২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বৃষ্টিও বাঁচাতে পারল না সাকিবদের

বৃষ্টিও বাঁচাতে পারল না সাকিবদের

মোঃ মামুন রশীদ ॥ চট্টগ্রামে টেস্টের নবীন সদস্য আফগানিস্তানের কাছে লজ্জার হারই শেষ পর্যন্ত জুটল স্বাগতিক বাংলাদেশ দলের। স্বাগতিকদের একমাত্র আশা ছিল প্রবল বৃষ্টি, সেই বৃষ্টি অঝোর ধারায় ঝরেছে কিন্তু ৭০ মিনিট খেলা হয়েছে পঞ্চম ও শেষদিনে। তাতেই ২২৪ রানের অবিস্মরণীয় এক জয় তুলে নিয়েছে আফগানিস্তান ক্রিকেট দল। ৩৯৮ রানের জয়ের লক্ষ্যে আগের দিন ৬ উইকেটে ১৩৬ রান নিয়ে খেলতে নেমে রশীদ খানের ধ্বংসাত্মক বোলিংয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৭৩ রানেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকেই ব্যাট হাতে ফিফটি এবং বল হাতে ১১ উইকেট নিয়ে বিরল এক রেকর্ড গড়ে আফগানদের এ জয় পাইয়ে দেন রশীদ খান। প্রথম ইনিংসে তিনি ৫ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট তুলে নেন।

চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে চতুর্থ দিনেই হানা দিয়েছিল বৃষ্টি। আফগান ইতিহাস রচিত হওয়ার জন্য একমাত্র বাধাই হয়ে উঠেছিল প্রকৃতি। সে কারণে চতুর্থ দিন প্রায় ৪০ ওভার খেলা হয়নি। না হলে হয়ত সেদিনই স্বাগতিক বাংলাদেশের ললাটে কলঙ্কজনক হারের তিলক অঙ্কিত হয়ে যেত। কিন্তু বৃষ্টি অপেক্ষায় রাখে আফগানদের। বাংলাদেশ দল কায়মনে প্রার্থনা করেছিল পঞ্চম ও শেষদিনে প্রবল বৃষ্টির। খেলা না হলেই শুধু লজ্জা আড়াল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আর অলৌকিক কিছু করার কথাও বড়াই করে বলেছিলেন ৩৯ রানে অপরাজিত থাকা অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। ৬ উইকেটে ১৩৬ রান নিয়ে চতুর্থ দিন শেষ করেছিল বাংলাদেশ। তখনও জয় থেকে ২৬২ রান দূরে বাংলাদেশ। একদিনে সেটি করা অসম্ভব নয় হাতে থাকা ৪ উইকেটে, কারণ অনিশ্চয়তায় ভরপুর ক্রিকেটে এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটে। আর সাকিব ও সৌম্য সরকারের মতো দু’জন স্বীকৃত ব্যাটসম্যান ক্রিজে থাকায় কেউ কেউ অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটার আকাশ-কুসুম কল্পনাটাও করেছিলেন। তবে সবাই চেয়েছিলেন পঞ্চম দিন বৃষ্টিতে খেলা না হোক, অলৌকিক কিছুর ওপর তো আস্থা রাখা যায় না। আফগানরা হয়ত কায়মনে অন্তত এক/দেড় ঘণ্টা খেলা হোক এমনটাই চেয়েছিল। দু’দলের কথাই হয়ত বিবেচনা করেছিলেন বিধাতা।

