১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সত্যাগ্রহী নজরুল

  • শাহীনুর রেজা

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ৩/৪-সি তালতলা লেনের একটি দোতলা বাড়ির নিচ তলার দক্ষিণ-পূর্ব কোনের ঘরে এক রাতের মধ্যে বিদ্রোহী কবিতা রচনা করেন। কবিতাটির প্রথম শ্রোতা নজরুলের রাজনৈতিক সারথী মুজফ্ফর আহমদ স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে-

‘সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রির কোন সময়ে তা আমি জানি না। রাত দশটার পর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি, এমন সময় নজরুল বললো- সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে আমাকে পড়ে শোনালো। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা।... আমার মনে হয় নজরুল ইসলাম শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে কবিতাটি লিখেছিল।... এখন থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে নজরুল কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বার বার কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে হাত তাল রাখতে পারবে না, এই ভেবেই সম্ভবত কবিতাটি পেন্সিলে লিখেছিল।’

৬ জানুয়ারি ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ (২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) শুক্রবার ‘সাপ্তাহিক বিজলী’ পত্রিকায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রথম ছাপা হয়। সেদিন বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও কাগজের চাহিদা এত বেশি হয়েছিল যে, সেই সপ্তাহে কাগজ দু’বার ছাপা হয়েছিল এবং দু’বার বিজলী ঊনত্রিশ হাজার কপি ছাপা হয়েছিল।

‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হবার পর রাতারাতি কাজী নজরুল ইসলামের কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর নামের সঙ্গে ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধা যুক্ত হয়। অবশ্য সমসাময়িক রচনা ‘তোরা সব জয় ধ্বনি কর’, ‘শিকল পড়া ছল মোদের’, ‘জাতের নামে বজ্জাতি’, ‘চল্ চল্ চল্’, ‘দুর্গম গীরি কান্তার মরু’, ‘সাম্যবাদী’ (গুচ্ছ কবিতা)’ ইত্যাদি কবিতা ও গান নজরুলের ‘বিদ্রোহী কবি’ খ্যাতিকে আরও বলিষ্ঠ করে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হবার পর বছরের শেষের দিকে অর্থাৎ ২৩ নবেম্বর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে নিজ সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় একটি প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক কবিতা প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে নজরুল গ্রেফতার হন। প্রেসিডেন্সি জেল, আলীপুর সেন্ট্রাল জেল, হুগলী ডিস্ট্রিক জেল ও বহরমপুর ডিস্ট্রিক জেল মিলে নজরুল ১বছর ২২ দিন বন্দী ছিলেন। এই বন্দী জীবনে তাঁকে আমরা অন্য বিদ্রোহী হিসেবে দেখতে পাই।

হুগলী জেলে কারা কর্তৃপক্ষের একের পর এক অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে নজরুল অনশন শুরু করেন। অভিযোগ ছিলÑ বিশেষ শ্রেণীর কয়েদীর মর্যাদা থেকে অরাজনৈতিক বন্দীতে অবনমন, কিশোর স্বেচ্ছাসেবকদের হাত-কড়া লাগানো, পায়ে ডা-াবেড়ী দেওয়া, ইচ্ছা অনুযায়ী সাজার মেয়াদ বৃদ্ধি, নির্জন সেলে স্থানান্তর, অপর্যাপ্ত ও কদর্য খাদ্য সরবরাহ, অশ্রাব্য গালাগাল দেওয়া ইত্যাদি।

নজরুলকে ডা-াবেড়ী, হ্যান্ডক্যাপ, সেল কয়েদ, ফোর্স ফিডিংÑ সব কিছু করা হয়। নজরুল ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েন। কিন্তু অনশন ভঙ্গ করেন না। ১৪ এপ্রিল ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ (১ বৈশাখ ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) তারিখ শনিবার নজরুল অনশন শুরু করে ভঙ্গ করেন ২২ মে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ (৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩০ বঙ্গাব্দ) তারিখ মঙ্গলবার। প্রথম ও শেষের দিন বাদ দিলে তিনি অনশন করেন ১ মাস ৮দিন অর্থাৎ ৩৮ দিন।

জেল জীবনে জেলারের কর্কশ কণ্ঠকে অবজ্ঞা করে মি. থার্সটনকে ডাকা হতো ‘হার্সটোন’ বলে। নজরুল এই জেল সুপারকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে’ গানটির সুরে প্যারডি লেখেনÑ

তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে তুমি ধন্য ধন্য হে

আমার এ গান তোমারই ধ্যান তুমি ধন্য ধন্য হে

জেলে এক জেলার নজরুলকে ‘কুত্তার বাচ্চা’ বলে চিৎকার করে গালি দিলে নজরুলও তৎক্ষণাৎ ঐ ভাষাই ব্যবহার করেন।

