২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের নীতিতে কেন পরির্বতন আনতে চাইছে ভারত?

পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের নীতিতে কেন পরির্বতন আনতে চাইছে ভারত?

অনলাইন ডেস্ক ॥ পারমানবিক শক্তিধর দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারত বহু বছর যাবত একটি নীতি মেনে আসছে। আর তা হল, আক্রান্ত না হলে দেশটি নিজে থেকে কারো ওপর পারমানবিক হামলা চালাবে না।

কিন্তু ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে নীতি পুনরায় মূল্যায়নের সময় হয়েছে।

আরেক পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে যখন দেশটির সম্পর্কে রীতিমত উত্তেজনা চলছে, তখন ভারতের এমন ঘোষণায় দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা।

মি. সিং অগাস্টের পাঁচ তারিখে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ, যা কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয়, তা বিলোপ করার ঘোষণা দেবার পর এই মন্তব্য করেন।

কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর, কাশ্মীরের আরেক দাবিদার পাকিস্তান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

কী বলেছেন রাজনাথ সিং?

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি গণমাধ্যমে বলেছেন, ভারত এতদিন ঐ নীতি মেনে এসেছে।

ভবিষ্যতে 'উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপর' নির্ভর করবে এই নীতির বহাল থাকা বা না থাকা।

"ঐ নীতি চিরস্থায়ী কিছু নয়, এবং বড় কোন সংকটে পড়লে ভারত ঐ নীতিতে অটল থাকবে বিষয়টি তেমন নয়," তিনি বলেন।

মি. সিং পোখরানে বসে এ কথা বলেন। এর একটি তাৎপর্য হলো নব্বই এর দশকের শেষ দিকে পোখরানেই ভারত পরমাণু পরীক্ষা চালিয়েছিল।

একই কথা মি. সিং তার নিজের অফিসিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকেও পোষ্ট করেন এবং সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো থেকে একই বার্তা দিয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়।

এটাই ছিল ভারত সরকারের তরফ থেকে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ইঙ্গিত যে, ভারত হয়ত শীঘ্রই তার 'নো ফার্স্ট ইউজ ডকট্রিন' অর্থাৎ আক্রান্ত হবার আগে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে যাচ্ছে।

অর্থাৎ নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে দরকার মনে করলে ভারত নিজেই এখন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে।

'নো ফার্স্ট ইউজ ডকট্রিন' কী?

এটি লিখিত কোন চুক্তি বা নীতিমালা নয়।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্য এদের সবারই পরমাণু হামলা চালাবার অধিকার ছিল।

এক্ষেত্রে প্রথমে পরমাণু হামলা চালানোর পক্ষে দুইটি যুক্তি ছিল--

১. যদি কোন রাষ্ট্র প্রচলিত সামরিক শক্তি ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে হারতে বসার উপক্রম হয়, তাহলে প্রতিপক্ষকে হারানোর জন্য কৌশলগত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে, অথবা

২. কোন রাষ্ট্রের যদি আশংকা থাকে যে প্রতিপক্ষ তার ওপর পরমাণু হামলা চালাতে পারে, তাহলে নিজের নিরাপত্তার জন্য ঐ রাষ্ট্র আগে পরমাণু হামলা চালাতে পারবে।

১৯৯৮ সালে ভারত যখন প্রথম পারমানবিক পরীক্ষা চালায়, দেশটি তখন ঘোষণা দিয়েছিল, পরমাণু অস্ত্র কেবলমাত্র আক্রান্ত হলে জবাব দেবার কাজে ব্যবহার করা হবে।

ভারত বলেছিল, এর মাধ্যমে এ অঞ্চলে সংঘাত কমানো সম্ভব হবে।

১৯৬৪ সালে চীন যখন পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা চালায়, সেসময় তারা ঘোষণা দিয়েছিল কোন অবস্থাতেই চীন প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করে কারো ওপর হামলা চালাবে না।

দিও ভারত কখনোই চীনের ঐ ঘোষণায় বিশ্বাস করেনি।

বরং চীনের কারণেই ভারত নিজে পারমানবিক শক্তি অর্জনের প্রকল্প হাতে নিয়েছিল।

অন্য কোন দেশের আছে এ নীতি?

