২০ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ খড়কী শরীফের আলা হযরত পীর শাহ্ আবদুল মতিন (রহ)

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

বাংলাদেশে প্রাচীন পীর খানদান হচ্ছে যশোরের খড়কী শরীফের পীর পরিবার। এই পরিবারের অষ্টম পীর হযরত মাওলানা শাহ্ সুফী আবদুল মতিন (রহ)। তিনি ২০১১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন এক উঁচু স্তরের কামিল পীর। তাঁর জানাজার সালাতে কয়েক লাখ লোক অংশগ্রহণে করেছিলেন। এই সালাতে ইমামতি করেছিলেন তাঁর বড় জামাতা বর্তমান লেখক। এই সময় বৃষ্টি হচ্ছিল যেন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল। কবরে যখন তাঁর বড় নাতি দ্বারিয়াপুর শরীফের ভাইয়া হুজুর আলহাজ আরিফ বিল্লাহ মিঠুসহ কয়েকজন শায়িত করছিলেন তখন মাটি কেঁপে উঠেছিল। সেই ভূকম্পনের রেশ সমগ্র বাংলাদেশে অনুভূত হয়েছিল যা সুদূর নেপাল পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। এই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে পাঞ্জাবের পীর অধ্যাপক খাজা হাফেজ আহম্মেদ খান (রহ) মীনারে নূর গ্রন্থে লিখেছেন : যশোরের খড়কীর পীর মাওলানা শাহ্ আবদুল মতিন (রহ) সত্যিকার অর্থে কুতুবে যামান। কুত্বে যামান অর্থ যুগের ধ্রুব নক্ষত্র।

বর্তমান লেখকের আব্বা হুজুর কেবলা বলেছিলেন, আমার বিয়াই শাহ্ আবদুল মতিন সত্যিকার অর্থে যুগ শ্রেষ্ঠ সুফী। উল্লেখ্য, কুত্ হচ্ছে উচ্চ স্তরের সুফীগণের খেতাব। গউসুল আযম হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ) বলেছেন : সমস্ত কুত্বের স্কন্ধে আমার পদযুগল এবং আমার স্কন্ধে স্থাপিত হয়েছে প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সা)-এর পদযুগল। এই ঘোষণা শুনে আজমীর শরীফে অবস্থানরত হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রহ) নিজের স্কন্ধ এগিয়ে দিয়েছিলেন। খড়কী শরীফের পীর খানদানের পূর্ব পুরুষ সুলতান আলাউদ্দীন খিলজীর আমলে ইয়েমেন হতে দিল্লীতে এসেছিলেন। সম্রাট আকবরের আমলে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের বিদ্রোহ দমনের জন্য রাজা মানসিংহের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভিযানে এই খানদানের এক পূর্ব পুরুষ আল্লাহর ওলী সৈয়দ সুলতান যশোরে আগমন করেন। চাঁচড়ার রাজা সুখদেব সিংহ রায় রাজা মানসিংহের বাহিনীকে বিপুল সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। যশোরের মনোরম দৃশ্য দেখে সৈয়দ সুলতান (রহ) এখানে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ রাজা সুখদেব সিংহ রায় রাজবাড়ীর খিড়কী এলাকায় প্রচুর নিস্কর ভূ-সম্পত্তি অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। এখানে সৈয়দ সুলতান (রহ) খানকা স্থাপন করেন। এলাকার নাম খিড়কী থেকে খড়কী নামে পরিচিত হয়। সৈয়দ সুলতানের বংশে অনেক আল্লাহর ওলীর আবির্ভাব ঘটে। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন শাহ সেলিম চিশতী, শাহ কলিম চিশ্তী শাহ আবদুল করিম (রহ), শাহ আব্দুল (রহ), শাহ্ আবুল খায়ের (রহ), শাহ্ আবদুল মতিন (রহ) প্রমুখ।

