১৮ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকায় কমান্ডো হামলা ॥ ৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। বাংলার মুক্তিসংগ্রামকে বেগবান করবার জন্য পাঁচটি প্রধান রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠন করা হয় একটি গণতান্ত্রিক পর্ষদ যা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ উপদেষ্টা পরিষদ নামে পরিচিতি পায়। মুক্তিবাহিনীকে দিকনির্দেশনা প্রদান করতে এবং বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ প্রদান করতে পরামর্শক হিসেবে আট সদস্যবিশিষ্ট এই উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমেদ এর সভাপতিত্বে দলসমূহের নেতৃবৃন্দের দুই-দিনের সভা শেষে এ পর্ষদ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র জানান, ‘বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের’ বিনাশে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করে সকল সম্প্রদায়ের জনগণের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানের বিষয়টি কমিটি অবশ্যই নিশ্চিত করবে। কমিটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আস্থাবান মুক্তিকামী জনসাধারণের মধ্যে একতার প্রতিফলন ঘটানো নিশ্চিত করবে । সভায় বাংলাদেশ সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ভারতসহ বিশ্বের সকল দেশের প্রতি আহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়াও সভায় যুদ্ধোপকরণাদি প্রদান করে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ‘সক্রিয় সহযোগিতা’ প্রদান করতে তাদের প্রতি আকুল-আবেদনও জানানো হয়। এ দিন পাকসেনারা মুক্তিফৌজের মন্দভাগ এবং মইনপুর অবস্থানের ওপরও আক্রমণ চালায়। মুক্তিবাহিনী বীর বিক্রমে পাকসেনাদের আক্রমণ প্রতিহত করে। পরাজয়ের আক্রোশে সকাল সাতটার সময় পাকসেনাদের প্রায় দুই কোম্পানি সৈন্য প্রবল কামানের গোলার সহায়তায় মুক্তিফৌজের মইনপুর অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রায় দু’ঘণ্টা যুদ্ধের পর পাকসেনাদের প্রায় ৪০ জন সৈন্য হতাহত হয়। মুক্তিফৌজের সৈন্যরা অসীম সাহসিকতার সঙ্গে সেই আক্রমণকেও প্রতিহত করে। মুক্তিফৌজের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। ফলে বাধ্য হয়ে আমাদের সৈনিকরা সে অবস্থান পরিত্যাগ করে ৬০০ গজ পিছে বায়েকের নিকট জেলা বোর্ডের রাস্তায় নতুন অবস্থান গড়ে তোলে। পাকসেনারা এই অবস্থানের ওপরও আক্রমণ চালায়। তাদের সেই আক্রমণকে মুক্তিফৌজ সৈনিকেরা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিহত করে। পাকসেনারা সামনে অগ্রসর হতে না পেরে পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। পাকসেনারা মনরা, বাগরা, নাগাইশ, দুশিয়া, আরাদুয়শিরা, ধান্দাইল, সিদলাই প্রভৃতিসহ প্রায় একুশটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করে। রাতে ক্যাপ্টেন গাফফার মুক্তিফৌজের একটি শক্তিশালী রেইডিং পার্টি ৩’ মর্টার ও ৬৫ এমএমআরআরসহ পাকসেনাদের অবস্থানের দিকে পাঠিয়ে দেন। সিলেটে মুক্তিবাহিনী শাহবাজপুর-বিয়ানীবাজার সড়কে পাকহানাদার বাহিনীর টহল দলকে এ্যামবুশ করে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ৮নং সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর ৪০ জন যোদ্ধার একটি দল শৈলকুপা থানার আলফাপুর গ্রামে পাকবাহিনীর এক কোম্পানি সৈন্যকে আক্রমণ করে। এই আক্রমণে পাকবাহিনীর ৫৩ জন সৈন্য ও ২০ জন রাজাকার নিহত হয়। অপরদিকে একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা আহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের কাছ থেকে ১৬টি রাইফেল ও ৭টি গোলার বাক্স দখল করে। পাকহানাদার বাহিনী দালাল রাজাকারদের নিয়ে কয়েকটি নৌকায় করে সুনামগঞ্জ সদর থানার ভাঁদের টেক মুক্তিবাহিনী অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়। এ খবর পেয়ে মুক্তিবাহিনী যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয় এবং তাদের আওতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে পাকবর্বরদের ওপর গোলাবর্ষণ শুরু করে। প্রায় দেড় ঘণ্টা যুদ্ধের পর পাকসেনারা সামনে এগুতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর অসংখ্য সৈন্য হতাহত হয়। অপরদিকে একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ৩নং সেক্টরে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিবাহিনী পাকসৈন্যদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে ৯ জন পাকসেনা নিহত হয়। মুক্তিফৌজের গেরিলারা রূপগঞ্জের নিকট যে গ্যাসলাইন ধ্বংস করে দিয়েছিল পাকসেনারা পশ্চিম পাকিস্তানী প্রকৌশলীদের দ্বারা তা মেরামত করে নেয়। এই সংবাদ মুক্তিফৌজের হেডকোয়ার্টারে যথাসময়ে পৌঁছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘোড়াশালের মুক্তিফৌজের গেরিলাদেরকে গ্যাস লাইনটি মেঘনা নদীর মাঝে ক্ষতি করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। নির্দেশ অনুযায়ী গেরিলারা রাতে নৌকার সাহায্যে নদীর মাঝামাঝি জায়গায় যায় এবং প্রায় ১৫-২০ ফুট পানির নিচে অবস্থিত গ্যাস পাইপে ডিমোলিশন দ্বারা ‘ডিলে সুইচ’ এর সাহায্যে