২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দারিদ্র্য বিমোচনে শেখ হাসিনার কর্মসূচীর প্রশংসা সিপিসির

  • বাংলাদেশ সফল হবে ॥ চীনে সেমিনারে আশা

ওবায়দুল কবির, গুইচৌ, চীন থেকে ॥ বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও দরিদ্র মানুষকে আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন করে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)। সোমবার চীনের গুইচৌ প্রদেশের চোনি শহরে সিপিসি স্কুলের সম্মেলন কক্ষে সফররত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল ও সিপিসি নেতাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে তারা বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশ যে সংগ্রাম করে যাচ্ছে তা প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেসব কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে তাতে লক্ষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ সফল হবে। সেমিনারে সিপিসি নেতারা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গৃহীত চীনের দারিদ্র্র্য বিমোচনে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কর্মসূচী তুলে ধরে বলেন, আমরা আশা করি এসব। অপর দিকে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রকল্প তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ আশা করে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাবে। পরে দুই পক্ষের নেতারা আশা প্রকাশ করেন, পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ে দুই দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে।

সিপিসি নেতাদের বক্তব্যে এবং বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের নেতা প্রেসিডিয়াম সদস্য এ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলেছে। তিনি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনের প্রতি বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। আমাদের সরকারের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্যতম লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ কিছু আর্থসামাজিক কর্মসূচী বাস্তবায়ন করে আসছে। এই সব পদক্ষেপের ফলে গত দশ বছরে দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বেশ কিছু কর্মসূচী গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে ‘আমার বাড়ি-আমার খামার’ (যা আগে নাম ছিল, ‘একটি বাড়ি-একটি খামার’)। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী ৭০ শতাংশ মানুষের জীন মানের উন্নয়ন করে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেয়া। ‘ক্ষুদ্র ঋণ নয়, ক্ষুদ্র সঞ্চয়’-এর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করার শেখ হাসিনার এই ধারণা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এনজিওদের প্রতি নির্ভরশীলতা কমিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিজস্ব অর্থে আত্মনির্ভরশীল এবং মর্যাদা সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হচ্ছে এর লক্ষ্য। প্রকল্পের ধারণা অনুযায়ী প্রতি গ্রামে ৬০টি পরিবার নিয়ে গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা (ভিডিও) গঠন করা হচ্ছে। ২০২০ সালে সারাদেশে এমন এক লাখ সংস্থা গঠনের কাজ শেষ হবে। এসব সংস্থায় যুক্ত হবে ৬ লাখ পরিবার। পর্যায়ক্রমে সারা বাংলাদেশকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গঠন করা হয়েছে পল্লী উন্নয়ন ব্যাংক। যে কোন কৃষক মাত্র দশ টাকায় ব্যাংকে হিসাব খুলতে পারছে।

প্রকল্পের ধারাপত্রে বলা হয়, প্রতি সদস্য মাসে দুইশত টাকা ব্যাংকে জমা দেবে। সরকারের পক্ষ থেকে জমা দেয়া হবে আরও দুইশত টাকা। এতে সদস্যদের একটি নিজস্ব পুঁজি দাঁড়াবে। এই পুঁজি কাজে লাগিয়ে সংস্থাগুলো প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ, আয় বৃদ্ধির কর্মসূচী পরিচালিত করতে পারবে। গড়ে তুলতে পারবে ক্ষুদ্র খামার। বিনিয়োগ করতে পারবে ব্যবসা-বাণিজ্যে। আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্বাস করে, এই কর্মসূচীর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে। বাংলাদেশ পক্ষের বক্তব্য শেষে সিপিসি নেতা সি ইউপো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহীত প্রকল্পগুলোর প্রসংশা করে বলেন, আশা করি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে।

