১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যাত্রীসেবার মান উন্নত করে বিমানের সুনাম বাড়াতে হবে

যাত্রীসেবার মান উন্নত করে বিমানের সুনাম বাড়াতে হবে
  • ড্রিমলাইনার গাঙচিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাত্রীসেবার মান উন্নত করার মাধ্যমে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সুনাম বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আমরা আশা করি, বিমানের সুনাম অক্ষুণœ রাখা, উত্তরোত্তর যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি করা এবং যে উড়োজাহাজগুলো আমরা এনে দিচ্ছি তার যথাযথ সংরক্ষণ করা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলের দায়িত্ব। এটা নিজস্ব সম্পদ, সে কথা মনে রেখে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে আপনাদের কাজ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হওয়া বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির আরও একটি ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ ‘গাঙচিল’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমান গাংচিল উদ্বোধন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ এই বিমান উদ্বোধনে এসেছি এই কারণে যে, আমার কেবলই মনে হয় একটু ভাল কাজ, যে কাজে আমার দেশের মানুষের কল্যাণ হবে, মানুষের মঙ্গল হবে, মানুষ স্বস্তি পাবে। সেই কাজটুকু করলে আমার বাবা-মায়ের আত্মা শান্তি পাবে এবং নিশ্চই তারা খুশি হবেন। জাতির পিতা বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার জন্যই আজীবন কষ্ট স্বীকার করে গেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বে দরবারে বাংলাদেশ যেন একটু সম্মান নিয়ে চলতে পারে। বাঙালী জাতি যেন একটি সম্মানীত জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেটাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।

এ সময় স্বাধীনতা অর্জনকালে বাংলাদেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বে প্রচলিত নেতিবাচক মনোভাবের প্রসঙ্গ স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, অনেকেই বলেছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে কি হবে, এদেশ কখনও উঠে দাঁড়াতে পারবে না। আর ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর সেই প্রচেষ্টাই নেয়া হয়েছিল। কাজেই ’৭৫ এর পর আমাদের জীবন থেকে মূল্যবান ২৯টি বছর হারিয়ে যায়, এটাই হলো দুর্ভাগ্যের কারণ। যারা ক্ষমতায় ছিল তারা দেশের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাস করত না। অথচ গত ১০ বছর এবং এর আগের ৫ বছরের আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই আমরা একটি উন্নত অবস্থানে নিতে সক্ষম হয়েছি।

তার সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য সকলের উন্নত-জীবনমানের নিশ্চয়তা বিধান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, একদম তৃণমূল পর্যায়ের মানুষকেও একটা সুন্দর জীবন যেন আমরা দিতে পারি সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং বিমানকে আরও উন্নত করার দিকে সরকারের দৃষ্টি রয়েছে। এ সময় সম্প্রসারণ, আধুনিকায়ন এবং নতুন নতুন বিমানবন্দর তৈরিতে তার সরকারের পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরেন তিনি।

১৯৯৬ সালে প্রথম সরকার গঠনের সময়ই তিনি সিলেট এবং চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজ নির্মাণসহ আধুনিকায়নের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার এখন কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরি করছে। যেটি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গন্তব্যের পথে পড়ায় সেসব গন্তেব্যের মধ্যে চলাচলকারী বিমানগুলো এখান থেকে রিফুয়েলিংয়ের সুযোগ পাবে এবং পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বালুময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের সৌন্দর্যও পর্যটকরা আরও বেশি করে উপভোগ করতে পারবে।

পর্যায়ক্রমে বিশ্বের অধিকাংশ গন্তব্যে যাত্রার জন্য বিমানের ফ্লাইট চালু সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ধাপে ধাপে বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিমান যেন যেতে পারে তার ব্যবস্থা আমরা করছি। বাইরে থেকে টাকা ধার না করে বিমান কেনার জন্য স্বাবলম্বী হওয়ার প্রতিও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, অতীতের মতো বিমান কেনার জন্য কারো মুখাপেক্ষী না থেকে, অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার না করে, নিজেদের ব্যাংকের টাকা ঋণ নিয়েই বিমান ক্রয় করব। তাই ধাপে ধাপে আমরা এগুচ্ছি। অর্থাৎ আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আত্মমর্যাদা নিয়ে চলতে চাই এবং দেশকে জাতির পিতার সোনার বাংলাদেশ হিসেবেই গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলাদেশ বিশ্বে মর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে চলবে। তিনি এজন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, জাতির পিতা আমাদের জন্য রক্ত দিয়ে গেছেন। তার রক্তঋণ আমাদের শোধ করতে হবে। তিনি বলেন, বিমান স্বাধীনতার প্রতীক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যখন যায় বিমানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে চিনবে, জানবে, সম্মান করতে পারবে। উড়োজাহাজগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ করতে হবে।

