১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শক্তিমান কথাসাহিত্যিকের বিদায়

  • লিটন মহন্ত

একটি লেখায় ভাষার ব্যবহার এবং সমসাময়িক শব্দ প্রয়োগ বলে দেয় সেটার ইতিহাস; ভাষার নানা মাত্রিক ব্যবহার ও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে তার রূপরেখা পাল্টে যেতে পারে, যা সেই লেখার লেখকের মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তেমনি এক লেখক ছিলেন সদ্য প্রয়াত রিজিয়া রহমান। তিনি লিখতে লিখতে উপন্যাস কিংবা গল্পের চরিত্রের সহযাত্রী হয়ে যেতেন, গড়ে তুলতেন কল্পনার ভেতর এক বাস্তবতা, যা লেখক কে করে তুলত ক্রমশ সংবেদনশীল। একটি চরিত্রের প্রতি গভীর থেকে গভীরতম সংবেদনশীল না হলে সেই লেখাটা আদতে পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে না। এমনিভাবে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ও ঘটনার অদ্বৈতরথে উঠে লেখক রিজিয়া রহমান আমাদের নিমগ্ন করেছেন বিভিন্ন অভিজ্ঞতার, যে অভিজ্ঞতা পাঠ পাঠক মাত্রই এক বিরল সম্ভাবনায় জারিত হয়েছে। তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রচুর দিয়েছেন আঞ্চলিক ভাষার ও চরিত্রের বয়ানের আদতে এক বর্ণিল সম্ভার; যা এই ভাষাকে দিয়েছে মর্যাদা ও প্রাচুর্যতা। তিনি তাঁর এক একটি উপন্যাসকে একটি ভাষার ভেতরের উপভাষা দিয়ে সজ্জিত করেছেন সুনিপুণভাবে। এখানেই রিজিয়া রহমান অনন্য এবং গদ্য লেখকদের পথপ্রদর্শক। তাঁর উপন্যাসে আমরা যেমন পাই সমাজের অসঙ্গতি ও ব্রাত্যজনের উপকথা তেমনি পাই মাটি ও ঘামের ঘ্রাণ। লেখার ভেতর দিয়ে সেই ঘামের গন্ধ, পতিতার চুলের গন্ধ, জারজ শিশুর ক্রন্দন, শোষণের হাহাকার, মানুষের মনের অনন্ত ভাবনা পাঠক মাত্রই আক্রান্ত হয়ে যায় অবলীলায় এবং চৈতন্যের সুতায় অজানা এক সূক্ষ্মটান অনুভব করে। রিজিয়া রহমান ১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসম্বর ভারতের কলকাতার ভবানীপুরে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল ‘জোনাকী’।

তাঁর বাবা আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিক ছিলেন একজন চিকিৎসক ও মা মরিয়ম বেগম ছিলেন একজন গৃহিণী। বাবার চাকরির কারণে তার শৈশব কেটেছে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর তিনি পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন। দেশের ফরিদপুরে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। তাঁর প্রিয় লেখক ছিলেন বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯৫০ সালে তিনি যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়েন তখন তার লেখা গল্প টারজান সত্যযুগ পত্রিকায় ছোটদের পাতায় ছাপা হয়। রিজিয়া রহমান ১৯৬৫ সালে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে ¯œাতক ডিগ্রী লাভ করেন এবং পরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। রিজিয়া রহমান সাহিত্য পত্রিকা ‘ত্রিভুজ’-এর সম্পাদক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় জাদুঘরের পরিচালনা বোর্ডের ট্রাস্টি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কার্য পরিচালক হিসেবে। তিনি বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শৈশব থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর কবিতা গল্প ছাপা হলেও প্রথম গল্পগ্রন্থ অগ্নিস্বাক্ষর ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়।

