১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকিস্তানের আত্মহত্যা!

  • ২১ আগস্ট, ১৯৭১;###;শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট দিনটি ছিল শনিবার। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সুনামের সুবিধা নিয়ে হানাদাররা এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করে, যেখানে বাঙালীদের অবস্থান ছিল গৌণ। গত ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর কারণে যে দুর্দশা, ভোগান্তি আর শোষণ বাংলাদেশের মানুষ সহ্য করতে করতে অবশেষে তারা বুঝতে পেরেছে যে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে তারা বেঁচে থাকতে পারবে না যতদিন না ১৯৪০ সালের পাকিস্তান ইশতেহারে বর্ণিত এলাকাসমূহের স্বায়ত্তশাসন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়। মুক্তিবাহিনীর একটি টহলদার দল কুমিল্লার উত্তরে গাজীপুর রেলওয়ে সেতুর কাছে পাকবাহিনীর একটি দলকে এ্যামবুশ করে। এই আক্রমণে একজন লেফটেন্যান্টসহ ৬জন পাকসেনা নিহত হয় এবং অবশিষ্ট পাকসেনারা পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাপ দখল করে। পাকবাহিনীর এক কোম্পানি সৈন্য নরসিংদীর নিকটস্থ মুক্তিবাহিনীর গেরিলা অবস্থানের দিকে অগ্রসর হলে পথিমধ্যে গেরিলা দল তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। প্রায় একঘণ্টা গোলাগুলির পর পাকসেনারা গোলাগুলি বন্ধ করে সামনের দিকে অগ্রসর না হয়ে পিছু হটে। সুন্দরবনে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। যুদ্ধে মুক্তিসেনাদের নেতৃত্ব দেন রাইফেলসের ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা। পাকসেনারা নরসিংদীর নিকটস্থ মুক্তিফৌজের গেরিলা অবস্থানের খবর পেয়ে প্রায় এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে মুক্তিফৌজের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়। অগ্রসর হওয়ার পর পথিমধ্যে মুক্তিফৌজের একটি গেরিলা দল তাদের অতর্কিত আক্রমণ করে। প্রায় এক ঘণ্টা গোলাগুলির পর পাকসেনারা তাদের গোলাগুলি বন্ধ করে মুক্তিফৌজের অবস্থানের ২-৩ মাইল দূরে থাকতেই আর অগ্রসর না হয়ে পিছু হটে যায়। মুক্তিফৌজ বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। কিন্তু পাকসেনারাও খুব দ্রুত বিদ্যুত সরবরাহের লাইনগুলো যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি মেরামত করে ফেলে। এর ফলে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত পরিমাণে বিদ্যুত সরবরাহ পায়। পাকসেনাদের বিদ্যুত সরবরাহে আরও বিঘœ সৃষ্টির জন্য নতুন করে আরেকটি পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিতাস গ্যাসের পাইপ লাইনের নকশা যোগাড় করা হয়। গ্যাসের পাইপ কেটে দিলে সিদ্ধিরগঞ্জ এবং ঘোড়াশালের বিদ্যুত সরবরাহ কেন্দ্রগুলো গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। হানাদার কর্তৃপক্ষ এইসব বিদ্যুত সরবরাহ কেন্দ্র চালাবার ব্যবস্থা করলে তাদের তেলের সঙ্কট দেখা দেবে। পাইপলাইন উড়িয়ে দেবার জন্য নরসিংদী এবং রূপগঞ্জের গেরিলাদের নির্দেশ দেয়া হয় পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সরকার আনসার অধ্যাদেশ ১৯৪৮ বাতিল করে ‘রাজাকার অধ্যাদেশ ১৯৭১’ জারি করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব উ’থান্ট আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের গোপন বিচার বন্ধ রাখার জন্য যে বিবৃতি দেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় পরিষদ তার সমালোচনা করে বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব এ ব্যাপারে ক্ষমতা বহির্ভূত হস্তক্ষেপ করেছেন। পরিষদে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার অনুষ্ঠান পাকিস্তান সরকারের নিজস্ব বিষয়। এ ব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিবের হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার নেই। ইরাকে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত, জনাব এএফএম আবুল ফতেহ বাংলাদেশের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন। জনাব ফতেহ এখন পর্যন্ত পদত্যাগকারী সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানী কূটনীতিক। তিনি আট মাস আগে বাগদাদের রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন এবং তার পূর্বে প্যারিস, ওয়াশিংটন, প্রাগ, নয়াদিল্লী ও কলকাতায় ছিলেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত তিনি ছিলেন নয়া দিল্লীর চ্যান্সেলর এবং পরে ডেপুটি হাইকমিশনার। তারপরের দুই বছর কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিশ্বজনমত অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সী কোসিগিন পাকিস্তানী ফ্যাসিবাদী সামরিক চক্রের এই ঘৃণ্য দূরভিসন্ধির কথা জানতে পেরে বাংলাদেশে গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও নারী নির্যাতনের নায়ক পাকিস্তানের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়াকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন: সাবধান! ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানো পাকিস্তানের পক্ষে আত্মহত্যার শামিল হবে। রাত প্রায় সাড়ে বারোটায় পাকসেনাদের ৪-৫টি বেডফোর্ড গাড়ি এবং জিপ তেজগাঁওর দিক থেকে গ্রিন রোড হয়ে অগ্রসর হয়। প্রথম গাড়িটি যখন অ্যামবুশ সাইটের শেষপ্রান্তে পৌঁছে তখন একটি মাইনের আঘাতে গাড়িটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়। দ্বিতীয় গাড়িটির চালক এই অবস্থা দেখে হতচকিয়ে পাশ কাটতে গিয়ে পার্শ্ববর্তী দালানের সঙ্গে ধাক্কা মারে, ফলে এই গাড়িটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পেছনে পেছনে পাকসেনাদের আরেকটি জিপ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে মাইনের আঘাতে সেটিও উল্টে যায়। যেসব পাকসেনা ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িগুলোতে অক্ষত অবস্থায় ছিল তারা গাড়ি থেকে বেরুবার চেষ্টা করে এবং গুলিবর্ষণ করতে থাকে। মুক্তিফৌজের এ্যামবুশ পার্টির গেরিলারা ছাদ থেকে তাদের ওপর গ্রেনেড আক্রমণ চালায় এবং গুলি ছুড়তে থাকে। এর ফলে অধিকাংশ পাকসেনা হতাহত হয়। পেছন থেকে আরও একটি গাড়িতে পাকসেনারা ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হয় এবং গাড়ি থেকে নেমে মুক্তিফৌজের গেরিলাদের ওপর আক্রমণ চালাবার চেষ্টা করে। মুক্তিফৌজের গেরিলারাও তাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। পাকসেনাদের হতাহতের সংখ্যা যখন বাড়তে থাকে তখন কোন উপায় না দেখে তারা ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালিয়ে যায়। গোলাগুলির শব্দে স্থানীয় জনসাধারণ তাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। তারা ২৪ জন পাকসেনার মৃতদেহ ও ৪১ জনকে আহত অবস্থায় এবং দুটি বিধ্বস্ত ট্রাক এবং একটি জিপ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে। মুক্তিফৌজের পক্ষে দু’জন সামান্য আহত হয়। মুক্তিফৌজের গেরিলারা