১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার দিনরাত

  • মারুফ রায়হান

ঈদের সময়ে ঢাকার জনসংখ্যার যে আভাস মেলে তাতে এ কথা বললে নিশ্চয়ই ভুল হবে না যে ঢাকা ছেড়ে যতজন যান, তার চেয়ে কম সংখ্যক মানুষ ঈদে ঢাকায় থাকেন। ঢাকার বাইরে ৬৩টি জেলায় ঈদ করতে যারা বাড়িতে যান তাদের সবার ভ্রমণ নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হয় না। নানা ঝক্কি ও বিড়ম্বনা থাকে তাতে। কয়েক ঘণ্টার পথ পেরুতে প্রায় আস্ত একটি দিনই লেগে যায় তাহলে সড়কপথে এই ঈদযাত্রাকে আমরা সন্তোষজনক বলব কী উপায়ে? ঈদের পর সাত দিন না কাটলে ঢাকা ত্যাগকারীদের ঢাকা ফিরতে মন চায় না- এমনটা তো দেখেই আসছি দশকের পর দশক ধরে। নিজস্ব ছন্দে ফেরার আগের কয়েকটা দিন ঢাকার রীতিমতো ঝিমুনি ভাব চলে আসে। বড় রাস্তায় বাস-মিনিবাসের সংখ্যাও কমে আসে। কুড়ি মিনিটের রাস্তা পেরুতে কুড়ি মিনিটই লাগে, দুই ঘণ্টা কুড়ি মিনিট নয়, এটাই পরম স্বস্তি।

কোরবানির পশু জবাইয়ের পর রাজধানীর প্রায় প্রতিটি অলিগলির নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে বড় ধরনের পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিত। জবাইয়ের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ বাড়ির সামনের রাস্তা ব্যবহার করা হয়। সিটি কর্পোরেশন কয়েক দিন ধরে ধোয়া-মোছা এবং দুর্গন্ধনাশক ব্যবহার করেও সার্বিক স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খেত। এই তো কয়েক বছর আগেও ঈদ-উল-আজহার পর বাইরে বেরুলে ঢাকাবাসীকে নাকে রুমাল চেপে পথ পেরুতে হতো বেশ কিছুদিন। কোরবানির পশু জবাইয়ের পর শুকনো রক্ত, নাড়িভুঁড়িসহ বিবিধ বর্জ্যে বাতাস দুর্গন্ধে ভারি হয়ে উঠত। আর নগরবাসী পড়তেন বিপাকে। ধুলা-আবর্জনা-দূষণের শহর ঢাকার বাসিন্দারা এমনিতেই সারাক্ষণই পরিবেশগত বিপন্নতার মধ্যে বসবাস করেন। কোরবানির সময় লাখ লাখ পশু জবাইয়ের পর সেই বিড়ম্বনা অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে। এমনকি ঢাকার বাইরে ঈদ করতে যাওয়া কোটি মানুষ ছুটি শেষে ঢাকায় ফিরে আসার পরও সেই দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর হতো না। গত দু-তিন বছর হলো পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এ বছর পরিস্থিতি আরও ভাল। সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকার থাকলে যে আপাত দুরূহ বিশাল কাজটিও সুসম্পন্ন হতে পারে- তারই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এবং সেটির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার ব্রতটি নিষ্ঠার সঙ্গে প্রশংসনীয়ভাবে পালন করে চলেছে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। ফলে বড় কিংবা ছোট রাস্তায় কোরবানির পশুর বর্জ্য দৃশ্যমান হচ্ছে না। কিন্তু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। তবে বলা দরকার, বহুতল ভবনের গ্যারেজে এবং সামনের রাস্তায় পালাক্রমে গরু-ছাগল জবাইয়ের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বড় ধরনের প্রচারণা দরকার।

