১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশকে লজ্জায় ডুবিয়ে ঐতিহাসিক জয় আফগানদের

বাংলাদেশকে লজ্জায় ডুবিয়ে ঐতিহাসিক জয় আফগানদের
  • সাগরিকার বৃষ্টিও বাঁচাতে পারেনি সাকিবদের, রশীদের বিধ্বংসী বোলিংয়ে ২২৪ রানে জয়ী আফগানিস্তান

মোঃ মামুন রশীদ ॥ বৃষ্টিকে একমাত্র বন্ধু ভেবে নেয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। টেস্ট ক্রিকেটের নবীন সদস্য আফগানিস্তানের কাছে লজ্জার পরাজয় এড়াতে তাই সকলে কায়মনে প্রার্থনা করেছিলেন সাগরিকায় পঞ্চম দিন যেন বৃষ্টি অনেক তীব্র হয়। সেটি হয়েছে, বৃষ্টি অনেক বড় ভূমিকা রেখে আফগান তাঁবুতে হতাশার কালো মেঘ পুঞ্জীভূত করেছে। কিন্তু মাত্র ১৭.২ ওভার খেলা হয়েছে, তাতেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস আগের দিনের ৬ উইকেটে ১৩৬ রান থেকে গুটিয়ে গেছে মাত্র ১৭৩ রানে। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ২২৪ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাস্ত হয়েছে বাংলাদেশ দল। ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা লেগস্পিনার রশীদ খান একাই ৬ উইকেট নিয়ে এই জয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচেই। অভিজ্ঞ অফস্পিনার মোহাম্মদ নবিকে বিদায়ী টেস্টে তাই ঐতিহাসিক এক জয় উপহার দিতে পেরেছে সতীর্থরা। শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়া ছাড়া আর কোন দলই নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের প্রথম তিন টেস্টের দুটিতে জিততে পারেনি। আফগানিস্তান সেই ইতিহাস গড়ল।

আফগানদের জয়ের মঞ্চটা চতুর্থ দিনেই বেশ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যায়। যে স্বপ্নের বীজটা তারা প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশকে ২০৫ রানে গুঁড়িয়ে দিয়ে বপন করেছিল একমাত্র টেস্টের তৃতীয় দিন সকালেই। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লেগস্পিনার রশীদ ৫ উইকেট শিকার করে। এরপর সময় যত গড়িয়েছে সেই বীজ থেকে চারা বের হয়ে চতুর্থ দিন শেষে মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এই চারদিন ব্যাটে-বলে বাংলাদেশকেই বরং নবীন এক টেস্ট দলে পরিণত করেছে সফরকারীরা। গত বছর টেস্ট ক্রিকেটে পদার্পণ করা আফগানরা এখনও মর্যাদার এ ফরমেটে শিক্ষানবিশ। সেই নবিশদের কাছেই বড় কিছু শিক্ষা পেয়েছে ১৯ বছর ধরে ১১৪ টেস্ট খেলা বাংলাদেশ দল। নিজেদের ১১৫তম টেস্টে শুধু ঘরের মাটিতে ইচ্ছেমাফিক উইকেট বানিয়ে এবং বড়াই করে যে জেতা যায় না, টেস্ট জেতার জন্য লাগে ধৈর্য, স্থিরতা আর শক্ত মানসিকতা- এসবই বাংলাদেশ দলকে শিক্ষা দিয়েছে আফগানরা। হয়ত চতুর্থ দিনেই ম্যাচের ফলাফল হতে পারত। কিন্তু বৃষ্টির দাপটে চতুর্থ দিন খেলা হয়নি প্রায় ৪০ ওভার। এরপরও ৩৯৮ রানের বিশাল জয়ের লক্ষ্যে নেমে ৬টি উইকেট হারিয়ে মাত্র ১৩৬ রানে ধুঁকছিল বাংলাদেশ। পরাজয়ের শঙ্কা তখন বেশ জোরালোভাবেই বাজছিল। কিন্তু বৃষ্টি বাঁচিয়ে দেয় স্বাগতিকদের। সবাই তাই প্রার্থনা করছিলেন শেষদিনে যে মুষলধারে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে তা যেন সত্যি হয় আর খেলা না হলেই শুধু বাংলাদেশ দল বাঁচতে পারে।

সবাই যখন বৃষ্টিকে রক্ষাকারী হিসেবে দেখছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব তখন চতুর্থ দিন শেষে দলের মুমূর্ষু অবস্থাতেও বড়াই করে বলেছিলেন তিনি আর সৌম্য সরকার মিলেই এ টেস্ট জেতাতে পারেন। তবে পরাজয়ের তীব্র শঙ্কাকে উড়িয়েও দিতে পারেননি। তাই সঙ্গে বৃষ্টির ভূমিকাও লাগবে বাংলাদেশকে বাঁচাতে এমনটাও বলেছিলেন। সেই সাকিব পঞ্চম দিনে যতটুকু বাংলাদেশ দল খেলতে পেরেছে তার মধ্যে শুরুতেই বিদায় নিয়েছেন বাজে একটি শট খেলে। অনভিজ্ঞ স্পিনার জহির খানকে বিন্দুমাত্র সমীহ করেননি বলে দলকে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে ঠেলে দিয়ে পঞ্চম দিনের দ্বিতীয় ওভারেই ফিরে গেছেন। সকাল থেকেই তুমুল বৃষ্টিতে দুপুর ১টার আগে খেলা শুরু করা সম্ভব হয়নি। আফগানরা সাগরিকার গ্রাউন্ডসম্যান আর ভেন্যুর ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সেজন্য বন্ধু ভাবতেই পারে। এমন বৃষ্টির পরও খেলা শুরু হয়ে যায় দুপুর ১টায়। আম্পায়াররা জানিয়েছিলেন এদিন আরও ৬৩ ওভার খেলা হবে। আগের দিন সাকিব ৩৯ আর সৌম্য ০ রানে অপরাজিত ছিলেন। সেখান থেকে তারা বেশ ভালভাবেই শুরু করেছিলেন। কিন্তু মাত্র ১৩ বল আর ৭ মিনিট পরেই বৃষ্টি ফিরে আসে দাপুটে মনোভাব নিয়ে। তখন দলীয় রান ৬ উইকেটে ১৪৩; সৌম্য ২ আর সাকিব ৪৪ রানে পৌঁছে যান। সেই বৃষ্টি আর থামার যেন লক্ষণই ছিল না।

