২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চাকরির দোকান! ॥ সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের ভয়াবহ দৌরাত্ম্য

চাকরির দোকান! ॥ সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের ভয়াবহ দৌরাত্ম্য
  • র‌্যাবের অভিযান

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ খোদ রাজধানীতেই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র চাকরি দেয়ার দোকান খুলে বসেছিল। দিনের পর দিন চক্রটি দেশের বেকার তরুণ-তরুণীদের প্রলুব্ধ করেছে। চাকরির জামানত আদায়ের নামে কৌশলে রমরমা বাণিজ্য করে। যারাই এসেছেন তারাই প্রতারণার ফাঁদে অর্থ খুইয়েছেন। প্রতারণার দৌরাত্ম্য এখানেই থামেনি, তাদের একটি অফিসে দিনের পর দিন আটকে রেখে শারীরিক মানসিক নির্যাতনও চালিয়েছে। শেষ পর্যন্ত একজনের বুদ্ধিমত্তার জেরে র‌্যাব সেখানে অভিযান চালিয়ে আটক করেছে ৮ জনকে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে নির্যাতনের ভয়াবহ

কাহিনী। তাদের প্রতারণার শিকার দেড় শতাধিক তরুণ-তরুণীকেও উদ্ধার করে র‌্যাব। চাকরি দেয়ার নামে ওই তরুণ-তরুণীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে টাকা। দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়েছে রুমে। শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। নারীদেরও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। র‌্যাবের অভিযানে জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরলেন কয়েকজন।

লাইফওয়ে নামের ওই কোম্পানির সঙ্গে জড়িত যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন পাবনার আতাইকুলার ওবাইদুল হক (২৭), যশোরের অভয়নগর উপজেলার ইয়ামিন ইসলাম (২০), পাবনা সদরের নাজনীন সুলতানা নিশা (২৯) ও রাজশাহী চারঘাটের ইসমাইল হোসেন (২৭), জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জের মোঃ মর্তুজা (২৮), গাজীপুর জয়দেবপুরের হোসাইন আহম্মেদ খাঁন ওরফে শাহাদৎ (২২), রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আরিফ হোসেন ওরফে আহসান হাবিব (২০) ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আমিনুল ইসলাম (২২)।

সোমবার তাদের নিয়ে র‌্যাবও তথ্য প্রকাশ করে। উদ্ধারকৃতদের মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে প্রতারণা ও নির্যাতনের ভয়ঙ্কর কাহিনী। পটুয়াখালীর মৌসুমী বলেন কি আর বলব। কপালে যা ছিল তাই ঘটেছে। বন্ধুর পরামর্শে এসে টাকাও হারিয়েছি, সম্মানও হারিয়েছি। এরকম সময় যেন কারও জীবনে না আসে, সেটাই চাই। এখানে আসার সিদ্ধান্ত ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। বাবাকে হারিয়েছি আগেই, মায়ের কষ্টের টাকায় জেলা শহরে পড়ছিলাম। স্বপ্ন দেখতে গিয়ে জীবনটাই শেষ হতে চলেছে। মান-সম্মান, টাকা সবই গেল। অনেক সময় তারা বলত, বড় কোন জায়গায় পাঠাতে চাইলে যাবেন কি না। সরকারী বড় কর্মকর্তাদের কাছে গেলে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যাবে নাকি। রাজি না হওয়ায় খেতে দেয়া হয়নি। অন্য নারীকে দিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। র‌্যাবের অভিযানে আজ সেই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেলাম। যদি র‌্যাব এসে উদ্ধার না করত তাহলে কপালে কি ঘটত আল্লাহই জানেন।

শরীয়তপুরের তরুণ ফারুক হোসেন জানিয়েছেন কিভাবে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। অনেকদিন আগেই তিনি জেনেছেন বন্ধুর মাধ্যমে এখানে চাকরি দেয়া হয়। সামান্য কিছু জামানত লাগে। সেজন্যই এখানে এসে ধরা খেতে হয়েছে। এক বন্ধুর মাধ্যমে এসে প্রায় মাসখানেক জিম্মি থাকার পর উদ্ধার হওয়ার কাহিনী সম্পর্কে তিনি বলেন, লাইফওয়েতে চাকরি করার চেয়ে বাড়িতে না খেয়ে মরা ভাল। এদের ফাঁদে পড়ে যেন কেউ টাকা-পয়সা না দেয়। কারও প্ররোচনায় যেন চাকরি করতে না আসে কেউ। এখানে লোক ঠকানো ছাড়া কোন কাজ নেই। কোন পণ্য নেই, যা মার্কেটিং করে টাকা উপার্জন করা যেত। তাদের সবটাই প্রতারণা। বলতে শতভাগ প্রতারণা।