কিছুসংখ্যক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গ্রিন রোডের পিছন দিকের নিচু জায়গা দিয়ে নিরাপদে চলে আসতে সক্ষম হয়। পরের দিন এই খ-যুদ্ধ এবং পাকিস্তানীদের দুরবস্থার কাহিনী হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে জানতে পারে। এই সংবাদ ঢাকায় মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঢাকা শহরের মুক্তিকামী জনগণের মনে আশার সঞ্চার হয়। দুদিন পরে ঢাকার গেরিলারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা বন্ধ করার জন্য নিউ মডেল ডিগ্রী কলেজসহ এবং আরও কয়েকটি কলেজে আক্রমণ চালায়। তারা পরীক্ষার খাতাপত্র জ্বালিয়ে দেয়। টঙ্গী এবং জয়দেবপুরের মাঝে দুটি বিদ্যুতের পাইলনও তারা উড়িয়ে দেয়। এছাড়া ঢাকার গেরিলা দল পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশের একটি দলকে কলাবাগানের কাছে অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে দশজনকে হত্যা করে। কালীগঞ্জ-ডেমরা এবং কালীগঞ্জ-টঙ্গীর মধ্যস্থিত বিদ্যুত সরবরাহ লাইনের চারটি পাইলন উড়িয়ে দেয়। আমাদের আরেকটি গেরিলা দল রূপগঞ্জের নিকট নদীর পাড়ে পাকসেনাদের যাতায়াতের রাস্তায় একটি এ্যামবুশ পেতে রাখে। পাকসেনাদের গুপ্তচর মুক্তিফৌজের ঢাকার গেরিলাদের ধোলাই খাল ঘাঁটির অবস্থান পাকসেনাদের অবহিত করে। সংবাদ পেয়ে পাকসেনারা ২০-২৫টি ট্রাক ধোলাই খালে মুক্তিফৌজের ঘাঁটি আক্রমণের জন্য আসে। পাকসেনাদের অতর্কিত আক্রমণে মুক্তিফৌজের গেরিলারা কোন উপায়ান্তর না পেয়ে তাদের সঙ্গে সম্মুখসমরে লিপ্ত হয়। প্রায় ২ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। সংঘর্ষে পাকসেনাদের প্রায় ৪০-৪৫ জন হতাহত হয়। অপরদিকে মুক্তিফৌজের দুজন গেরিলা মারাত্মকভাবে আহত হয়। প্রবল চাপের মুখে টিকতে না পেরে মুক্তিফৌজের গেরিলারা সাঁতরিয়ে ধোলাইখাল পার হয়ে অবস্থানটি পরিত্যাগ করে। পিছু হটার সময় একটি ২টি মর্টার, ৩টি ম্যাগজিন খালে ফেলে দিয়ে আসতে বাধ্য হয়। পরদিন পাকসেনারা সেগুলি উদ্ধার করে এবং তাদের প্রচারের কাজে ব্যবহার করে। মার্কিন সিনেটের আরও একজন প্রভাবশালী সদস্য রিপাবলিকান দলের মিঃ চার্লস পার্সি মন্তব্য করলেন, পাকিস্তানের মৃত্যু হয়েছে। আর কোন অবস্থাতেই দ্বিখ-িত পাকিস্তানকে জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। সিনেটর চার্লস পার্সি আরো বলেন, বাঙালী জাতি আজ যে ইস্পাতকঠিন সংকল্প নিয়ে লড়াই করছে তা একটি বিরাট ও মহৎসংকল্প। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, বঙ্গবন্ধুর বিচার প্রহসনে তারা যদি আর এক পা অগ্রসর হয়, তাহলে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তারা যদি তথাকথিত বিচারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণদ- দেয়, তাহলে পৃথিবীর কেউ-ই তাদের ক্ষমা করবে না। দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের মুক্তিফৌজ চট্টগ্রাম বন্দরে বোমা নিয়ে আক্রমণ করায় বন্দরে নোঙ্গর করা পাক বাণিজ্য জাহাজ আল আব্বাস এবং নারায়ণগঞ্জ নদীতে পাট, কয়লা ও পাক সৈন্যদের জন্য রেশম বোঝাই চারখানা স্টিমার সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছেন । শিলং থেকে ইউ এন আই এর খবরে প্রকাশ, এ মাসের প্রথম দিকে মুক্তিফৌজের গেরিলারা শ্রীহট্ট অঞ্চলে পাকিস্তানী সৈন্য বাহিনীর একটি দোতলা স্টিমার ডুবিয়ে দিয়েছে। ডুবিয়ে দেয়ার আগে মুক্তিফৌজ সেটি থেকে গোলাবারুদ নামিয়ে নেয়।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