২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একাধিক ব্যাংকের মার্জারই যথেষ্ট নয়

  • নিরঞ্জন রায়

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এই মর্মে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে অপেক্ষাকৃত ভাল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত বা মার্জ করানো হবে। এটি নিশ্চয়ই একটি ভাল উদ্যোগ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। অর্থমন্ত্রীর এমন ঘোষণা আবারও প্রমাণ করে যে, তিনি সত্যিকার অর্থেই দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বর্তমান অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই দেশের ব্যাংকিং খাতের পুঞ্জীভূত সমস্যা সমাধানে হাত দিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি খোলামেলা আলোচনা করেছেন এবং বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথাও বেশ জোরেশোরে উচ্চারণ করেছেন। যেগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান, ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির প্রয়োগ ও প্রসার ঘটানো, পরিচালনা পরিষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ব্যাংকিং কমিশন গঠনের বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য। এখন তিনি যোগ করলেন একাধিক ব্যাংকের একীভূত হওয়ার মতো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এগুলো দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য নিশ্চয়ই খুব ভাল খবর। কেননা দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ খাত নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিশেষ করে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী যখন আলোচনা করেন, তখন এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে বাধ্য। তবে সুদীর্ঘ তিন দশক ধরে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত যেভাবে এগিয়েছে এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এই খাতে যে অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে এই খাতকে মুক্ত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পদক্ষেপ নিয়ে এই খাতকে সুশৃঙ্খল করা সম্ভব নয়।

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মার্জার ও একুইজিশন খুবই জনপ্রিয় ও কার্যকর একটি ব্যবস্থা, যা দীর্ঘদিন ধরে উন্নত বিশ্বে তো বটেই, অনেক উন্নয়নশীল দেশেও চালু আছে। আজ থেকে দুই দশক আগে আমি যখন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশনে কর্মরত ছিলাম, তখন মার্জার ও একুইজিশন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। আইনটি এখনও প্রণীত হয়নি, সেটিই অবাক করার মতো ঘটনা। এই মার্জারের সুযোগ থাকার কারণে খুব সহজে ভাল মানের ছোট ছোট কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে সেগুলো উচ্চ মূল্যে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মার্জ হয়ে যায়। এতে করে নতুন নতুন ছোট মাপের ভাল প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তেমনিভাবে বৃহৎ কোম্পানিগুলো কোন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রাথমিক ঝামেলা খুব সহজেই এড়িয়ে তাদের ব্যবসায়িক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে। তদুপুরি কোন ছোট বা দুর্বল কোম্পানি সমস্যায় পড়লে খুব সহজেই বৃহৎ কোম্পানির সঙ্গে মার্জ হয়ে বাজারে টিকে থাকতে পারে। তবে এর বিপরীত বক্তব্যও সমান গুরুত্ব বহন করে। মার্জারের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে যে, বৃহৎ কোম্পানির প্রভাবে ছোট কোম্পানিগুলো দাঁড়াতেই পারে না এবং সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বিঘিœত হয়। কেননা কোন ছোট কোম্পানি একটু ভাল করলেই সেটি বৃহৎ কোম্পানির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং এক সময় বৃহৎ কোম্পানি মার্জারের মাধ্যমে ছোট কোম্পানিকে গ্রাস করে ফেলে। এই অব্যবস্থা যাতে প্রকট আকার ধারণ করতে না পারে, সেজন্য উন্নত বিশ্বে মার্জার ও একুইজিশন আইনের পাশাপাশি এ্যান্টি ট্রাস্ট আইনও বলবত থাকে। কোন কোম্পানিকে শুধু গ্রাস করার লক্ষ্যে মার্জার করার উদ্যোগ এই এ্যান্টি ট্রাস্ট আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যদি কোন ছোট কোম্পানিকে গ্রাস করা বা বাজার থেকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে মার্জার করা হয়, তবে সেটি এ্যান্টি ট্রাস্ট আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সে জন্য সেই অভিযুক্ত বৃহৎ কোম্পানিকে শাস্তি পেতে হবে। সম্প্রতি ফেসবুক কর্তৃক হোয়াটস-এ্যাাপ এবং ইনস্টাগ্রামকে মার্জারের মাধ্যমে একীভূত করার ক্ষেত্রে এ রকম একটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে। যাই হোক, আমাদের দেশেও যখন মার্জার ও একুইজিশন আইন প্রণয়ন করা হবে, তখন নিশ্চয়ই এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এই মার্জার ব্যবস্থার প্রচলন একটু ভেবেচিন্তে গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের ব্যাংকিং খাতকে সবার আগে কিছুটা সুশৃঙ্খল এবং সুনিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। কোন ব্যাংক দুর্বল বা কোন ব্যাংক সবল, তা নিরূপণ করার মতো মানসম্পন্ন কোন গ্রহণযোগ্য মানদ- নেই। বিদ্যমান যে পদ্ধতিতে এটি করা হয়, তা এক নতুন বিতর্ক এবং সমস্যার সৃষ্টি করবে। তবে সরকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে মার্জ করা হলে তা তেমন বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। কারণ দুটো ব্যাংকেরই মালিক সরকার এবং পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয় সরকার মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে। তাই সরকারী মালিকানাধীন একাধিক ব্যাংকের মার্জারে তেমন কিছুই আসে যায় না। কৃষি ব্যাংক ভেঙ্গে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক নামের দুটো ব্যাংক করার কারণে যেমন কোন উল্লেখযোগ্য লাভ হয়নি, তেমনি এই দুটো ব্যাংক মার্জ করে একটি ব্যাংক করা হলেও কোন খতি হবে না। তবে বেসরকারী মালিকানাধীন ব্যাংকের মধ্যে মার্জ করতে হলে যথেষ্ট ভেবেচিন্তে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা, এখন ব্যাংকিং খাতে যে কোন পদক্ষেপ নেয়ার আগে এই খাতকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা, দায়-দায়িত্ব ও জবাবদিহি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয়া এবং বাস্তবে তা কঠোরভাবে মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সব ব্যাংকেই তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান যুগের ব্যাংকিং হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর। সব ব্যাংক যেন একই মানসম্পন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ সমস্যারও একটি দীর্ঘমেয়াদী সন্তোষজনক সমাধান অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। সেইসঙ্গে ব্যাংকের পাশাপাশি গ্রাহকদেরও, বিশেষ করে কর্পোরেট গ্রাহকদের একটি সাধারণ র‌্যাংকিংয়ের অধীনে নিয়ে আসতে হবে এবং সেই র‌্যাংকিংই নির্ধারণ করে দেবে কোন গ্রাহক কি ধরনের ব্যাংকিং সেবা কি পরিমাণ গ্রহণ করতে পারবে। তাছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বে তো বটেই, অনেক উন্নয়নশীল দেশে, এমনকি ভারতেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাম শুনলেই ব্যাংকগুলোর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। সেখানে আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আদেশ-নির্দেশ অমান্য করা ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক ঘটনা। এমন দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে আর্থিক খাতে কখনই শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যায় না।

