১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জলের রূপালী শস্য

ত্রিশের দশকের স্বনামখ্যাত কবি ও সাহিত্য সমালোচক বুদ্ধদেব বসু বাংলার ইলিশকে অভিহিত করেছেন ‘জলের রূপালী শস্য’ হিসেবে। ইলিশ নিয়ে তাঁর একাধিক কবিতা ও গল্প রয়েছে। তো সেই ইলিশের প্রাক-মৌসুম চলছে আগস্ট থেকেই। চলবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত। ইলিশের দ্বিতীয় মৌসুম চলে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত। তবে সর্বাধিক ইলিশ পাওয়া যায় চলতি মৌসুমে। ইলিশ ধরা ও বাজারজাত পর্যন্ত ব্যাপক সুসংবাদ দিয়েছেন চট্টগ্রাম-পটুয়াখালী-কক্সবাজার-বরগুনা, বরিশাল-চাঁদপুর মেঘনাসহ উপকূলীয় সংবাদদাতারা। জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে অতি সুস্বাদু ও সুন্দর ঝকঝকে রূপালী রঙের এই মাছটি। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সর্বত্র ছেয়ে গেছে ইলিশে ইলিশে। দামও সহনশীল। তদুপরি প্রায় কেজি পরিমাণের ইলিশের প্রাপ্তিও আশাব্যঞ্জক। দাম প্রতি কেজি ৮০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত। গত বছর প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা বন্ধের ইতিবাচক সুফল এটি। মৎস্য অধিদফতরের মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ টনের বেশি ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে, যা আগামীতে আরও বাড়বে।

ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিরদিনের জন্য স্থান পেয়েছে বাংলার ইলিশ। এর আগে ঠাঁই হয়েছে ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ির। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এই দুটো পণ্য, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের এক সুদূরপ্রসারী সাংস্কৃতিক অর্জন। প্যাটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেড মার্কস অধিদফতর সূত্রের খবর, জিওগ্রাফিক্যাল ইনডেক্স বা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ইলিশ মাছের নাম নিবন্ধন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও বিশ্ব মেধাস্বত্ব কর্তৃপক্ষের (ডব্লিউআইপিআরও) যৌথ সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় সব দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। তদনুসারে ইলিশ এখন বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য।

দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে, এটি একটি সুসংবাদ বটে। ২০০২-২০০৩ অর্থবছরে যেখানে ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার টন, সেখানে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ টনের বেশি। সরকার তথা মৎস্য অধিদফতরের নেয়া নানামুখী পদক্ষেপের ফলেই ইলিশের এই আশাতীত উৎপাদন বৃদ্ধি। তবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি এখনও কাক্সিক্ষত উৎপাদন নয়। তা না হওয়ার প্রধান কারণ কারেন্ট ও বেহুন্দি জাল দিয়ে জাটকা আহরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে না পারা। এ অবস্থায় ‘জাটকা ইলিশ ধরব না, দেশের ক্ষতি করব না’ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রতিবছর পালিত হয় ইলিশ রক্ষা সপ্তাহ। এর জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছে ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্প। এর মাধ্যমে সারাদেশে বিশেষ করে ইলিশ আহরণের স্থানগুলোতে সরেজমিন অভিযান চালিয়ে এসব জাল পুড়িয়ে দেয়া হয়। জেলেদের দেয়া হয় প্রণোদনা। ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে রোল মডেল। এমনকি মৎস্য উৎপাদনেও চতুর্থ স্থানের অধিকারী। তবে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ আহরণে অনেক পিছিয়ে আছে দেশ।

দেশে মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১১ ভাগই ইলিশ। উপকূলীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রায় পাঁচ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া ২০ থেকে ৯৫ লাখ লোক জড়িত পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রফতানি ইত্যাদির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কাজে। বাঙালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম একটি অপরিহার্য উপাদান হলো ইলিশ। এর যতœ ও সুরক্ষার দায়িত্ব সকলের।