১৮ আগস্ট ২০১৯

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশা নিধনে জোর দিতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের ওপর দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন্ দিকে যাবে তা নির্ভর করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে এডিস মশা প্রজননের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করছে। প্রতি বছরই আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হয়ে থাকে। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর জীবাণু। ঈদে গ্রামে যাওয়া মানুষের দুই তৃতীয়াংশ ঢাকায় ফেরার পরও ঢাকা শহরের তুলনায় দেশের বিভিন্ন বিভাগে নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের হার বেশি রয়ে গেছে। দৈনিক ভর্তি হওয়া রোগীর তুলনায় ছাড়প্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা বেশি থাকার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে স্বাস্থ্য সেক্টর। কিন্তু এডিস মশা নিধনে প্রত্যাশিত সফলতা দেখাতে পারছে না ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্টরা।

অধিদফতরের ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সারাদেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ফের বেড়েছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি ও ছাড়প্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ১,৭০৬ ও ২,৩৯৪ জন। ঢাকায় নতুন ভর্তি ও ছাড়প্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ৭৩৪ ও ১,১০৯ জন এবং ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি ও ছাড়প্রাপ্ত রোগীর সংখ্যা ৯৭২ ও ১,২৮৫ জন। শনিবারের তুলনায় নতুন ভর্তি রোগী ১৭ শতাংশ বাড়ার বিপরীতে রবিবার ছাড়প্রাপ্ত রোগীর হার এসে দাঁড়ায় ৮১ শতাংশে। শনিবার এই হার ছিল ৮৫ শতাংশ। আর রবিবার সারাদেশে সর্বমোট চিকিৎসাধীন থাকা রোগীর সংখ্যা ৭,১৬৮ জন, যা আগের দিনের তুলনায় ৯ শতাংশ কম। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে বর্তমানে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩,৬৬৮ জন এবং ঢাকার বাইরে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩,৫০০ জন। শনিবার। রাজধানীসহ সারাদেশে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছিল ১,৪৬০ জন। তাদের মধ্যে ঢাকা শহরে ছিল ৬২১ এবং বিভিন্ন বিভাগে ৮৩৯ জন।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এডিস মশা নিধন করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ সানিয়া তাহমিনা বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বুঝতে আরও সময় লাগবে। আবহাওয়া আমাদের অনুকূলে নয়। এডিস নির্মূলে যেসব কর্মসূচী জোরদার করা প্রয়োজন, সেগুলো যদি সঠিকভাবে করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরিস্থিতি কি হবে বলা মুশকিল। দেশের এডিস মশা প্রজননের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করছে। প্রতি বছরই আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হয়ে থাকে বলে জানান অধ্যাপক ডাঃ সানিয়া তাহমিনা। একই কথা বলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা বুঝতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। অর্থাৎ ডেঙ্গু পরিস্থিতির উন্নতি হবে, নাকি আরও অবনতি হবে- সে বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। আমাদের এখন উচিত নিজেদের এডিস মশা থেকে দূরে রাখার সব পন্থা অবলম্বন করা। ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে মশক নিরোধক আমদানির ওপরও জোর দিয়েছেন আবুল কালাম আজাদ। দেশের জেলা ও উপজেলা ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের বিষয়ে তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়েও ডেঙ্গু শনাক্তের ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের প্রতিটি সরকারী হাসপাতাল ও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু শনাক্তের উপকরণ, ডেঙ্গু চিকিৎসা গাইড লাইন পাঠানো হয়েছে। অনেক বছর ধরে দেশে সারাবছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চলে। অনেক আগেই রেকর্ড সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সকে ডেঙ্গু রোগী শনাক্তকরণসহ চিকিৎসাসেবার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে জটিল ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। উপজেলা পর্যায়ে শনাক্তকৃত ডেঙ্গু রোগীদের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে রেফার্ড করার বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এভাবে প্রত্যন্ত এলাকায় শনাক্তকৃত ডেঙ্গু রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা মনিটরিং সেলের সভা ॥ শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে করণীয় বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপির সঙ্গে মতবিনিময় করেন ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা মনিটরিং সেল’। সভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচার কার্যক্রম বিষয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় ডেঙ্গু রোগের বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশন ও এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি এডিস মশার বংশ বিস্তার কমাতে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচার বৃদ্ধি করার বিষয়েও আলোচনা করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আওয়ামী লীগ ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক ও সভাপতি ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডাঃ রোকেয়া সুলতানা, বিএসএমএমইউ’র উপাচার্য ও কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডাঃ কনক কান্তি বড়ুয়া, স্বাচিপ মহাসচিব ডাঃ এম এ আজিজ, বিপিএসপিএ’র মহাসচিব ডাঃ জামাল উদ্দিন চৌধুরী, কমিটির সদস্য ডাঃ এহসানুল কবীর জগলুল, ডাঃ রউফ সরদার, ডাঃ কামরুল হাসান মিলন, ডাঃ পুরবী রাণী দেবনাথ, ডাঃ আবু ইউসুফ ফকির, ডাঃ মোঃ জাবেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

কিশোরগঞ্জ ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা কিশোরগঞ্জ থেকে জানান, কিশোরগঞ্জে দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এ পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮৫২ জন। হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৩২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ৩৫ জন। অবস্থা জটিল হওয়ায় এ পর্যন্ত ১১৩ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে গত সপ্তাহে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক কলেজ ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে।

ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট থাকলেও হাসপাতালে ব্লাডসেল কাউন্টার না থাকায় আক্রান্ত রোগীদের রক্তের সেল কাউন্ট করতে হচ্ছে বাইরের ক্লিনিকগুলো থেকে। কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। জেলা সদরের এ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় ডেঙ্গু রোগীদের সামাল দিতে ডাক্তারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা দুটি ওয়ার্ড খোলা হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাঃ সুলতানা রাজিয়া জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩ জন নতুন রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখানে এখন পর্যন্ত ৪৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। ভর্তি আছেন ৬৩ জন। অবস্থা খারাপ হওয়ায় এখন পর্যন্ত ৬৯ জন রোগীকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডাঃ হাবিবুর রহমান জানান, এ জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে এখনও তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে। হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীদের প্রতিদিন রক্তের প্লাটিলেট সেল কাউন্ট করতে হয়। কিন্তু জেলা সদর হাসপাতালে কাউন্টার মেশিন না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে ব্লাডসেল কাউন্ট করাতে হচ্ছে। তবে সদর হাসপাতালে একটি ব্লাডসেল কাউন্টার মেশিন আনার জন্য চেষ্টা চলছে।

বাগেরহাট ॥ স্টাফ রিপোর্টার বাগেরহাট থেকে জানান, বাগেরহাটে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রবিবার সকাল পর্যন্ত জেলায় সরকারী হিসেবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত আরও সাত রোগীকে শনাক্ত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এ নিয়ে বাগেরহাট জেলায় সরকারীভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭ জনে। তবে বেসরকারীভাবে এ সংখ্যা দুই শ’ ছাড়িয়েছে বলে বাগেরহাটের বেসরকারী হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সূত্রে জানা গেছে।

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডাঃ জিকেএম শামসুজ্জামান বলেন, গত ঈদে ঢাকা থেকে এখানে আসা কিছু ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী থাকলেও চিকিৎসাসেবা পেয়ে তারা এখন সুস্থ। উদ্বেগের কোন কারণ নেই।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোঃ মামুনুর রশীদ, এডিস মশা বিস্তার ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সকলকে একযোগে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।