২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একুশ আগস্টের ভয়াল স্মৃতি আজও তাদের তাড়িত করে

 একুশ আগস্টের ভয়াল স্মৃতি আজও তাদের তাড়িত করে
  • নাসিমা দীপ্তি রুমা পারভীনরা বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর দেখতে চান

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ ‘আমার সুন্দর জীবনটাই হারিয়ে গেছে। মৃত্যু-রক্তস্রোতের সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতি আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। পঙ্গুত্বের জীবন যে কী কষ্টের, কী যে ভয়াবহ- সে কথা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ অনুমানও করতে পারে না। গ্রেনেডের ঘাতক ‍স্প্লিন্টারের সঙ্গেই আমাদের নিত্য বসবাস। বিভীষিকাময় সেই ভয়াল দিনের কথা মনে হলে এখনও আঁতকে উঠি। তখন জীবনযন্ত্রণা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আরও শক্ত করে। দুই পা, পেট-সর্বাঙ্গে বিঁধে আছে অসংখ্য স্প্লিন্টার। শরীরের যেখানেই হাত দিই সেখানেই গ্রেনেডের স্প্লিন্টার। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলছে আমাদের নিত্যজীবন।’

সোমবার জনকণ্ঠের কাছে এভাবেই আবেগজড়িত কণ্ঠে ১৫ বছর ধরে সর্বাঙ্গে বিঁধে থাকা ২১ আগস্টের গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের তীব্র যন্ত্রণায় পঙ্গুত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার কথা জানালেন কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী রাশিদা আক্তার রুমা। হিংস্র শ্বাপদের ভয়ঙ্কর ছোবল থেকে প্রাণটা বাঁচলেও মরণঘাতী গ্রেনেডের স্প্লিন্টারের যন্ত্রণাদগ্ধ অভিশাপ নিয়েই চলছে এখন জীবন। ১৫ বছর ধরেই ক্র্যাচই তার একমাত্র অবলম্বন। ভয়াল স্প্লিন্টারের প্রতি মুহূর্তের যন্ত্রণায় দগ্ধ হলেও মনোবল ও সাহস আগেও হারাইনি, এখনো অটুট আছে। ক্র্যাচে ভর করেই দলীয় কর্মসূচীতে অংশ নিই। ‘জীবন্মৃত’ রাশিদা আক্তার রুমার চোখে মুখে ২১ আগস্টের ঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা-ধিক্কার স্পষ্ট। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিচারের রায়ে সন্তুষ্ট না হলেও হামলার মূল নায়কসহ ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানালেন দৃঢ়কণ্ঠেই।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাসহ পুরো আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে পরিচালিত ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলার ঘটনা ১৫ বছর পার করছে। কিন্তু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বীভৎস্য ও ভয়াল স্মৃতি এতটুকু ম্লান হয়নি সর্বাঙ্গে বিঁধে থাকা স্প্লিন্টারের তীব্র যন্ত্রণায় পঙ্গুত্ব নিয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকা আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীর। সেই মৃত্যু-ধ্বংস-রক্তস্রোতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি আজও তাদের তাড়া করে। জীবিত থেকেও তারা যেন মৃত। প্রত্যেকের শরীরেই বীভৎস ক্ষতের চিহ্ন। জীবনযন্ত্রণা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাদের আরও শক্ত করে। স্প্লিন্টারের বিষক্রিয়ায় শরীরেও দেখা দিয়েছে নানা উপসর্গ। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে এখনো বেঁচে আছেন আহত অনেক নেতাকর্মী। ভয়ঙ্কর ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুজাল ছিন্ন করে প্রাণে বেঁচে গেলেও শ্রবণশক্তির মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও।

তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ মদদেই যে ওই ভয়াল হামলা চালানো হয়েছিল তা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। মামলার রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের ফাঁসি এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদ-ের রায় ঘোষণা হয়েছে। বর্তমানে হাইকোর্টে মামলাটির আপীল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। তবে গ্রেনেড হামলায় নিহত-আহতদের পরিবার দ্রুত ঘাতকদের ফাঁসির রায় কার্যকর ও হোতা তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ এই গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে অকুতোভয় নেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ জন নিহত এবং পাঁচ শ’রও বেশি নেতাকর্মী আহত হন। এই নারকীয় বীভৎস হামলার ঘটনার ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বিচারের রায় কার্যকর হয়নি, শান্তি পায়নি নরপিশাচ ঘাতকরা।

১৫ বছর আগে ২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় আহত অধিকাংশ নেতাকর্মীর অনুভূতি প্রায় একই রকম। সময়ের সঙ্গে কষ্টের তীব্রতা এতটুকুও কমেনি তাদের। এই ভয়াবহ রাজনৈতিক জিঘাংসার শিকার অনেকেই আজ পঙ্গু। কেউ চলৎশক্তিহীন। কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। অনেকে প্যারালাইজ্ড হয়ে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করছেন, অনেকের জীবনেই এখন ক্র্যাচই নিত্যসঙ্গী। অনেকেরই শরীরে বিঁধে রয়েছে অসংখ্য স্প্লিন্টার। অনেকেরই শরীরে দগদগে ক্ষতের চিহ্ন জানান দিচ্ছে সেই ভয়াল দিনের মরণছোবলের বীভৎসতা। পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে জীবন্মৃত বেঁচে থাকা আওয়ামী লীগের বেশকিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপকালে তাঁরা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে পনেরো বছর ধরে তাদের দুঃসহ জীবন-যাপনের করুণ অবস্থার বর্ণনা দেন।

