১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টেস্টে স্মিথের আলোকিত প্রত্যাবর্তন

  • মোঃ রাশেদুল হক

দীর্ঘ ১৬ মাস পর টেস্ট ক্রিকেটে ফিরেই জোড়া সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ফেললেন সাবেক অসি অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ। এ্যাশেজের প্রথম টেস্টে এজবাস্টনে প্রথম ইনিংসে ১৪৪ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও সেঞ্চুরি (১৪২) হাঁকিয়েছেন। কঠিন সময়ে ফের দলের ত্রাতা সেই স্মিথ। একই সঙ্গে ভেঙে দিয়েছেন বিরাট কোহলির রেকর্ডও। টেস্টে দ্বিতীয় দ্রুততম ক্রিকেটার হিসেবে ২৫টি টেস্ট সেঞ্চুরির ইতিহাস গড়েছে তিনি। এজবাস্টনে চতুর্থ দিনে ক্যারিয়ারের ২৫তম সেঞ্চুরিটি করেন স্মিথ। শেষ পর্যন্ত ১৪২ রান করে আউট হন তিনি। আর তাতেই পেছনে ফেলেন কোহলিকে। ২৫টি সেঞ্চুরি করতে যেখানে স্মিথের লেগেছে ১১৯টি ইনিংস সেখানে কোহলির লেগেছিল ১২৭টি ইনিংসে। আর গ্রেট শচীন টেন্ডুলকর ২৫টি সেঞ্চুরি করেছিলেন ১৩০টি ইনিংসে। তবে ৬৮টি ইনিংসে ২৫টি টেস্ট সেঞ্চুরি করে সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে অসি কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। ২৫টি টেস্ট সেঞ্চুরির নিরিখে ব্র্যাডম্যানের পরেই রয়েছেন স্টিভ স্মিথ। টেস্টে দ্বিতীয় দ্রুততম ক্রিকেটার হিসেবে ২৫টি টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড এখন স্মিথের দখলে। অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন বুঝি একেই বলে। অবশ্য লর্ডসে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে প্রতিপক্ষ পেসার জোফরা আর্চারের বাউন্সারে আহত হয়ে মাঠের বাইরে ছিটকে যেতে হয় তুখোড় অসি-ব্যাটসম্যানকে। মাঠ ছাড়ার আগে খেলেন ৯২ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। প্রত্যাবর্তনে উঠে আসেন টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে। দৃঢ় মনোবলের অধিকারী স্মিথ হেডিংলিতে বৃহস্পতিবার শুরু হতে যাওয়া এ্যাশেজের পরের টেস্টেই মাঠে নামতে চাইছেন। যদিও সেটা নির্ভর করছে চিকিৎসকদের গ্রীন সিগন্যালের ওপর।

২০১৮ সালে কেপটাউন টেস্টে বল-বিকৃতি কাণ্ডে জড়িয়ে ক্রিকেট ও নিজের ক্যারিয়ারকে কালিমালিপ্ত করেছিলেন স্টিভ স্মিথ। নির্বাসন কাটিয়ে প্রত্যাবর্তন টেস্টে দুই ইনিংসে জোড়া সেঞ্চুরি করে নজির গড়লেন স্টিভ স্মিথ। দুই ইনিংসেই দলের ত্রাতা হিসেবে অবতীর্ণ হন তিনি। মাত্র পঞ্চম অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান হিসেবে এ্যাশেজের এক টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরি করেছেন স্মিথ। তার আগে এই কীর্তি ছিল ওয়ারেন বার্ডসলে, আর্থার মরিস, স্টিভ ওয়াহ ও ম্যাথু হেইডেনের। সাবেক বাঁহাতি ওপেনার হেইডেন ২০০২ সালে জোড়া সেঞ্চুরি করেছিলেন। ১৭ বছর পর সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন স্মিথ। আরও একটি কীর্তি গড়ে ইতিহাসের পাতায় নাম উঠিয়েছেন স্মিথ। সেখানে অবশ্য তিনি কারও পেছনে নন, বরং সবার আগে। সাদা পোশাকে ১১৯ ইনিংসে তার সংগ্রহ ৬ হাজার ৪৮৫ রান। সমানসংখ্যক ইনিংস খেলে এই সংস্করণে তার চেয়ে বেশি রান করতে পারেননি আর কেউ। স্মিথের আগে এই রেকর্ড ছিল ইংল্যান্ডের ওয়ালি হ্যামন্ডের (৬ হাজার ৪৪০ রান) দখলে।