প্রায় আড়াই ঘণ্টারও বেশি বৃষ্টি হওয়ার পর থেমে যায়। এবারও দ্রুতই উইকেট প্রস্তুত হয়ে যায় খেলার জন্য। সবমিলিয়ে ৩ ঘণ্টা ১৩ মিনিট পর যখন খেলা শুরু হয়, আম্পায়াররা জানিয়েছিলেন ১৮.৩ ওভার খেলা হবে দিনে। তখনও আকাশে কালো মেঘমালার ঘনঘটা। এ সময়ের মধ্যে অলআউট না হয়ে টিকে থাকতে পারলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা ড্র করতে পাবেন আর আফগানদের প্রয়োজন মাত্র ৪ উইকেটের। তবে আশাবাদী হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা। কারণ অধিনায়ক সাকিব ও স্বীকৃত ব্যাটসম্যান সৌম্য তখনও ক্রিজে। হয়ত কলঙ্ক থেকে বাঁচা যাবে। কিন্তু নতুন করে খেলা শুরুর পর জহির খানের প্রথম বলেই বাজে শট খেলে ব্যক্তিগত ৪৪ রানে সাজঘরে ফেরেন অধিনায়ক সাকিব নিজেই। জহিরের বলে মেহেদী হাসান মিরাজ ব্যক্তিগত ৬ রানে ক্যাচ দিয়েও জীবন ফিরে পান। নবীন এই স্পিনারের সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে অধিনায়ক রশীদ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। মিরাজকে (১২) এলবিডব্লিউ করে সাজঘরে ফেরান তিনি। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি তিনি। পরের ওভারেই আবার তাইজুল ইসলামকে (০) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে প্রথম ইনিংসের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও ৫ উইকেট শিকার করেন রশীদ। তখন জয়টা সময়ের ব্যাপার হয়ে যায় আফগানদের জন্য। বাংলাদেশের লজ্জা এড়ানোর গুরুভার সৌম্য ও নাঈম হাসানের ওপর। কিন্তু তখনও প্রায় ৮ ওভার ব্যাট চালিয়ে টিকে থাকতে হবে। সেটি হতে দেননি রশীদ। বাংলাদেশের কফিনে শেষ পেরেকটা তিনিই ঠুকেছেন সৌম্যকেও (১৫) শর্ট লেগে দাঁড়ানো ইব্রাহিম জাদরানের ক্যাচে পরিণত করে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন আফগানিস্তানকে।

দিনের ৩.২ ওভার বাকি থাকতেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস মুখ থুবড়ে পড়ে ১৭৩ রানে। ২২৪ রানের জয় পায় আফগানরা। গত মার্চে দেরাদুনে আরেক নবীন টেস্ট দল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে জিতেছিল তারা। আফগানিস্তান দল হোম ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করে এটি। বিদেশ সফরে দ্বিতীয় ম্যাচেই (ভারত সফরের পর) জয় তুলে নিল তারা। বাংলাদেশ সেই জয় পেয়েছিল ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে (৯ বছর পর)। আফগানরা এক বছরেই সেই কৃতিত্ব গড়ল। কোন দেশের প্রথম ৩ টেস্টের দুটিতেই জয়, অস্ট্রেলিয়ার পর দ্বিতীয় কোন দল হিসেবে তা করে দেখাল আফগানরা। অফস্পিনার নবি আগেই জানিয়েছিলেন এই ম্যাচটি তার শেষ টেস্ট। তাই ম্যাচশেষে তাকে গার্ড অব অনার দিয়েছে আফগানরা এবং পুরো জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামও প্রদক্ষিণ করেছে। অধিনায়ক হিসেবে রশীদ তার প্রথম টেস্টেই দলকে জয় এনে দিয়েছেন দারুণ কিছু রেকর্ড গড়ে। দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি ৬ উইকেট নেয়াতে ম্যাচে ১১ উইকেট তুলে নিয়েছেন। ইনিংসের এবং ম্যাচের বোলিং ফিগারে এটি তার ক্যারিয়ার সেরা। তবে মূল কৃতিত্ব হচ্ছে অধিনায়ক হিসেবে হাফসেঞ্চুরির পর ম্যাচে ১০ উইকেট নেয়ার কৃতিত্বটাই বিরল। রশীদ প্রথম ইনিংসে অর্ধশতক হাঁকানোর পর ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়েছেন। রশীদের আগে অধিনায়ক হিসেবে সেটি করতে পেরেছিলেন পাকিস্তানের ইমরান খান ও অস্ট্রেলিয়ার এ্যালান বোর্ডার।