০৫ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শীর্ষ ছাত্রলীগ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ

  • ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ;###;কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার খবরে সংগঠনে ফিরছে প্রাণচাঞ্চল্য

বিভাষ বাড়ৈ/মুনতাসির জিহাদ ॥ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার হাত ধরে সম্মেলনের মাধ্যমে অনেকটা চমক নিয়েই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শীর্ষ পদে এসেছিলেন দুই নেতা। মেধাবী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব গঠনের জন্য কঠোর যাচাই-বাছাইও হয়েছিল অসংখ্য আগ্রহী নেতার। তবে কমিটিতে শীর্ষ নেতৃত্বে যারা এসেছিলেন তারা বিবাহিত, অছাত্র, রাজাকারের সন্তানসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের অন্তর্ভুক্তি, স্বেচ্ছাচারিতা, ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে তাদের অবস্থান এখন প্রশ্নের মুখে। এদিকে দুই নেতার কর্মকা-ে চরম ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। অবশ্য ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার নির্দেশে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরছে সংগঠনে। খুশি পদধারী নেতাকর্মীরাও। গুঞ্জন উঠেছে, মেয়াদপূর্তির আগেই হতে পারে ছাত্রলীগের সম্মেলন।

ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সংগঠনের মধ্যে অসন্তোষ ছিল শুরু থেকেই। এরপর প্রায় ছয় মাস ধরে চলছে ত্যাগী ও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। এমন অবস্থার মধ্যেই এবার প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কঠোর ক্ষোভের বহির্প্রকাশ সাড়া ফেলেছে ছাত্র সংগঠনটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের প্রতিটি নেতাকর্মীর মাঝে। তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ক্ষোভের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করলেও তিনি কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন কিনা তা নিয়ে কৌশলী বক্তব্য দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। ছাত্রলীগ দেখভালের জন্য যেসব আওয়ামী লীগ নেতার দলীয় সভাপতি দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের কেউ কেউ কৌশলী বক্তব্য দিয়ে ছাত্র সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যর্থতা আড়াল করতে চাইছেন বলে মনে করছেন সাধারণ নেতাকর্মীরা। তবে সবাই স্বীকার করছেন শীর্ষ দুই নেতার কর্মকা-ে ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনার কাছে জমা হয়েছে অভিযোগের পাহাড়। দুই নেতা কোথায় কী করেন? কিভাবে সংগঠন চালাচ্ছেন, কোন্্ কোন্্ আওয়ামী লীগ নেতা তাদের অপরাধ আড়াল করে রক্ষা করতে চান কিংবা ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ছাত্রলীগকে কিভাবে কে কে বিতর্কিত করছেন তার সব তথ্যই জানেন প্রধানমন্ত্রী।

অনেক আশা নিয়ে হয়েছিল আলোচিত সম্মেলন ॥ এর আগে ছাত্রলীগে বহু বছরের সিন্ডিকেটের দাপট, অনুপ্রবেশকারী, অপরাধীদের সদস্যপদ গ্রহণসহ নানা বিতর্কের মধ্যে গত বছর নির্বাচনের পরিবর্তে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার মাধ্যমে সংগঠনটির নেতৃত্ব নির্ধারণের দাবি উঠেছিল। বিষয়টিতে ইতিবাচক সাড়াও দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলন হয় গত বছরের ২৯ এপ্রিল। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তরের সম্মেলন হয় যথাক্রমে ২৫ ও ২৬ এপ্রিল। এরপর ১১ ও ১২ মে নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে ছাত্রলীগের দুই দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন হয়। নির্বাচন না হলেও এবার ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের লক্ষ্যে আগ্রহীদের কঠোর ও ব্যাপক তথ্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া ছিল আলোচিত ঘটনা।

খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ উদ্যোগে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ছাড়াও নানা মাধ্যমে অনুসন্ধান করা হয় নেতৃত্বে আসতে আগ্রহী প্রায় আড়াই শ’ নেতাকর্মীর। তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয় আবেদন করেননি এমন নেতাকর্মীদেরও, যারা সংগঠনের নেতৃত্বে আগ্রহী। মূলত তাদের প্রিয় নেত্রীর হাত দিয়ে কমিটি হচ্ছে এই আশায় অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এবার ছাত্রলীগের বিভিন্œ পদে আসার প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি লক্ষ্য করা গেছে। নেত্রী পদ দিচ্ছেন এমন তথ্যে নেতাকর্মীদের আস্থাও এবার অনেক বেশি দেখা যায়।

এমন অবস্থার মধ্যে গত বছরের ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এরপর থেকেই পূর্ণাঙ্গ কমিটির জন্য শুরু হয় কয়েক হাজার নেতাকর্মীর অপেক্ষা। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হচ্ছে প্রায় এক বছর ধরে প্রতিমাসেই এমন খবর চাউর হয়েছে বহুবার। কিন্তু কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় বাড়তে থাকে অসন্তোষ। নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ প্রতিবাদের আকারে যেতে সময় লাগেনি। কেন্দ্রীয় দুই নেতার কর্মকা-ে দূরত্ব বাড়তে থাকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখা কমিটির সঙ্গেও।

কেন্দ্রীয় নেতাদের আগের মতো ক্যাম্পাসে না পাওয়া, বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের নতুন প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সভাপতি-সেক্রেটারির জন্য আলাদা অফিস কক্ষ থাকার পরেও সেখানে কালেভদ্রে হাজির হওয়া, ঢাবি ইউনিটির সঙ্গে সংগঠনের কাজে চরম সমন্বয়হীনতার কারণে নষ্ট হতে থাকে সংগঠনের শৃঙ্খলা।

কমিটি গঠন, তবে অভিযোগের শেষ নেই ॥ এরই মধ্যে বিতর্কিত এক কমিটি দিয়ে নেতারা বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে ফেলে দেন সংগঠনকে। কমিটিতে পদপ্রাপ্ত বিবাহিত, অছাত্র, রাজাকারের সন্তান, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের স্থান দেয়াকে কেন্দ্র করে হয় সংঘর্ষ। মধুর ক্যান্টিনে হামলার শিকার হন নেত্রীরাও। বিবাহিত, অছাত্র, রাজাকারের সন্তান, ব্যবসায়ীসহ অপরাধীদের বহিষ্কারের দাবিতে ক্যাম্পাসজুড়ে শুরু হয় লাগাতার আন্দোলন। অপরাধে জড়িতদের বহিষ্কারের দাবিতে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে টানা অবস্থান কর্মসূচী পালন করেছেন প্রতিবাদী নেতৃবৃন্দ। যেখানে ঈদও পালন করেছেন তারা। কোন সমাধান না পাওয়ায় অনশনও করেছেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের অন্তর্ভুক্ত করে ছাত্রলীগের কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন গত ১৫ মে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের চার মাস পার হলেও ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ ও বিতর্কের সমাধান হয়নি। উল্টো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিয়ে ধুয়াশা ছড়ানো হয়। ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা ১৭ বিতর্কিত নেতার নাম প্রকাশ করে বহিষ্কারের জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু এই ঘোষণার প্রায় চার মাস পরও ফল পাননি নেতাকর্মীরা। বরং তালিকাবিহীন ১৯ টি পদ শূন্য ঘোষণা করা হয়। কাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং কোন পদগুলো শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে এ নিয়ে নতুন করে সমালোচনা মুখে পড়েন শোভন-রাব্বানী।

দীর্ঘ ১৪ মাসে একটি ইউনিটেরও কমিটি করতে পারেননি তারা। জেলা কমিটিকে উপেক্ষা করে কেন্দ্র থেকে কয়েকটি উপজেলা কমিটি দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে উঠেছে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ। টেন্ডার বাণিজ্যে বাধা দূর করতে সামান্য অজুহাতে ভেঙ্গে দেয়া হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি। বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের কমিটি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের টেন্ডার থেকেও কোটি টাকা নেয়ার অভিযোগে এখন অস্থিরতা ক্যাম্পাসে।