এবারের কোরবানি ঈদে একটি নতুন সঙ্কট পরিলক্ষিত হলো। সেটি হলো চামড়া বিক্রিতে অস্বাভাবিক দরপতন। ফলে এতিমখানাও দানকৃত চামড়া নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ে। অনেক নগরবাসী বুঝে উঠতে পারেন না এই চামড়া কি মাটিতে পুঁতে ফেলবেন, নাকি ডাস্টবিনে ফেলবেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মতো অভিজাত এলাকায় বাসভবনের সামনে পড়ে থাকা পশুচামড়া কুকুরকে খেতে দেখা গেছে।

যেন না ভুলি বস্তি মানে মানব বসতি

রাজধানীর বস্তিতে আগুন লাগার ঘটনা প্রথম নয়। কড়াইল বস্তিতে একাধিকবার আগুন লাগার উদাহরণও রয়েছে। আগুন লাগলে প্রথমেই আগাম ধারণা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মনে করা হয় বস্তি উচ্ছেদ করার জন্যই পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। লাখ লাখ বস্তিবাসীকে স্থানচ্যুত করার এটি একটি কৌশল। শুক্রবার রাতে মিরপুরের রূপনগরের ঝিলপাড় বস্তিতে আগুন লাগায় প্রায় পুরো বস্তি এলাকাই বাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। প্রায় কয়েক হাজার বস্তিঘরে লাখো মানুষ বাস করত। ঈদের ছুটিতে অধিকাংশ বস্তিবাসীই দেশের বাড়িতে অবস্থান করায় বিরাট মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা মিলেছে। গরিব শ্রমজীবী মানুষের নিদারুণ ক্ষয়ক্ষতির ভেতর সান্ত¦না একটিই যে এই বিরাট অগ্নিকান্ডে একজনেরও প্রাণহানি ঘটেনি। প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে সরকারি জায়গায় এই বস্তিটি গড়ে ওঠে। প্রধানত রিক্সাচালক, গার্মেন্ট কর্মী, সবজি বা ফল বিক্রেতা এবং গৃহকর্মীদেরই বাস ছিল ওই বস্তিতে। আগুনে শুধু তারা আশ্রয়ই হারাননি, তাদের সংসারের যাবতীয় সামগ্রী ও সম্পদ তারা হারিয়েছেন। বলা যায় তারা সর্বস্বান্ত হয়েছেন রাতারাতি। প্রথমে তাদের মানবিক সহায়তা দানই জরুরী। উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তাৎক্ষণিকভাবে বস্তিবাসীদের মাথা গোঁজার জন্য স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ভবন খুলে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সাময়িকভাবে খাবারের বন্দোবস্তও করেছেন। এটি সাধুবাদযোগ্য। বস্তিতে যেহেতু ঘনবসতি থাকে এবং ঘরগুলোও গায়েগায়ে লাগানো থাকে তাই আগুন লাগলে অল্প সময়ের ভেতর আগুন ছড়িয়ে পড়ারই আশঙ্কা। তাই আগামীতে বস্তিতেও পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী হয়ে উঠেছে। সাধারণত বস্তিঘরগুলো তৈরি হয় তীব্রভাবে দাহ্য টিন-বাঁশ, পলিথিন দিয়ে। একটি ঘরের কোথাও আগুন লাগা মানে নিমেষে লাগোয়া সবকিছু পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। আর বস্তিবাসী একেবারেই প্রান্তিক আয়ের মানুষের এই মাথা গোঁজার আশ্রয়েই থাকে তাদের সহায়-সম্বল সবকিছু। উল্লেখ্য, ঢাকায় প্রায় ৫ হাজার বস্তি রয়েছে। শুক্রবার রাতের অগ্নিকা-ে রাতারাতি যারা গৃহহীন হলেন তাদের প্রতি সমাজের দায় রয়েছে। সবার আগে ভাবতে হবে তাদের পুনর্বাসনের কথাটি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব অল্প ক’জনই বস্তির অগ্নিকা- নিয়ে কথা বলেছেন। মাহমুদুর রশীদ নামে একজন সচেতন নাগরিকের অভিমত হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তার লেখা থেকে কিছুটা তুলে দিচ্ছি। তিনি লিখেছেন : ‘বস্তিতে যে সব নগরদরিদ্র বাস করে তারা এক অর্থে নগরের মূল চালিকাশক্তি। তাদের শ্রমে ঘামে মানুষ নাগরিক সুবিধা পায়। সেবা পায়। পরিকল্পিত নগরে সার্ভিস দেবার এসব নিম্নবিত্ত লোকদের জন্য আলাদা জোন থাকে। ঢাকায় তা নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাত’- যার উদ্ভব ও চালিকাশক্তি হচ্ছে দরিদ্র মানুষ। এ নিয়ে কোন আনুষ্ঠানিক ডাটা কারো হতে নেই। আমার দৃষ্টিতে ঘর শুধু থাকার বিষয় নয়, মানুষের মানুষ হওয়ার জন্য ঘর দরকার। মানুষের জন্ম হওয়ার ও সুস্থ থাকার জন্য জৈবিক ও যৌনজীবন দরকার। এরপর তার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানসিক গঠন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সবকিছুই ঘরের ওপর নির্ভরশীল। বস্তির ঘরও ঘর, ওখানে মানুষের এসব মৌলিক প্রয়োজনের জন্য ঘর দরকার। শুধু তাই নয়, আমার অনুমান, প্রায় ৪০-৫০ ভাগ বস্তিবাসীর জন্য ঘরই অর্থনৈতিক কেন্দ্র।’