লাইফওয়ের প্রতারকদের ধরিয়ে দেয়ার মূল ভূমিকা পালনকারী হলেন মোহাম্মদ মিলন (২০)। তার বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলাইয়াপুর ইউনিয়নে। তিনি জানিয়েছেন তার প্রতারণার অবিশ্বাস্য কাহিনী। জিয়া নামের এক বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি উত্তরায় আসেন। গত ১৫ জুলাই উত্তরায় লাইফওয়ে কোম্পানির ওই অফিসে ঢোকার আগে তার বন্ধু জানান, এখানে যারা কাজ করেন, তারা সবাই সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। এখানে চাকরি করলে ভাল সুযোগ-সুবিধা আছে। এরপর অফিসে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেন মিলন। এই কোম্পানি সম্পর্কে সিনিয়র কর্মকর্তারাও বলেন, কোম্পানিতে কাজ হবে অনলাইনে এ্যাড দেয়া। পোস্ট হবে সিনিয়র এ্যাডভাইজার। মাসে ১৫ হাজার থেকে বিশ হাজার টাকা বেতন। থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা ফ্রি। তবে এখানে যোগ দেয়ার আগে জামানত হিসেবে ৫০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। আইডি কার্ড ও অন্যান্য বাবদ আরও ৫০০ টাকা দিতে হবে। টাকা দিতে সময় নিচ্ছিলাম। এরই মধ্যে বন্ধু জিয়া জানায়, সে ভাল আছে। চাইলেও মিলনও ভাল থাকতে পারবে। এটা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোম্পানি। এরা পালাবে না। ভাল চাকরি পেতে হলে টাকা কিছু দিতেই হয়। বন্ধুর পরামর্শে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা জামানত হিসেবে জমা দেই। তারপর আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি ভবনে। সেখানকার এক রুমে গিয়ে দেখি, আরও ১৫ যুবক। তারা আমাকে দেখেই একযোগে বলে ওঠেন কি করলেন ভাই। ধরা খেয়েছেন জনমের। এমন ভুল করেছেন কিভাবে। সবই প্রতারণা।

