২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাফল্য পেয়েও উদ্বিগ্ন ক্ষুদে দাবাড়ু খুশবু!

   সাফল্য পেয়েও উদ্বিগ্ন ক্ষুদে দাবাড়ু খুশবু!

স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ মায়াবী চেহারার বালিকাটির বয়স সাত। নাম ওয়ারসিয়া খুশবু। পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে। জগতের অনেক ভালো-মন্দ বুঝতে পারে না, জানে না অনেক কিছুই। তবে দাবা খেলাটা জানে-বোঝে দারুণভাবে। আরেকটি ব্যাপারও জেনে গেছে এই বয়সেই। সেটি হচ্ছে টেনশন! কেননা সে জেনে গেছে যতবারই বিদেশের মাটিতে তার খেলা থাকে, ততবারই তার বিদেশযাত্রার টাকা সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হয় তার বাবা মেহেদী কায়সারকে। একটি এনজিওতে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করে তার বাবা। চাকরির স্বল্প আয়ে তার বিদেশ সফরের খরচ জোগানো সম্ভব নয়। অনেক চেষ্টা করেও কোন পৃষ্ঠপোষকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন না। তখন বাধ্য হয়ে বন্ধু এবং পরিচিতদের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়। এভাবে অনেক টাকা ঋণ হয়ে গেছে। কিভাবে এই টাকা শোধ হবে, এই চিন্তায় পেয়ে বসে বাবার। তার চিন্তাক্লিষ্ট মুখ দেখে খুশবুও উপলব্ধি করে রূঢ় বাস্তবতা। একরাশ উদ্বেগ ছুঁয়ে যায় তাকেও। তারপরও সব ঝেড়ে ফেলে সে বিদেশে খেলতে যায় এবং প্রায় প্রতিবারই দেশের জন্য বয়ে আনে সাফল্য-সম্মান। এই যেমন ভারতের ভারতের নয়াদিল্লিতে ওয়েস্টার্ন এশিয়ান ইয়ুথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের র‌াপিড ইভেন্টে রানারআপ হয়ে রৌপ্যপদক লাভ করেছে সে। অনুর্ধ-৮ বালিকা বিভাগে ৭ খেলায় ৬ পয়েন্ট পেয়ে এ কৃতিত্ব দেখায় খুশবু। এই ইভেন্টে ছয় দেশের ২২ দাবাড়ু অংশ নেয়।

এই আসরেই খুশবুর পরের ইভেন্ট স্ট্যান্ডার্ড দাবা। শুক্রবার শুরু হওয়া এই ইভেন্টের প্রথম দুই রাউন্ডের দুটি খেলাতেই জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে আছে খুশবু। এই ইভেন্টের আরও ৭ রাউন্ডের খেলা বাকি আছে। খুশবু এই ইভেন্টে স্বর্ণপদক পেতে দেয়া চেয়েছে দেশবাসীর। এছাড়া এই আসরের ব্লিটজ দাবাতেও অংশ নেবে সে। এই প্রতিযোগিতায় ২৩ দাবাড়ুর মধ্যে তার রেটিংই সবচেয়ে বেশি (১৩৩৪)। এই টুর্নামেন্টের এন্ট্রি ফি ২০০ ডলার, যা খুশবুর হয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন। কিন্তু খুশবুকে ভারতে নিয়ে যেতে তার বাবা মেহেদী কায়সার কোন পৃষ্ঠপোষকের সাহায্য পাননি। বাংলাদেশের একটি সফটওয়্যার কোম্পানি বিট মাসকট প্রাইভেট লিমিটেড খুশবুর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা রক্ষা করেনি। ফলে খুশবুর বাবা বিপদে পড়ে যান। ফলে অনেক কষ্টে টাকা ৫০ হাজার টাকা বিমানভাড়া সংগ্রহ করে মেয়েকে নিয়ে বুধবার ঢাকা থেকে দিল্লী পৌঁছেন। এছাড়া হোটেলে থাকা, খাওয়া ও স্থানীয় যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচ তো আছেই।

এই টুর্নামেন্টে গত বছরও খুশবু খেলেছিল। সেবার উজবেকিস্তানে অনুষ্ঠেয় ওই আসরে একটি স্বর্ণপদক জিতেছিল খুশবু। খুশবু এই বয়সেই বাংলাদেশে যুব দাবা প্রতিযোগিতার অনুর্ধ-৮ (বালিকা) বিভাগের শীর্ষ দাবাড়। এ পর্যন্ত দেশী-বিদেশী সব ধরনের টুর্নামেন্ট মিলিয়ে ১১টিতে চ্যাম্পিয়ন, ৭টিতে রানারআপ এবং ১টিতে তাম্রপদক পেয়েছে। এর মধ্যে আছে পাঁচটি আন্তর্জাতিক শিরোপা।

খুশবুর সর্বশেষ সাফল্য গত জুনে উজবেকিস্তানের তাসখন্দে অনুষ্ঠিত এশিয়ান স্কুল দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের রাপিড এবং স্ট্যান্ডার্ড দাবা ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন ও ব্লিটজ দাবা ইভেন্টে রানারআপ হওয়া (প্রতিটি ইভেন্টই ছিল বালিকা অনুর্ধ-৭)।

দাবা খেলে দেশের পাশাপাশি যে স্কুলেরও মুখ উজ্জ্বল করেছে খুশবু, গত জুলাইয়ে ঢাকার মালিবাগে অবস্থিত সেই সাউথ পয়েন্ট স্কুল খুশবুকে ফুলেল সংবর্ধনা দেয়। সেখানে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ হামিদা আলী খুশবুকে বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। বিনা বেতনে পড়ার খরচ মওফুক করে দেয়াতে দারুণ উপকৃত হয়েছে খুশবুর পরিবার। কেননা এই ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের পড়ার খরচ অনেক। মাসিক বেতনই ছয় হাজার টাকা। ভর্তি হতেই লাগে ৪০ হাজার টাকা! সেই খরচটা বেঁচে গেলেও স্পন্সর না পাওয়াতে বিদেশ গিয়ে খেলা নিয়ে খুশবু ও তার পরিবারের টেনশনটা এখনও রয়েই গেল!