসস্তূপে এখনও মূল্যবান জিনিস খুঁজে ফিরছে ক্ষতিগ্রস্তরা

নিয়াজ আহমেদ লাবু ॥ রাজধানীর রূপনগর ঝিলপাড় বস্তিতে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও পোড়া ধ্বংসস্তূপে তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র খুঁজছেন। অনেকে কিস্তিতে টাকা তুলে দোকানে মালামাল তুলেছিলেন। আগুনে দোকানগুলোর সেই মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই ঋণের বোঝা নিয়ে এখন অন্ধকার দেখছেন তারা।

শুক্রবার রাতে ভয়াবহ আগুনে ঘর-বাড়ি সব হারিয়ে পথে বসে আহাজারি করছেন অনেকে। খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার।

এদিকে সরকারী এই জমিতে বস্তি বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে মাসে লাখ টাকা বাণিজ্য করছিল বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্তদের নিকটস্থ আরামবাগ মাঠে প্যান্ডেল টানিয়ে রান্নাবান্না ও খাবারের বন্দোবস্ত করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)।

ক্ষতিগ্রস্ত মোহাম্মদ বাদশা জানান, এই বস্তিতেই ছোট থেকে বড় হয়েছি। তিন মাস হলো ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে এবং নিজের জমানো কিছু টাকা দিয়ে বস্তিতে মুদির দোকান দিয়েছিলাম। শুক্রবার আগুনে দোকানসহ আমার ঘরবাড়ি শেষ হয়ে গেছে। একদিকে ঋণের বোঝা অন্যদিকে সব হারিয়ে পথের ফকির আমি। কিভাবে এই ঋণের টাকা শোধ করব। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, তিনদিন ধরে নিয়মিত খেতেও পারছি না। কেউ সামান্য সহযোগিতাও করছেন না। এ অবস্থায় সরকারের কাছ থেকে আমরা সহযোগিতা আশা করছি। আগুনে ঘর পুড়ে গিয়ে বাস্তুহারা হওয়া সমিরন খাতুন জানান, সব হারিয়ে আজ আমি নিঃস্ব। আমাদের মতো গরিব বস্তিবাসীদের কথা কেউ ভাবে না। ভুক্তভোগী আব্দুল লতিফ জানান, আমার মেয়ে বিদেশে থাকত। কয়েকদিন আগে স্বর্ণের গহনা ও নগদ টাকা নিয়ে বাড়ি এসেছে। সেগুলো আমাদের ঘরেই রাখা ছিল। আগুন আমার মেয়ের সাজানো সংসার তছতছ করে দিল। খোলা আকাশের নিচে তারা মানববেতর জীবন কাটাচ্ছে। সব হারিয়ে রহিমা খাতুন আজ সর্বস্বান্ত। জন্মলগ্ন থেকেই তিনি এ বস্তির বাসিন্দা। কয়েকটি বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাত রহিমা। রবিবার বস্তির পাশের রাস্তায় বসে কান্নাকাটি করছিলেন তিনি। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, আর কিছুই নাই আমগো। না ঘর, না শোবার জায়গা! পরনের কাপড়টাও পরে আছি আজ তিন দিন ধরে। না ভাত রাঁধার হাঁড়ি আছে। না আছে খাওয়ার প্লেট। সব চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল! শুধু দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলাম না। তার মতো মাইনুদ্দিনের সংসার অন্ধকার দেখছেন। জন্ম থেকেই বেড়ে ওঠা এ বস্তিতে। বৃদ্ধ মাকে ঘর থেকে টেনে বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় আর কিছুই নিতে পারেননি তিনি। এক ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রী শান্তাকে নিয়ে তাই এখন নিজের ঘরের জায়গাটার ওপরই বসে আছেন একটা পলিথিনের ছাউনি দিয়ে। মাইনুল বলেন, আমার মা অসুস্থ। আমি মাকে নিয়েছি আর বউ ছেলে-মেয়ে দু’টোকে হাত ধরে নিয়েছে। এর বাইরে আর কিছুই নিতে পারিনি। শুধু দেখতে পেলাম আমার ৪০ বছরের সাধ-আহ্লাদ-স্বপ্ন সব পুড়ে গেল! এদিকে রাত যাপনের জন্য সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা করা হলেও কেন তারা এখনও বস্তিতে রাত কাটাচ্ছেন, তা জানতে চাইলে মধ্য বয়সী বাবুল হোসেন জানান, মায়া। হাতের ওপর একটু একটু করে এই জায়গাটাতে নিজের সবকিছু গড়ে তুলেছি। এখন ছেড়ে যাই কী করে! যদিও আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। তবুও পোড়া আলমারি আর পোড়া টিন যা একটু বেঁচেছে, রাতে চোর এসে যদি সেগুলোও চুরি করে নিয়ে যায়! তাই একটু পাহারা দিতে হয়। ওটুকু ছাড়া আর তো কিছুই নেই। তাই আশ্রয়ের ব্যবস্থা থাকলেও যেতে পারিনি। পরিবারের একেক সদস্য এখন একেক জায়গায় হয়ে গেছে!