সোমবার পঞ্চম দিনের খেলা বৃষ্টির দাপটে শুরু হয় দুপুর ১টায়। আম্পায়াররা জানিয়েছিলেন ৬৩ ওভার খেলা হবে। এ কয়েক ওভারে বাকি ২৬২ রান করা প্রায় অসম্ভব এক লক্ষ্য টেস্ট ম্যাচে। আর যদি হাতে উইকেট বলতে ৪টিই থাকে তাহলে তো জয়ের আশা বাদই দেয়া উচিত। তাই টিকে থাকার সংগ্রামটাই আসল। শুরুটা ভালভাবেই করেছিলেন সাকিব-সৌম্য। কিন্তু মাত্র ১৩ বল হতেই বাংলাদেশ যখন ৬ উইকেটে ১৪৩ রানে তখন বৃষ্টি আবার ফিরে আসে। খেলা বন্ধ থাকে ৩ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। পরে আবার খেলা শুরু হয়, আম্পায়াররা জানিয়েছিলেন ১৮.৩ ওভার খেলা হবে। নতুন করে এই শুরুর পর প্রথম বলেই ব্যক্তিগত ৪৪ রানে সাকিব বাজে একটি শট খেলে জহির খানের স্পিনে সাজঘরে ফেরেন। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ এসে ব্যক্তিগত ৬ রানে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে যান জহিরের বলে। এরপরও বাকি ওভারগুলো টিকে থাকতে পারেনি বাংলাদেশের বাকি ব্যাটসম্যানরা। রশীদের ঘূর্ণি তোপের মুখে মিরাজ (১২) ও তাইজুল ইসলাম (০) এলবিডব্লিউ হয়ে সাজঘরে ফেরেন। মিরাজ এ যাত্রা রিভিউ নিয়েও আউট হওয়া থেকে রক্ষা পাননি। প্রথম ইনিংসের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ৫ উইকেট পূর্ণ করেন রশীদ। শেষ উইকেটে অন্তত দিন পার করে ম্যাচ ড্র করার জন্য বাংলাদেশকে তখনও ৮ ওভার ব্যাট করে টিকে থাকতে হতো। কিন্তু ৩.২ ওভার বাকি থাকতেই রশীদ আবার আঘাত হানেন। তিনি ফিরিয়ে দেন সৌম্যকে (১৫) শর্ট লেগে ইব্রাহিম জাদরানের ক্যাচে পরিণত করে। সৌম্য অবশ্য রিভিউ নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মিরাজ আগেই বাংলাদেশের শেষ রিভিউটি নিয়ে ফেলেছিলেন। তাই মাত্র ১৭৩ রানে গুটিয়ে গিয়ে ২২৪ রানের বিশাল ব্যবধানে লজ্জাজনক পরাজয় মেনে নিতেই হয় বাংলাদেশ দলকে। এদিন একাই রশীদ ৩ উইকেট নিয়ে নিজ দলের জয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।

রশীদ মাত্র ৪৯ রানে ৬ উইকেট নেন। এটি তার ক্যারিয়ার সেরা। ম্যাচে ১০৪ রানে ১১ উইকেটও তার ক্যারিয়ার সেরা। জহির নেন ৩ উইকেট। প্রথম ইনিংসে ৫১ রানের একটি ইনিংসও খেলেছিলেন তিনি। ফলে অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচেই ৫০ রান ও ১০ উইকেটের বেশি নেয়ার বিরল রেকর্ড গড়েন রশীদ। সর্বোপরি অবশ্য পাকিস্তানের ইমরান খান ও অস্ট্রেলিয়ার এ্যালান বোর্ডার এ ধরনের কীর্তি গড়েছিলেন অধিনায়ক হিসেবে। এছাড়া আর কোন অধিনায়ক এমনটা করতে পারেননি। তবে ইমরান ও বোর্ডার অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকে সেটা করতে পারেননি। রশীদের অবিস্মরণীয় এ কীর্তির ফলে মাত্র তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই দ্বিতীয় জয় পায় আফগানরা। ১৪০ বছর আগে অস্ট্রেলিয়াও নিজেদের তৃতীয় টেস্টেই পেয়েছিল দ্বিতীয় জয়। সেই রেকর্ড এখন আফগানিস্তানেরও। ১৯ বছর ধরে টেস্ট ক্রিকেটে বিচরণ করা বাংলাদেশ দল এ নিয়ে একমাত্র দল হিসেবে ১০ টেস্ট খেলুড়ে দেশের কাছে হার দেখল। নিজেদের মাটিতে পছন্দসই উইকেট তৈরি করেও এমন লজ্জার স্বাদ তাদের দিয়েছে মাত্র এক বছর ধরে টেস্টে নামা আফগানিস্তান। তারা খেলেছে ৩ টেস্ট আর বাংলাদেশের এটি ছিল ১১৫তম টেস্ট। অভিজ্ঞ একটি দলকে এ ম্যাচে অনেক কিছুই শিখিয়ে দিল আফগানরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় শিক্ষা টেস্ট খেলার জন্য ব্যাটে-বলে ভাল পারফর্মেন্সটাই জরুরী, উইকেট কিংবা পরিবেশ নয়। সেজন্যই টেস্ট হার এড়াতে মাত্র ৭০ মিনিট আর ১৮.৩ ওভারই টিকতে পারেনি বাংলাদেশ দল।