১৯ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কিশোর গ্যাং

কৈশোর মানবজীবনের বাঁক ফেরার বিশেষ কালপর্ব। এ সময় কিশোর-কিশোরীরা থাকে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল ও আবেগপ্রবণ। এই বয়োঃসন্ধিকাল থেকে তারা যেমন ভয়ঙ্কর পথে বাঁক নিতে পারে, তেমনি মহৎ কিছুর সূচনাও করতে পারে। তবে সেটি কেবল তার নিজের ওপরেই নির্ভর করে না, এক্ষেত্রে পরিবার তথা অভিভাবক, শিক্ষকমন্ডলী, সর্বোপরি সমাজ থাকে নেপথ্য চালিকাশক্তি। ভাল নির্দেশনা পেলে এবং তাতে সে প্রভাবিত হলে জীবন ইতিবাচক ভবিষ্যতের দিকে গতি নেয়। বিপরীত হলে তা ভয়ঙ্কর কানাগলির বিপদাপন্ন অন্ধকার জগতের দিকে নিয়ে যেতে পারে। দেশে সাম্প্রতিককালে ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিতি পেয়েছে কিশোরদের একটি অংশ। নেতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে কিশোরদের ছোট ছোট দলের। কিশোররা দল গড়ছে অদ্ভুত সব নামে এবং প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাংয়ের ওপর চড়াও হচ্ছে। প্রতিটি কিশোর গ্যাংই কোন না কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে তাদের যথোচিত শাস্তি দেয়া যাচ্ছে না। পাঠানো হচ্ছে সংশোধনাগারে। সেখান থেকে ফিরে এসে তারা কতটুকু সংশোধিত জীবনযাপন করছে সেটি বড় প্রশ্ন। কিশোর অপরাধীদের বড় অংশের ভেতর সম্ভাবনা রয়েছে বড় হয়ে মারাত্মক অপরাধী হওয়ার। তাই তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের হুমকিস্বরূপ। শুক্রবার রাজধানীর একটি মাত্র এলাকায় অভিযান চালিয়ে শতজনের মতো কিশোরের আটক হওয়ার সংবাদটি উদ্বেগজনক। অবশ্য এর আগে প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাংয়ের হাতে একাধিক কিশোরের নিহত হওয়ারও খবর রয়েছে। বিগত পনেরো বছরে ৮৬ জন কিশোর খুন হওয়ার তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। তবে গ্রুপ ছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবেও কিশোররা খুনোখুনি করছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ বুধবার মোহাম্মদপুরে মোহসিন নামে এক কিশোরের নিহত হওয়া।

কোন সন্দেহ নেই যে, দেশে কিশোর অপরাধ বাড়ছে। রাজধানীর উত্তরাতেই রয়েছে কয়েকটি গ্রুপ। সেগুলোর নামেরও নানা বাহার- নাইন স্টার, ডিস্কো বয়েজ, বিগ বস ইত্যাদি। এরকম আরও একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে রাজধানী ও দেশের অন্যত্র। অধিকাংশই কিশোর বয়সী-নাইন-টেন থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। আবার বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া বস্তিবাসী কিশোরও রয়েছে। এসব গ্রুপের আবার গ্যাং লিডারও আছে, যারা অপেক্ষাকৃত অল্প শিক্ষিত এবং মস্তান শ্রেণীর। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে মারামারি, হানাহানি, প্রতিশোধ স্পৃহা লেগেই থাকে। গত বছর উত্তরায় স্কুলছাত্র আদনান কবির হত্যার এক বছরের মাথায় ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং।

কিশোরদের এসব অপরাধমূলক কর্মকা-ের জন্য শুধু মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ফেসবুক, ইন্টারনেট ইত্যাদিকে দোষ দেয়া যাবে না। শুধু থানা-পুলিশ দিয়েও হবে না। এক্ষেত্রে সবিশেষ গুরু দায়িত্ব রয়েছে সমাজ, পরিবার ও অভিভাবকদের, বিশেষ করে মা-বাবা, ভাই-বোনের। খেলাধুলা কিংবা পার্টির ছলে ছেলেটি কোথায় যায়, কি করে, কাদের সঙ্গে মেশে তা নিয়মিত নজরদারিতে রাখতে হবে। পাড়া-মহল্লার মুরব্বিরাও এক্ষেত্রে দেখভাল করতে পারেন। যথাযথ ভালবাসা দিয়ে সন্তানদের বোঝালে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা পেতেও পারে তারা। কিশোরদের সংস্কৃতিচর্চা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী যারা কিশোরদের ব্যবহার করছে তাদেরও শনাক্ত করা জরুরী। সম্মিলিতভাবে চেষ্টা নিলে কিশোর গ্যাং নামক দুষ্টক্ষত থেকে মুক্ত হতে পারে সমাজ।