অন্যদিকে রবিবার ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীরা বলেন, আগুনে পোড়া টিনগুলো এখন বিক্রি হচ্ছে খুবই কম দামে। তা ৫ টাকা থেকে ২০ টাকা কেজি দরে কিনছে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীরা। আর এ টিন বিক্রির টাকা দিয়েই এখন নিজেদের খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা করছে ঝিলপাড়া বস্তিবাসী। বস্তির বাসিন্দা মিলন হোসেন জানান, লোহা-লক্কড় আর টিন বিক্রি করেই এখন খাবারের টাকা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। রাতে এখানে থাকছি টিন সোজা করে তার ওপর। ৫০০ টাকার টিন এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ৫ টাকায়! তবে এত হারানোর ভিড়েও নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন বলে মনোবল যোগানোর শক্তি খুঁজছেন সবাই। তাই তো মাইনুদ্দিন, রহিমা অথবা মিলনের মতো মানুষ বলতে পারেন, কী করব জানি না! তবে কিছু একটা তো করতেই হবে। সবকিছু ভুলে আবার সব শুরু করতে হবে নতুন করে।

মাদক বিক্রি, অবৈধ বিদ্যুত ও গ্যাস সংযোগে লাখ লাখ টাকা নেতাকর্মীদের পকেটে ॥ রাজধানীর রূপনগর, চলন্তিকা, আরামবাগ বস্তি থেকে মালিকরা প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বস্তির রুম ভাড়া দেয়া, বস্তিতে অবৈধ বিদ্যুত, গ্যাস ও পানি সংযোগ দিয়ে টাকা উপার্জন করছেন তিন বস্তির মালিক। তাদের সহযোগিতার জন্য রয়েছেন অবৈধ সংযোগ দেয়ার লাইনম্যান ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। শুক্রবার রাতে লাগা আগুনে রূপনগর, চলন্তিকা, ঝিলপাড় ও আরামবাগ বস্তি কমপক্ষে ২৫ হাজার ঘর পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এসব ঘরে অন্তত ৫৫ হাজার লোকের বসবাস ছিল।

কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৫-৩০ বিঘা জায়গার ওপর গড়ে ওঠে এই বস্তি এলাকা। প্রায় ৩০ হাজার ঘর আছে এখানে। বস্তিবাসী এবং আশপাশের এলাকার মানুষজন বলছেন, প্রতিটি ঘরেই ছিল গ্যাসের সংযোগ। অভিযোগ আছে, স্থানীয় ‘নেতারা’ই নিয়ন্ত্রণ করতেন গ্যাসের অবৈধ এই ব্যবসা। বস্তির ঘরগুলো থেকে প্রতি চুলায় এক হাজার টাকা করে বিল আদায় করতেন নেতাদের লাইনম্যান। সালমা নামের বস্তির এক বাসিন্দা জানান, সরকার খালি বলে অবৈধ, এগুলা তো নেতাফেতারা খাইতেছে। আমরা কি অবৈধ রাখছি, নাকি নেতা-ফেতারা অবৈধ রাখছে? আমরা তো বিল দেই। পানির বিল দেই, বিদ্যুতের বিল দেই, গ্যাসের বিল দেই। এক চুলায় এক হাজার টাকা করে বিল খাইছে (লাইনম্যানরা)। বস্তির আরেক বাসিন্দা সুমিও এর সঙ্গে যোগ করে বলেন, আমরা তো সবকিছুর বিল দিছি। সালমা জানান, এইডির নাম বলা যাবে না। নেতাফেতার নামের অভাব নাই। আশেপাশেই থাকে, এডি কি দূরে থাহে? তিনি জানান, নাম না নেয়াতেই এতকিছু, নাম নিলে তো আমগো মাইরাই ফালাইব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বস্তিবাসীদের কয়েকজন জানান, রাজনৈতিক মদদপুষ্ট একাধিক গ্রুপ সমঝোতার ভিত্তিতে এলাকা ভাগ করে বস্তির এই অবৈধ গ্যাসের বাণিজ্য পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতেন। কেউ কেউ অভিযোগের তীর স্থানীয় কাউন্সিলর মোঃ রজ্জব হোসেনের দিকে। তবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাউন্সিলর রজ্জব হোসেন। অবশ্য বস্তিতে এই অবৈধ ব্যবসা হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।