উপসংহারে বলি, ঝিলপাড় বস্তির ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসনের কাজটিই সবার আগে করতে হবে।

কবির ছবি

আমাদের কোনো কোনো কবি ছবি আঁকেন, তবে সবাই যে একক চিত্র প্রদর্শনী করেন, এমন নয়। সৈয়দ শামসুল হক ছবি আঁকতেন, প্রদর্শনী করেননি। কিন্তু নির্মলেন্দু গুণ করেছেন। মঈন চৌধুরী কি করেছেন? মনে পড়ে না। বেশ অনেককাল পর একজন কবির চিত্র প্রদর্শনী হচ্ছে ঢাকায়। ষাট ছুঁইছুঁই বয়সের এই কবি হলেন শামসেত তাবরেজী। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের নতুন চিত্রশালা দ্বীপ গ্যালারিতে ৩৫টি বিমূর্তধারার ছবির এই প্রদর্শনীতে গিয়েছিলাম। কবিতার বইয়ের নামেই চিত্রপ্রদর্শনীর শিরোনাম- মুহূর্তমা। ইংরেজিতে বললে বলতে হবে মোমেন্টাম। রীতিমতো ডিগ্রিপাওয়া শিল্পীদের মতোই এ কবির শিল্পকর্ম। রেখার গতি আর রঙের ধর্ম যিনি বোঝেন, আর যাঁর রয়েছে কবিমন, তাঁর পক্ষেই বোধহয় এমন সব নয়নলোভন ছবি আঁকা সম্ভব। শিল্পীর কথা একটু শোনা যাক। তিনি বলছেন, ‘নিরাকারের আকার-ভাব আমার ছবির বিষয়বস্তু। কাল ও কালো বানানভেদেও ক্লেশ এড়িয়ে আমি দুইকে এক অর্থের মধ্যে দেখার পক্ষে। আকার জ্যামিতিময়, বর্ণপ্রধান। আদি মৌলিক পদার্থের মধ্যে অন্যতম কার্বনের প্রতিভাস তাই প্রভাবসঞ্চারী রং হিসাবে বিরাজমান মদীয় ছবিতে, এরসঙ্গে যুক্ত হচ্ছে গতি। তাই জন্ম এবং ধ্বংসের ভেতর দিয়ে ক্রমাগত রূপান্তর হয়ে চলেছে জগত নিরবধিকাল ধরে এবং তাই নিখিল শূন্যের আরেক নাম বলা হয় শিবা। ইংরেজিতে বললে ‘দ্যাট হুইচ ইজ নট’। আমার ছবি এই ইশারাকে শিল্পমান্য মনে করে গড়ে ওঠার আহ্লাদ করে। শিল্প বলে যে বুর্জোয়া ধারণা আছে, তার প্রতি আমার ইমান নাই। আমি ছবি-জ্যামিতি, সঙ্গীত, কবিতাসমূহকে মানুষের তাবৎ দেহ-নিগূঢ়তার ‘হওয়া’ বা হয়ে ওঠার কাব্য বলে মনে করি। আছেময়তাই আমার কাছে অপার সম্ভাবনা।’

