১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইউনাইটেড পাকিস্তান?

  • ২৫ আগস্ট, ১৯৭১;###;শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ২৫ আগস্ট দিনটি ছিল বুধবার। ক্যাপ্টেন দিদারুল আলমের নেতৃত্বে এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লার উত্তরে জামবাড়িতে পাকসেনাদের একটি কোম্পানিকে মর্টারের সাহায্যে আক্রমণ করে। এই আকস্মিক আক্রমণে পাকসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাবার চেষ্টা করে। এ্যামবুশ দল পলায়নপর পাকসেনাদের ওপর মর্টারের গুলিবর্ষণ করলে ৩০ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়। অবশিষ্ট পাকসেনারা পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর এ্যামবুশ দল কুমিল্লার সি এ্যান্ড বি সড়কে পাকবাহিনীর একটি ডজ গাড়ি এ্যামবুশ করে। এই এ্যামবুশে ডজ গাড়িটি ধ্বংস হয় এবং ডজের আরোহী একজন হাবিলদারসহ ৪ পাকসেনা বন্দী হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এ অভিযান থেকে ৬টি রাইফেল, ২২৫ রাউন্ড গুলি, ২টি পিস্তল ও ৩টি গ্রেনেড হস্তগত করে। সিলেটে কুকিতল সাব-সেক্টরের অসম সাহসী আতিকুল হক পনীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা দল পাকবাহিনীর দিলখুশার অগ্রবর্তী ক্যাম্পের ২শ’ গজ এলাকাজুড়ে এ্যামবুশ পাতে। ভোরে আজানের বেশ পড়ে পাকসেনারা একজন একজন করে বাঙ্কার থেকে বের হতে থাকে। এভাবে পাকসেনাদের কমান্ডার বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তিযোদ্ধা পনীরের গুলিতে তার বুক বিদীর্ণ হয়। মুহূর্তে গর্জে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের আগ্নেয়াস্ত্র। আধ মিনিট পর আবার সবকিছু স্তব্ধ। এই স্তব্ধতার সুযোগে আর একজন সৈন্য বাঙ্কার থেকে বের হলে সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর একঝাঁক গুলি নিক্ষিপ্ত হয়েই মুহূর্তে বিরতি। এভাবে মুক্তিবাহিনী থেমে থেমে আক্রমণ চালালে ছয় পাকসেনা নিহত হয়। ২নং সেক্টরে পাকবাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য ব্রাহ্মণপাড়া থেকে ধানদইল গ্রামের দিকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর একটি পেট্রোল পার্টি ধানদইল গ্রামে এ্যামবুশ পাতে। পাকসেনারা এ্যামবুশের মধ্যে এসে পড়লে মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে একজন ক্যাপ্টেনসহ ১০ পাকসেনা নিহত হয়। অপর পাকসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। মুক্তিফৌজের ২-৩ জন গেরিলা একজন মেজর ও দুইজন ক্যাপ্টেনকে (পাক গোলন্দাজ বাহিনীর) একটি জীপে করে আজিমপুরের নিকট এসে জীপ থেকে নেমে দূরে কোন এক বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখে। কিছুক্ষণ পর সে বাড়ি থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে আমাদের গেরিলারাও সেই বাড়িতে প্রবেশ করে। তারা বুঝতে পারে যে অফিসাররা ওই বাড়ির মহিলাদের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করছে। তৎক্ষণাৎ গেরিলারা অফিসারদেকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। গেরিলারা পাক অফিসারদের মৃতদেহ দূরে অপেক্ষমাণ পাক জীপের মধ্যে রেখে দেয় এবং নিরাপদে সে স্থান পরিত্যাগ করে। যশোরে বারিনগর ২৫ আগস্টে এক মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে ছয় রাজাকার নিহত হয় ও ২টি রাইফেল উদ্ধার হয়। আর তিনজন আহত হয়। অপর এক রাজাকার অবস্থানে আক্রমণে ১৪ জন আহত হয়। ১৫টি রাইফেল ও ৮ রাজাকার বন্দী করা হয়। পাক-পুলিশের একটি টহলদার দলকে মুক্তিফৌজের ধানম-ির গেরিলারা প্রতিদিন ধানম-ি