গ্রেনেড হামলায় পঙ্গু অবস্থায় বেঁচে থাকা নেতা-কর্মীদের কণ্ঠে হামলার পর তাদের জীবন রক্ষায় বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহায্য-সহযোগিতা ও বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসা করানোর বিষয়টি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তারা বলেন, নেত্রী (শেখ হাসিনা) অসংখ্য আহত মানুষের জন্য অনেক করেছেন, অনেক দিয়েছেন। এখনও করে যাচ্ছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের অবদানের মূল্যায়ন করতে গিয়ে আমার মতো কাউকে কাউকে জাতীয় সংসদের এমপি পর্যন্ত করেছেন। সেজন্য বঙ্গবন্ধু কন্যার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন তারা। তবে একটাই দুঃখ এখনও ওই ভয়াল হত্যাযজ্ঞের বিচার সম্পন্ন হয়নি। আমরা চাই ঘাতক ও হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

অবশ্য ভয়াল গ্রেনেডের স্প্লিন্টার দমাতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সৈনিকদের। অসংখ্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সর্বাঙ্গে কিছু স্প্লিন্টারের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়েই দলীয় কর্মকা-ে সরব রয়েছেন। রাজপথের সাহসী নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসিমা ফেরদৌসীও ২১ আগস্ট ভয়াল গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন। দেশ-বিদেশে চিকিৎসার পর এখনও তার হাত-পাসহ সর্বাঙ্গে দু’শরও বেশি স্প্লিন্টার বিঁধে রয়েছে। এই স্প্লিন্টারের কারণেই শরীরজুড়ে অসহ্য যন্ত্রণার পাশাপাশি অনেকটা পঙ্গুত্ব নিয়েই রাজনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ভয়াল গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুজাল ছিন্ন করে প্রাণে বেঁচে গেলেও স্প্লিন্টার তাদের পিছু ছাড়েনি। দীর্ঘ ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি এসব মানুষের। আমৃত্যু এমন জীবনযন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, এটা ভেবেই অসহায়-বেদনার্ত আহাজারি প্রতিটি আহতদের মাঝে। কারোর চোখ নেই, কেউ কানে শোনে না, কেউবা হাত-পা বাঁকা করে চলাফেরা করছেন, শরীর সোজা করে এখনো শুতে পারেন না অনেকেই। এমনকি তাঁদের দেহে একটু স্পর্শ করলেই ব্যথায় চিৎকার করে ওঠেন।

নাসিমা-দীপ্তি-রুমা-পারভীনদের মতো আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ নেতাও দেহে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়েও রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় নেতা এস এম কামাল হোসেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ এমপিসহ বেশ কিছু নেতা মন্ত্রী ও এমপির দেহেও বিঁধে রয়েছে অসংখ্য স্পিøন্টার। আমৃত্যু তাঁদের মতো সকল নেতা-কর্মীকেই এই জীবনযন্ত্রণা ভোগ করেই পথ চলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন আওয়ামী লীগের অধিকাংশ শীর্ষ নেতাকেই গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে যন্ত্রণাদগ্ধ রাজনৈতিক জীবন চালাতে হচ্ছে। গ্রেনেডের যন্ত্রণা নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রবীণ নেতা আবদুর রাজ্জাক, প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফসহ অনেকে।

জীবনযন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকলেও ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় আহত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এখনও ন্যায় বিচার পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। যে দলকে নিশ্চিহ্ন করতে ঘাতকরা গ্রেনেড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই দলটি টানা তৃতীয়বারের মতো ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। গ্রেনেডের আঘাতে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, ছন্দপতন ঘটিয়েছে স্বাভাবিক জীবনের- তাদের সবারই তাই প্রত্যাশা বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, এখনও চলছে। ভবিষ্যতে আর কেউ যেন এমন নৃশংস ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায় সেজন্য ২১ আগস্টের বিচারের রায়ও অবিলম্বে কার্যকর করা হোক।

আহত অনেক নেতাকর্মীই আলাপকালে তাঁদের দুঃসহ জীবনযাত্রার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি। তারা বলেন, নেত্রী (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) এক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে এই ভয়াল গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকা অবস্থাতেও শেখ হাসিনা আহত সবার দেখভাল করেছেন, গুরুতর আহতদের দফায় দফায় বিদেশ পাঠিয়ে উন্নত চিকিৎসা করিয়েছেন। ক্ষমতায় আসার পরও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে এবং বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের মাধ্যমে আহতদের চিকিৎসা, ওষুধপত্রসহ আর্থিক নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে সবার কণ্ঠেই ছিল ২১ আগস্টের ঘাতকদের প্রতি তীব্র ঘৃণা-ধিক্কার।