১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাশিয়া এখন চীনের জুনিয়র পার্টনার

  • এনামুল হক

বিশ্ব রাজনীতিতে এ হলো এক ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র বার বার তাদের পার্টনার বদলে করেছে। জোসেফ স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর চীন-সোভিয়েত চুক্তি ভেস্তে যায়। পরবর্তীকালে রিচার্ড নিক্সন ১৯৭২ সালে চীন সফরে যান। ত্রিশ বছর আগে চীনের সঙ্গে তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিথাইল গরবাচেভ দাঁতাত করেন। আজ দু’দেশের প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে যে বন্ধুত্বের জুটি গড়ে উঠেছে ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পর তা সুদূর রূপ নেয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে দেশটি ত্রিভুজ প্রেম থেকে ছিটকে পড়েছে তাকে একটা মূল্য দিতে হয়েছে। দেশটি সামরিক শক্তির প্রসার ঘটাতে বাধ্য হয়েছে।

কিন্তু এবারের কাহিনীটা ভিন্ন। এবার ত্রিভুজ প্রেম থেকে আমেরিকা নিজেই সরে পড়েছে। ফলে মূল্যটা প্রধানত রাশিয়ার ঘাড়েই এসে পড়ছে। চীন দু’দেশের অংশীদারিত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। ক্রয়ক্ষমতার অনুপাতের বিচারে এর অর্থনীতি রাশিয়ার তুলনায় ৬ গুণ বড় এবং এর ক্ষমতাও ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যদিকে রাশিয়ার ক্ষমতা ও শক্তি ক্রমশ ম্লান হয়ে পড়ছে। পাশ্চাত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং রাশিয়ার প্রভাব প্রতিপত্তিকে বড় করে দেখানোর যে অসাধারণ কৌশল পুতিনে বলে ব্যাহত দেখা গিয়েছিল সেটা একটা ফাঁদে হয়েছে যা থেকে তার দেশের পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন থাকে। সমান অংশীদার হওয়া তো দূরের কথা রাশিয়া এখন একটা শাখা নদীর মতো হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কথাটা রূঢ় মনে হতে পারে। রাশিয়া এখনও একটা পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ যার পরমাণু বোঝার সংখ্যা বিশ্বের সর্বাধিক। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এর স্থায়ী আসন আছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ঘটানো হয়েছে এবং এই বাহিনীকে ব্যবহার করতে সে সে দ্বিধাগ্রস্ত নয় তা ক্রিমিয়া ও সিরিয়ায় দেখা গেছে। সম্প্রতি রাশিয়া ও চীনের যুদ্ধবিমান প্রথমবারের মতো যৌথ বিমান টহলে অংশ নেয় যা অন্যদের মনে উদ্বেগের কারণ ঘটায়। দক্ষিণ কোরিয়া অভিযোগ করে যে রাশিয়ার একটি বিমান তার আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করেছে।

কিন্তু প্রকৃত খবরটা হলো কত দ্রুত রাশিয়া তার এই বৃহৎ প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। চীন রাশিয়ার কাঁচামালের এক গুরুত্বপূর্ণ বাজার। রাশিয়ার জাতীয় তেল কোম্পানি রোসনেফট্্ চীনের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল এবং ক্রমবর্ধমান হারে তার তেল চীনে স্থানান্তর করছে। রাশিয়া যেখানে ডলারের আধিপত্য এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে সেখানে চৈনিক মুদ্রা ইউয়ান তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বৃহত্তর অংশে পরিণত হচ্ছে। ২০১৮ সালে তার এই রিজার্ভের বৃহত্তর অংশে পরিণত হচ্ছে। ২০১৮ সালে তার এই রিজার্ভে ডলারের ভাগ অর্ধেক হ্রাস পেয়ে ২৩ শতাংশ দাঁড়ায়। অন্যদিকে ইউয়ানের ভাগ ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে। চীন রাশিয়ার উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থার অপরিহার্য উপদানগুলো সরবরাহ করে। নিজ জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পুতিনের যে নেটওয়ার্কিং ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম দরকার তার উৎস হলো চীন। কিছুদিন আগে রাশিয়া চীনের টেলিকম ফার্ম হুয়াওয়ের সঙ্গে ৫জি সরঞ্জাম উৎপাদনের একটি চুক্তি করে। এভাবে রাশিয়া চীনের স্পিøন্টারনেটের অর্ধেকের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সুতরাং চীন এখন এক চমৎকার অবস্থানে। নিজের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত নিরাপদ করার জন্য চীন রাশিয়ার সঙ্গে স্থায়ী বন্ধুত্ব চায়। তা ছাড়া সার্বজনীন মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পশ্চিমী ধ্যান-ধারণা বানচাল করার জন্য চীন যে প্রচারাভিযানও চালাচ্ছে তাতে রাশিয়া উৎসাহী অগ্রসেনার ভূমিকা পালন করছে। পুতিন অবশ্য চীনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের পক্ষ বেশকিছু যুক্তি দিতে পারেন। তার একটি হচ্ছে বিভিন্ন কারণে রাশিয়ার ওপর পাশ্চাত্যের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা। চীন সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমকে ছাত্রছায়াও যুগিয়ে ছিল। পুতিন আরও যুক্তি দিতে পারেন যে ভবিষ্যতটা এখন চীন ও তার রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার হাতে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুই দেশ এখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকা বেশি। রাশিয়া চীনের রফতানি বাজারগুলোর মধ্যে দশম। এদিক দিয়ে তার অবস্থান ফিলিপিন্সের ওপরে তবে ভারতের বেশ নিচে। অন্যদিকে চীন হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি বাজার। অন্য যে কোন দেশের তুলনায় চীন অধিক পরিমাণে রাশিয়ার তেল কিনে থাকে। চীনের প্রতি পুতিনের ভূমিকার কারণে রাশিয়া প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে তার এই প্রতিবেশীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাই তাজিকিস্তানে চীনের সামরিক উপস্থিতিকে রাশিয়া মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। স্ট্যালিনের যুগে চীন ছিল রাশিয়ার জুনিয়র পার্টনার। আর আজ শি জিনপিংয়ের আমলে রাশিয়াই চীনের জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়েছে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

এই মাত্রা পাওয়া