২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ক্রিকেটারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চান ডোমিঙ্গো

ক্রিকেটারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চান ডোমিঙ্গো
  • গতকাল বুধবার থেকে টাইগারদের সঙ্গে পথ চলা শুরু নতুন কোচের

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ যে কোচই হন, একটি দলের দায়িত্ব নেয়া মানেই সেই দলকে ভাল একটি স্থানে নিতে চান। প্রধান কোচ হিসেবে তো দায়িত্ব আরও বেশি। সাফল্য না মিললেই বিদায়, তিরস্কার। আর সাফল্য মিললে চুক্তি নবায়ন। সঙ্গে প্রশংসা তো আছেই। সব কোচই চান সাফল্য। কিন্তু সবার আগে তো খেলোয়াড়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকতে হবে। যে খেলোয়াড়দের নিয়েই কোচের থাকে আসল কাজ। বাংলাদেশ দলের প্রধান কোচ রাসেল ডোমিঙ্গোও সাফল্য চান। এ জন্য তিনি সবার আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চান।

মঙ্গলবার ঢাকায় এসে বুধবার প্রস্তুতি ক্যাম্পে যোগ দেন। বাংলাদেশ দলের কোচ হিসেবে বাংলাদেশের মাটিতে নিজের প্রথমদিনটির শুরু ক্রিকেটারদের সঙ্গে পরিচয়পর্ব দিয়েই করেন। এরপর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মাটিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডোমিঙ্গো। এত সাংবাদিক দেখে হতভাগ হন ডোমিঙ্গো। তবে মুখের হাসি তার লেগেই থাকে। আপাতত দুই বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া ডোমিঙ্গো জানান তার প্রথম লক্ষ্যের কথা, ‘শুরুতেই আমার লক্ষ্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। খেলোয়াড়ের বিশ্বাস অর্জনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি আগামী দু’এক সপ্তাহ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করব। পর্যবেক্ষণটা হবে খেলোয়াড়রা আমার কাছ থেকে কেমন শিখতে পারছে।’