এ রকম কিছু মৌলিক পদক্ষেপ নিতে পারলে দেশের ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ একটি মানসম্পন্ন অবস্থানে এসে দাঁড়াবে। তখন খুব সহজেই নিরূপণ করা যাবে যে, কোন ব্যাংক সত্যিকার অর্থেই দুর্বল, আর কোন ব্যাংক সবল। সে অনুযায়ী একাধিক ব্যাংকের মধ্যে একীভূত করার উদ্যোগ নিলে তা যেমন কার্যকর হবে, তেমনি উভয় ব্যাংকের জন্য লাভজনকও হবে। নচেৎ প্রস্তাবিত মার্জার ব্যবস্থা কার্যকর না হবার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা কোন ভাল ব্যাংকই জেনেশুনে কোন দুর্বল ব্যাংককে গ্রহণ করতে চাইবে না। সেক্ষেত্রে জোরপূর্বক মার্জারের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হতে বাধ্য। কারণ, দেখা যাবে গৃহীত দুর্বল ব্যাংকের চাপ সহ্য করতে না পেরে ভাল ব্যাংকটিই দুর্বল হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে ব্যাংকগুলোকে সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রণ করা গেলে দেখা যাবে একাধিক ব্যাংকের মধ্যে মার্জারের প্রয়োজনই পড়ছে না। তখন প্রতিটা ব্যাংকই তাদের নিজ নিজ সক্ষমতা অনুযায়ী ভালভাবে চলতে পারবে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে তাদের নিজ নিজ সক্ষমতা অনুযায়ী দুই বা তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে। যেমনÑ ক তফসিলভুক্ত ব্যাংক, খ তফসিলভুক্ত ব্যাংক, গ তফসিলভুক্ত ব্যাংক ইত্যাদি। এই তফসিল অনুযায়ী ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমও নির্দিষ্ট এবং সীমিত করে দেয়া যেতে পারে। যেমনÑ গ তফসিলভুক্ত ব্যাংক শুধু একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ও মেয়াদের জামানত গ্রহণ করতে পারবে এবং কেবল নগদ জামানতের বিপক্ষে ঋণ দিতে পারবে। প্রয়োজনে মোটা অঙ্কের প্রভিশন সংরক্ষণের শর্তে ক্রেডিট কার্ড এবং ভোগ্যপণ্য ঋণ প্রদান করার অনুমতি দেয়া যেতে পারে। এভাবে সকল তফসিলভুক্ত ব্যাংকের কার্যক্রমেই ঝুঁকি যেমন কমিয়ে আনা সম্ভব, ঠিক তেমনি তাদের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও সহজ। এতকিছুর পরও যদি একাধিক ব্যাংকের মধ্যে মার্জারের প্রয়োজন হয়, তবে তা করা যেতে পারে। মনে রাখা উচিত যে, মার্জার ও একুইজিশন ব্যবস্থা ভাল কাজ করে যেখানে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা বিরাজ করে। তা নাহলে এটা বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়। আমাদের দেশে দীর্ঘ তিন দশক ধরে কোন রকম ভাবনা-চিন্তা না করে একের পর এক ব্যাংকের অনুমোদন দিয়ে এখন যেমন মনে হচ্ছে যে, একটা ভুল হয়ে গেছে। ঠিক তেমনি ভালভাবে ভেবেচিন্তে এবং ব্যাংকিং থাতে ন্যূনতম শৃঙ্খলা নিশ্চিত না করে একাধিক ব্যাংকের মধ্যে মার্জার করার উদ্যোগও আরেকটি ভুল হতে পারে। মোটকথা, দেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং অব্যবস্থার কারণে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সেখানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে শুধু একাধিক ব্যাংকের মধ্যে মার্জার করার সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়।

লেখক : ব্যাংকার, টরনটো, কানাডা