১৯ নভেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার দিনরাত

  • মারুফ রায়হান

আজ পবিত্র আশুরা। ইসলামী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১০ মহররম বা আশুরার দিনটি মুসিলম বিশ্বে শোকের দিন হিসেবে খ্যাত। ঐতিহাসিক ও ঘটনাবহুল এই দিনটি পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও পালন হয়ে থাকে। বিশেষ করে রাজধানীতে দিবসটি পালন করা হয় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নানা আনুষ্ঠানিকতায়। নানা উদযাপনের মধ্যে শিয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল অন্যতম। তবে পবিত্র দিবসটিতেও জঙ্গী হামলা হয়েছে ঢাকায়।পুরান ঢাকার হোসেনী দালানের তাজিয়া মিছিল শুরুর আগে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গীরা গ্রেনেড হামলা চালায়। ওই হতাহতের ঘটনার চার বছর পরও বিচার হয়নি। আসামিদের মধ্যে ৪ জন জামিনে বের হয়ে গেছে। ৬ আসামি এখনও কারাগারে। আর ৪৬ সাক্ষীর মধ্যে এখনও অনেকের সাক্ষ্য গ্রহণও শেষ হয়নি। দীর্ঘ চারবছর পরও বিচার না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে হতাহতের পরিবার। ওই ঘটনায় নিহত হয় দুইজন, আহত হয় শতাধিক।

শারদীয়া দিয়াবাড়ি

শরত এলে প্রকৃতিপ্রেমী নগরবাসী ছুটে যায় নগরের উত্তরপ্রান্তের দিয়াবাড়িতে। এমন কাশবন এই ইটপাথরের শহরে কোথায় মিলবে? তাই শারদীয়ার সঙ্গে দিয়াবাড়ির বেশ মেলবন্ধন। অনেকেই খোঁজখবর রাখছেন যাত্রাপথ কতটা নির্বিঘœ থাকছে মেট্রোরেলের এই মহাযজ্ঞকালে। আর কাশফুল কতটা বড় হয়েছে। এখনি যাবেন, নাকি আশ্বিন পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। মধুপূর্ণিমা রাতেও কেউ কেউ পরিকল্পনা করছেন দিয়াবাড়ির সৌন্দর্যে ¯œান করতে।

কাশবনে ছুটন্ত ট্রেনের ছবি আমাদের চোখে লেগে আছে সত্যজিৎ রায়ের কল্যাণে; সেখানে অপু দুর্গার যুগল বিস্ময় আমাদের হৃদয়ে চির জাগরূক। কাশবন কন্যাদের ফটোসেশন আমরা দেখতে পাচ্ছি অধুনা ফেসবুকের সৌজন্যে। রাজধানীর ট্রেডমার্ক কাশবন হলো দুটি: দিয়াবাড়ি ও বসুন্ধরার ৩০০ ফুট রাস্তার পাশের প্রান্তর। লালমাটিয়া থেকে উত্তরা আসার পথে বাদামি ঘোড়া দেখে গাড়ি থামিয়েছিলেন এক নিকট আত্মীয়া। দেখে মনেই হবে না এটি ঢাকার একটি অংশ- যেন যুক্তরাজ্যের দৃশ্য। ঘোড়া নিয়ে কবি শামসুর রাহমানের অবসেশন কম ছিল না। তার কত কবিতাই না উঠে এসেছে বিচিত্র মাত্রিকতায়। ডানাওয়ালা ঘোড়ার পদশব্দ শুনেছি কত! দিয়াবাড়ির ঘোড়াটি দেখলে নিশ্চয়ই কবির কলম নিশ্চল থাকত না। শারদসন্ধ্যায় দিয়াবাড়ির কাশবনে হারিয়ে গিয়ে হঠাৎ যান্ত্রিক শব্দে চমকে ওঠে মানুষ; আকাশ বন পেরিয়ে উড়ে আসছে বিমান। কয়েক মিনিটের মধ্যে সে অবতরণ করবে রাজধানীর মাটিতে। দিয়াবাড়ির অবারিত অঙ্গনের সৌন্দর্যে নিমজ্জিত হয়ে ভেসে চলুন মেঘে আর আকাশের ওপারে আকাশ থেকে মেঘের পরে মেঘ পেরিয়ে দেশের মানুষকে তার দেশের মাটিতে নিয়ে আসার আগমনী আওয়াজে আরেকবার নেমে আসুন কাশফুলের ঠিক পাশটিতে। সত্যি বলছি, এই শরতে একবার দিয়াবাড়ি বেরিয়ে আসুন- আমার মতোই দিয়ারবাড়ির নাম বদলে রাখবেন- ‘শরত-বসত’।

