১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আরএমও হাজিরা দিয়ে চলে যান নোয়াখালী, রোগী দেখেন জুনিয়র

  • কুমিল্লায় স্বাস্থ্য সেবার হাল

মীর শাহ আলম, কুমিল্লা ॥ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার চিকিৎসকদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছে। কর্মস্থলে সকাল ৮টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা পদ্ধতিও চালু করেছে। এতেও অনেকে বিলম্বে কিংবা ইচ্ছামাফিক কর্মস্থলে যাওয়া-আসা করে হাজিরা দিয়ে কর্মস্থল থেকে বের হয়ে নিজ কাজে কিংবা প্রাইভেট প্র্যাকটিসে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া হাসপাতাল ক্যাম্পাসে আবাসিক ভবন থাকলেও চিকিৎসক থাকে শহরে। ফলে অনাকাক্সিক্ষতভাবে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে অধিকাংশ চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতি এবং রোগীদের দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে। সেখানে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) সকাল ৯টা ৩৫ মিনিট ৮ সেকেন্ডে ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে ব্যক্তিগত কাজে নোয়াখালীতে চলে যান। তখনও কোন চিকিৎসককে ওই হাসপাতালে দেখা যায়নি। তবে ওই সময়ে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে রোগী দেখছিলেন ওই উপজেলার সাহেবাবাদ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার আরিফুল ইসলাম। এসব বিষয়ে কুমিল্লার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ সাহাদাত হোসাইন বলেন, ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে কর্মস্থল থেকে চলে যাওয়া দায়িত্বহীনতার পরিচয় এবং এটি বিবেক বর্জিত কাজ।