এর আগে সিপিসির পক্ষ থেকে পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষিত দারিদ্র্য বিমোচনের একটি মডেল উপস্থাপন করা হয়। এটি উপস্থাপন করেন, সিপিসি নেতা লিং হোন। এতে বলা হয়, মিস্টার শি জিনপিংয়ের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচীর ছয়টি প্রধান দিকনিদের্শনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, কে দরিদ্র এবং কেন দরিদ্র তা খুঁজে বের করা। এই জন্য দারিদ্র্য কবলিত এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করে সরকার এবং দলের উর্ধতন কর্মকর্তাগণ দরিদ্রের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করেন। পাওয়ার পয়েন্টে উপস্থাপনে দেখানো হয়, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজেও দারিদ্র্য কবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন।

চীনের সাধারণত পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে দারিদ্র্যের সংখ্যা বেশি। একেক এলাকায় দারিদ্র্যের কারণেও ভিন্নতা রয়েছে। দারিদ্র্যের সঠিক কারণ নির্ধারণ করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। সরকার এবং দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সমম্বয়ে এসব কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা। এসব পদক্ষেপের ফলে চীনের দারিদ্র্যের সংখ্যা নেমে এসেছে এক দাশমিক সাত শতাংশের নিচে। সিপিসি আশা করে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে চীন সম্পূর্ণ দারিদ্র্যমুক্ত হবে।

সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সিপিসি নেতাদের পারস্পরিক প্রশ্নের জবাব দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলের নেতা আবদুল মতিন খসরু ছাড়াও প্রশ্ন করেন দীপঙ্কর তালুকদার, আমিনুল ইসলাম আমিন, আবদুস সবুর, আজমতউল্লাহ খান, এবিএম রিয়াজুল কবির কাওছার, কামাল চৌধুরী, সেলিম মাহমুদ প্রমুখ। সিপিসির পক্ষে আলোচনায় অংশ নেন লিং হোন এবং সি ইউ পো ছাড়াও সিএ ইউ চৌ, ইয়ান চেন ইউ, জং ইউ লান প্রমুখ। এছাড়াও এই সেমিনারে অংশ নেন আওয়ামী প্রতিনিধি দলের সদস্য আফজাল হুসেইন, হারুনুর রশিদ, দীপঙ্কর তালুকদার, আমিরুল আলম মিলন, রফিকুর রহমান, বাসন্তী চাকমা এমপি, নাজমুল আলম ভূঁইয়া, তরুণ কান্তি দাস প্রমুখ।

দুই পক্ষের পারস্পরিক প্রশ্নে উঠে আসে দুই দলের কাঠামো ও কর্মপন্থা। বিভিন্ন প্রশ্নে সিপির নেতারা জানান, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক হচ্ছে সিপিসির পলিট বুরে‌্যা। সরকার এই নীতি বাস্তবায়ন করেন। নীতি বাস্তবায়নে দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা দায়ভুক্ত থাকেন। প্রাদেশিক কমিটি দায়ভুক্ত থাকেন নীতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে। সরকারের নানা সংস্থা নীতি বাস্তবায়ন করে থাকে। গ্রাম পর্যায়ে দলের কমিটি গঠন করা হয সরাসরি সাধারণ মানুষের ভোটে। পরবর্তী পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কমিটি নির্বাচিত হয় দলীয় সদস্যদের ভোটে। সিপিসি নেতাদের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের দলের সকল পর্যায়ে দলীয় সদস্যদের ভোটে নেতা নির্বাচিত হলেও স্থানীয় সরকারের প্রত্যেক স্তর যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদে নেতা নির্বাচিত হন সরাসরি সাধারণ মানুষের ভোটে। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এসব নির্বাচনে ত্রিশ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারক হচ্ছে জাতীয় সংসদ। সাধারণ মানুষের সরাসরি ভোটে সংসদ নির্বাচিত হয়। রাষ্ট্রের সকল নীতি নির্ধারণ করা হয় সংসদ থেকে। সরকার এসব নীতি বাস্তবায়ন করে। নীতি বাস্তবায়নে প্রধান ভূমিকা পালন করেন স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ।

সেমিনার শেষে সিপিসির পক্ষ থেকে সি ইউ পো আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা আশা করি উন্নয়ন সহযোগী দুই রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।