১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সেলিম আল দীন নাট্য শিল্পের অপরিহার্য অধ্যায়

  • জাহিদ রিপন

বাংলা অঞ্চলের রয়েছে সহস্র বছরের দীর্ঘ ঐতিহ্যময় এক সমৃদ্ধ নাট্য-ঐতিহ্য, আমরা এ কথা আজ গর্বভরেই উচ্চারণ করতে পারি। কেননা, ‘পঞ্চমবেদ’খ্যাত সম্ভাব্য খ্রিস্টপূর্ব প্রথম থেকে খ্রিস্টাব্দ প্রথম শতাব্দীর মধ্যে রচিত ‘ভরত নাট্যশাস্ত্র’, বাংলা সাহিত্যের প্রাপ্ত প্রাচীনতম নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ প্রভৃতি প্রাচীন-মধ্যযুগের নানা সুবিখ্যাত শাস্ত্রগ্রন্থ থেকে আমরা বর্ণিত মতের অনুকূলে নানা প্রামাণ্য উপস্থাপন করতে পারি অনায়াসেই। কিন্তু প্রায় দু’শ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসন এবং এ কারণে সৃষ্ট মানসিক দীনতা আমরা কিছুকাল পূর্বেও বিস্মৃত ছিলাম আমাদের স্বকীয় সংস্কৃতির নানা গর্বযোগ্য উত্তরাধিকার বিষয়ে। তখন উপনিবেশের অনিবার্য প্রভাবে আমাদের প্রায়-অমোচ্যবিশ^াস ছিল যে আমাদের নাট্যচর্চা পাশ্চাত্য বিশেষত ব্রিটিশ প্রভাবে সৃষ্ট শিল্প এবং বাংলায় স্থানীয় কিছু পরিবেশনাসদৃশ রীতি থাকলেও সেসব আসলে নাট্যপদবাচ্য নয়! এসব ধারণার বিপরীতে যাদের দূরদৃষ্টি ও আজীবন ঐকান্তিক প্রচেষ্টা-গবেষণায় আমাদের নাট্যসংস্কৃতির কাক্সিক্ষত মুক্তি সম্ভবপর হয়েছে, তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণতম নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন।

উপনিবেশ-উত্তরকালে বাংলার নিজস্ব নাট্যরীতি সম্পর্কে প্রথম কার্যকর সচেতনতা লক্ষ্য করা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে এবং এ কারণেই সমকালে প্রচলিত নাট্যধারার ব্যতিক্রম প্রাচ্যের স্বতন্ত্রবৈশিষ্টম-িত বেশ কিছু কালজয়ী নাটক

রচনায় সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। পাশ্চাত্য নাট্যরীতি সম্পর্কে তাই তার সুস্পষ্ট অনাস্থা প্রকাশসহ উপনিবেশ-উত্তরকালে বাংলা নাট্যরীতি সম্পর্কিত সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা প্রকাশ করেছেন তার ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রভৃতি প্রবন্ধে। এমনকি রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক এতদবিষয়ে উল্লেখযোগ্য বেশকিছু ব্যবহারিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে তার ‘শান্তিনিকেতন পর্ব’ নাট্যচর্চাকালে।

পরবর্তীতে আরও কেউ কেউ বাংলা নাট্যরীতি বিষয়ে কিছুটা অবদান রাখলেও আধুনিক গবেষকের সচেতনতায় দীর্ঘ অভিনিবেশ ও চর্চার মাধ্যমে ঐতিহ্য ও রবীন্দ্রনাথের ধারাবাহিকতায় বাংলা নাট্যকে সূত্রাবদ্ধ-শৃঙ্খলা দানসহ বলা যায় গগনবিস্তৃত উচ্চতায় পৌঁছে দিয়ে গেছেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। তিনি অনুধাবন করেন যে ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জনের সমান্তরালে মানসিক স্বাধীনতা অর্জনও অত্যাবশ্যক। সেলিম আল দীন পূর্বোল্লিখিত পাশ্চাত্য নাট্যরীতি উদ্ভূত নাট্যচর্চার সমকালে জন্মগ্রহণ করেও দেশ-কাল-প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন সমকালীন এ নাট্যরীতির অসারতা এবং বাংলার নিজস্ব নাট্যরীতির গুরুত্ব পূর্ণমাত্রায় অনুধাবনে সক্ষম হলেন। নিরন্তর গবেষণার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন যে, বাঙালীর নাট্যসচেতনতা উপনিবেশের কারণে সম্প্রতিলব্ধ পাশ্চাত্যজ্ঞান নয় বরং তা সহ¯্র বছরের ব্যবহরিক-তাত্ত্বিকচর্চার ধারাবাহিকতা

এবং তা বাঙালীর দেশ-কাল-যুগরুচি ও নিজস্ব নন্দনভাবনার আধারে বিকশিত। পাশাপাশি গ্রাম থিয়েটার তথা অনুরূপ প্রয়াসের মাধ্যমে মাঠপর্যায় থেকে অস্তিমান নিজস্ব ধারার নাট্য-উপকরণসমূহ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নাট্যকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রচলন, প্রাচীন-মধ্যযুগের বাংলা নাট্যরীতির ধারাসমূহ চিহ্নিতকরণ, বাংলার প্রথম নাট্যকোষগ্রন্থ রচনা, বাঙালীর শিল্প ধারায় উপনিবেশ-উত্তর নিজস্ব অসামান্য নাট্যসাহিত্য রচনার পদ্ধতি ও প্রয়োগকৌশল উদ্ঘাটন প্রভৃতির মাধ্যমে জাতীয় নাট্য-আঙ্গিক নির্মাণের সকল সহৃদয় প্রস্তুতি সম্পন্ন এবং এর যাত্রাপথ নির্দেশ করে

গেছেন। শুধৃ তাই নয় বাঙালির চিরায়ত দর্শন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’-র আধুনিক প্রয়োগের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে বাঙালির সমগ্রশিল্পের এক অনিবার্য আধুনিক পরিকল্পনাপথে জাতিকে সম্মুখ অগ্রসরমাণতায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াস পেয়েছেন এ জাতশিল্পী। আশার কথা হচ্ছে যত দিন অতিবাহিত হচ্ছে নবীন প্রজন্মের মধ্যে আল দীনের দর্শন তথা বাংলা নাট্যরীতি সম্পর্কিত তাত্ত্বিক-ব্যবহারিক আগ্রহ ততটাই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে। শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয় বরং দূর দেশেও সেলিম আল দীন সম্পর্কিত আগ্রহের কিছু প্রমাণ আমার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করছে।