রিজিয়া রহমান ছেলেবেলায় স্বপ্ন দেখতেন কবি হবেন কবিতা লিখেছিলেন, তাঁর পরিচিতরা তাকে কবি বলে ডাকত। পরবর্তীতে তিনি কবিতা বাদ দিয়ে গদ্য সাহিত্য লিখতে শুরু করলেন। রিজিয়া রহমানের লেখায় সমাজ বাস্তবতা, সমাজের নিচু স্তরের মানুষের কথা, বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস ছিল প্রধান বিষয়বস্তু। তিনি নির্যাতিত নারীদের নিয়েও প্রচুর লিখেছেন। রিজিয়া রহমান যা দেখতেন, বিশ^াস করতেন এবং যা তাকে আকৃষ্ট করত তাই নিয়ে তিনি লিখতেন। তিনি জীবনে প্রচুর লিখেছেন, এই লেখালেখির জন্য তিনি এক সময় অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন এবং আটপৌরে ভাষায় কথা বলতেন। তিনি রান্না করতে পছন্দ করতেন এবং মানুষকে খাওয়াতেও পছন্দ করতেন। অতি সহজেই মানুষ কে তিনি আপন করে নিতে পারতেন। তিনি গল্প উপন্যাস লেখার সময় প্রতিটি চরিত্রের ভেতর ডুবে যেতেন, যেন চরিত্ররা তাকে ডমিনেট করত। তাঁর লেখনীর তীব্রতা এমনি ছিল যে, বাস্তব জীবনে তিনি সেই স্থানে না গিয়েও সেই চরিত্রের সঙ্গে মিশে যেতেন। রিজিয়া রহমান লেখার সময় একটা ঘোরের ভেতর থাকতেন এবং লেখাটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেই ঘোর থেকে বের হতেন না। তিনি কখন আরোপিত হয়ে লেখেননি, তাঁর লেখায় স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল লক্ষণীয়। লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল। রিজিয়া রহমান অনেক ছোট গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন, কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তিনি অধিক সমাদৃত। রিজিয়া রহমানের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো ঘর ভাঙ্গা ঘর (১৯৭৪), উত্তর পুরুষ (১৯৭৭), রক্তের অক্ষর (১৯৭৮), বং থেকে বাংলা (১৯৭৮), অরণ্যের কাছে (১৯৮০), শিলায় শিলায় আগুন (১৯৮০), ধবল জোছনা (১৯৮১), একাল চিরকাল (১৯৮৪), সবুজ পাহাড় (১৯৮৫), সীতা পাহাড়ে আগুন (২০১০) প্রভৃতি। তিনি গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি কবিতা, রম্যরচনা, আত্মজীবনী, অনুবাদ ও শিশুসাহিত্য রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থগুলো হলো আজব ঘড়ির দেশে, ঝিলিমিলি তারা, মতিশীলের বাড়ি ও অন্যান্য গল্প প্রভৃতি। তিনি কথাসাহিত্যের জন্য সারাজীবন বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। রিজিয়া রহমান ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে আসফ-উদ-দৌলা রেজা স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ লেখক সংঘ সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯০ সালে কমর মুশতারি সাহিত্য পদক, ১৯৯৫ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে একুশে পদক পান। তিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘর ভাঙ্গা ঘর থেকে সর্বশেষ উপন্যাস আবে রওয়াঁ পর্যন্ত ত্রিশটার বেশি গল্প-উপন্যাস গ্রন্থ রচনা করেছেন। রিজিয়া রহমানের অধিকাংশ গ্রন্থ পাঠক নন্দিত এবং বোদ্ধা পাঠকদের পড়ার টেবিলে সোভা পেয়েছে। প্রথম জীবনে কখন ভাবেননি সিরিয়াসলি লেখালেখিটাকে পেশা হিসেবে নেবেন, পরে নিজের ভেতরের শক্তিটা বুঝতে পেরে অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে ধ্যানীর মতো ডুবে গেলেন লেখালেখিতে। রিজিয়া রহমান সাহিত্য সাধনার ভেতর যে অলৌকিক আনন্দ-বেদনার জগত রয়েছে তার সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে নিজেই নিজেকে একটু একটু করে আবিষ্কার করেছেন এবং বাংলা সাহিত্যের বাঁক বদলে দিয়েছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘর ভাঙ্গা ঘর লিখেছেন কম বয়সে তখন তিনি এমএ ফাইনাল পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয় হলো নদী ভাঙ্গা বাস্তুহারা মানুষ, যারা অন্নের খোঁজে শহরে ছুটছেন এবং শহরে তৈরি