১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোরবানির পশুর উচ্ছিষ্ট ॥ রফতানি বাণিজ্যে অমিত সম্ভাবনা

  • এসএম মুকুল

সচেতনতা কিংবা প্রচার না থাকায় গবাদি পশুর হাড়গোড়, খুর, শিং, লেজ কিংবা রক্ত শত কোটি টাকার সম্পদ উচ্ছিষ্ট হিসাবে স্থান হয় আবর্জনার ডাস্টবিনে। আমরা সাধারণত জানি কোরবানির পশুর উচ্ছিষ্ট বর্জ্য হলো পশুর হাড়, শিং, অ-কোষ, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রথলি, পাকস্থলী ও চর্বি। এসব কোন কাজে লাগে না বলেই আমরা এসব ফেলেই দিই। তাই গবাদি পশুর মাংস আর চামড়ার কদর আমাদের কাছে থাকলেও পশুর এসব উচ্ছিষ্টের কোনই মূল্য নেই অজ্ঞতার কারণে। কিন্তু এ সকল উচ্ছিষ্ট সামগ্রী বিক্রি করেই কোটি টাকা উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করছে অনেক মানুষ। ফেলে দেয়া পশুর উচ্ছিষ্ট বর্জ্য হিসাবে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির জন্য রয়েছে বাজারও। মাংস আর চামড়া ছাড়া বাকি সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রয়েছে অর্থমূল্য এমনকি বিপুল রফতানির সম্ভাবনাও। একবার ভাবুন তো আমরা উচ্ছিষ্ট হিসাবে গবাদি পশুর যেসব অংশ ফেলে দিই বিদেশীরা সেগুলো কিনে নেয় চড়া দামে। আমাদের ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্ট অংশই আনছে বিদেশী মুদ্রা। মূলকথা হলো- গরু বা খাসির সব অংশই মানুষের কোন না কোন কাজে লাগে। বিশ্লেষকদের মতে, কোরবানির পশুর উচ্ছিষ্টের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে দেশ শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের মতে, দেশের সব স্থানের জবাইকৃত পশুর উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করতে পারলে পরিবেশ দূষণ যেমন কমবে তেমনি আয় হবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। জানা গেছে, চামড়া বাণিজ্যের আড়ালে হাড়, প্রজনন অঙ্গ, চর্বি, শিং, দাঁত এমনকি রক্তও রফতানি পণ্য হিসেবে বাজারে এসেছে। রফতানি বাণিজ্যে পশুবর্জ্যরে বাজারের আকার এখন বেশ বড়। যার অর্থমূল্যে কয়েকশ’ কোটি টাকা। শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হাড়। হাজারীবাগেই এখন পশু প্রত্যঙ্গের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শতাধিক। পরিত্যক্ত পশুঅঙ্গ থেকে এখানে দেশী পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে সিরিশ কাগজ আর রঙে ব্যবহৃত গাম। হাড় ওষুধের ক্যাপসুলের কাভার, সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার হয়। দেশের সাবান শিল্পের চর্বির বড় যোগানদারও হাজারীবাগের কারখানাগুলো।