টেস্টেও যে এত উদ্ভাবনী ফিল্ডিং সেট আপ করা যায়, সেটা এজবাস্টন টেস্ট না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। স্টিভ স্মিথের পায়ের ব্যবহার ও যুক্তির উর্ধে ওঠা সব শটে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে নানা রকম চেষ্টাই চলল। কিন্তু সেই স্মিথ আউট হলেন বড় সাদাসিধে উপায়ে। অফ স্টাম্পের বাইরে সুইং করা এক বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে। অনবদ্য এক ইনিংসের এই সাদাসিধে সমাপ্তির আগেই অবশ্য দুটি কাজ হয়ে গেছে স্মিথের। এক, অস্ট্রেলিয়াকে লড়াই করার পুঁজি এনে দিয়েছেন। দুই, টেস্ট ক্রিকেটের রহস্যময় এক তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার অর্ধেকের বেশি রানই এসেছে স্মিথের ব্যাট থেকে। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে ফেরার আগে ১৪৪ রান করেছিলেন স্মিথ। দ্বিতীয় ইনিংসে অতটা একা লড়তে হয়নি তাকে। ম্যাথু ওয়েডের আগে ট্র্যাভিস হেডও ভাল সঙ্গ দিয়েছেন। তাই যখন ১৪২ রানে আউট হয়েছেন, ততক্ষণেই প্রথম ইনিংসের চেয়ে ৪৭ রান বেশি করে ফেলে অস্ট্রেলিয়া। সেটাও ৫ উইকেট হাতে রেখেই। শেষ পর্যন্ত ৪৮৭/৭ ডিক্লে:। দলকে বড় রানের লিড এনে দিয়ে ফেরা স্মিথ এর আগেই করে ফেলেন চমৎকার কীর্তি।

ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ২৩৫৩টি টেস্ট খেলা হয়েছে। এর মাঝে কোন ব্যাটসম্যানকে দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করতে দেখা গেছে মাত্র ৮৫ বার। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, দুই ইনিংসেই ১৪০-উর্ধ ইনিংসে খেলতে পেরেছেন মাত্র চারজন ব্যাটসম্যান। স্মিথ হলেন এই তালিকার চতুর্থ সংযোজন। প্রথম টেস্টের ১০৩ বছর পর ১৯৮০ সালে এ্যালেন বোর্ডার সর্বপ্রথম এটা করে দেখিয়েছিলেন (১৫০* ও ১৫৩)। এরপর ২১ বছরের অপেক্ষা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এ্যান্ডি ফ্লাওয়ার প্রথম ইনিংসে ১৪২ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ছিলেন ১৯৯ রানে। এর পর ২০০৯ সালে বাংলাদেশকে দুঃস্বপ্ন উপহার দিয়েছিলেন তিলকরতেœ দিলশান (১৬২ ও ১৪৩)। আজ তাদের সঙ্গী হলেন স্মিথ। সিরিশ কাগজ নিয়ে প্রস্তুত ছিল বার্মি আর্মি। দুয়ো ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল গ্যালারি থেকেও। নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর টেস্টে প্রত্যাবর্তন হচ্ছে এ্যাশেজেই। সেখানে প্রথম দিন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করে আবেগে লাফ দেয়া স্টিভ স্মিথের কানে তালির সঙ্গে কিছুটা শ্লেষাত্মক বাণীও শুনতে হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরির পর যখন আরেকবার ব্যাট ওঠালেন স্মিথ, এবার অনেকটাই সৌম্য-শান্ত ভঙ্গিতে; তখন আর বিদ্রƒপ ছিল না ইংলিশ সমর্থকদের মুখে। তাদের চোখে মুখে তখন বিস্ময় আর অবিশ্বাস্য এক ব্যাটিং কীর্তি দেখার প্রশান্তি।

