২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাস কি পাকিদের ক্ষমা করবে?

  • অজয় দাশগুপ্ত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে পোল্যান্ডে নাৎসি বর্বরতার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন জার্মানির প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক-ভল্টার স্টায়ানমার। ৮০ বছর আগে, ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডের ভিয়ালুন শহরে বোমা মেরেছিল জার্মান বাহিনী। ওই ঘটনা স্মরণে রবিবার শহরটিতে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশ্বনেতাদের সামনে স্টায়ানমার পোল্যান্ডে গিয়ে এ ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। জার্মানির প্রেসিডেন্ট আট দশক আগের ওই হামলার পেছনে থাকা ‘নির্মূল করে দেয়ার আকাক্সক্ষার’ তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ‘জার্মান নিপীড়নে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মাথা নোয়াচ্ছি আমি। ক্ষমা চাইছি।’ নাৎসি জার্মানির ওই হামলাকে ‘বর্বরতা’ অ্যাখ্যা দিয়ে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্টও জানান তীব্র নিন্দা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের জন্য এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে রবিবার স্থানীয় সময় ভোর ৪টার দিকে ওই স্মরণানুষ্ঠান শুরু হয়। পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট দুদা বলেন, ‘সেটি কী ধরনের যুদ্ধ ছিল তা দেখেছে ভিয়ালুন। সেটি ছিল পুরোদস্তুর যুদ্ধ, নিয়ম ছাড়া, ধ্বংসাত্মক একটি যুদ্ধ।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি গ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে পোল্যান্ড অন্যতম। ওই যুদ্ধে দেশটির প্রায় ৬০ লাখ লোক প্রাণ হারিয়েছিল। ৮০ বছর ধরেই পোল্যান্ড জার্মানির কাছে বিশ্বযুদ্ধের প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য ক্ষতি পূরণের দাবি জানিয়ে আসছে।

এটি এ বছরের খবর। ভাবুন একবার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে কবে? এখনও ৫০ বছরও হয়নি। তারপরও আমরা সব ভুলে গেছি। মাঝে মাঝে মনে হয় এত অকৃতজ্ঞ জাতি কি আর কোথাও আছে? আমাদের দেশের আয়তন-জনসংখ্যা এসব বিবেচনায় রাখলে হতাহতের সংখ্যা কি কম? আমাদের সঙ্গে তো কারও যুদ্ধ ছিল না। একটা অসম লড়াই চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল নিরীহ জাতির ওপর। আমরা যাদের দেশের অঙ্গ ছিলাম, তারাই আমাদের মেরেছিল। বিশ্বযুদ্ধ দূরে থাক, কোন যুদ্ধের ঘনঘটা ছাড়াই আমাদের জাতিকে ফেলে দেয়া হয়েছিল মহাসঙ্কটে। একটি নিরীহ জাতির রক্তে ভাসানো দেশ স্বাধীন হবার এত অল্পসময়ে কি করে সব ভুলে গেল? ভুলে যাওয়া তো বড় কথা নয়। আমরা পারলে এখন যেন পাকিস্তানের সেবাদাস হতেই পাগল। এই বিকৃতি কি ইতিহাসের কোন ভুলের মাশুল? না অন্য কোন কারণে এমন হয়? যারা বলেন, কেবল ধর্মীয় উন্মাদনার জন্য আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। আমার মনে হয় এর পেছনে এক বিরাট কারণ, হিন্দু অধ্যুষিত ভারত। মূলত ভারত বিরোধিতাই আমাদের জাতির এক বিরাট অংশকে পাকিপ্রেমী করে তুলেছে।

কিন্তু এসব কথায় তো ইতিহাস বা ভবিষ্যত বদলায় না। আজ আমরা সবদিক বিবেচনায় পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে। ক’দিন আগে সিডনির এক দৈনিকে পাকিস্তানী এক কলাম লেখকের লেখা দেখে চমকে উঠেছিলাম। তিনি তার দেশ ও সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন, এস্টনিয়া আর বাংলাদেশকে অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে। তাঁর লেখার অনেকটা জুড়েই ছিল বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী পথে অগ্রসর হচ্ছে। কোন কোন খাতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ভারতের চেয়েও চমকপ্রদ। এমন কি গড় আয় জিডিপির হিসাবেও এগিয়ে বাংলাদেশ। এটা কোন মুখের কথা না। এর পেছনে কি আছে? ভদ্রলোক বলছেন, নারী শক্তির জাগরণ আর নারীদের অগ্রাধিকার দিয়েই বাংলাদেশ আজ এই জায়গায়। যা পাকিস্তানে নেই।

একটা তথ্য পেয়েছি সম্প্রতি। দুনিয়ার প্রায় সব দেশে নাগরিকদের শিক্ষার হার বাড়লেও কমেছে পাকিস্তানে। কেন? কারণ সেখানে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ নারীদের পড়াশোনা করতে দেয় না। বন্ধ করে দেয়া হয় স্কুল-পাঠশালা। এমন একটি অন্ধ জাতির প্রতি আমাদের এত আগ্রহ কেন? যে জাতি নিজে আছে ঘোর বিপদে, তার প্রতি এই দুর্বলতা প্রমাণ করে আমরা আর্থিকভাবে অগ্রসর হলেও মানসিকতা আর চেতনায় পিছিয়ে পড়েছি। অথচ যারা মূলত সভ্য বা আধুনিক, তারা তাদের সঙ্গে বেঈমানী করা কোন দেশ বা জাতিকে ক্ষমা করে না। যার প্রমাণ পোল্যান্ড।

একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আমাদের জাতিসত্তার এক বিরাট অংশ স্বাধীনতা চেয়েছিল কি-না, তা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এমনও হতে পারে যে, আমাদের যে নতুন প্রজন্ম তাকে বশ করেছে অপপ্রচার। খেয়াল করবেন খুলে যাওয়া দুনিয়ায় সব দেশ সব জাতি এখন ওপেন উইনডো। এই খোলা জানালায় মুখ রেখে তারা কেন একটি পশ্চাৎপদ দেশের জন্য মরিয়া? যেখানে ইউরোপের দেশগুলো আশি বছর পরও তাদের পাওনা বুঝে নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সেখানে আমরা ক্রমেই দেন পাকিপ্রেমী হয়ে উঠছি! কমতে কমতে মাইক্রোস্কোপিক সংখ্যার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে মরিয়া হয়ে কোনক্রমে জীবন ধারণ করছেন দেশে। যেখানে তাদের থাকার কথা সবার ওপরে। সেখানে তারাই আজ তলানিতে। জানি আপনারা বর্তমান সরকারের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে করা কাজ ও মানুষকে দেয়া সম্মান পদকের কথা তুলবেন। সেগুলো মূলত কাগজ-কলম আর মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ। আপনি সাধারণ মানুষের কাছে গেলে যে ছবিটা পাবেন, তা কোনভাবেই সুখকর না। আমরা ভুলে গেছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরব।

আমরা যত উন্নয়ন আর অগ্রগতির পথে চলি না কেন, ইতিহাস থেমে থাকবে কেন? আর সেখানেই বড় হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের রক্তবীজ। যাদের আমরা রাজাকার বলি, যাদের দালাল বলি তাদের ষড়যন্ত্র কিংবা চক্রান্ত বন্ধ হয়নি। তারা সুযোগ পেলেই দেশকে আবার পাকি কায়দায় ফিরিয়ে নেবে। তখন হয়ত উল্টো পাকিরাই আমাদের কাছে টাকা চাইবে। বা জরিমানা গুনতে বলবে। এই উল্টোরথ এই বিপরীত যাত্রা বন্ধ করার কোন উদ্যোগ দেখছি না। কথা আর কাজে ক্রমাগত দূরত্ব তৈরি করা সরকারের যে অংশ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে তারা মূলত মাঠে থাকে না। শেখ হাসিনা, তাঁর মুষ্টিমেয় সহকর্মী আর অগুনিত কর্মীরাই এখনও হাল ধরে আছেন।

দুনিয়ার যত ঘটনা তুলে ধরি না কেন, যারা দালাল তাদের হুঁশ ফিরবে না। তারা বলতে থাকবে এত বছর আগে কি ঘটেছিল তা নিয়ে কথা বলে কি লাভ? কি লাভ হানাহানি উস্কে দিয়ে? অথচ বাস্তবতা কি? আর একবার সুযোগ পেলেই আমাদের দুশমনরা নিশ্চিহ্ন করে দেবে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে। তারা কাউকে ছাড় দেবে না। আমরা সহিষ্ণুতার নামে যেসব আপদ লালন করছি, তারা এক সময় আমাদের প্রায় বদলে দিয়েছে। এখনও তারা তা করতে ছাড়বে না।

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, দেখলেন তো পোল্যান্ডে গিয়ে মাফ চেয়ে এসেছেন জার্মানির প্রেসিডেন্ট। এর নাম উদারতা। এর নাম আত্মসমালোচনা। আর পাকিস্তান? মাফ চাওয়া দূরের কথা, আমাদের প্রাপ্যও বুঝিয়ে দেয়নি। সেদিকে কোন মনোযোগ বা কোন ইচ্ছার পরিচয় না দিয়ে তাদের শাসকরা সবসময় উল্টো কথা বলে আসছে। ক্রিকেটার ইমরান খান আরও এককাঠি সরেস। তার দল, তার মুখ দিন-রাত আমাদের বিরুদ্ধে। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির সময় আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি। শেখ হাসিনার বাংলাদেশ এদের চোখে দুশমন। এমন একটি জাতিকে কাছে টানার অপচেষ্টা নিজেদেরই অপমান করা। তার চেয়ে দরকার পোল্যান্ডের উদাহরণ অনুসরণ করা। দৃঢ়চিত্তে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখা। এদেশ না বাঁচলে, বড় না হলে আমরা কেউই কারও না। আমাদের সব পরিচয়ের যে উৎস সে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ কারও কাছে হার মানে না। ভবিষ্যতেও মানবে না। ইতিহাসে জার্মানি ও পোল্যান্ডের এই সম্পর্ক হোক আমাদের আত্মার খোরাক।