রফতানি বাণিজ্যে অমিত সম্ভাবনা

আমরা কজনই বা জানি, ঢাকার ট্যানারি থেকে চীন, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় রফতানি করা হয় এসব ফেলনা হাড়। হাজারীবাগের কিছু উদ্যোমী মানুষ ময়লার স্তূপ থেকে গবাদি পশুর এসব উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করে বিদেশে রফতানি করছেন। আবার বাংলাদেশের সিরামিক ও মেলামাইন তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো গুঁড়া ও দানা অবস্থায় কাঁচামাল হিসেবে হাড় পুনরায় আমদানি করে। এই হাড় বাণিজ্যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দূষণের হাত থেকে পরিবেশও রক্ষা হচ্ছে। দেশে ১ কোটি পশু কোরবানি হলে প্রতিটি গড়ে ১০ ডলার হিসেবে পাকস্থলি থেকেই অর্জিত হতে পারে প্রায় ১০ কোটি ডলার বা ৮ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি গরু থেকে গড়ে ২০ কেজি হাড় ও ৫ কেজি অন্য অঙ্গ পাওয়া যায়। দেখা গেছে, বছরে গরুর উচ্ছিষ্টই উৎপন্ন হয় প্রায় ২৫ কোটি কেজি। এসব অঙ্গের মাত্র ১০ শতাংশও রফতানি করা সম্ভব হয় না। রফতানিকারকরা মনে করেন পশুর বর্জ্য রফতানিতে সরকারের সহায়তা পেলে কয়েক হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। তথ্য-উপাত্তে জানা গেছে, পশুর পাকস্থলি একটু ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দিলেই এর দাম দাঁড়াবে ১০ থেকে ১২ ডলার। গবাদি পশুর লিঙ্গ থেকে রফতানি আয় হতে পারে পাঁচ কোটি ডলার। জার্মানি, ইতালিতে পশুর শিং এবং গরু, মহিষ, ভেড়া, খাসির অ-কোষের পাউডার জাপান, চীন ও কোরিয়া, মিয়ানমার ও হংকংয়ে রফতানি করা হয়। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকেও আসতে পারে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

হাড়ের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হচ্ছে ক্যাপসুল সেল

পশুর হাড় থেকে তৈরি হচ্ছে ক্যাপসুলের সেল, মুরগির খাবার ও জমির সার। ক্যাপসুলের সেল বা আভরনের ভেতরে থাকে ক্যাপসুলের ওষুধ। জানা গেছে, দেশে মোট প্রায় ২শ’টি ওষুধ কোম্পানিতে ক্যাপসুল সেলের প্রয়োজন হয়। বিদেশেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। অপসোনিন গ্লোবাল ক্যাপসুল সেল গুঁড়া করা হাড় কিনে জিলাটিন বানিয়ে তা থেকে তৈরি করে ক্যাপসুলের সেল। এসব কাজে প্রতি মাসেই প্রয়োজন হয় কয়েক শ’ টন পশুর হাড়। প্রতি ঈদে কোরবানির পশুর হাড় দিয়ে এ চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ পূরণ হয়। জানা গেছে, দেশীয় ওষুধ কোম্পানি ও হারবাল প্রতিষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য প্রতিমাসে ৪০ থেকে ৪৫ কোটি ক্যাপসুল সেলের চাহিদা রয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি ক্যাপসুল সেল বিদেশে রফতানি হচ্ছে। পাকিস্তান, আমেরিকা, ইউক্রেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, সৌদি আরবসহ ১৭টি দেশে রফতানি হচ্ছে ক্যাপসুল সেল।

কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয় ডাস্টবিনে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি প্রতিটি এলাকায় একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পশু কোরবানি করা হয় তাহলে এসব উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করা সহজ হয়। সচেতন হলে এ খাতে কোটি কোটি টাকা রফতানি আয় সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকার চাইলে এই শিল্পখাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদাশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। সংরক্ষণের আধুনিক সুবিধা আর সরকারের পক্ষ থেকে নীতি সহায়তা পেলে, অর্থের অঙ্কটা কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। ব্যবসায়ীদের দাবি, কোরবানির পশুর বর্জ্য রফতানি করেই হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। দরকার সরকারের সহায়তা। সাভার চামড়া শিল্প এলাকায় প্লট পেলে অপ্রচলিত পণ্যের তালিকায় শীর্ষ রফতানিকারক হতে পারবে বাংলাদেশ।

