১৬ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আয় বৈষম্য কমান

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে রবিবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সেমিনারটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, সমিতির প্রায় সবাই পেশাদার অর্থনীতিবিদ ও গবেষক এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক। তদুপরি কোনভাবেই সরকারবিরোধী নয়। বরং বিভিন্ন সময়ে সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন গুরুদায়িত্ব, দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে সামলেছেন সমিতির অনেক সদস্য। সে অবস্থায় সমিতি আয়োজিত ‘বাংলাদেশে আয় ও ধনবৈষম্য’ শীর্ষক সেমিনারে বিভিন্ন প-িত ও বিদগ্ধজনের বক্তব্যে সুচিন্তিত যেসব মন্তব্য উঠে এসেছে তা নিঃসন্দেহে বিশেষ মূল্যবান এবং দেশ ও দশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সারবত্তা যদি সরকারের নীতি নির্ধারক মহল সম্যক অনুধাবন করেন এবং তদনুযায়ী প্রতিকারের, তাহলে দেশের জনগণের জন্য মঙ্গল। সেমিনারে ‘বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য : সমাধান কোন্ পথে’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ‘২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে বলে সরকারীভাবে প্রাক্কলিত হয়েছে। এ বিবেচনায় বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু আয়বৈষম্য যেভাবে বাড়ছে, একে দেশের আসন্ন মহাবিপদ সঙ্কেত বললে অত্যুক্তি হবে না।’ আয়বৈষম্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি বৃদ্ধি, দুর্নীতির অর্থ বিদেশে পাচার, প্রাথমিক শিক্ষায় ১১ ধরনের প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ বিত্তের নিক্তিতে সন্তানের পড়াশোনা করানোর ব্যবস্থা, ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মহোৎসব, অগণিত ঋণখেলাপী, বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি, একশ্রেণীর যথেচ্ছ বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশে বাড়ি কেনার প্রবণতা, ব্যাংকিং সেক্টরে প্রায় একচ্ছত্র লুটপাট-নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। এর পাশাপাশি আছে চাঁদাবাজি, দুর্বৃত্তায়ন, মস্তানতন্ত্র, দখলদার, ভেজালদার ইত্যাদি। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, দেশে এমন কোন সরকারী, আধা সরকারী বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা নেই, যেটি একেবারে দুর্নীতিমুক্ত। এও সত্য যে, ২০১৮-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের ৬২ শতাংশই ব্যবসায়ী। এ সবই কম-বেশি কাজ করছে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির পেছনে। তবে এও সত্য যে, সরকার তা কমিয়ে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।

বর্তমান জনবান্ধব সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী সম্প্রসারণের উদ্যোগ লক্ষণীয় বৈকি। এর আওতায় দরিদ্র ও বঞ্চিতদের মধ্যে সুবিধাভোগীর সংখ্যা আরও অন্তত ১৩ লাখ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। এর জন্য চলতি বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। এতে সুবিধা পাবেন প্রায় ৮৯ লাখ দরিদ্র মানুষ। উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রায় ৭৬ লাখ মানুষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর আওতায় সুবিধা ভোগ করছেন।

আগামী পাঁচ বছরে জাতীয় প্রবৃদ্ধি দুই ডিজিটে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই গৃহীত এবং প্রণয়ন করা হয়েছে পরবর্তী পাঁচশালা পরিকল্পনা। তাতে অগ্রাধিকার পেয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান প্রকল্প। দেশের তরুণ সমাজকে কাজ দিতে গ্রহণ করা হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনা। দারিদ্র্য শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে গ্রহণ করা হয়েছে বেশ কয়েকটি সামাজিক কর্মসূচী। অবকাঠামো উন্নয়নে দশ মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়িত হলে বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। দেশে উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি হবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র। দারিদ্র্য বিমোচন করে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো বর্তমান সরকারের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে শহরের চেয়ে গ্রাম-গঞ্জকে সবিশেষ প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। গ্রহণ করা হয়েছে নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কর্মসূচী ও প্রকল্প।

বর্তমানে মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৫১ মার্কিন ডলার, টাকার অঙ্কে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৭৮৯ টাকা। দেশে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৮ ভাগে। হতদরিদ্র মানুষের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৩ ভাগে। উল্লেখ্য, অর্থবছরের শুরুতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। শেষ পর্যন্ত তা বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। পরিকল্পনামন্ত্রীর মতে, যেভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে ২০৩০ সালের আগেই দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। আগামীতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীতে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ এর আওতা সম্প্রসারিত হলে দেশে দারিদ্র্যের হার আরও কমে আসবে নিঃসন্দেহে। সেক্ষেত্রে কমবে আয়বৈষম্যও। তবু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান হ্রাস তথা আয়বৈষম্য নিরসনে সরকারের আরও কিছু করণীয় রয়েছে।