১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডেঙ্গুতে অরক্ষিত জেলা উপজেলা শহরসহ গ্রামাঞ্চল

ডেঙ্গুতে অরক্ষিত জেলা উপজেলা শহরসহ গ্রামাঞ্চল
  • সারাদেশে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ১৬২৬

স্টাফ রিপোর্টার ॥ গ্রামে যাওয়া রাজধানীবাসী ফিরে আসার পরও গ্রামাঞ্চলে নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের হার কমছে না। দেড় সপ্তাহ ধরে ঢাকার বাইরে শনাক্তকৃত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে রাজধানীর মতো গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গুর প্রকোপ স্থায়ী রূপ নেয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধের বড় বড় কর্মসূচী রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় জেলা ও উপজেলা এলাকা অবহেলিত হয়ে আছে। এতদিন রাজধানী থেকে ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে জেলা ও উপজেলায় ডেঙ্গু রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু রাজধানীবাসী ফিরে আসার পরও ঢাকার বাইরে রাজধানীর তুলনায় বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। রাজধানীতে অবস্থান করে গ্রামে যাওয়া লোকজনই নন, গ্রামাঞ্চলের লোকজনেরাও স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অনেকটা অরক্ষিত রয়ে গেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারী পরিসংখ্যানে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ জনে। বেসরকারী হিসাবে এই সংখ্যা অনেক আগেই ১শ’ ছাড়িয়ে গেছে। বুধবারও বরিশাল একজনের মৃত্যু হয়েছে। আর নেত্রকোনাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১৬২৬ জন। তাদের মধ্যে ঢাকা শহরে আক্রান্ত ৭১১ জন এবং ঢাকার বাইরে আক্রান্ত ৯১৫ জন। অনেক আগেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু রোগী। গত ১৫-২০ আগস্টের চিত্র দেখলেও ঢাকার বাইরে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি। ১৫ আগস্ট ঢাকায় ৮১৫ জন ও ঢাকার বাইরে ১১১৮ জন, ১৬ আগস্ট ঢাকায় ৭৬১ ও বাইরে ৯৬০ জন, ১৭ আগস্ট ঢাকায় ৬২১ ও বাইরে ৮৩৯ জন, ১৮ আগস্ট ৭৩৪ ও বাইরে ৯৭২ জন, ১৯ আগস্ট ঢাকায় ৭৫৭ ও বাইরে ৮৫৮ জন এবং ২০ আগস্ট ঢাকায় ৭৫০ জন ও বাইরে ৮২২ জন।

সূত্রটি আরও জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা শহর ব্যতীত ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলায় ২৯৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি জেলায় ৫২ জন, চট্টগ্রামের ১১টি জেলায় ১১৮ জন, খুলনা বিভাগের ১০টি জেলায় ১৭৫ জন, রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলায় ৬৭ জন, রংপুর বিভাগের ৮টি জেলায় ৪০ জন, বরিশালের ৬টি জেলায় ১২৭ জন এবং সিলেট বিভাগের ৪টি জেলায় ১১ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে।

আর বর্তমানে ঢাকা শহর ব্যতীত ঢাকা বিভাগে ৭১৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১২ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৬৬ জন, খুলনা বিভাগে ৫৯৮ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৮৪ জন, রংপুর বিভাগে ১৫৪ জন, বরিশাল বিভাগে ৩৪৯ জন এবং সিলেট বিভাগে ৪০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, সারাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম প্রসারিত করেছে সরকার। দেশের প্রতিটি সরকারী হাসপাতালে ডেঙ্গু শনাক্তের উপকরণ প্রেরণ করা হয়েছে। ডেঙ্গু শনাক্তকরণসহ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা দিতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে দেশবাসীকে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে সরকারী নানা কর্মসূচী অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