উপকরণের উৎস পশুর উ”িচ্ছষ্ট

পশুর কোন কিছুই ফেলনা নয়। ১২ ঘণ্টা চুলার আগুনে পশুর অপ্রচলিত চর্বি জ্বালিয়ে বের করা হয় তেল। কোরবানির পশু থেকে সংগ্রহ করা এসব কমার্শিয়াল ফ্যাট বিভিন্ন কল-কারখানার কাজে ব্যবহার করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পশুর অ-কোষ দিয়ে তৈরি সুসেড রুলসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার জাপান, কোরিয়া, চীন, জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় খাদ্য।

ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে প্রায় ১৫০টি ওষুধ কোম্পানি ও হারবাল প্রতিষ্ঠান। বেশ কিছু কোম্পানি গুঁড়া করা হাড় থেকে ক্যাপসুলের সেল তৈরি করে। বাংলাদেশ বোন এক্সপোর্টার অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেয়া গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার হাড়, শিং, অ-কোষ, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রথলি, চর্বি বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে শিল্প কারখানায়। পশুর হাড় দিয়ে- জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ক্যাপসুলের কভার, বোতাম, সিরামিক পণ্য, মেলামাইন, খেলনা, শোপিসসহ ঘর সাজানোর নানা উপকরণ, নাড়ি দিয়ে- অপারেশনের সুতা, রক্ত দিয়ে- পাখির খাদ্য, চর্বি দিয়ে- সাবান, পায়ের খুর দিয়ে বিভিন্ন প্রকার ক্লিপ ইত্যাদি উপকরণ তৈরি হয়। পিত্ত থলি দিয়ে তৈরি হয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। আন্তর্জাতিক বাজারে যার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। জাপান, চীন, কোরিয়া আর থাইল্যান্ডে উপাদেয় খাবার সুপ তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয় গবাদি পশুর লিঙ্গ। ৪ থেকে ৬ ডলারে বাংলাদেশ থেকে পশু লিঙ্গ কিনে নেয় এসব দেশ। এগুলোই বছরে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা রফতানি হয়। নাড়িকোষ দিয়ে তৈরি হয় জাপানের জনপ্রিয় খাবার সুসেড রুল। হাড়, খুর, দাঁত, শিং আর রক্ত দিয়ে তৈরি হয় ক্যাপসুলের কভার, জেলোটিন, ক্যামেরার ফিল্ম, সিরিজ কাগজ আর পশুপাখির খাবার। দেশেই ওষুধ কোম্পানি অপসোনিন তৈরি করছে ক্যাপসুলের কাভার। মাথার হাড় মেলামাইন তৈরিসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা হয়। পশুর শিং দিয়ে তৈরি হয় চিনাংনি, বোতাম, এক্স-রে ফিল্ম, ক্যামেরার ফিল্ম, ঘর সাজানোর শো-পিছ।

বিশাল বাণিজ্য কোরবানিকে ঘিরে

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির গবেষণা অনুযায়ী, কোরবানি ঈদে শুধু ঢাকা শহরেই উৎপাদিত হয় ৩৫ হাজার টন বর্জ্য। এসব উচ্ছিষ্ট শতভাগ রফতানিযোগ্য। এগুলো রফতানি করলে শত কোটি টাকা আয় করা সম্ভব শুধু কোরবানি ঈদকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যে জানা যায়, কোরবানির বর্জ্য দিয়ে উৎকৃষ্ট জৈব সার তৈরি করলে মাটির উর্বরতা বাড়াতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ বলছে, পশু ও মৎস্য খামারিরা প্রতি কেজি প্রোটিন ৭০ থেকে ৮০ টাকায় আমদানি করে। অথচ কোরবানিসহ পশুর উচ্ছিষ্ট ও বর্জ্য ব্যবহার করে প্রোটিন উৎপাদন করলে প্রতি কেজি প্রোটিন উৎপাদনে খরচ হবে ৩ থেকে ৪ টাকা। এভাবে পশু ও মৎস্য খাদ্যের প্রোটিন চাহিদা পূরণ হবে এবং সাশ্রয় হবে কোটি কোটি টাকা।

এই মাত্রা পাওয়া