ভারত আর চীন ব্যতীত পৃথিবীর অন্য কোন দেশেরই 'নো ফার্স্ট ইউজ ডকট্রিন' নীতি নেই।

উত্তর কোরিয়া এক সময় এ কথা বলেছিল।

কিন্তু তার কথাও কেউ বিশ্বাস করেনি, কারণ তার পরমাণু শক্তি অর্জনের মূল কারণটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আক্রমণ ঠেকানো, ফলে সে আক্রান্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এমন বিশ্বাস কারোই ছিল না।

ভারত কেন নীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে চায়?

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারত যে নীতি মেনে চলছে, তা নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত বরাবরই ছিলো।

কিন্তু এবারের মত সরকারের কেউ আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সে কথা কথা বলেননি।

১৯৯৮ সালে 'নো ফার্স্ট ইউজ ডকট্রিন' ঘোষণার পর, ২০০৩ সালে ভারত সেটির কিছুটা সংস্কার বা পরিমার্জন করে।

যাতে বলা হয়, কেবল পারমানবিক হামলা নয়, কেমিক্যাল বা বায়োলজিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করে কেউ হামলা চালালেও ভারত পরমাণু হামলা চালাতে পারবে।

২০১৬ সালে ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকার প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, এই নীতির মাধ্যমে ভারত নিজেকে দুর্বল করে তুলছে কিনা।

যদিও সেই বক্তব্যকে তিনি নিজের ব্যক্তিগত মত বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কিন্তু মি. সিং ও পথে হাঁটেননি।

১৯৯৮ সালে ভারতের কেবলমাত্র কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপনাস্ত্র, সীমিত গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং আকাশ থেকে হামলা চালানোর মাঝারি মানের সামর্থ্য ছিল।

কিন্তু এখন ভারতের উচ্চতর ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপনাস্ত্র, মহাকাশে কয়েকটি স্যাটেলাইট, নানা মাপের ও সক্ষমতার ছোট বড় ক্ষেপণাস্ত্র যা দিয়ে অল্প দূরত্ব থেকে হামলা চালানো যায়, এমন সব অস্ত্রের বিপুল এক ভাণ্ডার রয়েছে।

তাছাড়া রাশিয়া ও ইসরায়েলের সাহায্য নিয়ে এমন এক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে ভারত যা প্রতিপক্ষ হামলা চালিয়ে সহজে ধ্বংস করতে পারবে না।

মি. সিং এর কথা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

'নো ফার্স্ট ইউজ ডকট্রিন' এর মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে ভারত নীতিগত দিক থেকে একটি উচ্চতর অবস্থানে থাকে।

এর মানে হচ্ছে, ভারতের আগে হামলা করার সামর্থ্য আছে, কিন্তু শান্তির জন্য সে তা করছে না।

কিন্তু এখন সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার বিষয়টির সমালোচনা করছেন দেশটির অনেক বিশ্লেষক।

অবসরপ্রাপ্ত লে: জেনারেল প্রকাশ মেননের যুক্তি হচ্ছে, এখন একটি দায়িত্বশীল পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে ভারতের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও এর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, "ভারতের পরমাণু অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এখন ফ্যাসিস্ট, বর্ণবাদী, হিন্দু আধিপত্যবাদী প্রধানমন্ত্রী মোদীর হাতে।"

তবে, পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার কোন মতবাদ বা বাকযুদ্ধের ওপর নির্ভর করেনা। বরং পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে পুরো বিষয়টি।

তবে এর মূল ঝুঁকি হচ্ছে, গত সপ্তাহেই পাকিস্তান কিছুটা গোপনেই জানিয়েছে যে তারা ভারতের কথা বিশ্বাস করেনা।

ফলে যেটা হতে পারে, তা হলো এখন পাকিস্তান আরো বেশি পরমাণু শক্তি বাড়ানোর দিকে নজর দেবে।

আর ভারতের সামনে তার পরীক্ষাও চালাবে। সেটাই হবে আসল ঝুঁকি।

এছাড়া যেকোনো সংকটে আগের চেয়ে দ্রুত পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের প্রশ্ন চলে আসতে পারে।

তাতে শান্তির জন্য পাকিস্তান কোন উদ্যোগ নেবার পরিবর্তে, বরং তারাও তখন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে চাইবে।

এখন দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা এবং সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝির কী পরিণাম হতে পারে, সেটা এখনি পরিষ্কার বোঝা না গেলেও যা বোঝা যাচ্ছে তা হলো, নিঃসন্দেহে এ অঞ্চলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা সামনের দিনে বাড়তে যাচ্ছে।

সূত্র- বিবিসি বাংলা