পাইপটি উড়িয়ে দেয়া হয়। ফলে গ্যাস পাইপের ভিতর পানি ঢুকে যায়। এতে গ্যাস সরবরাহ অনেক দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা শহরের বাসাবো এলাকায় শত্রুদের একটি চেক পোস্টে ১১ জন পাঞ্জাবি পুলিশ ও কয়েকজন রাজাকারকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধাদের একদল তরুণ যোদ্ধা চমকপ্রদ গেরিলা কৌশলের নজির স্থাপন করেছে। ঢাকা শহরে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেবেশ ও গেরিলা আক্রমণ ঠেকানোর জন্য পাকসেনারা শহরের বিভিন্ন স্থানে অনেক ক্যাম্প ও চেক পোস্ট বসিয়েছে। বাসাবো এলাকায় এইরূপ একটি ক্যাম্পে একদল পাঞ্জাবি পুলিশ ও রাজাকার পাহারায় ছিল। গেরিলাদের কয়েকজন সাধারণ বেশে ‘ভাল মানুষের মতো’ প্রতিদিন তাদের সঙ্গে আলাপ করতে করতে ভাব জমায় ওইরূপ ৫ জন আলাপী গেরিলা বেলা ২ টায় পুলিশ ও রাজাকারদের সঙ্গে দ্বিপ্রহরিক বিশ্রাম আলাপ জুড়িয়ে দেয় এবং সুযোগ বুঝে হঠাৎ এক সময় শত্রুদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে গুলি চালাতে শুরু করে। আশপাশে লুকিয়ে থাকা গেরিলারাও শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সংঘর্ষে ১১ জন পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ ও কয়েকজন রাজাকার নিহত হয় ও বাকিরা ক্যাম্প ছেড়ে চম্পট দেয়। বাংলাদেশ ফোর্স হেডকোয়ার্টার-এর গণসংযোগ বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘যুদ্ধ বিষয়ক বুলেটিন’-এ বলা হয়, মুক্তিবাহিনী শাসি আলি, গাজীপুর, পানছড়া, জামবাড়ি ও কোটেশ্বরে শত্রুবাহিনীর ৪৫ জনকে হত্যা এবং ১৫ জনকে আহত করে। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আজম ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রশ্ন ও বাংলাদেশের পক্ষের শক্তিশালী লবিকে মোকাবেলা করার জন্য পাকিস্তানী প্রতিনিধি দলে হামিদুল হক চৌধুরী, মৌলবী ফরিদ আহমদ ও বিচারপতি হামুদুর রহমান, ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, এ.কিউ.এম. শফিকুল ইসলাম, ব্যারিস্টার আখতার উদ্দিন, আবদুস সবুর ও ফজলুল কাদের চৌধুরীকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। ঔপনিবেশিক দেশ ও জনগণকে স্বাধীনতা দানের ঘোষণা কার্যকরকরণ সংক্রান্ত জাতিসংঘ বিশেষ কমিটির সভায় বিশ্বশান্তি পরিষদের ভারতীয় প্রতিনিধি রাম কৃষ্ণ মেনন বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনে ঐ কমিটির হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দৈনিক হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ডে ‘ইউরোপে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি’ শিরোনামের সংবাদভাষ্য থেকে জানা যায়, আগামী মাসে মিসেস গান্ধীর পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকা সফরের কথা রয়েছে, বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের ভুমিকার যথাযথ প্রেক্ষাপট তুলে ধরাই এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানী আর্মির বর্বরতা ও দমনের মাত্রা সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্ব জানতে পারে সপ্তাহ-মাস খানেক পর কিন্তু যখন সংগঠিত হচ্ছিল তখন নয়। এটা তখনই জানতে পারে যখন লাখ লাখ উদ্বাস্তুর ঢল নামে ইন্ডিয়াতে, যখন কলেরা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, এবং এসব কিছুর পরেই পশ্চিমা বিশ্বের দুয়ারে পাকিস্তান আর্মির ভয়াবহ আগ্রাসনের খবর গিয়ে পৌঁছায়। পশ্চিমা বিশ্বের মাত্র অর্ধেক লোকই বিশ্বাস করে যে পাকিস্তানের ভাঙ্গন অপরিহার্য, এমনকি যারা মনে করে যে, পূর্ব বাংলা একদিন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব লাভ করবে, কিন্তু তা কত সময়ের মধ্যে সে সম্পর্কেও তারা পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশ সমস্যার ব্যাপারে হোয়াইট হাউসের মনোভাবে এক ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। যা বলা হয়েছে ঠিক তার মাধ্যমে নয় বরং যা বলা হয়নি তার মাধ্যমে। নতুন কাজের ধরনে, এই পরিবর্তনগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে, ইসলামাবাদ কে নিন্দা করার চাইতে বরং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কে তার সীমানা রক্ষা করার ব্যাপারে তারা অনেক বেশি এগিয়ে। পশ্চিমাদের এই নিষেধ এবং এই নিষেধের মূল বিষয় হচ্ছে যে, ইন্দো-সোভিয়েত সম্পর্কের কারণে কখনোই তারা পাকিস্তানের ভাঙ্গন চায় না। এমনকি যখন চুক্তি সম্পাদিত হয় বিশ্বের সামনে, বেশির ভাগ পশ্চিমা ইউরোপিয়ানদের ধারণা হয়েছিল যে, ভারত সোভিয়েত শিবিরে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তাদের মন থেকে লম্বা সময় ধরে থাকা সন্দেহ মুছে দিতে যে ভারত জোটনিরপেক্ষ একটি কাঠামো। সেই সঙ্গে চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই আছে ইসলামাবাদের পাশে। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী মিলিটারি শাসকদের কার্যকলাপ সত্ত্বেও বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো তাদের নৈতিকতার মানদণ্ডে তাদের বিচার করবে বরং করবে তাদের জাতীয় স্বার্থ দ্বারা।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com