সাত-মসজিদ রোড ও নিকটবর্তী রাস্তায় টহল দিতে দেখে। গেরিলারা সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ১৮নং রোডের মোড়ে একটি চলন্ত গাড়ি থেকে স্টেনগানের গুলি দ্বারা ৯জন পুলিশকে গুলি করে হত্যা করে। গুলির সংবাদ পেয়ে নিকটবর্তী টহলদার পাকসেনারা জীপ নিয়ে গেরিলাদের পিছু ধাওয়া করে। গেরিলারা গাড়ি থেকে গুলি ছুড়ে জীপের ড্রাইভারকে হত্যা করে। এ সময় দ্রুত গতিসম্পন্ন চলন্ত জীপটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাইরে চলে যায় এবং পার্শ্ববর্তী দেয়ালে প্রচ-ভাবে ধাক্কা খেয়ে বিধ্বস্ত হয়। এর ফলে গাড়ির আরোহী দুজন পাকসেনা নিহত এবং তিনজন আহত হয়। এই গেরিলাদের নেতৃত্বে ছিল রুমী। পাকসেনারা পরে রুমীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় এবং তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। শিবগঞ্জে অবস্থিত পাকবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করার উদ্দেশে বিনোদপুর থেকে ৫টি নৌকাযোগে ডাঃ মইন উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল শিবগঞ্জ অভিমুখে রওনা দেয়। সঙ্গে মোঃ ফাইজুর রহমানও ছিলেন। ভবানীপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে নৌকাযোগে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত স্রোতের কারণে নৌকা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একটি নৌকা আড়াআড়িভাবে পিঠালী গাছে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে যায় ও যোদ্ধারা অস্ত্রসহ ছিটকে পড়ে। পানিতে পড়া মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে এবং উদ্ধার করতে এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বন্যায় কুমিরাদহ বিলের থৈ থৈ পানিতে দিক নির্ণয় করা খুব কঠিন হয়ে যায় এবং দুর্লভপুর পৌঁছতে সকাল হয়ে যায়। শিবগঞ্জের ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি দলে বিভক্ত হয়, একদল তর্ত্তীপুর ঘাট থেকে ও অপর একটি দল কালুপুর উত্তরপাড়া জুম্মা মসজিদের পাশ দিয়ে সরাসরি ক্যাম্প আক্রমণ করার কথা এবং তৃতীয় দলটি ডাঃ মইন উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে দুর্লভপুর হাই স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে মরহুম সুবেদার আনেশুর রহমানের নেতৃত্বে ৬ইঞ্চি মর্টারসহ অন্য ভারি অস্ত্রের মাধ্যমে মূল ক্যাম্পে আক্রমণ পরিচালনা করে। এছাড়া ভোর হয়ে যাওয়ায় অন্য দুটি দলকে দূর থেকে আক্রমণ করতে হয়েছিল। ওই দুটি দলকে ফিরিয়ে আনার জন্যে ক্যাম্পের ওপর মর্টারিং করা হয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে এ আক্রমণ চালানো হয়। ওই দু’টি দল সরাসরি পাক বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ না করে কালুপুরে অবস্থানকারী রাজাকারদের ওপর আক্রমণ চালায়। পাকসেনা ও রাজাকারদের অনেক ক্ষয়-ক্ষতি করে মুক্তিযোদ্ধারা বিনোদপুর ফিরে যায়। রাত দুটায় পাকিস্তানী সৈন্যরা হাটহাজারী ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের বংশাল ঘাট, ফটিকছড়ি রোসাংগিরি ও ফরহাদাবাদ ঘেরাও করে। বংশাল ঘাট আর রোসাংগিরি ছিল মুক্তিযোদ্ধা আর নেতাকর্মীদের অভয়াশ্রম। বলা যায় মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনমেলা। কারও মনে কোন ভয়-ভীতি নেই। মনে হতো এটাই স্বাধীন বাংলাদেশ। গোপনে সংবাদ পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা একঘণ্টা আগে রাত ১টায় হালদা নদী হয়ে নৌকা করে দক্ষিণ দিকে চলে যায়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কোন মুক্তিযোদ্ধাকে না