এদিকে, রাজধানীসহ বিভাগীয় শহর ব্যতীত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এডিস মশা নিধন কার্যক্রম একেবারেই নেই। ডেঙ্গু শনাক্তের ব্যবস্থা সীমিত পরিসরে থাকলেও জটিল ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। স্থানীয়ভাবেও অনেক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব ক’টি বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু রোগী। রাজধানীতে আক্রান্তদের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় এডিস মশা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বাহক দু’ প্রকার এডিস মশার মধ্যে ‘এডিস এজিপ্টি’ শহরে এবং ‘এডিস এ্যালবোপিকটাস’ গ্রামাঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়াতে পারে ‘এডিস এ্যালবোপিকটাস’ মশা। এ বিষয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডাঃ এ এস এম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকার বাইরেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ডেঙ্গু মশা দু’ধরনের হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলে ছড়ানোর আরেকটি কারণ হলো, ডেঙ্গু বাহক ‘এডিস এজিপ্টি’ মশা যেমন নাগরিক মশা, শহরের মশা। এ ধরনের মশা শহুরে এলাকায় মানুষের বাড়ি-ঘরে থাকে। ডেঙ্গুর আরেকটি বাহক ‘এডিস এ্যালবোপিকটাস’ থাকে গ্রামাঞ্চলে। এই এডিস এ্যালবোপিকটাস যদি কোন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে কামড় দেয় তাহলে এই মশাটিও ডেঙ্গু ছড়াতে পারে। তাই গ্রামে যারা যাচ্ছে তারা গিয়ে সেখানে যে মশার কামড় খাচ্ছে তাতে করে ডেঙ্গু ছড়াতে পারে। ফলে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তারলাভের সুযোগ রয়ে যাচ্ছে। আর গ্রামাঞ্চলে স্থানীয়ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে ডেঙ্গু পরিস্থিতির ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাবে।

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল থেকে জানান, জেলার গৌরনদী উপজেলার পিঙ্গলাকাঠী গ্রামে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চার সন্তানের জননী গৃহবধূ নাছিমা বেগম (৩৭) মারা গেছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেয়ার পথে মঙ্গলবার রাতে তিনি মারা যান। নাছিমা বেগম পিঙ্গলাকাঠীর মোল্লারখালপাড় নামক এলাকার আবুল হোসেন মোল্লার স্ত্রী।

নিজস্ব সংবাদদাতা, নেত্রকোনা থেকে জানান, অবশেষে নেত্রকোনাতেও এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত হয়েছে। বুধবার দুপুরে জেলা শহরের হোসেনপুর এলাকার একটি জায়গায় পরিত্যক্ত গাড়ির টায়ারে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করেন জেলা স্বাস্থ্যবিভাগের সহকারী কীটতত্ত্ববিদ মঞ্জুরুল হক।

জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার কামালের নেতৃত্বে স্বাস্থ্যবিভাগ ও পৌরসভার একটি যৌথ টিম বুধবার শহরের বিভিন্ন এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং মশার লার্ভা শনাক্তকরণ অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় ঢাকা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হোসেনপুর এলাকার জনৈক রুকন উদ্দিনের বাড়ির সামনে কয়েকটি পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানি পরীক্ষা করে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তখন রুকন উদ্দিনকে এক হাজার টাকা জরিমানা করেন। এছাড়া পৌরসভার পরিচ্ছন্নকর্মীরা টায়ারগুলো পুড়িয়ে ফেলেন। সিভিল সার্জন ডাঃ তাজুল ইসলাম জানান, জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৮৩ জন রোগীকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এরা প্রত্যেকে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে এসেছেন। এছাড়া জেলার দু’জন বাসিন্দা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট থেকে জানান, বাগেরহাটে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় নতুন করে আরও ১০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ নিয়ে গত ২৭ জুলাই থেকে বুধবার পর্যন্ত বাগেরহাটে সরকারী হিসেবে ১১২ জন ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে বেসরকারী হিসেবে এ সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাগেরহাট সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশুসহ ২৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। বাগেরহাটে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সব শ্রেণীপেশার মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। জোহোরা বেগম জানান, তার স্বামী শাহ্ আলম (৩১) একজন ভ্যানচালক। তিনি কখনো বাগেরহাটের বাইরে যাননি। গত ৫ দিন আগে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বোলপুর গ্রামের মিনু ডাকুয়া জানান, তার ছেলে হৃদয় কুমার ডাকুয়া (২১) ছাত্র। গত ৩ দিন আগে সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডাঃ জিকেএম শামসুজ্জামান জানান, বাগেরহাটে আরও ১০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১২ জনে। বর্তমানে বাগেরহাট সদর হাসপাতাল এবং বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশুসহ ২৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে। অন্যরা চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। আক্রান্তদের অধিকাংশই ঢাকা ফেরত বলে তিনি উল্লেখ করে বলেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে, উদ্বেগের কোন কারণ নেই।

নিজস্ব সংবাদদাতা, কেরানীগঞ্জ থেকে জানান, কেরানীগঞ্জ উপজেলার সর্বত্র এখন মশার রাজত্ব। কেরানীগঞ্জবাসীর জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলেছে। এ মৌসুমেও কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৬০ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বুধবার আরও ১২ জন রোগী ডেঙ্গুর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

এই মাত্রা পাওয়া