১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সেফ হোম থেকে নতুন জীবনে ১০ নারী

মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী ॥ ওরা ১০ জন। ছোট থেকেই তাদের ঠাঁই হয়েছিল রাজশাহীর সরকারী সেফ হোমে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। এখন তাদের বয়স কারও ২০ কারও ২৪ থেকে ২৫ বছর। সবাই বাকপ্রতিবন্ধী। কথা বলতে পারেন না। এদের মধ্যে দুজন সামান্য শুনতে পান। একটু কথাও বলতে পারেন। তবে তেমন বোঝা যায় না। কথা বলেন ইশারায়। নাম ঠিকানা ও পরিচয়হীন এই ১০ নারী বিভিন্ন সময় আদালতের মাধ্যমে ঠাঁই পেয়েছিলেন সেফ হোমে। কেউ ১৪ বছর, কেউ ৭ বছর আবার কেউ ৫ বছর ধরে সেফ হোমে রয়েছেন। সবার বাবা-মায়ের ঠিকানা অজ্ঞাত। তারাও বলতে পারেন না নিজেদের পরিচয়।

আদালতের মাধ্যমে এতদিন জীবন কেটেছে রাজশাহী মহানগরীর বায়া এলাকায় সরকারী সেফ হোমে। তবে সেই সেফ হোম থেকেই তারা পেলেন নতুন আরেক জীবন। এখন আর বন্দীদশা নয়, এখন থেকে কর্মব্যস্ত থাকবে তাদের জীবন। কারণ প্রথমবারের মতো সেফ হোম কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরির ব্যবস্থা করেছে।

এই ১০ নারী হলেন- মায়া সুলতানা, আসমা খাতুন, নাসরিন খাতুন, তারা, সালমা, তানিয়া, আলোকি, লতা, জাহানারা ও হাজেরা। এসব নামও তাদের সেফ হোম কর্তৃপক্ষের দেয়া। এই মায়া সুলতানারা এখন একটি পোশাক কারখানা ‘ইস্কয়ার গ্রুপের’ কর্মী। বন্দীজীবন ছেড়ে নতুন আলোর সন্ধানে সেফ হোমের ব্যবস্থাপক লাইজু রাজ্জাক তাদের চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আজ শনিবার তাদের নারায়নগঞ্জের পোশাক কারখানা ‘ইস্কয়ারে’ নিজে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন রাজশাহী সেফ হোমের উপ-তত্ত্বাবধায়ক লাইজু রাজ্জাক।

এর আগে অবশ্য চাকরির জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল ১৫ জনকে। এদের মধ্যে ১০ জন চাকরি করার উপযোগী হয়েছেন। এসব নারীকে সেফ হোম কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার বিকেলে আনুষ্ঠানিক বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছে। সবার হাতে মোমবাতির আলো জ্বালিয়ে আলোকিত পথের সন্ধান দিয়েছে সেফ হোম কর্তৃপক্ষ।

সে অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানের অতিথিদের অনেকেরই চোখ ভিজে ওঠে। বেসরকারী সংস্থা ‘ইউসেফ বাংলাদেশে’র পক্ষ থেকে এই মেয়েদের সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে ইতোমধ্যে। আর তাদের মাধ্যমেই ‘ইস্কয়ার গ্রুপ’ তাদের টেক্সটাইল ডিভিশনে এদের চাকরি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে অবস্থিত। অনুষ্ঠানে ইউসেফের প্রশিক্ষক রউফুল ইসলাম বলেন, তারা এই ধারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, কর্মজীবনে তারা অনেক ভাল করবেন।

রাজশাহী সেফ হোমের উপ-তত্ত্বাবধায়ক লাইজু রাজ্জাক শোনালেন কিভাবে তাদের চাকরির জোগাড় হলো। তিনি বলেন, একদিন ইউসেফ বাংলাদেশের রাজশাহী কার্যালয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখেন ‘চাকরির মেলা’ শিরোনামে একটি নোটিস ঝুলছে। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন তারা মেয়েদের সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করেন। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ কোটা রয়েছে। যেই কথা সেই কাজ। সেফ হোমে ১৫ জন মেয়ে প্রশিক্ষণ নিল।

এবার চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানে ‘ইস্কয়ার গ্রুপে’র লোকেরা এলেন। সেফ হোমেই পরীক্ষা হলো। পাস করল ১০ জন। সঙ্গে সঙ্গে নিয়োগপত্র। প্রথম অবস্থায় তারা মাসে ছয় হাজার টাকা করে বেতন পাবে। ভাল করলে পরের বছরই বেতন বেড়ে হবে ১২ হাজার। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা তারাই করবে। এ জন্য মাসে বেতন থেকে দুই হাজার টাকা কাটা যাবে।

সেফ হোমের উপ-তত্ত্বাবধায়ক জানালেন, আজ শনিবার তিনি এই মেয়েদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাবেন। নিজ হাতে তাদের ব্যাংক হিসাব নম্বর খুলে দিয়ে আসবেন। যাওয়ার আগেই তাদের জন্য নতুন জামা বানিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রত্যেকের জন্য একটি করে কম্বল, মশারি, এক জোড়া করে স্যান্ডেল ও একটি করে ব্যাগ কিনে দেয়া হয়েছে। এ যেন কনে বিদায়ের অনুষ্ঠান। উপ-তত্ত্বাবধায়ক লাইজু রাজ্জাক জানান, আজ তিনি নিজে সঙ্গে করেন তাদের নতুন ঠিকানায় (কর্মস্থলে) নিয়ে যাবেন। তারা অনেক ভাল করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সমাজসেবা অধিদফতরের রাজশাহী বিভাগীয় উপ-পরিচালক রাশেদুল কবীর বলেন, এটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। পরিবার হারা, বাবা-মায়ের সান্নিধ্য হারা মেয়েরা এখন নিজের পায়ে দাঁড়াবে। সেফ হোমের চার দেওয়ালের বাইরে গিয়ে পা রাখবে নতুন দিগন্তে। তিনি বলেন, যেন নিজের মেয়েদের বিদায় দিচ্ছেন। বললেন, হয়ত ঠিকমতো দেখাশোনা করতে পারিনি। মায়েরা, তোমরা আমাকে করে দিও। আর আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে নিজেদের জীবনকে আলোকিত কর।

নির্বাচিত সংবাদ