১৭ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ স্বীকৃতি মিলল না!

  • মোশারেফ হোসেন শামীম

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাবার চাকরির সূত্রে আমরা তখন নোয়াখালী জেলার চৌমুহনীতে বসবাস করছিলাম। আমি ছিলাম চৌমুহনী কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র। বাবা ছিলেন ব্যাংকার। চৌমুহনী ছিল নোয়াখালী জেলার ব্যবসা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। সে কারণে পাক সেনারা দ্রুত চৌমুহনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পাক বাহিনীর আগমনে বাবা পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাই মে মাসের প্রথম দিকে আমাদের নানা বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই থানার মোবারকঘোনা গ্রামে ছিল আমার নানাবাড়ি। এই গ্রামটি চট্টগ্রাম জেলার শেষ প্রান্তে এবং এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ফেনী নদী। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে আমার নানাবাড়ির যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত। তাই ধারণা ছিল এই গ্রামে হয়ত কখনও পাক সেনারা প্রবেশ করবে না। কিন্তু জুন মাসের মাঝামাঝি একদিন সকালবেলা খবর এলো, পাক সেনারা আমাদের গ্রাম ঘিরে ফেলেছে এবং বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে যুবকদের খুঁজছে। এই খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে নানাবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা ফেনী নদীতে ঝাঁপ দিই এবং সাঁতার কেটে মাঝ নদীতে গিয়ে একটি নৌকায় আশ্রয় নিয়ে নিজকে রক্ষা করি। পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে একা হেঁটে বর্ডারের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। দুুপুর নাগাদ ছাগলনাইয়া বর্ডারে পৌঁছাই। বর্ডার অতিক্রম করে পুনরায় হেঁটে যাত্রা শুরু করি এবং সন্ধ্যায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হরিণা ক্যাম্পে উপস্থিত হই। হরিণা ছিল মূলত ট্রানজিট ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে ৪-৫ দিন অবস্থানের পর আমাকেও একটি দলের সঙ্গে ভারতের অসম রাজ্যের শিলচর লোহারবন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হয়। আমরাই ছিলাম এই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। শিলচর লোহারবন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে এক মাস প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলার শহর বর্ডারের ভারতীয় ক্যাম্পে। এখান থেকেই আমরা প্রায় সাড়ে তিন মাস ৪নং সেক্টরের সিলেট আলীনগর অঞ্চলে সম্মুখ গেরিলা যুদ্ধ করেছি। অক্টোবরের শেষের দিকে আমরা কৈলার শহর ক্যাম্প ত্যাগ করি। সেখান থেকে আমাদের কিছু সহযোদ্ধা উদয়পুর হয়ে নোয়াখালী প্রবেশ করে এবং আমি হরিণা হয়ে প্রথমে মিরসরাই ও পরে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করি। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনুযায়ী আমি ৩১-১-১৯৭২ইং তারিখে চট্টগ্রাম কোর্ট মালখানায় অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। মাত্র সতেরো বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি।

ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা না ভেবে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য ইতোপূর্বে আবেদন না করায়, মুক্তিবার্তায় নাম না থাকায় গেজেটভুক্ত না হওয়ায় ও সার্টিফিকেট না থাকায় আমি সরকারীভাবে স্বীকৃতপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হতে পারিনি। ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে যেসব মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছে এবং স্বাধীনতার পর ভারত সরকার যাদের তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করেছে তাদের আবেদন করে কেন স্বীকৃত পেতে হবে এই ক্ষোভ ও অভিমানে আমি ইতোপূর্বে তালিকাভুক্তির জন্য কখনও আবেদন করিনি। কিন্তু পরে জানতে পারলাম ভারতীয় তালিকাটি ছিল আংশিক এবং যেখানে আমার নাম খুঁজে পাইনি। (ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল এক লাখের ওপরে পক্ষান্তরে ভারতীয় তালিকায় নাম আছে মাত্র পঁয়তাল্লিশ হাজার)। তাছাড়া বাংলাদেশের বাস্তবতায় সার্টিফিকেট ছাড়া কোনভাবেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সম্ভব নয় এই উপলব্ধি থেকে ২০১৪ সালে প্রথম বারের মতো যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করি (উএও ১৯২২৮৭)। জামুকা আমার আবেদনটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ঢাকা মহানগর দক্ষিণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বিগত ২৬-০২-২০১৭ইং তারিখে আমি সাক্ষী সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা যারা আমার সঙ্গে প্রশিক্ষণও নিয়োছিল তাদেরসহ ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) কমিটির সম্মুখে উপস্থিত হই। কিন্তু কমিটি আমাকে জানিয়ে দেয় ঢাকায় যুদ্ধ না করার কারণে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আমার আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ নেই। জবাবে আমি কমিটিকে জানাই আমরা যারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে ৪নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছি তাদের সিলেটে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ ছিল না। তাই আমার সহযোদ্ধারা নিজ নিজ জেলায় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আমি ১৯৮৭ সাল থেকে ঢাকায় স্থানীয়ভাবে বসবাস করছি। সে কারণে ঢাকায় আবেদন করেছি। জামুকা আমাকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তালিকাভুক্ত করেছে। যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে সাক্ষী। আমি নিয়ম অনুযায়ী সাক্ষী সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ও অন্য প্রমাণপত্রসহ কমিটির সম্মুখে উপস্থিত হয়েছি। কাজেই এতে কমিটির আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু কমিটি বলে তারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যারা ঢাকায় যুদ্ধ করেনি তাদের যাচাই-বাছাই এ কমিটি করবে না। যেহেতু মুক্তিযুদ্ধে আমার শেষ অবস্থা ছিল চট্টগ্রামে, আমি সেখানেই অস্ত্র জমা দিয়েছি এবং আমার সহযোদ্ধারাও চট্টগ্রাম মহানগরে তালিকাভুক্ত। তাই যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আমাকে চট্টগ্রাম মহানগর কমিটিতে উপস্থিত হতে হবে এবং আমি সম্মত হলে এই সুপারিশ তারা জামুকাতে পাঠাবে। আমি তাৎক্ষণিক সম্মতি প্রদান করি এবং দ্রুত তাদের সুপারিশ জামুকাতে প্রেরণের অনুরোধ জানাই। পরে আমি সার্বিক বিষয়টি জামুকার উর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করি। তারা সুপারিশ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। কিন্তু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কমিটির এই সুপারিশ দীর্ঘ এক বছর পরও জামুকাতে পাঠানো হয়নি। এমনকি কমিটির সদস্য সচিব অতিঃ জেলা প্রশাসক (ভূমি)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করে বিষয়টি তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া সত্ত্বে¡ও কমিটির সুপারিশ জামুকাতে প্রেরণ করা হয়নি। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর যাচাই-বাছাই কমিটির কার্যক্রম সম্পন্ন হয়ে যায়। ফলে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া থেকে আমি ছিটকে পড়ি। রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারীভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার আমার রয়েছে। কিন্তু ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যাচাই-বাছাই কমিটির দায়িত্ব অবহেলার কারণে আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে শুরু হওয়া সর্বশেষ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ও স্থানীয় পর্যায়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। যার কারণে ২০১৮ সালের শেষ দিকে সেই তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে অনবরত লেখা হচ্ছে। এটি জাতির জন্য অত্যন্ত গ্লানিকর। তবে আশার কথা সম্প্রতি সরকার ভুয়া সনদ দাখিলকারী প্রায় ৪৭ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে একটি সঠিক ও নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করার পথ সুগম হবে। তবে একই সঙ্গে সরকারকে বাদ পড়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাও তালিকা থেকে বাদ পড়বে না। তার এই প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন হবেÑ এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : টানা সাতবার দেশের দ্রুততম মানব (১৯৭৫-১৯৮১) ও

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এ্যাথলেট