কুমিল্লা জেলার উত্তর প্রান্তে এবং শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অবস্থিত। এ উপজেলায় আটটি ইউনিয়ন রয়েছে এবং উপজেলার জনসংখ্যা ৩ লক্ষাধিক। এ উপজেলার জনগণের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল এই সরকারী হাসপাতালটি। ওই হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র সরেজমিন দেখতে বৃহস্পতিবার ওই হাসপাতালে যাওয়ার পর চিকিৎসক ও অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতিসহ স্বাস্থ্যসেবায় নানা দুর্ভোগের কথা জানান রোগী ও তাদের স্বজনরা। তখন সকাল ৯টা। একনজর ঘুরে দেখা হলো হাসপাতাল ক্যাম্পাস। দুই তলা বিশিষ্ট ৫০ শয্যার ওই হাসপাতালের নিচতলায় জরুরী বিভাগে রোগী দেখছেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার আরিফুল ইসলাম। তিনি উপজেলার সাহেবাবাদ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কর্মরত বলে জানালেন। তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ মামুন খান হজে আছেন। আরএমও ডাঃ কামরুল হাসান ছুটিতে আছেন। জরুরী বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ শাহিদা আক্তারের পরিবর্তে আমি রোগী দেখছি। পাশের্^র দুইতলা ভবনে ডাক্তারদের ১, ২, ৩ ও ৪ নং কক্ষগুলোর দরজা খোলা। এসব কক্ষে ফ্যান ঘুরছে, আর লাইটের আলোও জ্বলছে। কথা হয় অফিস সহকারী সানি আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানালেন, স্যারেরা (ডাক্তার) এখনও আসেননি। তারা ১০টা থেকে ১১টার দিকে আসবেন। ভবনের ১১ নং কক্ষে কথা হয় রোগীদের টিকেট প্রদানকারী ভারপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, চিকিৎসক আসার পর আমি টিকেট দিয়ে থাকি। এদিকে সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে সাড়ে ৯টার দিকে তড়িঘড়ি করে ভবনের ৭ নং কক্ষের দরজা খুলছিলেন মিডওয়াইফ অঙ্কিতা তালুকদার পুজা। তিনি বলেন, ‘ম্যাডাম (ডাঃ তাছলিমা বেগম) সপ্তাহে রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার হাসপাতালে আসেন। বৃহস্পতিবার তিনি ১০টা-১১টার দিকে আসবেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কথা হয়, হাসপাতালের মা ও শিশু ওয়ার্ডের ৬৪ নং কক্ষের রোগী তানহার (২৩ মাস) বাবা ওই উপজেলার বাগরা গ্রামের কামরুল হোসেন, ৪৯ নং কক্ষে মহিলা ওয়ার্ডের রোগী তানহার (১০ মাস) বাবা দুলালপুর গ্রামের তাজুল ইসলাম, রোগী নুসরাত জাহানের (২ মাস) মা রামনগর গ্রামের শিরীন আক্তারের সঙ্গে। তারা জানান, বুধবার ডাক্তার রোগীদের দেখে গেছেন, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কোন ডাক্তার আসেননি। ২য় তলায় নার্সদের ৪৮ নং কক্ষে দায়িত্বরত নার্স শাহিনুর আক্তার জানান, স্যারেরা (ডাক্তার) বেলা ১১টায় রাউন্ড দিবেন, তখন সকল রোগী দেখা হবে। এ সময় তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায় মেডিক্যাল অফিসার ও ইপিআই-এর ৫ ও ৮ নং কক্ষ। এরই মধ্যে কুমিল্লা শহরের বাসা থেকে সকাল ৯টা ৫০ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে হাসপাতালে উপস্থিত হন জুনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ হাসিনা সুলতানা, ১০টা ১৮ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে উপস্থিত হন ডেন্টাল সার্জন ডাঃ খুরশিদা রহমান। তারা কুমিল্লা শহরে বসবাস করেন এবং শহর থেকে আসা-যাওয়া করে অফিস করেন বলে জানান। এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বে থাকা আরএমও ডাঃ কামরুল হাসানের অনুপস্থিত। তাই হাসপাতালের বিষয়ে তথ্য জানার জন্য প্রধান সহকারী কবির আহম্মেদের কক্ষে দীর্ঘক্ষণ বসে থেকেও তাকে পাওয়া যায়নি। এদিকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ওই হাসপাতালের চিকিৎসকদের ডিজিটাল হাজিরা অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালের ডাঃ কামরুল হাসান (আরএমও) ৯টা ৩৫ মিনিট ৮ সেকেন্ড, ডাঃ মোঃ এনামুল হক ৯টা ৫০ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড, ডাঃ শাহিদা আক্তার ১০টা ৩৯ মিনিট ২৩ সেকেন্ড, ডাঃ তাছলিমা বেগম ১০টা ৫৯ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড, ডাঃ মোহাম্মদ সোহেল রানা ১১টা ৩২ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে হাজিরা দিয়েছেন এবং ডাঃ জুনায়েদুর রহমান ছুটিতে আছেন। জানা যায়, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনী বিশেষজ্ঞ ডাঃ তাছলিমা বেগমের কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলা এলাকায় একটি হসপিটাল রয়েছে। এর নাম ‘তাছলিমা মেটার্নিটি এ্যান্ড ফার্টিলিটি কেয়ার সেন্টার’। নিজস্ব ওই হসপিটালে তিনি প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখেন। কিন্তু প্রাইভেট চেম্বারে রোগীদের জন্য তিনি যে চিকিৎসাপত্র/প্যাড ব্যবহার করেন এতে তার কর্মস্থল ‘কনসালটেন্ট, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল’ উল্লেখ রয়েছে- যা গর্হিত কাজ বলে মনে করেন রোগীদের অনেকে। বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে ব্রাহ্মণপাড়ার পাশর্^বর্তী উপজেলা বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ রত্না দাসকে পাওয়া না গেলেও হাসপাতালের আরএমও ডাঃ মনিরুল ইসলাম জানান, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ রত্না দাস অফিস থেকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে গেছেন।

এই মাত্রা পাওয়া