হচ্ছিল বস্তি। ঘর ভাঙ্গার যে বেদনা যাঁরা বাস্তুহারা শুধুমাত্র তারাই জানে, এসব ছিন্নমূল মানুষের জীবন মানেই সংগ্রাম, যদিও প্রকৃত অর্থে প্রতিটি মানুষের জীবনে একটা করে সংগ্রাম থাকে, যা তাকে একাই লড়তে হয়; তবে সর্বহারাদের সংগ্রাম হলো মানুষের মৌলিক সংগ্রাম, এই নিরন্ন মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস উঠে এসেছে এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। এভাবেই বাংলা ধ্রুপদী সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে একজন রিজিয়া রহমানের। তাঁর অন্য একটি বিখ্যাত উপন্যাস হলো উত্তর পুরুষ যা তিনি প্রথম উপন্যাসটি ছাপা শেষ হতে না হতেই লিখে ফেলেন। এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি, পর্তুগিজ জলদস্যুদের উৎপাত আর প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্বগাথার ইতিহাস। রিজিয়া রহমানের অন্যতম বিখ্যাত একটি উপন্যাস হলো বং থেকে বাংলা, যেখানে তিনি বয়ান দিয়েছেন বাঙালীর জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তনের গল্প। তাঁর আর এক বিখ্যাত উপন্যাস হলো শিলায় শিলায় আগুন, যেখানে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের নিপীড়িত মানুষের স্বাধীনতার চেতনার কথা বলা হয়েছে। তিনি একাল চিরকাল উপন্যাসে ধারণ করেছেন সাঁওতাল জীবনের আনন্দ, বেদনা, বঞ্চনা ও শোষণের কথামালা। রিজিয়া রহমানের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম হলো রক্তের অক্ষর, এই আখ্যানের বহুমাত্রিকতা ছিল পতিতাপল্লীর মেয়ে মানুষের জীবনের আলো-অন্ধকার নিয়ে। এই উপন্যাস সম্পর্কে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন ‘সাধারণ একজন লেখকের প্রেরণা ভেতর থেকে যেভাবে আসে, তেমনি করেই এসেছিল। আমার ক্ষেত্রে যেটি মূল কারণ বলে মনে হয়েছে, তা হলো মানুষের প্রতি ভালবাসা ও মানবতার অবমাননায় ব্যথিত হওয়া এবং প্রতিবাদ করা। হয়ত সে কারণেই উপন্যাসটি লিখতে পেরেছিলাম। পরে যখন এই উপন্যাসটি নিয়ে মানুষের অনুভূতি ও প্রতিক্রিয়া জানতে পেরেছি, মনে হয়েছে, লেখাটি হয়ত ভাল হয়েছে। আমি যেটা করেছি বা আমার লেখার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, যখন যে কাজটি করেছি, সেই কাজের মধ্যে একাকার হয়ে যাওয়া। সে কারণেই হয়ত লেখাটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছে। আমি কেমন বা কোন সমাজের মানুষ, লেখার সময় সেটি মনে রাখতে চাই না। উপন্যাসের ঘটনা বা চরিত্রই আমার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে এবং তারাই তখন আমাকে ডমিনেট করে।’

রিজিয়া রহমানের প্রতিটি উপন্যাস ধরে ধরে বলতে গেলে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধের বই হয়ে যাবে। তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি চরিত্রই সাহিত্য সমালোচনার দাবিদার। এ কথা ধ্রুব সত্য যে, তিনি তাঁর ছোট গল্প এবং উপন্যাসের জন্য বাংলা সাহিত্যে চিরদিন উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন। এই নক্ষত্রের গত ১৬ আগস্টে মহাপ্রয়াণ ঘটে, তাঁর প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। রিজিয়া রহমান দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন, সেই তুলনায় শেষ বয়সে শারীরিক অসুস্থার কারণে লিখতে পারেননি কিন্তু সাহিত্যের জগতের সকল খোঁজখবর তিনি রাখতেন। সত্য যে, প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক রিজিয়া রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর অমর সৃষ্টি সব রয়ে গেছে, যাঁর মধ্যে দিয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। বর্তমান প্রজন্মের জন্য তাঁর এই মহামূল্যবান লেখনীগুলো এক একটা বাতিঘর হয়ে জ্বলে উঠুক এই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

নির্বাচিত সংবাদ