লেখক আলম খোরশেদের মন্তব্যই তুলে দিচ্ছি যা থেকে পাঠকেরা কবির ছবি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবেন। তিনি লিখেছেন: ‘সম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত এই শিল্পীর পঁয়ত্রিশটি শিল্পকর্ম গভীরভাবে অবলোকন করে মনে হয়েছে, তিনি ছবি আঁকেন প্রাণের আবেগে, মনের আনন্দে এবং এক অন্তর্গত সৃজনতাগিদে। বিমূর্ত ঘরানার এই ছবিসমূহ মূলত আঙ্গিকপ্রধান হলেও, রেখার কারিকুরি আর রঙের উদার উদ্ভাসনে আমরা শিল্পীর স্মৃতি, সংরাগ, সংবেদনার পাশাপাশি সমকালের সন্ত্রাসদীর্ণ বাস্তবতা এবং সম্পর্কের জটিল ব্যাকরণের প্রতিচ্ছবিও যেন দেখতে পাই তাঁর এইসব মগ্ন, মৌল ক্যানভাসের সমগ্র শরীরজুড়ে।’

প্রর্দশনী চলবে আরো এক সপ্তাহ কমপক্ষে।

বিদায় রিজিয়া রহমান

শক্তিমান কথাশিল্পী রিজিয়া রহমান চলে গেলেন! শুক্রবার সকালে লেখালেখির টেবিলে ছিলাম, চ্যানেল আই থেকে ফোন করলেন ছড়াশিল্পী আমীরুল ইসলাম। বললেন, রিজিয়া আপা তো চলে গেলেন। এখন আমাদের দায়িত্ব পড়েছে আজকেই তাঁর স্মরণে অনুষ্ঠান করা। আপনি চলে আসেন, মারুফ ভাই।’

এই এক নিয়তি আমাদের, আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি। এক দশক আগেও কোন শিল্পী বা সাহিত্যিক প্রয়াত হলে ব্যক্তিগত শোক মুলতবি রেখে পরের দিনের সংবাদপত্রে ধরানোর জন্য নিউজ লিখতে বসে যেতাম। এখন অত তাড়া নেই। তবে পরবর্তী সপ্তাহের সাহিত্য পাতার জন্য কিংবা কোন অনলাইনের জন্য চটজলদি বসে যেতে হয় সদ্য প্রয়াত সাহিত্যিকের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে প্রবন্ধ লেখায়।

রিজিয়া রহমানের স্বামী উত্তরাতেই বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। দেড় দশক আগে আমি উত্তরাবাসী হওয়ার পরে প্রথমেই খুঁজে বের করি রিজিয়া রহমানের বাসা। তিনিও হঠাৎ হঠাৎ ফোন করে আদেশ দিতেন, আজকেই চলে এসো অফিস শেষে ফেরার পথে। স্মৃতির সঞ্চয় অঢেল। সে সব কথা আজ থাক। তিনি কবে হাসপাতালে ভর্তি হলেন জানতে পারিনি। হুঁশ হলো কবি রুবী রহমানের টেলিফোন পেয়ে। হাসপাতাল থেকেই ফোন করেছিলেন রুবী আপা। রিজিয়া আপাও কথা বললেন। পরের দিনই আমরা জনকণ্ঠে তাঁর অসুস্থতার খবর প্রকাশ করি। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি তাঁকে আমরা হারাব এমনটা অনুমানও করিনি। যদিও দীর্ঘ জীবনই তিনি পেয়েছেন। আমি দু-একবার তাঁকে ঘর থেকে বের করেছি টেলিভিশনে তাঁর সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য। এসব তিনি এড়িয়েই চলতেন। শুধু লেখা আর পড়াতেই তাঁর সময় যেত। তিনি ছিলেন সাহিত্যে শতভাগ নিবেদিত মানুষ।

কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার তাঁর মূল্যায়ন করতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন, ‘প্রচার-নোংরামি, দলবাজি, তোষামোদ, ব্যক্তিগত যোগাযোগের বাইরে থেকে নিজের কলমের জোরে যে সাহিত্যে স্থান করে নেয়া যায়, তিনি তার উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁকে দেখে আমি এবং আমার মতো মফস্বলবাসী অনেকেই সাহস পেয়েছিলাম। নিজেদের কলমের ওপর আস্থা রাখতে শিখেছিলাম।’

কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমানও গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন রিজিয়া রহমন সম্পর্কে। তিনি বলেছেন, আমি মনে করি রিজিয়া রহমান শুধু বাংলাদেশের লেখকদের মধ্যেই অগ্রগণ্য নন, তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিকও। ‘নারী লেখক’ শ্রেণীভুক্ত করে তাঁকে বিচার করাটা ভুল হবে, তাঁর মতো শক্তিমান, মেধাবী ও বিস্তৃত অভিজ্ঞতার বয়নকুশলী লেখক বর্তমান বাংলা সাহিত্যে, বলা চলে অঙ্গুলিমেয়। তাঁর প্রয়াণ মানে আমাদের কথাসাহিত্যের একটি দীপশিখা নিভে যাওয়া। অসাধারণ শক্তিমান লেখক রিজিয়া আপা ছিলেন খুব নিভৃতচারী। বর্তমানের প্রচারপ্রিয় মানসিকতার বিন্দুমাত্রও তাঁর মধ্যে ছিল না। কোন আয়োজনে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি এড়িয়ে যেতেন।’

কথাশিল্পী রিজিয়া রহমানের সঙ্গে একবার আনুষ্ঠানিক দীর্ঘ আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিল। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা কম নয়। আমরা জানি লেখকের কাছে তাঁর প্রতিটি গ্রন্থই প্রিয়। কিন্তু তিনি সুস্পষ্টভাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোকে শনাক্ত করে আমাকে বলেছিলেন, ‘ বই আকারে প্রকাশের পর নিজের বই যখন পড়ি রীতিমতো লজ্জিত হই। মনে হয় আবার লিখতে পারলে ভালো হতো। আমার সবগুলো উপন্যাসের মধ্যে ‘ঘর-ভাঙা-ঘর’, ‘শিলায় শিলায় আগুন’, ‘সূর্য-সবুজ-রক্ত’ ও ‘একাল চিরকাল’ উপন্যাসকেই কেবল গুরুত্ব দিতে পারি। ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাস আমাকে ঔপন্যাসিক হিসেবে মর্যাদার উঁচু আসন দিলেও ও বই নিয়ে অসম্পূর্ণতাবোধ আমার রয়ে গেছে। ‘রক্তের অক্ষর’-এর জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। কিন্তু আমার বিবেচনায় এটিকে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসের তালিকায় রাখবো না।’

তাঁর এসব কথা আজ যখন স্মরণ করছি, তখন হাহাকারে ভরে উঠছে আমার মন। এমন একজন নির্মোহ সহিত্য সমালোচককে আমরা অনুপ্রাণিত করতে পারিনি সাহিত্য সমালোচনায়। ব্যর্থতা আমাদেরই।

১৮ আগস্ট ২০১৯

marufraihan71@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