২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ছেলে, শোকে স্তব্ধ মা রোমানা

গাফফার খান চৌধুরী ॥ বাসচাপায় স্বামীর মৃত্যুর শোক ভুলতে না ভুলতেই বাসের চাপায় ছেলে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ার ঘটনায় কষ্টে বোবা হয়ে গেছেন রোমানা পারভেজ। পিতার মৃত্যুতে লোককে খাওয়ানোর জন্য বাসে করে টঙ্গী বাজারে যাচ্ছিল। এ সময় সেই ভিক্টর কোম্পানির বাস ছেলেকে চাপা দেয়। এমন ঘটনায় শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো পরিবার। তাই তো মায়ের মুখ থেকে কোন কথাই বের হচ্ছে না। শুধু হাসপাতালে ছেলের বিছানার পাশে বসে আদরের সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কষ্টে ছেলের নাম পর্যন্ত ভুলে গেছেন। স্বামীর রোজগারে সংসার চলত। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলে বাসচাপায় মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার ঘটনায় রীতিমতো দিশাহারা পুরো পরিবার। বলছিলেন, পৃথিবীতে আমার মতো এমন পোড়াকপালী আর দ্বিতীয়টা পাওয়া যাবে না। বলেই ছেলের বুকের ওপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। বাস মালিক পক্ষের তরফ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ টাকা দেয়ার প্রস্তাবকে রীতিমতো তামাশা বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এর চেয়ে নির্মম তামাশা আর হতে পারে না। তিনি এমন ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। সোমবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বেসরকারী ট্রমা সেন্টারের ছয় তলায় গিয়ে দেখা যায়, বাসচাপায় নিহত সঙ্গীতশিল্পী পরিচালক পারভেজ রবের ছেলে বাসচাপায় মারাত্মকভাবে আহত ইয়াসির আলভীর (১৯) মাথায় তার মা শুধু হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মায়ের দু’চোখ দিয়ে শুধু অশ্রু ঝরছে। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইতেই তিনি আরও আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। গগনবিদারী আর্তনাদ করে ছেলের বুকের ওপর আছড়ে পড়েন। কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, পৃথিবীতে আমার মতো পোড়াকপালী আর দ্বিতীয়টা পাওয়া যাবে না। বাসচাপায় স্বামীর মৃত্যুর শোক ভুলতে না ভুলতেই একই কোম্পানির বাসের চাপায় ছেলে এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। অথচ বাস কোম্পানি ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ টাকা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। যা রীতিমতো পরিবারটির সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি স্বামী হত্যার ও ছেলেকে হত্যাচেষ্টার বিচার এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চাই। বলেই আবারও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। গত ৫ সেপ্টেম্বর তুরাগ থানা এলাকায় ভিক্টর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন সঙ্গীত পরিচালক পারভেজ রব (৫৬)। তিনি প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক আপেল মাহমুদের চাচাত ভাই। ট্রমা সেন্টারেই কথা হচ্ছিল আলভীর ছোট খালা মিতুর সঙ্গে। তিনি বলেন, ঘটনার পর ভিক্টর পরিবহন কোম্পানির তরফ থেকে কয়েকজন আলভীদের তুরাগ থানাধীন ধউরের বাসায় যান। তারা আলাপ আলোচনা শেষে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রস্তাব করেন। এ সময় তাদের পুরো পরিবারের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। বলা হয়, পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন পারভেজ রব। তার বড় ছেলে ইয়াসিন ইশরাক রব মালয়েশিয়ায় হোটেল ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করছে। তার খরচ তার পিতা দিয়ে থাকে। দ্বিতীয় ছেলে ইয়াসির আলভী রব উত্তরা টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিষয়ে অর্নাস পড়ছে। সে প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণীর ছাত্র। আর সবার ছোট রামিসা ইবনাত কামারপাড়া স্কুল এ্যান্ড কলেজের স্কুল শাখার সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। সবার পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবার চালানোর দাবি জানানো হয় বাস কোম্পানির কাছে। সে ক্ষেত্রে বাস কোম্পানি এককালীন টাকা দিলেও কোন অসুবিধা নেই। আবার সংসার ব্যয়ভার মিটিয়ে গেলেও কোন সমস্যা নেই। কিন্ত বাস কোম্পানি এক লাখ টাকার বেশি দিতে পারবে না বলে জানিয়ে চলে যায়।

পারভেজ রবের সবার ছোট সন্তান রামিসা প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বলছিল, গত ৮ সেপ্টেম্বর বাবার মৃত্যুর তিনদিন পর কুলখানি উপলক্ষে লোকজন খাওয়ানোর কথা। এজন্য গত শনিবার ৭ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক সোয়া আটটার দিকে আলভী টাকা আর বাজারের ব্যাগসহ বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটনকে নিয়ে টঙ্গী বাজারে রওনা হয়। তারা উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের সøুইসগেট এলাকায় বাসের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এ সময় ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের একটি গেটলক বাস সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তারা বাসটিতে উঠার জন্য সিগন্যাল দেয়। বাসটি গতি কমিয়ে দেয়। তারা উঠতে গেলে হেলপার দরজা বন্ধ করে দেয়। তারা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর পর আবার না উঠতে দেয়ার কারণ জানতে চাইতেই বাসটি জোরে চলা শুরু করে। ইতোমধ্যেই ওই বাসটি ঘেঁষে আরেকটি বাস যেতে থাকে। নিরুপায় হয়ে আলভী ও তার বন্ধু তখন জানালা ধরে ঝুলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করতে থাকে। যাতে তারা চাপা না পড়ে। কিন্তু ভেতর থেকে তাদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। ভিক্টর পরিবহনের বাসটি অপর বাসটির ঘা ঘেঁষে যেতে থাকে। এতে বাসের নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই আলভীর বন্ধু মারা যায়। আলভী কোনমতে বেঁচে গেলেও তার কোমর ভেঙ্গে যায়। প্রথমে তাকে পথচারীরা উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রবিবার তাকে ট্রমা সেন্টারে পাঠানো হয়। কাঁপা কাঁপা গলায় কথাগুলো শেষ করেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে কিশোরী রামিসা। কাঁদতে কাঁদতে সে বলছিল, আমাদের তো রোজগার করার কেউ নেই। আমরা কি খাব, কিভাবে আমাদের সংসার চলবে। বলেই হাসপাতালের ফ্লোরে বসে পড়ে। রামিসার কান্না দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা তার বড় খালা মনিরা আর ছোট খালা মিতুও অঝোরে কাঁদতে থাকেন।