হবে নাই-বা কেন? অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহর ক্যারিয়ার কম লম্বা ছিল না। দুটি বিশ্বকাপজয় করেছেন, ১৯ বছরের ক্যারিয়ারের শেষ ১৫ বছর এ্যাশেজে হার কী সেটাই জানতেন না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে ৩৪ বছর জড়িয়ে থাকা সেই গ্রেট ওয়াহ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হচ্ছেন স্মিথের মতো কাউকে দেখেননি। স্টিভ ওয়াহর মতো ঠা-া মাথার এক ব্যক্তির আবেগে ভেসে কোন কিছু বলার সম্ভাবনা এতটাই কম যে কথাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতেই হচ্ছে! ২০০১ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডের মাটিতে এ্যাশেজ সিরিজ জেতা হচ্ছে না অস্ট্রেলিয়ার। দেড় যুগ পুরনো সে স্বাদ ফিরে পেতে প্রতিপক্ষের মাটিতে সর্বশেষ এ্যাশেজ জেতা অধিনায়কের শরণাপন্ন হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। স্টিভ ওয়াহকে দলের মেন্টর হিসেবে ডেকে আনা হয়েছে। সে দায়িত্ব পালন করার ফাঁকেই ওয়াহ ম্যাচের চতুর্থ দিন মধ্যাহ্ন বিরতিতে কথা বলেন চ্যানেল নাইনের সঙ্গে। তখনও এজবাস্টন টেস্টের নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি পাননি স্মিথ, অপরাজিত ছিলেন ৯৮ রানে। তাতেও ওয়াহর স্তুতিতে কম পড়েনি, ‘আমি ওর মতো কাউকে দেখেনি। সে যেভাবে প্রস্তুতি নেয়, সেটা অসাধারণ। সে আগে থেকেই সব ভেবে রাখে। আমার দেখা যে কারও চেয়ে বেশিবার বলে ব্যাট চালায়। সে যখন ব্যাট করতে নামে তখন অনেকটা ঘোরের মধ্যে থাকে।’

স্মিথের প্রশংসায় এখানেই থামেননি ওয়াহ। মাত্র পঞ্চম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে এ্যাশেজে টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি পেয়েছেন স্মিথ। ১৯৯৭ সালে সর্বশেষ ইংল্যান্ডের মাটিতে এ কীর্তি করা ওয়াহ স্মিথকে বিশ্বের অন্য সব ব্যাটসম্যানের চেয়ে আলাদা চোখে দেখতে শুরু করেছেন, ‘সে জানে সে কী করবে। সে জানে প্রতিপক্ষ কী করবে, তাকে কীভাবে আউট করার চেষ্টা করবে। ওকে দেখে মনে হয়, সব উত্তর ওর জানা। সে অসাধারণ এক খেলোয়াড়। আমার মনে হয় না এমন কাউকে আমি দেখেছি এবং রানের জন্য ওর যে ক্ষুধা এটা কারও নেই। ওর টেকনিক দুর্দান্ত, অনন্য। সে জানে কী করছে এবং কীভাবে রান করতে হয়। সে প্রত্যেকটা বল বিশ্লেষণ করে। সে অনেকটা কম্পিউটারের মতো, প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দেয়।’ স্মিথের ১৪৪ ও ১৪২ রানের সুবাদেই ২৫১ রানের বড় জয় দিয়ে এ্যাশেজ শুরু করে অস্ট্রেলিয়া। অথচ প্রথম দিন ১২২ রান তুলতে ৮ উইকেট হারিয়ে বসেছিল দলটি। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইকেল ভনের টুইট, ‘আমি যত দিন ধরে খেলেছি এবং খেলা দেখেছি, তাতে আমার দেখা সেরা টেস্ট ব্যাটসম্যান হলো স্টিভ স্মিথ। এই লোক একটা জিনিয়াস!’

এই মাত্রা পাওয়া