শাহ আবদুল মতিন (রহ)-এর দাদা শাহ আবদুল করিম (রহ) বাংলা ভাষায় সর্ব প্রথম বিস্তারিত নির্ভরযোগ্য মৌলিক ‘তাসাওউফ গ্রন্থ’ এরশাদে খালেকিয়া বা খোদা প্রাপ্তি তত্ত্ব রচনা করে বাংলা ভাষায় তাসাওউফ চর্চা দিগন্ত উন্মোচিত করে। এই গ্রন্থ বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে। এখনও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগে এ গ্রন্থ পড়ানো হয়। শাহ আবদুল মতিন লেখাপড়া করেছিলেন যশোর জেলা স্কুল, কলকাতা এবং ঢাকায়। তার কর্ম জীবনের সূচনা হয়েছিল যশোর জেলা স্কুলের শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে খুলনা তেরখাদা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন এবং যশোর মুসলিম একাডেমির প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি খড়কী দরবার শরীফের গদিনশিন পীর হন। তার দায়িত্বভার গ্রহণের মধ্য দিয়ে খড়কী দরবারের জৌলুস সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তিনি কাশ্ফ সম্পন্ন আল্লাহর ওলী। তাঁর সান্নিধ্যে যেই এসেছে সেই মুহূর্তের মধ্যে আলোকিত মানুষ হয়েছে। তাঁর সদা হাস্যমুখ, অমায়িক ব্যবহার মানুষকে মুগ্ধ করত। সবাই মনে করত হুজুর আমাকেই বেশি ভালবাসেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় তাঁর অসংখ্য মুরিদ মুতাকীদ রয়েছে। তাঁর কারামতের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। তিনি মানববাদী মহান পীর ছিলেন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে খড়কীতে তিনি স্থাপন করেন বহুতল বিশিষ্ট এক ইয়াতিমখানা। যার নাম আঞ্জুমানে খালেকিয়া। এই ইয়াতিমখানা ইয়াতিমরা কুরআন হিফ্জও করতে পারে যেমন তেমনি আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এখান থেকে পড়াশোনা করে অনেকেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে। অনেকেই বড় বড় চাকরিতে লিপ্ত হয়েছে।

হযরত মাওলানা শাহ্ আবদুল মতিন (রহ)-এর নির্দেশনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত হয়েছে বহু খানকা ও হুজরা শরীফ। খুলনা শাহপুরে; খুলনা শহরে, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে, ধাপের হাটে, পীরগঞ্জের রওশনপুরে, জয়পুরহাটে এমনি তার খানকা শরীফ রয়েছে। মূলত তিনি ছিলেন নফশ বন্দিয়া তরিকার পীর। তার তাওয়াজ্জু ও ফয়েজে তার অনেক মুরিদ আল্লাহর ওলীতে পরিণত হয়েছে। তার উদ্যোগে বহু রচনাবলী প্রকাশিত হয়েছে। এরশাদে খালেকিয়ার নব নব সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে মিনারে নূর আওয়ালিয়া সংলাপ, খড়কী দরবার প্রভৃতি। তিনি বহু দেশ সফর করেছিলেন। সৌদি আরব, পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড সস্ত্রীক সফর করেছেন। চীনের ক্যান্টক শহরে অবস্থিত বহু সাহাবায়ে কেরামের মাজার শরীফ জিয়ারত করেছিলেন। এখানে ম্যাসেঞ্জার মসজিদে হযরত আবু ওয়াক্কাস (রা) মাজার শরীফ জিয়ারত করেছিলেন। এই সময় অপরূপ অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল।

তার প্রথম সন্তান আলহাজ্জা মাহমুদা বেগম মায়া বর্তমান লেখকের বিবি সাহেবা। তার দ্বিতীয় সন্তান আলহাজ আবুল হাসানাত পিন্টু ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তার তৃতীয় সন্তান আবু সাঈদ বাবলু ইন্তেকাল করেছেন। তিনি ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তার চতুর্থ সন্তান মঈনুল হাসান লাভলু অল্প বয়সে ইন্তেকাল করেন। পঞ্চম সন্তান আহসান হাবীব মনি ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। বর্তমান তিনি অবসরপ্রাপ্ত। ষষ্ঠ সন্তান নাসরিন বেগম নীলা ঘর সংসার করছেন। সপ্তম সন্তান জাহিদ হাসান খশু ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। কনিষ্ঠ পুত্র কামরুল হাসান হাসু পিতার কায়েম মোকাম হিসেবে খড়কী দরবার পরিচালনা করে চলেছেন। তিনি খড়কীর মসজিদে আম্বারার কয়েকতলা বিশিষ্ট করেছেন।

হযরত মাওলানা শাহ সুফী আবদুল মতিন (রহ)-এর বড় নাতি আলহাজ আরিফ বিল্লাহ মিঠু দ্বারিয়াপুর শরীফের ভাইয়া হুজুুর হিসেবে সমধিক পরিচিত।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