তিনি বলেন, আজকের উদ্বোধন করা ‘গাঙচিল’কে নিয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তিকৃত ১০টি বিমান ক্রয়ের মধ্যে ৯ নম্বর বিমানটি বহরে যুক্ত হলো। আর একটা এলেই ১০টি পূর্ণ হবে। অচিরেই উড়োজাহাজগুলো ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে চলাচল করবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমেরিকায় এখনও আমরা যেতে পারছি না, তবে, আশা করছি শীঘ্রই এই সমস্যার সমাধান হবে। আমাদের ড্রিমলাইনার সরাসরি ঢাকা থেকে জেএফকে (জনএফ কেনেডি এয়ারপোর্ট, নিউইয়র্ক) যাওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে। কাজেই আমরা প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। সেই সঙ্গে লন্ডনে বিমানের জন্য সøট যেন আরও বৃদ্ধি পায় এবং আরও কয়েকটি দেশে বিমান তার যাত্রীসেবা যেন বৃদ্ধি করতে পারে এবং যেতে পারে সরকার সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এয়ারক্রাফটের সংখ্যা বৃদ্ধিতে তার সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে সরকারপ্রধান বলেন, পরবর্তিতে আমাদের প্রয়োজন অনুসারে আমরা আরও বিমান ক্রয় করব। তবে, এর মাঝে আমি আরও চাচ্ছি দুটো কার্গো বিমান আমাদের নেয়ার জন্য। যাতে আমাদের আমদানি-রফতানি বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই দুটি কার্গো বিমান কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এটাও ঠিক আমাদের দেখতে হবে কোথা থেকে ভাল পাওয়া যায়, ভাল দামে পাওয়া যায়-সেটাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, জাতির পিতার আদর্শে পথ চলছি। তার সুফল জনগণ পাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতার শুরুতেই জাতির পিতাসহ ১৫ আগস্টের শহীদ, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং সম্ভ্রমহারা ২ লাখ মা-বোনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু তার সাড়ে ৩ বছরের শাসনামলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রতিষ্ঠান এবং ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলার সময়ই রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিমান সংস্থা গড়ে তোলেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে ৩ বছর সময় পান, তাতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই তিনি করে দিয়ে যান। বন্ধুপ্রতীম দেশগুলো থেকে সহায়তা নিয়ে আমাদের বিমান এয়ারলাইন্স তিনি চালু করে দিয়ে যান।

অনুষ্ঠানে দেশ ও জাতির উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মোঃ মাহবুব আলী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মুহিবুল হক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অবঃ) মোহাম্মদ ইনামুল বারী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ক্যাপ্টেন ফারহাত হাসান জামিল প্রমুখ। মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, তিনবাহিনী প্রধানগণ, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার এবং পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ মহিবুল হক বলেন, আগামী অক্টোবর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকেট পাওয়া যাবে মোবাইল এ্যাপে। মোবাইল এ্যাপ ব্যবহার করে বিশ্বের যে কোন প্রান্ত থেকে কেনা যাবে বিমানের টিকেট। এতে বিমানের টিকেট কাটা নিয়ে গ্রাহকদের আর ভোগান্তি পোহাতে হবে না।

ফিতা কেটে উদ্বোধন করেই প্রধানমন্ত্রী বিমানের তৃতীয় বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ‘গাঙচিল’ উড়োজাহাজটিতে আরোহণ করেন এবং ককপিটসহ বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং পাইলট ও ক্রুদের সঙ্গে কথা বলেন। বিকেল সাড়ে ৫টায় উদ্বোধনী ফ্লাইটে আবুধাবির উদ্দেশে আকাশে ডানা মেলে ‘গাঙচিল’। গত ২৫ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল থেকে দেশে আসে ‘গাঙচিল’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দে উড়োজাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে ‘গাঙচিল’। ‘গাঙচিল’ যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াল তিনটিতে।

২০০৮ সালে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার জন্য ২১০ কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর আগে এগুলোর মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, দু’টি নতুন বোয়িং ৭৩৭-৮০০ যুক্ত হয়েছে। বাকি চারটি ড্রিমলাইনারের ২০১৮ সালে বাংলাদেশ বিমানের বহরে আকাশবীণা ও হংসবলাকা যুক্ত হওয়ার পর গতকাল যুক্ত হলো ড্রিমলাইনার গাঙচিল। সর্বশেষ ড্রিমলাইনারটি আগামী সেপ্টেম্বর মাসে দেশে আসতে পারে। চতুর্থ ড্রিমলাইনারের নাম রাজহংস। ড্রিমলাইনার গাঙচিল একটানা ১৬ ঘণ্টা উড়তে পারে। এটিতে অন্যান্য উড়োজাহাজের তুলনায় ২০ শতাংশ কম জ্বালানি খরচ হয়। গাঙচিলের আসনসংখ্যা ২৭১। এর মধ্যে বিজনেস ক্লাস ২৪টি এবং ২৪৭টি ইকোনমি ক্লাস আসন রয়েছে। বিজনেস ক্লাসের ২৪টি আসন ১৮০ ডিগ্রী পর্যন্ত রিক্লাইন্ড সুবিধা এবং সম্পূর্ণ ফ্ল্যাটবেড হওয়ায় যাত্রীরা আরামদায়ক ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ভ্রমণ করতে পারবেন। অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৩ হাজার ফুট ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময়ও ওয়াইফাই সুবিধা নিতে পারবেন যাত্রীরা।

নির্বাচিত সংবাদ