ক্রিকেটারদের সঙ্গে আগে সুসম্পর্ক তৈরি করেই তিনি দলকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। জানেন বাংলাদেশে কাজ করাটা চ্যালেঞ্জিং। সমর্থকদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সেই চ্যালেঞ্জ নিতে চান ডোমিঙ্গো, ‘বাংলাদেশে কাজ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। কোচ হিসেবে আপনি যদি জানেন আপনার দায়িত্ব কি, তবে কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। আমিও এটা উপভোগ করি। এদেশের ক্রিকেট নিয়ে সমর্থকদের প্রত্যাশা বেশি। আমার প্রধান কাজ এখন ক্রিকেটারদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক গড়ে তোলা। বাংলাদেশ কিন্তু খারাপ দল না। বিশ্বকাপে ভাল করেছে। ফলাফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ কিন্তু ইতিবাচক ক্রিকেট খেলেছে। সবসময় ফলাফল দিয়ে সবকিছু বিচার করা যায় না।’ বিশ্বকাপে অষ্টম হয়েছে বাংলাদেশ। এরপর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে। এ বিষয়গুলোকে বড় করে দেখতে চান না কোচ। সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথেই হাঁটতে চান, ‘আমি মনে করি না শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে হেরেছে বলেই বাংলাদেশ খুব বাজে দল। আমি শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের পারফর্মেন্স নিয়ে খুব বেশি পড়িনি। বিশ্বকাপে তারা কিন্তু সত্যিই খুব ভাল খেলেছে। কয়েকটি ম্যাচে জেতার খুব কাছে গিয়েও বাংলাদেশ হেরেছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তো ওই রান আউটটিই (মুশফিকের আউট) সর্বনাশ করেছে। এই দলটা বিশ্ব ক্রিকেটে শক্তিশালী দল হয়ে ওঠার খুব কাছেই রয়েছে।’ বাংলাদেশ দলকে যে বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তি বানাতে চান তা আগেই জানিয়েছেন। ডোমিঙ্গোর তত্ত্বাবধানে ২০১৪ টি২০ বিশ্বকাপ ও ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা সেমিফাইনালে খেলে। এমন অসাধারণ সাফল্য ঘেরা এ কোচ বাংলাদেশকে বিশ্বের সেরা শক্তিধর দলেও পরিণত করতে চান। তবে এ জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের যে আসল ক্রিকেটের স্বাদ বেশি বেশি করে নিতে হবে। টেস্ট ক্রিকেট বেশি বেশি করে খেলতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। তা স্পষ্টই জানিয়ে দেন ডোমিঙ্গো, ‘ভেবে দেখুন ছয় মাস (১৭ মাস) ধরে কোন টেস্ট ম্যাচ খেলেনি বাংলাদেশ। আসলে বাংলাদেশ টেস্ট খুব কম খেলে। শুনতেও খারাপ লাগে যে বাংলাদেশ বেশি টেস্ট খেলে না। এটাই উন্নতির পথে বড় বাধা। যত বেশি খেলবে ততবেশি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে। ততবেশি টেস্ট খেলার মানসিকতা গড়ে উঠবে। ভারত, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখেন তারা অনেক বেশি টেস্ট খেলে। তাই তারা কিন্তু টেস্ট দল হিসেবেও অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী। তাই টেস্টে ভাল করতে হলে বেশি বেশি ম্যাচ খেলার কোন বিকল্প নেই।’ সমানেই নবেম্বর থেকে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে নামবে বাংলাদেশ। টেস্ট খেলা কম হলেও এখন থেকে নিয়মিত টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ। এ নিয়ে ডোমিঙ্গো বলেন, ‘টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপটা বাংলাদেশের ভাল খেলা ও এগিয়ে যাওয়ার পথে অনেক বড় একটা পদক্ষেপ হতে পারে। আমি এর অপেক্ষায় রয়েছি।’ বাংলাদেশ দল ওয়ানডেতে এখন শক্তিশালী দল। তবে সেই সাফল্য যে টানা মিলে তা নয়। ঘাটতি আছে। ডোমিঙ্গো চান যে করেই হোক স্থায়ী সাফল্যের দিকে এগিয়ে যেতে। তিনি যে ২৫ বছর বয়স থেকেই কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করেছেন। বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় দলেও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তার এও জানা আছে কিভাবে সাফল্য পেতে হয়। ভাল ক্রিকেটার তুলে আনার বিকল্পও যে নেই, তাও জানান, ‘আমার কথা শোনার জন্য অনেকেই বেশ আগ্রহী মনে হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ে কোচিং করানোয় আমি জানি কিভাবে ভাল ক্রিকেটার তুলে আনতে হয়। আমি অনুর্ধ-১৫, অনুর্ধ-১৯, ঘরোয়া লীগের পরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোচিং করিয়েছি। কিভাবে খেলোয়াড় উঠে আসে এবং জাতীয় দলে কিভাবে ভাল খেলতে হয় এই প্রক্রিয়া আমি খুব ভাল জানি। জাতীয় দলে কিভাবে ভাল করার সুযোগ তৈরি করে দেয়া যায়, এই বিষয়ে আমি খুবই সচেতন। জাতীয় দলে খেলতে হলে তাদের কি করতে হবে আমি সেদিকেই জোর দেব।’ মাশরাফি বিন মর্তুজার সময় ফুরিয়ে এসেছে। এমনিতেই ওয়ানডে ছাড়া কিছু খেলেন না। সেটিও আর বেশিদিন খেলতে পারবেন না। অবসরে চলে যেতে হবে। সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহীম, তামিম ইকবাল, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ছাড়া তো দল একরকম অচলই বলা চলে। এ ক্রিকেটারদের বিকল্পই বের করা যাচ্ছে না। ডোমিঙ্গো বিকল্প তৈরি করে রাখতেই বেশি জোর দেবেন বলে জানান, ‘আমার অন্যতম একটা কাজ হবে, জাতীয় দলের জন্য ক্রিকেটার তৈরি করা। যাতে করে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সফলতা দীর্ঘমেয়াদী হয়।’ ডোমিঙ্গোর একটি দিক সবচেয়ে শক্তিশালী বলেই মনে হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের প্রধান কোচের পদে থাকুন আর নাই বা থাকুন, ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের জন্য দল গড়ে দিতে চান। নিজেই বলেছেন, ‘দু-তিন বছরের মধ্যেই বর্তমান দলের বেশ কিছু খেলোয়াড় থাকবে না। পাইপলাইন থেকে খেলোয়াড় তুলে এনে আগামী ছয়-সাত বছরের জন্য জাতীয় দল তৈরি করতে চাই। আর আমি থাকি বা না-ই থাকি, ২০২৩ সালের জন্য দল গড়ে দিয়ে যাব।’ বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে কাজ করবেন ডোমিঙ্গো। প্রতিনিয়তই তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের দেখবেন। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনেই প্রচুর সাংবাদিক দেখে ফেললেন। যা দেখে বলেও ফেললেন এত সাংবাদিক কখনই একসঙ্গে দেখেননি তিনি, ‘আমি জীবনে এত রিপোর্টার এক সঙ্গে দেখিনি। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার বড় কোন ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে বড়জোর আট-নয়জন রিপোর্টার থাকে। মঙ্গলবার বিমানবন্দরে মনে হয় ১০০ ক্যামেরা ছিল। এতেই বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে গেছি। এই যে বাংলাদেশের মানুষের ক্রিকেট নিয়ে এত আবেগ, এটাই হয়তো আমাকে এখানে আসতে অনুপ্রাণিত করেছে।’ ডোমিঙ্গো অনেকবারই বাংলাদেশে এসেছেন। ২০০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা অনুর্ধ-১৯ দলের হয়ে সর্বপ্রথম এসেছেন। প্রতিবার দক্ষিণ আফ্রিকার কোন না কোন দলের হয়ে আসলেও এবার বাংলাদেশের কোচ হয়ে এসেছেন। তিনি সব বদলে দেবেন, এমন চিন্তা করে আসেননি। তিনি মানিয়ে নিয়ে দেশের ক্রিকেটে উন্নতি ঘটাতে চান। বলেছেন, ‘এখানে পৃথিবী বদলে দিতে আসিনি। উপমহাদেশে সব সময়ই ক্রিকেট খেলা হয়। আমরা আশাকরি না বাংলাদেশ ক্রিকেট আমাদের সঙ্গে মানিয়ে নেবে। বরং আমাদের মানিয়ে নিতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে। প্রক্রিয়া তৈরির উপায় আমাদের বের করতে হবে। এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের মানিয়ে নিতে হবে।’ সামনেই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একমাত্র টেস্ট রয়েছে। এরপর ত্রিদেশীয় টি২০ সিরিজও রয়েছে। এ সিরিজের পর নবেম্বর পর্যন্ত কোন আন্তর্জাতিক খেলা নেই বাংলাদেশের। ডোমিঙ্গো ফাঁকা সময়গুলোতে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দলের খেলা দেখতে চান। সেখান থেকে ক্রিকেটার বের করে জাতীয় দলের জন্য প্রস্তুত করে রাখতে চান তিনি। পাইপলাইন শক্ত করার কাজে নামতে চান। এ জন্য বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফরেও যেতে চান ডোমিঙ্গো। তবে সর্বপ্রথম ক্রিকেটারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চান। এই কাজটি দ্রুত করা গেলে যে কাজ করতেও মহাসুবিধা হবে।