দুপুরের আগে ঘুম থেকে না ওঠা বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ। তৃণমূলের নেতারা তাদের খুব একটা সাক্ষাত পান না। বিশেষ করে ছাত্রলীগ সভাপতিকে অনেক জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ফোন করেও পান না। ঢাকায় এলেও শোভনের সাক্ষাত মেলে না। মধুর ক্যান্টিনেও অনিয়মিত। শীর্ষ নেতারা মধুতে মাঝেমঝে আসেন দুপুরের পর। অল্প সময় থেকেই চলে যান তারা। ফলে ছাত্রলীগের মধুর ক্যান্টিন কেন্দ্রিক রাজনীতি নেই। সময় দেন না দলীয় কার্যালয়েও। তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ফলে তৃণমূলে প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা অঘটন। জেলা কমিটির নেতারা হামলার শিকার হলে একটা বিবৃতিও দেন না। গত শুক্রবার সিলেট থেকে ফেরার পথে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছাত্রলীগ সভাপতি শোভনের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার এবং তাকে এগিয়ে দিতে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিমানবন্দরের টারমাকে চলে আসার ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করে। ঘটনায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ক্ষুব্ধ।

সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্ধারিত সময় সকাল ১১টায় এলেও শোভন-রাব্বানী আসেন বিকেল তিনটায়। ততক্ষণ পর্যন্ত মন্ত্রী ক্যাম্পাসেই অবস্থান করছিলেন। প্রচ- গরমে ভোর থেকেই নেতাকর্মীরা সম্মেলনস্থলে অবস্থান করায় হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সুলতান মোহাম্মদ ওয়াসী নামে সংগঠনটির এক কর্মী।

এ ঘটনার পর সংবাদ মাধ্যমসহ সামাজিক মাধ্যমে তখন সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের গাফিলতিকেই দায়ী করা হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ছাত্রলীগের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আসার অনেক পরে তারা আসেন। সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদের একটি অনুষ্ঠানেও একই ঘটনা ঘটে। এসব বিষয় দলটির কোন পর্যায়ের নেতাই ভালভাবে নেননি।

শোভনের ছোট ভাই রাকিনুল হক চৌধুরী ছোটন ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। অভিযোগ উঠেছে ভাই সভাপতি হওয়ায় ছোটন তার বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে (যারা রাজনীতির সঙ্গে কখনই সক্রিয় ছিল না) কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়ও ছোটন ও তার বন্ধুরা বিকল্প গ্রুপ তৈরি করে নানা অপকর্মে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ছোটনের তালিকায় যারা নেতা হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই বিএনপি-জামায়াত পরিবারের, অছাত্র কিংবা ব্যবসায়ী। এক জামায়াত নেতার ছেলেকে ছাত্রলীগের উপদফতর সম্পাদক বানিয়েছেন ছোটন।

একের পর এক অভিযোগ জমেছে দুই নেতা বিরুদ্ধে। অভিযোগ কমিটিতে আর্থিক লেনদেন, মাদক সেবন, টেন্ডার ও তদবির বাণিজ্যসহ নানা ধরনের অপরাধ ও অনৈতিক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়েছেন তারা। নেতাদের কর্মকা- ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে নানা আলোচনা। এ নিয়ে বিব্রত খোদ সভাপতি শেখ হাসিনা। দলীয় ফোরামে একাধিকবার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তিনি। ছাত্রলীগের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চার নেতার কাছেও একাধিকবার বর্তমান কমিটির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যারা তাদের পক্ষে কথা বলেছেন সতর্ক করেছেন তাদেরও।

এবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে পবিত্র কোরান খতম ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছিল ছাত্রলীগ। অনুষ্ঠানের পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে যায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের পাতা। কিন্তু রীতিমতো ছাত্রশিবিরের মতো পোস্টার তৈরি, জাতির জনক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার না করা ও চিহ্নিত জামায়াতীদের অনুষ্ঠানে অতিথি করা নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়। সমালোচনার ঝর বইতে থাকে নেতাকর্মীর মাঝে।

এমন অবস্থার মধ্যেই শনিবার রাতে ছাত্রলীগের কমিটি ভাঙ্গার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী-এমন খবরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। জানা যায়, গণভবনের ওই বৈঠকের এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির কর্মকা- ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই সময় উপস্থিত নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি ছাত্রলীগের এমন নেতা চাই না, যাদের বিরুদ্ধে মাদকের অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে।

এসব বিষয়ে সরাসরি উত্তর না দিলেও সাংবাদিকরা জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, শনিবার গণভবনের বৈঠকটি ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙ্গে দেয়া সংক্রান্ত ছিল না। সেখানে ছাত্রলীগের বিষয়ে কী আলোচনা হয়েছে, সেটা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না। ছাত্রলীগের কর্মকা- নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, কিছু কিছু ব্যাপারে তো থাকতেই পারেন। ছাত্রলীগের বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু কিছু ব্যাপার আছে, সেগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কনসার্ন থাকতেই পারেন, এটা খুব স্বাভাবিক।

নেত্রীর অবস্থানে খুশি নেতাকর্মীরা সরব ॥ এদিকে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অবস্থানে খুশি নেতাকর্মীরা। সাবেক প্রচার বিষয়ক সম্পাদক সাইফ বাবু বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই কাউকে কোন ধরনের গুরুত্ব দেয় না। বরং যারা সংগঠনকে নিজের মধ্যে ধারণ করত, খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানত, তাদেরকে কমিটি থেকে বাদ দিয়ে বিতর্কিত, অতীত অভিজ্ঞতাহীন এবং বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্তদের কমিটিতে জায়গা দিয়েছে। এই যে তাদের সাংগঠনিক ত্রুটি-বিচ্যুতি এগুলো মূলত তাদের অভিজ্ঞতার অভাবে। তাদের আশেপাশে এমন কেউ নেই যারা অতীতে সংগঠনের কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। আমার পরামর্শ থাকবে অভিজ্ঞদের আশপাশে রাখলে সাংগঠনিক দুর্বলতা কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারবে।

সাবেক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন বলেন, শেখ হাসিনার কোন আশা তারা পূরণ করতে পারেনি। তেমনি ছাত্রলীগের কর্মীদের আকাক্সক্ষাও পরিবর্তন করতে পারেনি। ছাত্রসমাজ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই নতুন সম্মেলনের মাধ্যমে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব সৃষ্টি করা উচিত।

সাবেক স্কুলছাত্র বিষয়ক সম্পাদক জয়নাল আবেদীন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে উদ্দেশ করে ফেসবুক পেজে লেখেন, যারা আপার(প্রধানমন্ত্রী) কথা কোড করে মিথ্যা ও বানোয়াট নিউজ ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধে (দেশের সব জাতীয় পত্রিকা) মামলা হওয়া উচিত। আর আপা যদি সত্যি কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনারা (ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) পোলাপান দিয়ে গণভবন সূত্র দিয়ে কেন মিথ্যাচার করাছেন? এর জবাবও আপনাদের দিতে হবে।

ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার অনেক দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার বিষয়ে বিগত কমিটির সমাজসেবা সম্পাদক রানা হামিদ বলেন, আমাদের দেশের দাফতরিক কাজগুলো কি রাতে হয়? প্রিয় হাসু আপা কি দাফতরিক কাজগুলো রাতে করেন? তবে তিনি ঘুমান কখন? সারাদিন তো টেলিভিশন অথবা অনলাইন নিউজে হাসু আপাকে দেশের জন্য কাজ করতে দেখি। তবে কি আপা মুমান না? যুবলীগ, স্বেছাসেবকলীগের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক মহোদয়রাই বা কখন কাজ করেন? দিনে নাকি রাতে? সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী মহোদয়রাই বা কখন কাজ করেন? কখনই তো তেনারা রাতের বেলা দাফতরিক কাজ করেন না অথবা কর্মীদের সঙ্গে সভা করেন না। ও আপনারা কয়টা কর্মিসভা রাতের বেলায় করেছেন তারও কোন হদিস পাওয়া যায়নি, শুনেছি কর্মীরা রাত ৪টা পর্যন্ত শুধু কথা বলার জন্যই আপনাদের বাসার সামনে অপেক্ষমাণ থাকে। তবে কি আমি হিসাব বুঝি না? দয়া করে ঘুমের হিসাবটা মিলিয়ে দেবেন।

সাবেক দফতর বিষয়ক উপসম্পাদক শেখ নকিবুল ইসলাম সুমন বলেছেন, সবাইকে ভূগোল বোঝানো গেলেও, বঙ্গবন্ধু তনয়াকে ভূগোল বোঝানো সম্ভব নয়। অযোগ্য, অথর্ব লোকজন দিয়ে আর কত? জয় হোক আদর্শবান প্রকৃত ছাত্রলীগের। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মেহেদী হাসান রনি বলেন, ছাত্রলীগের কমিটি কখনও এক বছরের বেশি মেয়াদ থাকাটা জরুরী নয়। তাছাড়া অমানবিক মনোভাবাপন্ন ও উগ্র সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি থেকে সংগঠন মুক্ত রাখা দরকার। ঢাবিতে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে আগুন দেয়া, পদবঞ্চিতদের নির্যাতন করে বিতর্কিতদের পুনর্বাসন, সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতিকে মারধর, এফ আর হলের সেক্রেটারির রুম ভাংচুর খুবই দুঃখজনক। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী যদি সত্যি এই নির্দেশ দিয়ে থাকেন তাহলে আর এই কমিটির কার্যকারিতা নেই, এই কমিটি এমনিতেই ভেঙ্গে গেছে। আর যদি এই নির্দেশ না দিয়ে থাকেন তাদের আগামী সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। একথা সত্য, তাদের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি সৈয়দ আরিফ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে ছাত্রলীগ। তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিতর্ক হচ্ছে সে ব্যাপারে নেত্রী ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার কথা বলেছেন। যেটি আমরা বিভিন্ন অনলাইন সংবাদে দেখেছি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, এটির বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। আমার প্রত্যাশা একটাই, আমাদের অভিভাবক শেখ হাসিনা যেভাবে ছাত্রলীগ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন, তার ওপর আস্থা রেখে নগণ্য কর্মী হিসেবে সেটা মাথা পেতে নেব।

ডাকসুর সদস্য ও ছাত্রলীগ নেতা তানভীর হাসান সৈকত বলছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে নেত্রী তাদেরকে নানানভাবে বলছে, তাও তাদের সাংগঠনিক পরিবর্তন আসেনি। ত্যাগীদের কমিটিতে আনা পরের কথা বিতর্কিতদেরকেই তো বাদ দিতে পারেনি। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কমিটিগুলো করছে। মধুর ক্যান্টিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে বহুবার চেষ্টা করেও সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী জনকণ্ঠকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী আমাদের মায়ের মতো। তিনি আমাদের শাসন করেছেন। আমি মনে করি, এটা সন্তানের জন্য সতর্কতা। আমরা নিশ্চই আমাদের নেত্রীর আশানুরূপ কাজ করতে পারিনি। আশা করি, নেত্রীর সতর্কতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সঠিকভাবে কাজ করতে পারব। আমি সবার সহযোগিতা নিয়ে কাজ করতে চাই।

নির্বাচিত সংবাদ