সড়কে বিশৃঙ্খলা

চলতি সপ্তাহেও ঢাকার আলোচিত বিষয় ছিল সড়ক দুর্ঘটনা। এমন সব মর্মস্পর্শী সড়কসন্ত্রাস চলছে যে ঢাকাবাসীর হতবাক হওয়ার মতো পরিস্থিতি। ঢাকায় এখন প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের বাস। এর নগণ্য সংখ্যকই প্রাইভেট গাড়ির সওয়ার অথচ সড়কের সিংহভাগই এসব গাড়ির দখলে। কোটি ঢাকাবাসীর চলাচলের জন্য যেসব গণপরিবহন রয়েছে তার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। সুষ্ঠু পরিকল্পনামাফিক এ মহানগরী গড়ে তোলা হয়নি বলে পর্যাপ্ত সড়কও এখানে অনুপস্থিত। গত কয়েক বছরে সরকার সড়কের সংখ্যা বাড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছেÑ বিশেষত ফ্লাইওভার নির্মাণ যান চলাচলে সহায়ক হয়েছে। আগামীতে নগরীতে মেট্রোরেল চলবে, পাতাল রেলও হবেÑ ঢাকা বেশ বদলে যাবে। কিন্তু সে তো ভবিষ্যতের কথা। এখন ঢাকাবাসীর হাঁসফাঁস অবস্থা। যানজটে নাকাল মানুষের বিরক্তি এবং কর্মঘণ্টার ক্ষতি নানা সময়ে খবরের কাগজে উঠে এসেছে। ঘটা করে ট্রাফিক সপ্তাহ পালিত হয়ে থাকে। জনসাধারণ ও যানচালকের ট্রাফিক আইন বিষয়ে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি তথা ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে কিছু অভিযানও পরিচালিত হতে দেখা যায়। কিন্তু বৈধ লাইসেন্সের অধিকারী না হয়েও গাড়ি চালানোর জন্য ক’জন চালককে নিবৃত করা হয়? গণপরিবহনের চালকের হাতে থাকে গণমানুষের জীবনÑ এটি বরং চাপাই পড়ে থাকে। কত হাজার নবিস চালক ঢাকার রাস্তাকেই তার ড্রাইভিং ট্রেনিংয়ের স্থান হিসেবে দোর্দ- প্রতাপে ব্যবহার করছে তার ওপর কোন প্রতিবেদন দেখি না। যে নবিস চালকটির স্বেচ্ছাচারী চালনায় কেউ শয্যাবন্দী হয়ে পড়ছেন, কারও বা চিরশয্যা পাততে হচ্ছে বাসের নিচে- সেই নবিস চালকদেরই শুধু দোষ দেব আমরা? একটা সংসার চালানোর জন্য তরুণ-নবীন-যুবা তড়িঘড়ি হাতে তুলে নিচ্ছে স্টিয়ারিং আর অন্য পিঠে সেই তারই জন্য কত না সংসার বিপন্ন আর এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এখানে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোথায়? যে দফতর নিয়ম বহির্ভূতভাবে দেদার লাইসেন্স দিয়ে চলেছে; যে মালিক গাড়ির চাবিটি তুলে দিচ্ছে আনাড়ির হাতে; যে সংগঠন দোষী চালকের শাস্তি রুখে দিচ্ছে- এদের প্রত্যেকেই প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার নেপথ্যকারিগর!