ওই অফিসে ভয়াবহ নির্যাতনের বিষয়ে মিলন সাংবাদিকদের বলেন, আমাকে কোম্পানির পক্ষ থেকে বোঝানো হয়, কারও কথা না শোনার জন্য বলা হয়। আমাকে খুশি রাখার জন্য বিভিন্ন সময় ডিজে পার্টিতে নিয়ে যেত। গাড়িতে করে ঘুরানো হতো। ভাল ভাল রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেত। এক সপ্তাহ পর কোম্পানির এক লোক এসে পরিচালক পরিচয় দিয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি রুমে আমাকে বলা হলো, অনেক দিন তো আরাম করলেন। এবার কাজ শুরু করেন। আপনার পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের এখানে ডেকে আনেন। শুধু আপনি ভাল থাকতে চান, নাকি কাছের বন্ধু-বান্ধবদেরও ভাল রাখতে চান? মিলন বলেন, তাদের কথায় রাজি না হলে আমাকে প্রথমে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। তিন দিন খেতে দেয়া হয়নি আমাকে। এরপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে ভাল বন্ধু রুবেল ও ফরহাদকে ডেকে নিয়ে আসি। তাদের বুঝিয়ে বলি, আমি ও জিয়া এখানে টাকা দিয়েছি। ভাল চাকরি করছি। তোরাও টাকা দে, ভাল হবে। আমার কথা মতো রুবেল ও ফরহাদ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা করে দেয়। এভাবে তারাও আরও কয়েকজনকে নিয়ে আসে এবং তারাও একই পদ্ধতিতে টাকা দেয় কোম্পানিতে। তখন একটি রুমে থাকা-খাওয়া ছাড়া আর কোন কাজ নেই এখানে। আমরা সবাই বুঝতে পারছি যে এখানে লোক এনে টাকা দেয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। একটা রুমের মধ্যে ১২ থেকে ১৭ জনকে আটকে রাখা হতো। কেউ ঝামেলা করলে তাকে অন্য জায়গায় নিয়ে রাখা হতো। নতুন ও পুরনোদের এক জায়গায় রাখা হতো না। অনেক মেয়ে বন্ধুকেও নিয়ে আসতে বাধ্য করেছে কোম্পানির কর্মকর্তারা। তবে আমি কোন নারীকে নিয়ে আসিনি। আর বন্ধু জিয়া পরে আমার কাছে স্বীকার করেছে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরেই আমাকে নিয়ে এসেছিল এই প্রতারণার ফাঁদে। নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে গত সপ্তাহে এক মামাকে খুলে বলি। পরে সেই মামা র‌্যাব-১-এ অভিযোগ দিলে তারা অভিযান চালায়। তবে সবাইকে উদ্ধার করা যায়নি। নোয়াখালী থেকে যে ১৫ জনের মতো এসেছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র তিনজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১২ জনের কাউকে এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। মিলন বলেন, এখানকার কয়েকজন কর্মকর্তা কক্সবাজারে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে গেছেন। আমাদের সঙ্গের কয়েকজনকে তারা নিয়ে গেছেন। আমরা র‌্যাবের কাছে তাদের কথা বলেছি। র‌্যাব আশ্বস্ত করেছে এ চক্রের সবাইকে ধরা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-১-এর অভিযান চালানো কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার সুজয় সরকার বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়। তদন্তে সত্যতা মেলায় উত্তরার তুরাগ এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৮ প্রতারককে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী ওই এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে দেড়শ তরুণ-তরুণীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জন নারী। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এসব বেকার তরুণ-তরুণী চাকরির আশায় এসেছিলেন। জামানতের নামে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা করে নেয়া হয়েছে প্রত্যেকের কাছে। টাকা দেয়ার পর এক থেকে দুই মাস প্রশিক্ষণ শেখানোর নামে যে কৌশল অবলম্বন করা হয়, তা মূলত প্রতারণার কৌশল। টাকা দিতে পারলে কিছু কমিশন পাওয়া যায়। প্রশিক্ষণের সময় প্রতারক চক্রের সদস্যরা ভিকটিমের মোবাইল ফোন নিয়ে নিজেদের কাছে রেখে দেয় এবং তাদের নজরবন্দী করে রাখে, যেন তারা বাড়িতে কিংবা বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে। এছাড়াও ভিকটিমরা নিজেদের মধ্যে যেন ঘনিষ্ট হতে না পারে, সেজন্য ঘন ঘন তাদের রুম পরিবর্তন করানো হয়। অনেকে এই কাজে অস্বীকৃতি জানায় এবং জামানত ফেরত চায়। যারা তাদের সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের জামানতের টাকা ফেরত না দিয়ে খালি স্ট্যাম্পে নেয়া সইয়ের কথা বলে ভয় দেখানো হতো। এছাড়াও প্রতারক চক্রটি নিজেদের সামরিক বাহিনীর সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে হুমকি দিয়ে আসত। তারাও নিরুপায় হয়ে তাদের সব কথা মেনে নিতে বাধ্য হতো। তিনি বলেন, যেখানে চাকরি করবেন সেখানকার সবকিছু যাচাই-বাছাই করে যোগ দেবেন। কারও কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চাকরি বা চাকরির নামে টাকা লেনদেন না করার পরামর্শ দেন তিনি। এ ঘটনায় তুরাগ থানায় ভুক্তভোগী মোহাম্মদ মিলন বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। বাকিদেরও ধরার চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে র‌্যাবের মুখপাত্র কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের আরও অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রাজধানীতে প্রতারণার দোকান খুলে বসেছে। এর আগেও গাজীপুর থেকে একই প্রকৃতির প্রতারকদের গ্রেফতার করেছি। রাজধানীতে আরও কয়েকটি কোম্পানির তথ্য হাতে পেয়েছি। তাদের ওপর নজরদারি চলছে। যে কোন সময় অভিযান চালিয়ে এ্যাকশন নেয়া হবে। এভাবে বেকার তরুণ তরুণীদের প্রতারণার মাধ্যমে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়া হবে এটা কিছুতেই বরদাশত করা হবে না। এ বিষয়ে র‌্যাব কঠোর পদক্ষেপ নেবে।