১৯ অক্টোবর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অপারেশন সারদা ॥ ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

  • শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

১৯৭১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। ২নং সেক্টরে মুক্তিবাহিনী কায়েমপুরে পাকসেনা ঘাঁটি আক্রমণ করে। এই সংঘর্ষে পাকবাহিনীর ২০১ জন সৈন্য নিহত হয়। ৭০টি পাকসেনা বাঙ্কার ধ্বংস হয়। অপরপক্ষে ১০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও ৬ জন যোদ্ধা আহত হয়। মুক্তিবাহিনী কায়েমপুর ঘাঁটি ও পাকসেনাদের প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র দখল করে। ৭নং সেক্টরে মুক্তিবাহিনী মর্টারের সাহায্যে শারদায় পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ওপর আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে পাকবাহিনীর ৩০ জন সৈন্য ও রাজাকার নিহত এবং ৫০ জন আহত হয়। রাজশাহীতে মুক্তিবাহিনী পাকবাহিনীর কানপুর অবস্থানের ওপর এক দুঃসাহসিক অভিযান চালায়। এই অভিযানে ২ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং পাকসেনা স্থাপিত ক্যাম্প ও ৭টি বাঙ্কার ধ্বংস হয়। কুমিল্লার চামুবসতিতে পাকবাহিনী আক্রমণ চালালে মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধারা প্রতিহত করে। এতে ৩ জন পাকসৈন্য নিহত ও ৫ জন আহত হয়। খুলনার ভোমরায় মুক্তিবাহিনী পাকসেনা অবস্থানের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। এই সংঘর্ষে পাকবাহিনীর ৪ জন সৈন্য নিহত হয়। রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, বিলুপ্ত আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সামরিক ট্রাইব্যুনালে গোপন বিচারের কাজ শেষ হয়েছে। পিডিপি প্রধান নুরুল আমিন পিটিআই প্রতিনিধিকে জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে পশ্চিম পাকিস্তান যাচ্ছেন। তিনি এ আলোচনায় দুষ্কৃতকারীদের অত্যাচারে এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আরও অর্থ বরাদ্দের দাবি করবেন বলে জানান। লে. জেনারেল নিয়াজী চট্টগ্রাম এলাকা সফর করেন। পরে তিনি রাঙ্গামাটি যান। সেখানে তাকে চাকমা প্রধান ও নির্বাচিত এমএনএ রাজা ত্রিদিব রায় অভ্যর্থনা জানান। জামালপুর জেলায় ইসলামপুর থানা আলবদর ইনচার্জ এবং জেলা শান্তি কমিটির প্রচার সম্পাদক মুহাম্মদ আব্দুল বারী দৈনিক সংগ্রামে এক চিঠিতে লিখেন, জামালপুরে পাকিস্তানপন্থী ও ইসলামপন্থী ছাত্ররা আলবদর বাহিনী গঠন করে দুষ্কৃতকারীদের জামালপুর, শেরপুর, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও নালিতাবাড়ি এলাকা থেকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত কথিকায় বলা হয়, ২৩ বছর ধরে নিরপরাধ অসহায় বাঙালীর ওপর যে অত্যাচার অবিচার আর নির্যাতন চলে আসছিল সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বাঙালীর দানা বাঁধা ক্ষোভ এবার ফেটে পড়েছে ’৭১-এর ২৫ মার্চে স্বাধীনতা সংগ্রামের বাঙালীর ওপর অস্ত্র ব্যবহার করছে। রক্তপিপাসু নরপিশাচরা বার বার রক্ত পান করছে। কিন্তু এবার বাঙালীর ধর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে, তাই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ স্বাধীনতাকামী বাঙালী তার স্বাধীনতা রক্ষাকল্পে এবার হাতে অস্ত্র নিতে শিখেছে- হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। আর তাই বাংলার তরুণ যুবকরা দলে দলে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর তরুণ যোদ্ধারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে সাহস আর কৃতিত্বের সঙ্গে প্রচুর শক্রসেনা খতম করে অস্ত্রের ভাষায় অস্ত্রের জবাব দিচ্ছে। আজকের আমাদের মুক্তিসংগ্রাম বাংলার সাড়ে সাত কোটি নর-নারীর মুক্তিসংগ্রাম। বাংলার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি আন্দোলনের এ ধারা দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অকাতরে এ সংগ্রামের সাফল্যের জন্য প্রাণ দিচ্ছে। বাংলার