অযোগ্য শহরের তালিকা এবং সামান্য উন্নতি

বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছে রাজধানী ঢাকা। বসবাসযোগ্যতার দিক দিয়ে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান এখন ১৩৮তম। ঢাকার চেয়ে খারাপ অবস্থা কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর সিরিয়ার দামেস্ক ও নাইজেরিয়ার রাজধানী লাগোস।

যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত বাণিজ্যবিষয়ক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (সিপিইউ) সম্প্রতি এ তালিকা প্রকাশ করেছে। আগের গত সপ্তাহে ইআইইউ ‘নিরাপদ শহর সূচক-২০১৯’ শীর্ষক একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। বিশ্বের নিরাপদ শহরের এ তালিকায় গতবারের চেয়ে ২ ধাপ এগিয়েছে ঢাকা। আপাতদৃষ্টিতে অবশ্যই এটি সুসংবাদ। তবে মাত্র দুই ধাপ উন্নতি হওয়ায় আত্মতুষ্টির কোন সুযোগ নেই। কেননা রাজধানীবাসী তাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় এমন কোন অগ্রগতি অবলোকন করেননি যে সন্তুষ্ট হয়ে বলা যেতে পারে, হ্যাঁ আমাদের নিরাপত্তা বেড়েছে। খুব বেশিদূর যাওয়ার তো দরকার পড়ে না, অতি সাম্প্রতিককালেই নানামুখী পর্যবেক্ষণে উঠে আসছে ঢাকার মানুষের অনিরাপদ তথা বিপন্ন বিপর্যস্ত জীবনের গল্প। এই মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ এক রকম খোলা আকাশের নিচেই অবস্থান করছেন। ঝিলপাড় বস্তির কয়েক হাজার ঘর পুড়ে সমগ্র এলাকা শ্মশানচিত্র হয়ে উঠেছে। তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোয় বস্তিবাসীর ঠাঁই হয়েছিল। যদিও ঈদ-উল আজহার পর স্কুল খুলে যাওয়ার পরে তাদের আবার আশ্রয়হীন হতে হয়েছে। কোন নগরের একটি অঞ্চলেই যদি হাজার হাজার মানুষ রাস্তার ওপর রাত্রিবাস করে তবে তাদের জীবন কীভাবে নিরাপদ হতে পারে। এই তো সেদিন মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজের কারণে সরু হয়ে যাওয়া সড়কে বেপরোয়া গতিতে ধেয়ে আসা একটি বাস ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর পায়ে আঘাত করে। পরে সেই পা কেটে ফেলতেই হয়েছে। সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য খোঁজ নিতে এসেছিলেন এক মা। ছেলেধরা সন্দেহে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। কাগজে খবর ছাপা হয়েছে খ-কালীন চাকরির জন্য সাক্ষাতকার দিতে যাওয়া এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে পানীয়র সঙ্গে নেশাদ্রব্য মিশিয়ে খেতে দিয়ে অজ্ঞান করা হয়। তারপর পালাক্রমে তার ওপর চলেছে পাশবিক নির্যাতন। এসব উদাহরণ দেখে-শুনে সূচকের উন্নতির বিষয়টি বিবেকবানদের কাছে অর্থহীন বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু বিশ্বপর্যায়ে এর একটি তাৎপর্য নিশ্চয়ই রয়েছে।

কানের পোকা খসাতে...