পেয়ে অনেক বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেয়। হত্যা করে রোসাংগিরি ইউনিয়নের নিরীহ যুবক আব্দুর রাজ্জাকসহ অপর এক ব্যক্তিকে। জামায়াতের প্রাদেশিক আমীর গোলাম আজম পেশোয়ারে বলেন, সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে। দৃষ্কৃতকারী ও অনুপ্রবেশকারীদের খতম করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের স্টিফেন ক্লাইভম্যান পরিবেশিত এক বিশেষ বিবরণে নিক্সন সরকারের অফিসিয়ালদের বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান রক্ষা করাই মার্কিন সরকারের নীতি।’ আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সদর দফতর থেকে প্রচারিত এক বুলেটিনে বলা হয় মুক্তিবাহিনী ২২ শে আগস্ট থেকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে তৎপরতা চালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য রাজাকার ও মুসলিম লীগ সমর্থকসহ ১৫০ জনকে হত্যা করেছেন। আহতদের মধ্যে পাক সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বহু অফিসাররাও আছেন। শুধু শ্রীহট্টের সিভিল হাসপাতালেই ১৫০ জন রাজাকারের চিকিৎসা করা হচ্ছে। এছাড়া মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা রেল লাইন ও সেতু উড়িয়ে দিয়েছেন। তারা গাড়ি ও বৈদ্যুতিক লাইন ধ্বংস ও টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে হাজার টন ওজনের ‘আল আব্বাস ‘ ও ১২৫০০ টনের আরেকটি জাহাজ ডুবানোর সংবাদ সমর্থিত হয়েছে। মালবাহী বড় বজরাকেও ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। যশোর পাক সৈন্যরা ঈগল বাহিনী নামে একটি নতুন বাহিনী গঠন করেছে। বর্ষা শেষে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণ চালানোর জন্য এই বাহিনী গঠন করা হয়েছে। রংপুরের রায়গঞ্জ এলাকায় ২২ আগস্ট গেরিলারা দুটি সেতু ধ্বংস করেছে। পরের দিন ভুরুঙ্গমারি ও বাগবান্দা এলাকায় পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। শ্রীহট্টে ১৯ আগস্ট মুক্তিবাহিনী জাফলং এলাকা থেকে পাকসেনাদের হটিয়ে দেন। সুনামগঞ্জ এলাকা থেকে আটার অস্ত্রসহ দুজন রাজাকার আটক করে। পাকসেনাদের যাতায়াত বিঘিœত করার জন্য জকিগঞ্জ এলাকায় কুশিয়ারা নদীর বাঁধটিকেও উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ঢাকার বৈদ্যেরবাজারে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী মাইন বিস্ফোরণে দুটি সামরিক জীপ ও একটি বেবিট্যাক্সি ধ্বংস হয়েছে। ১১ জন পাকসেনা ও ৩ জন রাজাকার খতম হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে সোমবার ৩ জন রাজাকার খতম হয়েছে ও দুটি রাইফেল উদ্ধার করা গেছে।

টাঙ্গাইল জেলায় কাকুয়ার কাছে ধলেশ্বরীতে মুক্তিবাহিনী ৪টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে। মুক্তিবাহিনী কুমিল্লার সালদা নদীতে পাক সৈন্যবাহিনী একটি মোটর লঞ্চ আক্রমণ করে ৮ খানসেনাকে খতম করেছে। নয়নপুর ও মওলা ভাগের অর্ধাংশ সম্প্রতি মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে। মউলাভাগ বাজারের পাক সৈন্য শিবিরও আক্রান্ত হয়েছে। মুক্ত এলাকা দখল করার জন্য পাকসেনারা ২৩ আগস্ট থেকে গ্রামে গোলাবর্ষণ করেছে। মুক্তিবাহিনীও পাল্টা আক্রমণ করেছেন। পাকসেনারা রঘুরামপুর, কাশীরামপুর, কুলাপাথর, চারউয়া, চাঁদখোলা, মন্দভাগ, কাইম্পুর, মনিপুর, কমলপুর, দাউশ, গিকরা, জৈকালি প্রভৃতি এলাকায় গোলাবর্ষণ করে জনসাধারণের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বহু লোক আহত হয়েছেন।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com

নির্বাচিত সংবাদ