সামগ্রিক জনতার অর্ধাংশ যে নারী তারাও আজ পিছিয়ে নেই। তাদের মধ্যেও স্বাধীনতা-চেতনার পরিস্ফুটন আজ আমরা আমাদের মুক্তি সংগ্রামে দেখতে পাই। তাই দেখতে পাই ইতিহাসের পাতায় বীরাঙ্গনা খাওলা, চাঁদ সুলতানা থেকে শুরু করে জামিলা বোখারদ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার আর লায়লা খালেদের পাশে বাংলার বীরাঙ্গনা রওশনারা নিজের নাম যোজনা করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। এ প্রসঙ্গে কবির সেই বৈপ্লবিক চেতনার কথা স্মরণ করতে হয়। কবির ভাষায়- ‘এ বিশ্বে যা-কিছু সৃষ্টি চিরকল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ কিংবা- জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হয়েছে মহীয়ান। আজকের আমাদের এ সংগ্রামও বাংলার মাতা, ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে মহীয়ান হয়ে উঠেছে। আজকে দেখি বঙ্গমাতার হীরের টুকরো ছেলে যখন অশ্বধামের বলির মতো বর্বর পশুর হাতে স্বাধীনতা শিকারে পরিণত হয়েছে তখনও শোকাকিনী মাতা স্বগর্বে আর এক সন্তানকে তার প্রতিশোধ নিতে মুক্তি সংগ্রামে পাঠাচ্ছে। আজকে বাংলার ভগ্নীকুল তার নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েও ভাইকে দেশের স্বাধীনতা মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছে। আজকে বাংলার কুলবধূ স্বামী হারিয়েও রণাঙ্গনের পাশে বীর সৈন্যদের সেবাশুশ্রুষা করছে। নরপিশাচরা আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে হত্যা করে, পাইকারি হারে লুটতরাজ করে, মহিলাদের ইজ্জত নষ্ট করে-কামান, মেশিনগান, ট্যাঙ্ক চালিয়ে, নাপাম বোমা ব্যবহার করেও আমাদের মুক্তি সংগ্রামকে নস্যাৎ করতে পারেনি। কেননা আমাদের ভাইরা যখন রণাঙ্গনে থেকে শত্রু খতম করছে, বিভিন্ন জায়গায় সড়ক, সেতু উড়িয়ে দিচ্ছে তখন বাংলার মহিলারা তাদের অনুপ্রেরণায় শরীরে ডিনামাইট বেঁধে ট্যাঙ্ক ধ্বংস করছে। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় মহিলারা তাদের স্বেচ্ছাসেবিকা কেন্দ্র স্থাপন করে যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন ট্রেনিং গ্রহণ করছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে মহিলা সমাবেশ সৈন্যদের খাবার ও পোশাক তৈরি করা হচ্ছে। চিকিৎসালয়ে মা-বোনেরা নার্স হিসেবে তৎপর রয়েছে। ‘কোনকালে একা হয়নি জয়ী পুরুষের তরবারি-প্রেরণা দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।’ তাই বাংলার বিজয় লক্ষ্মী নারীরাও আজ বঙ্গবন্ধুর ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছে। জয় বাংলা। নতুন বাংলা পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায়, ইয়াহিয়ার দস্যু বাহিনী ঢাকা শহরকে এখন কার্যত বন্দী শিবিরে পরিণত করেছে। উপর্যুপরি কমান্ডো ও গেরিলা আক্রমণে ভীত হয়েই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও মুক্তিবাহিনীর তৎপরতা বন্ধ হয়নি। পাকিস্তানী বাহিনী শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করেছে। বুড়িগঙ্গা নদীতে সশস্ত্র টহলদার বাহিনী গানবোট ও লঞ্চযোগে দিবারাত্র ঘোরাফেরা করছে। শহরের সহিত অন্যান্য স্থানের যোগাযোগ একেবারেই নেই বললেই চলে। শহর থেকে বহিরে সড়কসমূহের প্রবেশ পথে সশস্ত্রবাহিনীর কড়া চেক পোস্ট ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে ঢাকা ও বরিশালের মধ্যে লঞ্চ চলাচল করছে। তাও আবার অনিয়মিত। সন্ধ্যা হলেই স্থল ও জলপথে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পানির ট্যাঙ্ক ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীর ২৪ ঘণ্টা প্রহরা মোতায়েন রয়েছে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের অধিকৃত অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে আবার নতুন করে শিক্ষক, শিল্পী, আইনজীবী সাংবাদিক তথা বুদ্ধিজীবী গ্রেফতার করা হচ্ছে। জঙ্গীশাহীর নির্যাতনের ফলে অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীই বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন শিক্ষকসহ কয়েকজন শিল্পী ও আইনজীবী গ্রেফতার হয়েছেন। গ্রেফতারকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আহমদ শরীফ, আবুল খায়ের, রফিকুল ইসলাম, শহীদুল্লাহ প্রমুখ রয়েছেন। পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনে অবস্থিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী শিবির হতে প্রেরিত এক পত্রে জানা যায়, সম্প্রতি বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদকে ঢাকায় তার বাসভবন হতে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই একইপত্রে জানান হয়, বরিশালের বিশিষ্ট আইনজীবী আব্দুস সাত্তার হাওলাদারকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। বলা হয় যে, এসব গ্রেফতারের পর গ্রেফতারকৃতদের আর কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। দৈনিক কালান্তরের সংবাদ থেকে জানা যায়, সম্প্রতি কলকাতার জামশেদপুরে জনসভায় বিশ্ব শান্তি সংসদের ইতালির কমিউনিস্ট নেতা ও সংসদ সদস্য শ্রী অন্টনিলা ট্রম্বোদরি এবং লেবাননের জননেতা মুহাম্মদ টব্বো তাদের ভাষণে অবিলম্বে বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের দাবি করেন। স্থানীয় সাকচি বেঙ্গল ক্লাবে বাংলাদেশ সংহতি কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় কমিউনিস্ট ও শ্রমিক নেতা শ্রী বারিন দে। শ্রী ট্রম্বোদরি পাকিস্তানে ইয়াহিয়া খানের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সেখানকার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে স্বাগত জানিয়ে তার ভাষণ শুরু করেন। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যে ব্যাপক গণহত্যা ও চন্ডনীতি গ্রহণ করেছে তার বিরুদ্ধে ধিক্কার জানান। শ্রী ট্রম্বোদরি বলেন, যদি ইয়াহিয়া খান ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করেন তবে তার পরিণতি মুসোলিনির মতোই হবে। তিনি দাবি করেন, অবিলম্বে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দিয়ে জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে। বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম কে সহায়তা করার জন্য তিনি ভারত সরকারের প্রশংসা করেন। মুহাম্মদ টব্বো সভায় ঘোষণা করেন যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার চক্রান্তকে ব্যর্থ করার জন্য তারা বিশ্বের জনমত জাগ্রত করবেন। তিনি মুক্তি সংগ্রামের সাফল্যের জন্য যুক্তফ্রন্ট গঠনের উপর বিশেষ জোর দেন। বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আলী আকসাদ তার ভাষণে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পটভূমি বর্ণনা করেন। মুক্তি সংগ্রামকে সাহায্য করার জন্য ভারতসহ বিশ্বের প্রগতিশীল জনগণের কাছে তিনি ভাষণে আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, ওই সভায় জামশেদপুর ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সহায়ক সমিতির’ সভাপতি ডাঃ বিশ্নপদ মুখার্জি আলী আকসাদের হাতে এক হাজার টাকার একটি চেক মুক্তি সংগ্রামীদের সাহায্যের জন্য প্রদান করেন। সভায় বিশ্ব শান্তি সংসদের ওই দুই নেতার আগমন উপলক্ষে স্থানীয় স্টেশনে তাদের বিপুলভাবে সংবর্ধনা দেয়া হয়। তারা সভাশেষে কয়েকটি আলোচনা সভায়ও যোগ দেন। ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কুষ্টিয়ার বাবলা চড়া ইউনিয়ন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান তার অধীনস্থ ২২ জন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে তাদের কাছে রক্ষিত বিপুল পরিমাণ রাইফেল, মেশিনগান, শটগান, স্টেনগানসহ মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ‘কালান্তর’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়- গত ১৫ দিনে খুলনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমার সাড়ে ৬৩ বর্গমাইল অঞ্চল থেকে মুক্তিবাহিনী খান সেনাদের হটিয়ে দিয়ে মুক্ত এলাকা স্থাপন করেছে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

sumahmud78@gmail.com