নিজের বাসায় কোন ব্যক্তির আচার আচরণে ত্রুটি থাকলে তা শুধু পরিবারের মানুষের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পাবলিক প্লেসে, যেমন কোন সামাজিক অনুষ্ঠানের জমায়েতে কিংবা বাসের ভেতর অবাঞ্ছিত আচরণ করা হলে সেটা অন্য দশজনের বিরক্তির কারণ ঘটায়। এক সময় দেশে মোবাইল ফোনের চল ছিল না। হাটে-মাঠে-বাটে আর পাবলিক বাসে এত বাচালতারও সুযোগ ছিল না। এখন ঢাকা মহানগরীর পথে যারা বের হন তাদের প্রায় প্রত্যেকের কাছেই একটি করে মোবাইল থাকে বলেই অনুমান করি। বাসের ভেতর মোবাইল ব্যবহার নিয়ে বাসযাত্রীদের সচেতন করার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাসের ভেতর নানা উপদেশবাণী লেখা থাকত আগে। এখন কমই থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বাসের ভেতর স্টিকার লাগানোর সুপারিশ জানাতে হবে। তাতে বড় বড় করে দুটো বাক্য লেখা আবশ্যক : বাসের ভেতর মোবাইল ফোন সাইলেন্ট রাখুন। শুধুমাত্র জরুরী আলাপ সারুন নিচু গলায় অতি সংক্ষেপে। দেখে শুনে যথেষ্ট শিক্ষিতই মনে হয় এমন লোককেও দেখেছি বাসের ভেতর হাই ভলিউমে ফোন চালু রাখেন। উচ্চৈঃস্বরে তার ফোন বেজে চললেও তিনি ধরেন না, পাশের জন নোটিস করলে তখন ধরেন। আরও এক শ্রেণীর বাসযাত্রী আছেন যারা মোবাইলে একান্ত ব্যক্তিগত আলাপ বা ব্যবসায়িক আলাপ জোশ ও জোরের সঙ্গে চালিয়ে যান। এমনকি ঝগড়াঝাটিও করে থাকেন। তাদের কণ্ঠস্বরও এত চড়া যে বাসের প্রত্যেক যাত্রীর কানের পোকা খসিয়ে দিতে সক্ষম। এরা কবে প্রকৃত শহরবাসী হয়ে উঠবেন?

ভীতিকর মোটরসাইকেল

ঢাকায় হোন্ডাঅলাদের দৌরাত্ম্য নিয়ে এর আগেও লিখেছি, পত্র-পত্রিকায় ছবিসহ এসব অনিয়মের খবর ছাপা হয়। তবু অবস্থার কোন উন্নতি ঘটেনি। ট্রাফিক পুলিশকে ব্যবস্থা নিতেও তেমন শোনা যায়নি। তীব্র হর্ন দিতে দিতে ফুটপাথের ওপর মোটরসাইকেল তুলে দেয়ার ফলে পথিকদের কী বিপন্ন দশায় পড়তে হয় সে কথা শুধু ভুক্তভোগীই জানেন। প্রধান প্রধান সড়ক ছাড়াও আবাসিক এলাকার ফুটপাথে মোটরসাইকেল আরোহীদের নির্বিচার বেপরোয়া চলাচলে বিরক্ত বিব্রত এলাকাবাসী।

মোটরসাইকেল যাতে ফুটপাতের ওপর দিয়ে চলতে না পারে সেজন্য ২০১২ সালে হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছিল। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে ফুটপাথের ওপর যাতে মোটরসাইকেল উঠতে না পারে সেজন্য অনেক স্থানে স্টিলের পাইপ দিয়ে প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করা হয়েছে। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যানজটের কারণে সবাই দ্রত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ব্যাকুল। তাই যানজট সমস্যার সমাধান না হলে এ প্রবণতা ঠেকানো বেশ মুশকিল। পুলিশ বলছে, বেপরোয়া কিংবা ফুটপাথে মোটরবাইক চালানোর বিরুদ্ধে শহরের বিভিন্ন জায়গায় জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু আরোহীদের সচেতনতা ও মানসিকতা না বদলালে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। প্রায়শই রাস্তার এসব লাটভাইদের দৌরাত্ম্যে ভুক্তভোগীরা বিপন্নতা প্রকাশ করেন, ফেসবুকে ছবি দেন। কবে এর অবসান হবে?

৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

marufraihan71@gmail.com