এ ঘটনার ঠিক এক বছর পরের কথা, মে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে হুগলীতে সত্যগ্রহ (সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আগ্রহ ) আন্দোলন দানা বাঁধে। নজরুল তখন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রমীলাকে বিয়ে করে (২৫ এপ্রিল ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ) হুগলীতে মোগলপুরার গলিতে সংসার সাজাতে ব্যস্ত। এ অবস্থায় তিনি চিত্তরঞ্জন দাশ ও সুভাষ বসু পরিচালিত সত্যগ্রহ আন্দোলনে যোগ দেন।

মূলত সত্যাগ্রহ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন ‘বীরদলে’র (স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ দিয়ে উদ্বুদ্ধ স্বেচ্ছাসেবী তরুণের দল) নেতা স্বামী বিশ্বানন্দ এবং স্বামী সচ্চিদানন্দ। এরপরে প্রাদেশিক কংগ্রেসের তরফ থেকে সুভাষ চন্দ্র বসু, শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং চিত্তরঞ্জন দাশ ‘বীরদল’কে সমর্থন দান করেন।

আমরা জানি প্রায় ৩০০ বছর আগে হুগলীর হরিপালের রামনগর-রাজরাজা ভারামল্ল স্বয়ং তারকেশ্বর সেবার জন্য এক হাজার তেইশ বিঘে জমি অর্পণ করেছিলেন। শর্ত ছিল তারকেশ্বরের মোহন্ত (তারকেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত মোহন্ত নামে পরিচিত) দশনামা সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারী রূপে দেবসেবা করবেন। মোহন্ত মারা গেলে তাঁর শিষ্যই পরবর্তী মোহন্ত রূপে অভিষিক্ত হবেন। এটাই ছিল প্রথা। অথচ পরবর্তীকালে দেখা গেছে মোহন্তদের অনেকেই অবিবাহিত থাকবার শর্ত লঙ্ঘন করে অন্য নারীর সঙ্গে অবৈধ সংসর্গে জীবন কাটাতেন। রাজার দরিদ্র প্রজাগণ প্রথম থেকেই এতে কষ্ট পেতেন। স্বামী বিশ্বানন্দ ১৯২৪ সালে প্রথম এ জাতীয় অনৈতিক ঘৃন্য কর্মের প্রতিবাদে সন্ন্যাসী হয়েও প্রকাশ্যে ফেটে পড়েন। ফলে তিনি শ্রীমন্ত ও তার দলবল দ্বারা প্রহৃত হন। সে সময় শ্রীমন্ত গিরি তাঁর ধর্মকর্মে সাহায্যের জন্য জনৈক দেহোপজীবীনিকে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই পতিতা জগন্নাথপুর নিবাসী রামসুন্দর নামে এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে গোপনে সংসর্গ বজায় রেখে অন্যায় সম্পর্ক পাতালে তা শ্রীমন্ত গিরি টের পেয়ে যান। তার অধীনস্থ সহায়িকাকে ভোগ করার অধিকার তিনি ছাড়তে অস্বীকৃত ছিলেন। ২ চৈত্র ১২৩০ বঙ্গাব্দ শনিবার শ্রীমন্ত অবশেষে গভীর রাতে রামসুন্দরকে হাতে-নাতে ধরে ফেলেন। বিশেষ অছিলায় সেই পতিতা রমণীকে তিনি পানিয় জল আনতে অন্যত্র পাঠান। তারপর সেই ব্রাহ্মণ রামসুন্দরকে বুকে চেপে মোহন্ত তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন। কিছুক্ষণ বেঁচে থাকার পর গুরুতর আহত সেই ব্রাহ্মণের মৃত্যু হয়। ১৬ চৈত্র ১২৩০ তারিখে ১৪ দিন পর মোহন্তকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিচারে অবশেষে মোহন্তের ফাঁসি হয়। মোহন্ত মাধবগীরিও এক মহিলার সতীত্ব নাশের অপরাধে কারাবরণ করেন।

তারকেশ্বরে তখন রাজা ভারামল্লের প্রদত্ত সম্পত্তি থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল বার্ষিক প্রায় দেড় লাখ টাকারও অধিক। ফলে তা আত্মস্থ ও দখল রাখার জন্য মোহন্তরা গু-া ও লেঠেল পুষতেন। সন্ন্যাসী ট্রেড ইউনিয়ন পিতা বিশ্বানন্দ এ ব্যাপারে প্রথম এগিয়ে আসেন। তাঁর দুর্বার আন্দোলনের ফলে ১৮২৪ সালে শ্রীমন্তগিরির ফাঁসি হয়। সেকালে ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় তার বিস্তৃত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল। একশ’ বছর পরেও সেই অনাচার ও নারী নির্যাতনের পালা শেষ না হওয়ায় স্বামী সচ্চিদানন্দ পুনরায় আন্দোলন শুরু করেন। প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলাম।

