১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চামড়া শিল্পের সঙ্কট

ঈদ-উল-আজহার পর কোরবানির পশুর চামড়া বিতরণ ও বিপণন নিয়ে এবার যা হয়েছে, তা ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সকল রেকর্ড। এ যেন চামড়ার খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী তথা আড়তদারদের সঙ্গে ট্যানারি মালিক সমিতির রীতিমতো রশি টানাটানি অথবা তেলেসমাতি কা-কারখানা। এবার প্রায় এক কোটি গবাদিপশু কোরবানি দেয়া হয়েছে বলে খবর আছে। এর বাইরেও রয়েছে ছাগল-ভেড়া-খাসি-উট-দুম্বা-মহিষ। ঈদের আগে সরকার তথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে চামড়ার দামও বেঁধে দিয়েছিল, যা ছিল গত বছরের মতোই। অথচ ইত্যবসরে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। শুধু বাড়েনি চামড়ার দাম। তাও নির্ধারিত মূল্যে চামড়ার বেচাকেনা হলে কথা ছিল। বাস্তবে তা তো হয়ইনি; উপরন্তু ২০-২৫ শতাংশ চামড়া ক্ষোভে-দুঃখে প্রায় ফেলে দেয়া এমনকি মাটিচাপা দেয়ার খবর পাওয়া গেছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে। এতিমদের হকদার বলে পরিচিত অনেক মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও এই কাজটি করতে বাধ্য হয়েছে আদৌ চামড়ার দাম না পেয়ে। বাস্তবে এ সময়ে এক রকম হাত গুটিয়ে বসে থেকেছে ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশন। চামড়ার দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় সরকার তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নেয় কাঁচা চামড়া রফতানির। তখন নড়েচড়ে বসে ট্যানারি মালিকরা। এ পর্যায়ে চামড়ার বাজার স্থিতিশীল রাখতে শিল্পমন্ত্রী এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে রবিবার জরুরী বৈঠকে বসে চামড়া ব্যবসায়ী আড়তদার এবং ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশন। সভায় চামড়া কেনাসহ আড়তদারদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। অবশেষে জোড়াতালি দিয়ে একটি নামকাওয়াস্তে সমঝোতা হলেও, সেটা কতটা ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ হবে তার প্রতিফলন ঘটবে আগামীতে। চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তারা আড়তদারদের পাওনা মেটানোর জন্য বৈঠকে বসবে ২২ আগস্ট, যার মধ্যস্থতা করবে এফবিসিসিআই। তবে বাস্তবতা হলো, ক্ষয়ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে ইতোমধ্যে। যার খেসারত হিসেবে চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে চামড়াজাত পণ্যের রফতানি আয় কমেছে আগের বছরের চেয়ে।

ট্যানারি মালিকদের মতে, গত কয়েক বছর ধরেই চামড়ার বাজারে মন্দা চলছে। বাস্তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম বেশি। কেননা, কৃত্রিম চামড়ার কারণে প্রকৃত চামড়াজাত পাদুকাসহ অন্যবিধ পণ্যদ্রব্য বর্তমানে বিলাসপণ্য হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বরাবরের মতো এবারও সক্রিয় ছিল চামড়া সিন্ডিকেট। তাদের দাবি ও চাপের মুখে তাই এবারও চামড়ার দাম বাড়ানো যায়নি।

কোরবানির পশুর চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে ঢাকার আড়তে আসে। আড়তদাররা এসব চামড়া কিনে সাভারের ট্যানারি শিল্প নগরীতে সরবরাহ করে থাকে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ঢাকার আড়তদার ও ট্যানারি মালিক এই তিন পক্ষের মধ্যে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়। ট্যানারি মালিকরা ব্যবসায়ীদের পাওনা পরিশোধ না করায় আড়তদারদের পুঁজির সঙ্কটে পড়তে হয়েছে। এ বছর লবণ সঙ্কটের কথা শোনা যায়নি। সংগ্রহের পর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ করতে না পারলে চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অনেক ব্যবসায়ীকেই বাধ্য হয়ে লোকসানে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে। দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয় তার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ আসে ঈদ-উল-আজহায়। চামড়ার দাম এবারও না বাড়ানোয় ট্যানারি মালিক এবং এই শিল্প খাতে সংশ্লিষ্টরা লাভবান হলেও এতিম, অসহায়, এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের স্বার্থে কোরবানির চামড়া নিয়ে অসাধু বাণিজ্য বন্ধ করা জরুরী। চামড়া শিল্পের সুরক্ষায় চারটি সরকারী ব্যাংক স্বল্প সুদে এবার ১৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নিশ্চয়ই এর সদ্ব্যবহার করবেন। চামড়ার বাজার উন্নত ও স্থিতিশীল রাখা জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই প্রয়োজন।

নির্বাচিত সংবাদ