১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্মরণ ॥ শংকর গোবিন্দ চৌধুরী

  • সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। মানুষ হিসেবে তিনি মনুষ্যত্ব ও মহত্বের যে নিদর্শন রেখে গেছেন তা কখনই ভোলার নয়। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। নাটোরবাসীর আশা ও ভরসার জায়গা ছিলেন শংকর গোবিন্দ চৌধুরী। সবার ‘শংকর কাকা’। বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট বাবা জ্ঞানদা গোবিন্দ চৌধুরী ছিলেন নাটোরের ভাবনীর প্রজাহিতৈষী জমিদার। শিক্ষিত পরিবারে শংকর গোবিন্দ চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ৪ মার্চ। তিনি নাটোর, বগুড়ায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক এবং কলকাতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ার সময়ই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তিনি ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ হতে সব ধরনের আন্দোলন সংগ্রামে তিনি ছিলেন সক্রিয়। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে শাহাদাতবরণের ঘটনার পরবর্তী শাসন আমলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক কারণে অনেকবার কারাবরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষদের একজন ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি একাধিকবার নাটোর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি নাটোর সদর আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭নং সেক্টরের জোনাল কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্যও ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু তাঁকে নাটোরের গবর্নর নিযুক্ত করেন। ১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নাটোর সদর আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত ছিলেন। নাটোর রানী ভবানী মহিলা কলেজের (বর্তমানে সরকারী মহিলা কলেজ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এছাড়া নাটোর বনলতা হাইস্কুল, বড়গাছা হাইস্কুল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী উচ্চ বিদ্যালয়, দিঘাপতিয়া বালিকা শিশু সদন (এতিমখানা)সহ নাটোরের ডায়াবেটিক হাসপাতাল, আধুনিক বাসটার্মিনাল, নাটোর সুগারমিল তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে। দিঘাপতিয়া রাজবাড়ীকে ‘উত্তরা গণভবন’ ঘোষণার সময়েই তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন ঐতিহ্যবাহী নাটোর হবে উত্তরবঙ্গের রাজধানী। বঙ্গবন্ধু তাঁকে আশ্বস্তও করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর সবকিছুই থমকে যায়।

তিনি আইনের প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তার দুটি উদাহরণ এখানে তুলে ধরলামÑ ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক জমির সিলিং নির্ধারণের পরপরই তিনি ১০০ বিঘা জমি নিজে রেখে অনেক জমিজমা তাঁর এলাকার সাধারণ গরিব মানুষের মধ্যে রেজিস্ট্রি করে দেন- যাতে তারা চাষ-বাস করে খেতে পারে। অবশিষ্ট জমি সরকার বরাবর স্যারেন্ডার করেন। ১৯৯০ সালের ২৯ নবেম্বর কনিষ্ঠা কন্যার বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য (নির্ধারিত জনের অতিরিক্ত) সরকারী ফি জমা দিয়ে জেলা প্রশাসকের অনুমতি গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৯৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পরলোক গমন করেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মধ্যে বিরাজমান ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার সম্পর্ক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৯ সালের ১২ জানুয়ারি নাটোরে তাঁর স্মরণে ‘শংকর গোবিন্দ চৌধুরী’ আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণ শেষে উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৮ সালে তাঁকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর)’ প্রদান করা হয়।

লেখক : সচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়