আন্দোলনের কর্মসূচী হিসেবে তারকেশ্বর দিবসে কলকাতার খিদিরপুর, হরিশ পার্ক, মির্জাপুর পার্ক, হ্যালিডে পার্ক, বিডন স্কয়ার, শ্যাম বাজার, নিউপার্ক ইত্যাদি এলাকায় সভা-সমাবেশ ও শোভাযাত্রা হয়। নজরুল বিভিন্ন সভায় গান পরিবেশন করেন। দেশব্যাপী আন্দোলনের ফলস্বরূপ সকল সত্যাগ্রহের শেষে তারকেশ্বরে পুরাতন নিয়মের বদলে ট্রাস্টি বোর্ড গঠিত হয় এবং তারকেশ্বরের যাবতীয় দায়িত্ব ও ক্ষমতা ট্রাস্টি সদস্যদের হাতে অর্পণ করা হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির মাধ্যমে একটি অনুসন্ধান কমিটি ( ওহয়ঁরৎু ঈড়সসরঃঃবব) গঠন করা হয়।

সত্যাগ্রহকালে তারকেশ্বরের মোহন্ত ছিলেন সতীশ গিরি। তার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন ধরানাথ ভট্টাচার্য ও বিশ্বানন্দ। নজরুল ইসলাম ছিলেন ধরানাথের আস্থাভাজন। তাঁর নির্দেশেই মূলত নজরুল চারণ কবি হিসেবে ‘মোহ-অন্তের গান’ শিরোনামে গান লিখে বিভিন্ন সভায় উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসেবে পরিবেশন করেন। গানটি হলোÑ

জাগো আজ দ--হাতে চ- বঙ্গবাসী।

ডুবালো পাপ-চ-াল তোদের বাঙলাদেশের কাশী জাগো বঙ্গবাসী।

মোহন্ত সতীশ গিরির লাঠিয়ালদের প্রধান সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় সহস্র লাঠিয়ালসহ এক সভায় আক্রমণের অপেক্ষায় সভা ঘিরে ছিল। তিনি স্বয়ং কাজী নজরুলের ৪৩ পঙক্তির এই গান শুনে বিহ্বল হয়ে কবিকে সেই গান পুনরায় গাইতে অনুরোধ করেন। অন্যান্য লাঠিয়ালরা এতে হতচকিত হয়ে সবাই লাঠি ফেলে দিয়ে সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথ অনুসরণ করে বিদ্রোহ করেন। তারা একত্রে মোহন্তের বিরুদ্ধে সত্যের স্বপক্ষে শপথ নেয়। আন্দোলনের মোড় এরপর ঘুরে যায়।

তারকেশ্বরে নজরুলের সঙ্গে যোগদানকারী অন্যান্য সত্যাগ্রহীদের মধ্যে ছিলেন নগেন্দ্রনাথ, স্বামী সচ্চিদানন্দ, শচীনন্দন, সৈনিক জীবনের বন্ধু মণিভূষণ মুখোপাধ্যায় (যিনি পরে মোক্ষানন্দগীরি নাম ধারণ করেন), মহিম দাস, প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় ও নজরুলের অন্যান্য বন্ধু। ছাত্রনেতা হিসেবে যোগ দেন গীষ্পতি ভট্টাচার্য ও চিত্তরঞ্জনের ছেলে নিরঞ্জন।

এরপর সতীশ গিরির বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়। কেড়ে নেওয়া হয় মোহন্তের হাত থেকে দেবোত্তর সম্পত্তির অধিকার। দশনামী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী প্রথা এখান থেকেই অপসারিত হয়। বদলে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেটের উপর নতুন মোহন্ত নির্বাচনের ভার বর্তায়।

অত্যাচারী স্বার্থপর লোভী ভোগী মোহন্ত অপসারণের মূলে সেদিন অন্যতম শক্তি ছিল কবি নজরুলের লেখা কবিতা ও গান (মোহ-অন্তের গান)। কবি সেদিন পথে পথে গান গেয়ে বঙ্গবাসীকে জাগাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। তিনি গেয়েছিলেনÑ

....তোরা পূজারীকে করিস্ পূজা পূজার ঠাকুর ছেড়ে।

র্মা অসুর শোধ্রা সে-ভুল, আদেশ দেন মা সর্বনাশী-

‘জয় তারকেশ্বর’ বলে র্পবি রে, নয় গলায় ফাঁসি।

জাগো বঙ্গবাসী।।

তারকেশ্বরের মোহন্তদের বিরুদ্ধে শত বর্ষের সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অনেক সত্যাগ্রহীর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম সত্যাগ্রহী হিসেবে।

নির্বাচিত সংবাদ